বলিউডে সময়ের সেরা পরিচালক কে, এমন প্রশ্নের জবাবে অনেকের মুখেই হয়ত উচ্চারিত হবে রাজকুমার হিরানীর নাম। তবে তিনিই যে বর্তমান সময়ে বলিউডে অন্য সব পরিচালকের থেকে এগিয়ে, এমনটিও ঠিক জোরের সাথে বলা সম্ভব না। এর কারণ তাঁর কাজের স্বল্পতা। পরিচালক হিসেবে সাড়ে বারো বছরের ক্যারিয়ারে এখন অবধি মাত্র চারটি ছবি মুক্তি পেয়েছে তাঁর – মুন্নাভাই এমবিবিএস, লাগে রাহো মুন্নাভাই, থ্রি ইডিয়টস আর পিকে। রক্ষণশীল অনেক সমালোচকই তাই বলে থাকেন, এত অল্প কাজের মাধ্যমে কোন নির্মাতাকে বিচার করা যায় নাকি! যদি অন্য কোন পরিচালকের ব্যাপারে কথা বলা হতো, সেক্ষেত্রে এই উত্তরই বিনা বাক্যব্যয়ে মেনে নেয়া যেত। কিন্তু ব্যক্তিটি রাজকুমার হিরানী বলেই কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাচ্ছে না। কারণ এখন পর্যন্ত মাত্র চারটি ছবি মুক্তি পেলে কী হবে, সেই চারটি ছবি দিয়েই কোটি কোটি ভক্তের মনে জায়গা করে নিয়েছেন তিনি।

তাঁর ছবিগুলো একাধারে যেমন বক্স অফিসে ঝড় তুলেছে, তেমনই সমালোচকদের কাছ থেকেও কুড়িয়েছে নিরন্তর প্রশংসা। তাই পঞ্চম ছবি ‘সাঞ্জু’ যখন মুক্তির দোরগোড়ায়, লাইমলাইটে যতটা এ ছবিতে মুখ্য ভূমিকায় অভিনয় করা রনবীর কাপুর, ঠিক ততটাই ক্যামেরার পেছনের সৃষ্টিকর্তা রাজকুমার হিরানীও। সবাই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে আছে, এবার কোন চমক নিয়ে হাজির হচ্ছেন তিনি। ছবির ফার্স্ট লুক, টিজার আর ট্রেইলারের মাধ্যমে ইতিমধ্যেই অনেক চমকের দেখা মিলেছে বটে, কিন্তু মূল ছবিতে যে আরও অনেক অবিশ্বাস্য চমকের দেখা মিলবে, সে কথা বলাই বাহুল্য। ‘সাঞ্জু’ কতটা মুগ্ধতার আবেশ ছড়াবে দর্শকের মনে, আর কতটাই বা সাফল্য পাবে বানিজ্যিকভাবে, সেসব সময়ই বলে দেবে। তবে তার আগে রয়টার্সের মুখোমুখি হয়ে অনেক অজানা কথাই বললেন ৫৫ বছর বয়সী হিরানী। এগিয়ে চলোর পাঠকদের জন্য থাকছে সেই সাক্ষাৎকারের বাংলা অনুবাদ।

* আপনার ক্যারিয়ারের একটি বড় অংশের সাথে জড়িয়ে সঞ্জয় দত্তের নাম। বিশেষত মুন্নাভাই ছবিগুলোর কারণে। তাই সাঞ্জু নির্মাণ করতে গিয়ে দৃষ্টিভঙ্গির জায়গা থেকে নিরপেক্ষ থাকাটা কি খুব কঠিন কাজ ছিল না?

– হ্যাঁ, আমি আগেও তাঁর সাথে ছবি করেছি। তবে সাঞ্জুকে কখনোই আমি খুব কাছের বন্ধু বলে মনে করিনি। সে ছিল একজন অভিনেতা যিনি আমার ছবিতে কাজ করত। এজন্য আমাদের মধ্যে বেশ হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক ছিল বটে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে আমরা একসাথে ডিনারে যেতাম বা পান করতাম। সাঞ্জুর অন্য অনেক বন্ধু ছিল। কিন্তু আমার সাথে সে সবসময়ই একটা দূরত্ব বজায় রাখত, খুব সাবধানে কথা বলত। তাই আমরা যখন একসাথে কাজ করতাম, আমি তাঁর জীবনের ব্যাপারে খুব বেশি কিছু জানতাম না। শুধু তাঁর সম্পর্কে যেটুকু শুনেছি বা পড়েছি আরকি। কেবল তখনই আমি তাঁর ব্যাপারে সত্যিকারের মুগ্ধ হয়ে গেলাম, যখন তাঁর নিজের মুখে আমি তাঁর জীবনের গল্পগুলো শুনলাম। এবং এ মুগ্ধতাও এ কারণে নয় যে আমি তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে চিনতাম। বরং এ কারণে যে আমি ভাবতাম, ‘এমনটিও কি কারও জীবনে ঘটতে পারে!’ চলচ্চিত্র নির্মাতারা অনেক লোভী মানুষ হয়। আমরা সন্ধানে থাকি ভালো গল্প বা বিষয়ের। আর এই গল্পটি তো সরাসরি আমার কাছে এসে ধরা দিয়েছিল।

সঞ্জয় দত্ত, সুনীল দত্ত, বলিউড, বোম্বে ব্লাস্ট, বেআইনী অস্ত্র, নার্গিস

* আজকাল বলিউডে আমরা প্রচুর বায়োপিক দেখতে পাচ্ছি। আপনার কী মনে হয়, একটি ভালো বায়োপিক বানানোর জন্য কী কী প্রয়োজন হয়।

– বায়োপিক জিনিসটাকে বলা যায় একদমই ভিন্ন ধাঁচের একটি দৈত্য। বায়োপিকের ব্যাপারে আমাদের প্রাথমিক আকর্ষণগুলো মূলত জন্মায় কোন ব্যক্তির জীবনের ছোট ছোট ঘটনাগুলোর ব্যাপারে শুনে। আপনি যখন একটি কাল্পনিক কাহিনী রচনা করছেন, আপনি জানেন যে এটি সম্পূর্ণ আপনার নিজস্ব কাহিনী। কিন্তু আসল লড়াইটা শুরু হয় যখন আপনি সেই কাহিনীর উপর ভিত্তি করে চিত্রনাট্য লিখতে বসেন। আপনাকে প্রতিমুহূর্তে ভাবতে হয় কী করে প্রতিটি দৃশ্যকে কাহিনীর সাথে প্রাসঙ্গিক ও বিনোদনপূর্ণ রাখা যায়। বায়োপিকের ক্ষেত্রে যেটি হয়, আপনি প্রতিটা ছোট ছোট ঘটনা শুনেই ভাবতে থাকেন এটি কী আমার ছবিতে রাখা যায়? কিন্তু এসব ছোট ছোট ঘটনা দিয়ে তো আর একটি গোটা ছবি হয় না। আপনার কাহিনীতে একটি মূল মেরুদন্ড থাকা চাই, যেটিকে কেন্দ্র করে পুরো ছবির কাহিনী আবর্তিত হবে। এই ছবিটি বানাতে গিয়ে আমি এই জিনিসটিই আবিষ্কার করেছি। শুরুতে আমি ছোট বড় সব ঘটনার ব্যাপারেই আকৃষ্ট হয়ে পড়েছিলাম। কিন্তু গল্পটি লিখতে গিয়ে আমরা অনুধাবন করলাম যে শুধু এগুলোই যথেষ্ট নয়। আমাদেরকে পুরো কাহিনীটিকে এক সুঁতোয় গাঁথার মত কিছু একটি থাকতে হবে।

দেখুন, বেশিরভাগ ছবিই কিন্তু সফল ব্যক্তিত্বদের নিয়ে। আপনি ভাগ মিলখা ভাগ বা ধোনীর মত ছবি দেখেন। কিংবা গান্ধী বা লিংকনের উপর বায়োপিকও। প্রতিটি ছবিই শেষ হয় বিশাল কোন অর্জনের মাধ্যমে। কিন্তু সাঞ্জুর ক্ষেত্রে সেটি হচ্ছে না। এজন্য আমি যতটা মনে করেছিলাম, ছবির গল্পটি লেখা তারচেয়েও অনেক বেশি কঠিন কাজ হয়ে উঠেছিল। দেখা যাক শেষ পর্যন্ত কী হয়। আমি তো আশা করি মানুষ গল্পটি পছন্দই করবে।

* যেহেতু আপনার ছবির মূল চরিত্রটি খুবই ঘটনাবহুল একটি জীবন পার করে এসেছে, সেক্ষেত্রে আপনি কীভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে কোন বিষয়গুলোকে ছবিতে রাখবেন আর কোন বিষয়গুলোকে রাখবেন না? আপনি কি কিছু কিছু ঘটনাকে নিজের মত করে ঝাড়ামোছা করে নিয়েছেন?

– সেটি তো আপনাকে করতেই হবে। সে আপনি যেকোন বায়োপিকের কথাই চিন্তা করুন না কেন। যেমন অ্যাটেনবরোর গান্ধী ছবিটির কথা ভাবুন। ওখানে কিন্তু গান্ধীর ব্যক্তিগত জীবনের কোন উল্লেখই ছিল না। অথচ গান্ধীর ব্যক্তিগত জীবনও কিন্তু অনেক নাটকীতায় পূর্ণ ছিল। যেমন ছেলের সাথে তাঁর সম্পর্কের বিষয়টি, যেটিকে তাঁরা পুরোপুরি বাদ দিয়ে দিয়েছিল। এমনকি স্বাধীনতা সংগ্রামের সময়টিকেও তাঁরা অনেক বেশি সংক্ষিপ্ত করে দিয়েছিল। এক ঘটনার সাথে আরেক ঘটনা জুড়ে দিয়েছিল। ছবি বানানোর সময়ে এই কাজটি করতেই হবে। নাহলে মাত্র আড়াই ঘন্টায় আপনি কী করে গোটা একটি কাহিনী বলে শেষ করবেন? সেক্ষেত্রে হয় আপনাকে একটি নেটফ্লিক্স সিরিজ বানাতে হবে, নয়ত ১০০ পর্বের উপরে একটি টিভি সিরিজই।

সঞ্জয় দত্ত, সুনীল দত্ত, বলিউড, বোম্বে ব্লাস্ট, বেআইনী অস্ত্র, নার্গিস

* যখন আপনি ঘটনাগুলোকে বাছাই করেন, কিসের উপর ভিত্তি করে তা করেন? আগে যেমনটি বলছিলেন কাহিনীর মেরুদন্ডের কথা, তার সাথে কি এর কোন যোগসূত্র রয়েছে?

– না, তারও আগেই আপনাকে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিতে হয় যে জীবনের কোন বিষয়গুলোর উপরে আপনি মূলত ফোকাস করতে চান। এই ছবির ক্ষেত্রে যেটি ঘটেছে, আমি মনে করেছি মানুষের তাঁর (সঞ্জয় দত্তের) অস্ত্র নিয়ে কাহিনীটি জানা প্রয়োজন। কারণ এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমি যদি এটিকেই না রাখতাম, তাহলে বায়োপিকটি দাঁড়াতই না। এবং তাঁর মাদকজীবনের কাহিনীও। কীভাবে নিজের প্রথম ছবিটির পরই সে মাদকের সাথে জড়িয়ে পড়ে, আর সবাই ভেবে নিয়েছিল সে বুঝি আর বাঁচবেই না। কিন্তু সে এই সময়গুলোকে পিছে ফেলতে পেরেছি। মূলত এই প্রধান দুইটি বিষয় নিয়েই আমার ছবি। বাকি সবকিছু, সত্যি কথা বলতে, ঘটনাক্রমে উপস্থিত হয়েছে। যেমন তাঁর সম্পর্কের কাহিনী বা এসব কিছু। অনেক মানুষই এগুলোর সাথে জড়িয়ে ছিল। কিন্তু এটি মূল কাহিনী নয়।

* বলিউডের ব্যাপারে এ বিশ্বাস রয়েছে যে এখানকার লোকজন খুব সহজেই নিজেদেরকে ক্ষমা করে দেয়। সঞ্জয় দত্তের জীবনের দিকে তাকালেও অনেকেই মনে করে তিনি ছিলেন এমন একজন ব্যক্তি যিনি অপরাধ করেও খুব সহজেই পার পেয়ে গিয়েছেন, যা একজন সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে কখনোই সম্ভব ছিল না। আপনার ছবিতেও কি তাঁর এই পাপমুক্তির বিষয়টি স্থান পেয়েছে?

– আগে আপনি আমাকে বলুন, এ জাতীয় ধারণা সৃষ্টি হয়েছে কীভাবে? এগুলো কী তাঁর ব্যাপারে যা কিছু লেখা হয়েছে, কেবল সেগুলোর উপর ভিত্তি করেই গড়ে ওঠেনি? অথচ তাঁর ব্যাপারে যা কিছু লেখা হয়েছে, সেগুলো তো কেবল একটি বহিরাবরণকেই স্পর্শ করতে পেরেছে। ঘটনার গভীরে তো সেগুলো কখনো প্রবেশ করেনি। প্রথম কথা হলো, আমি সঞ্জয় দত্তকে নির্দোষ হিসেবে উপস্থাপন করিনি। আপনি সেটা ছবিটি দেখার সময়ই টের পাবেন। কিন্তু তাঁর অপরাধটি কী ছিল? হ্যাঁ, সে নিজের কাছে বন্দুক রেখেছিল। কিন্তু তা দিয়ে কি সে কাউকে খুন করেছিল? বা সে কি কাউকে ওই বন্দুক দিয়ে খুন করার হুমকি দিয়েছিল? তাহলে এই সবকিছু কেন ঘটল? এর পেছনে কারণ কী ছিল? সেটিই আমার ছবির কাহিনী। ছবিটি দেখতে গিয়ে এসব জিনিসই আপনারা আবিষ্কার করবেন।

* আপনার ছবিগুলোর ক্ষেত্রে একটি ব্যাপার ধ্রুব ঘটনায় পরিণত হয়েছে। তা হলো, আপনার ছবিতে সবসময়ই একটি সামাজিক বার্তা থাকে। কোন একটি বড় ইস্যুর উপর আপনি নিজের বক্তব্য তুলে ধরার চেষ্টা করেন। এই বিষয়গুলো কি সাঞ্জুতেও রয়েছে?

– হ্যাঁ। তবে আগে থেকে এর বেশি কিছু আমি বলতে পারছি না।

* আপনি কি আমাদের কোন আভাসও দেবেন না?

– দেখুন, ছবিটিতে প্রাথমিকভাবে তিনটি জিনিস রয়েছে। এক তো হলো পিতা-পুত্রের সম্পর্ক, তারপর একটি বন্ধুত্বের কাহিনী, আর সবশেষে একটি প্রশ্নবোধক চিহ্ন। শেষ জিনিসটির জন্যই আপনাদেরকে ছবিটি দেখতে হবে।

* সবসময়ই আপনার ছবিতে কোন না কোন বার্তা থাকবে, এই বিষয়টি কি আপনার জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ?

– না, কিন্তু এটি হয়েই যায়। আপনি যখন একটি স্ক্রিপ্ট লিখছেন, আপনি এর মাধ্যমে নিজের জীবনেও প্রবেশ করছেন, এবং আপনার নিজের ভেতরে যেসব আদর্শ-বিশ্বাস রয়েছে, সেগুলোও স্বাভাবিকভাবেই কাহিনীর সাথে মিশে যায়। কিন্তু আমার কখনোই মনে হয় না যে চিত্রনির্মাতা হিসেবে এটি আমাদের কর্তব্যের পর্যায়ে পড়ে যে সবসময়ই আমাদের ছবিতে কোন না কোন বক্তব্য থাকতেই হবে। আপনি যদি মানুষকে বিনোদিত করতে পারেন, সেটিই যথেষ্টের চেয়েও অনেক বেশি।

Comments
Spread the love