সমগ্র ভারতজুড়ে মটরবাইক চালিয়ে আত্মহত্যা ও বিষণ্ণতার বিরুদ্ধে প্রচারণা চালানোয় বিশেষ সুখ্যাতি ছিল সানা ইকবালের। কিন্তু জীবনে শেষবার তিনি সংবাদের শিরোনাম হলেন এমনভাবে, যা কারও সুদূরতম কল্পনাতেও ছিল না। এক নির্মম সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হয়ে অকালেই জীবনাবসান হয়েছে সানার। গতবছরের ২৪শে অক্টোবর আনুমানিক বিকাল সাড়ে তিনটার দিকে হায়দ্রাবাদ শহর থেকে একটু বাইরে এক স্থানে গাড়ি দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয় তার। এ সময় একই গাড়িতে তার সাথে ছিলেন তার স্বামী আব্দুল নাদিমও।

আত্মহত্যাবিরোধী প্রচারণায় ভারতজুড়ে ৩৮ হাজার কিলোমিটার মোটরসাইকেল চালিয়ে ভ্রমণ করেন সানা। ২০০৫ সালের নভেম্বরে তিনি আত্মহত্যাবিরোধী প্রচারণায় তার মোটরসাইকেলযাত্রা শুরু করেন। শুরুতে বেশ মানসিক চাপের মুখে ছিলেন। এই চাপ কাটানোর কোনো পথ খুঁজে পাচ্ছিলেন না তিনি। তবে বাইকযাত্রা শুরু করার পর বিভিন্ন অঞ্চলের লোকজনের সঙ্গে কথাবার্তায় তার জীবন সম্পর্কিত দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে যেতে থাকে। নিজের অভিজ্ঞতার সূত্রে তিনি জীবন সম্পর্কে হতাশ হয়ে পড়া ও বিভিন্নভাবে মানসিক চাপে থাকা তরুণদের সমস্যা থেকে উতরাতে পরামর্শ দেওয়া শুরু করেন। 

আত্মহত্যার মতো জঘন্য অপরাধমূলক কাজ যেন কেউ না করে সে ব্যাপারে তিনি মানুষজনকে অনুপ্রেরণা দেওয়া শুরু করেন। এই কাজে তিনি ভারতজুড়ে বিভিন্ন স্কুল-কলেজ পরিদর্শন করেন। এমন অনুপ্রেরণাদায়ক কাজের মাধ্যমে অনেকের কাছেই রোল মডেল হয়ে উঠেছিলেন সানা। তাই তার মৃত্যুর ধরণ, এবং তাকে কেন্দ্র করে পরবর্তীতে যেসব ঘটনাপ্রবাহ, তা সত্যিই দুঃখজনক।

মৃত্যুর ২৪ ঘন্টা যেতে না যেতেই তার মৃত্যু নিয়ে নানা সন্দেহ ডানা মেলতে শুরু করে দিয়েছিল। সানার মৃত্যুর পরদিন তার সানার মা দাবি করেছিলেন যে তার মেয়ের মৃত্যু নিছকই কোন সড়ক দুর্ঘটনার কারণে হয়নি। বরং মেয়ের মৃত্যুকে তিনি আখ্যায়িত করছেন ‘হত্যাকান্ড’ হিসেবে, এবং এ ব্যাপারে অভিযোগের আঙ্গুল তুলছেন স্বয়ং নিজের মেয়ের জামাইয়ের দিকে। এ ব্যাপারে তিনি ২৫শে অক্টোবর সংবাদমাধ্যমের সামনে এসে বলেন, ‘গতকাল সে (সানার স্বামী নাদিম) সুপরিকল্পিতভাবে এই কাজটি করে, এবং সেটিকে এমনভাবে উপস্থাপন করে যেন সবার কাছে এটিকে দুর্ঘটনা বলে মনে হয়। কিন্তু আদতে এটি ছিল আগে থেকে সাজানো গোছানো, ঠান্ডা মাথার একটি খুন।’

তবে স্থানীয় পুলিশ সানার মায়ের দাবিকে খুব একটা আমলে নেয়নি। তারা এখনও এটিকে সড়ক দুর্ঘটনা বলেই মনে করছে, এবং এমন কোন সূত্রের হদিস তারা এখন পর্যন্ত পায়নি যা থেকে এটিকে হত্যাকান্ড বলে মনে হতে পারে। মাধাপুর জোনের পুলিশ ডেপুটি কমিশনার বিশ্ব প্রসাদ ঘটনার পরে বলেছিলেন, ‘প্রাথমিক তদন্ত থেকে এমন কিছুই বের হয়ে আসেনি যা থেকে আমাদের কাছে এটিকে সড়ক দুর্ঘটনা ভিন্ন অন্য কিছু মনে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘তাছাড়া মৃতের স্বামী নিজেও মারাত্মকভাবে জখমের শিকার হয়েছেন। তাই তার ওপর খুব একটা সন্দেহ আমরা করছি না।’ তবে তারপরও সানার মায়ের অভিযোগ খতিয়ে দেখা হবে বলে আশ্বাস দিয়েছিলেন তিনি।

নরসিঙ্গি পুলিশ স্টেশনের ইন্সপেক্টর জি ভি রামান গৌড় বলেন সানা ও তার স্বামী নিজেদের বাসার উদ্দেশে যাচ্ছিলেন। সানার স্বামী নাদিম গাড়িটি চালাচ্ছিলেন, কিন্তু অতি দ্রুতবেগে চালানোর কারণে গাড়িটি সড়কদ্বীপে আঘাত হানে। এতে গাড়ির বাম দিকের অংশ পুরো চুরমার হয়ে যায়। যদিও গাড়িতে থাকা দুজনেই সিট বেল্ট পরিহিত অবস্থাতেই ছিলেন, তারপরেও তারা মারাত্মকভাবে জখম হন। হাসপাতালে নেয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসকেরা সানাকে মৃত ঘোষণা করেন। তবে নাদিম এখনও চিকিৎসাধীন অবস্থায় রয়েছেন।

সানার মা যে অভিযোগ তুলেছেন, তা স্বীকার করে গৌড় বলেছিলেন, তারা এ ব্যাপারে তদন্ত করে দেখবেন, এবং সানার পরিবারকে জানিয়েছেন তাদের অভিযোগের স্বপক্ষে কোন সাক্ষ্যপ্রমাণ থাকলে তা উপস্থাপন করতে।

মৃত্যুর আগের মাসে সানা তার মোবাইল থেকে কাছের কয়েকজন বন্ধু ও পরিবারের সদস্যদের মেসেজ দিয়েছিলেন যে তার জীবন হুমকির মুখে রয়েছে, এবং হঠাৎ করে যদি তিনি হার্ট অ্যাটাক বা ব্রেইন স্ট্রোকের কারণে মারা যান তার জন্য দায়ী হবে তার স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির অন্যান্য সদস্যরা।

তবে এ ব্যাপারে গৌড়ের বক্তব্য, ‘হ্যাঁ, ওই সময়ে তাদের দুজনের মধ্যে কোন একটি বিষয় নিয়ে হয়তো দ্বন্দ্ব চলছিল, কিন্তু এই সড়ক দুর্ঘটনার সাথে ওই ঘটনার কোন যোগাযোগ নেই।’

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-