খেলা ও ধুলা

মেজর লীগ সকারে বাংলাদেশি ফুটবলার!

আমরা ধরে নিয়েছিলাম যে জিদান মিয়া হতে যাচ্ছে মেজর লীগ সকারে খেলা প্রথম বাংলাদেশি। কিন্তু মাঝে থেকে উদয় হল সামিত সোম নামের এক বিস্ময়! বলা যায় যে অনেকটা ধুমকেতুর মত আবির্ভাব এই ছেলেটির। তরতর করে সিঁড়ি ডিঙিয়ে আজকের এই অবস্থানে এসে পৌঁছেছে সোম।

মেজর লীগ সকার! বিশ্বব্যাপী নানা ধাঁচের র‍্যাংকিংয়ে যার অবস্থান থাকে শীর্ষ লীগগুলোর মাঝে। স্বনামধন্য ব্লীচাররিপোর্ট ডট কম এর এই বছরের এক বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, মেজর লীগ সকার বিশ্বের অষ্টম সেরা লীগ। বস্তুগত কিছু বিশ্লেষণের সাথে নানাবিধ তথ্যও বিবেচনায় নেয়া হয়েছে এতে- লীগের বাজার মূল্য, ব্যাক্তিগত সর্বোচ্চ মূল্যপ্রাপ্ত খেলোয়াড়, ম্যাচপ্রতি গোল, দর্শক উপস্থিতি ইত্যাদি ইত্যাদি।

এবং এতে সর্বপ্রথম বাংলাদেশি হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে ১৯ বছর বয়সী সামিত সোম!

সামিত সোমের জন্ম কানাডা তথা উত্তর আমেরিকার সর্ব উত্তরের শহর এডমন্টনে ১৯৯৭ সালের ৫ই সেপ্টেম্বর। তার বাবা-মা দু’জনই বাংলাদেশি, বাবা সিলেটি এবং মা ঢাকাইয়া। সামিত এখন ইউনিভার্সিটি অফ আলবার্টার ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ছাত্র।

২০০২-তে স্থানীয় ক্লাব এডমন্টন সাউথ-ওয়েস্ট ইউনাইটেড থেকে তার ফুটবলে হাতেখড়ি। ২০১৫ তে নর্থ আমেরিকান সকার লীগ (এর অবস্থান মেজর লীগ সকার এর পরেই) এর একমাত্র কানাডিয়ান দল এফ,সি এডমন্টন এর একাডেমিতে নাম লেখায় সামিত। সেখান থেকে তাকে পাঠানো হয় কানাডার বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের সর্বোচ্চ ফুটবলে। সেখানে আলবার্টা গোল্ডেন বিয়ারস্ এর হয়ে তার নৈপুণ্য তাকে এনে দেয় পশ্চিম কানাডার বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের নবাগত খেলোয়াড়দের জন্য সর্বোচ্চ সম্মান- সিডব্লিউইউএএ রুকি অফ দ্য ইয়ার এওয়ার্ড। সর্বমোট ৯টি ক্রীড়ার খেলোয়াড়দের মধ্য থেকে বেছে নেয়া হয় বিজয়ীকে। অর্জনটা স্বভাবতই অভাবনীয় ছিল।

পরের বছরই ফেব্রুয়ারীতে এফসি এডমন্টন এর মূল দলে জায়গা করে নেয় সামিত। মৌসুম জুড়ে তার (প্রত্যাশিত) নৈপুণ্য নজর কাড়ে কানাডার ফুটবল সংশ্লিষ্টদের।

এডমন্টন সাউথ-ওয়েস্ট ইউনাইটেড এ থাকা অবস্থাতেই ২০১৪ সালের অক্টোবরে কানাডা অনূর্ধ্ব-১৮ দলে ডাক পায় সামিত। কানাডা অনূর্ধ্ব-২০ দল থেকে আহ্বান আসে। পরের বছরের ফেব্রুয়ারীতে এফসি এডমন্টনের মূল দলে জায়গা করে নেবার মাসে। উপলক্ষ্য ছিল মার্চে ইংল্যান্ডে স্বাগতিকদের বিপক্ষে আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচ। সেখানেই অনূর্ধ্ব-২০ দলের হয়ে অভিষেক হ্য় সামিতের। পুরো ৯০ মিনিট খেলে সামিত এবং মার্কাস রাসফোরডের ইংল্যান্ড কে ২-১ এ হারায় কানাডা।

ছবি- ইংল্যান্ড অনূর্ধ্ব-২০ দলের বিপক্ষে সামিত

আপন গুণে এক সময় কানাডা অনূর্ধ্ব-২০ দলের অধিনায়ক নির্বাচিত হয় সামিত। কোস্টারিকায় বাগতিকদের বিপক্ষে দুইটি আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচে অধিনায়কত্ব করে সে গত বছরেরই আগস্টে। তা এমনকি দলটিতে লিভারপুল, স্টোক সিটি, লিও’র মত বিভিন্ন দলের খেলোয়াড় থাকার পরও। দলটির অবিচ্ছেদ্য অংশ হবার পরও এ বছরের ফেব্রুয়ারী-মার্চে কোস্টারিকায় অনূর্ধ্ব-২০ কনকাকাফ চ্যাম্পিয়নশীপে সে অংশ নিতে পারেনি হাটুর ইনজুরিতে আক্রান্ত হয়ে। কানাডা গ্রুপ পর্ব পেরোতে পারেনি সেখানে।

ছবি- গত বছর কানাডার সেরা অনূর্ধ্ব-২০ ফুটবলার মনোনয়নের সংক্ষিপ্ত তালিকায় নাম ছিল সামিতের

বছরের শুরুতেই জানুয়ারির ৪ তারিখ জেনারেসন এডিডাসের আওতায় এমএলএস ড্রাফটের দ্বিতীয় রাউন্ডে মেজর লীগ সকারের মন্ট্রিয়াল ইম্পেক্টে চুক্তিবদ্ধ হয় ৫ ফুট ৯ ইঞ্চি উচ্চতার সামিত। এমএলএস ড্রাফটে নাম লেখাতে তিনটি শর্তের যে কোন একটি পূরণ হলেই চলে, যার একটি হচ্ছে জেনারেসন এডিডাস নামক এক প্রজেক্ট, যা যোগ্য পেশাদার হতে প্রস্তুত আমেরিকান ও কানাডিয়ান প্রতিভাবান তরুণ ফুটবলারদের খুঁজে বের করে ড্রাফটে অন্তর্ভুক্ত করে। এই প্রজেক্টের অন্যতম সুবিধা হচ্ছে আগ্রহী দলগুলো যে মূল্য দিয়ে প্রজেক্টটির আওতাধীন খেলোয়াড় কিনবে তা দলগুলোর সর্বমোট বরাদ্দকৃত মূল্য থেকে কাটা যাবে না।

এমএলএস এর ক্লাবে নাম লিখিয়ে উল্লসিত সামিত

সামিত একজন দ্রুতকায়, ধৈর্যশীল এবং আক্রমণাত্বক মানসিকতার সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার। তার আছে ভারসাটাইলিটি এবং দারুণ পজেসন সেন্স। পাস দিতে অতিশয় দক্ষ, যে কিনা এফসি এডমন্টনের হয়ে নিয়মিত খেলবার সময় ৮৩.৫০ পাস সফলভাবে সম্পন্ন করে পুরো মৌসুমে। উইদাউট দ্য বল মুভমেন্টে তার জুড়ি মেলা ভার। তার খেলার ধরণ লীগটির কলাম্বাস ক্রিউএসসি এর দর্শনের সাথে খুব যায়। কোন সন্দেহ নেই যে এই দলটির কেন সামিতের ব্যাপারে আগ্রহ ছিল।

সাবেক কানাডিয়ান তারকা ফুটবলার, কানাডার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কোচ ও বিভিন্ন মেয়াদে দেশটির অন্তর্বর্তীকালীন প্রধান কোচের দায়িত্ব পালন করা কলিন মিলার সামিতের ব্যাপারে গত বছরের আগস্টে বলেছেন, ‘লীগে (নর্থ আমেরিকান সকার লীগ) যদি সামিতের চেয়েও ভালো কোন মিডফিল্ডার থেকে থাকে তো তার সেটা এখনো প্রমাণ করা বাকি আছে’। উল্লেখ্য মিলার ২০১২ সাল থেকে এফসি এডমন্টন এর কোচের দায়িত্ব পালন করে আসছেন।

বাংলাদেশ কি কোনোদিন সামিতের সার্ভিস পাবে?

দুর্ভাগ্যজনক ব্যাপার এই যে কানাডা মাতিয়ে মেজর লীগ সকারে নাম লেখানো এই বাংলাদেশি ছেলেটির ব্যাপারে কোন খবর বাংলাদেশের মিডিয়ায় আসলো না। আর বাফুফের কথা বলে তো আরও লাভ নেই। সম্ভাবনা সত্যিকার অর্থে ক্ষীণ যে সামিত বাংলাদেশ এর হয়ে খেলবে। কিন্তু প্রচেষ্টা তো নেয়াই যায়। সে এদেশেরই ছেলে। সাইক সিজার যদি যুক্তরাষ্ট্রের অলিম্পিক দলের ডাক প্রত্যাখ্যান করে বাংলাদেশের হয়ে খেলে থাকতে পারে তো বাফুফে কেন পারবে না বাংলাদেশ এথলেটিক্স ফেডারেসনের মতো উদ্যোগী হয়ে সামিত কে অনুপ্রাণিত করতে? এরপরও অনেক ব্যাপার রয়ে যায়, তবে আগে যোগাযোগটা তো হোক? কে জানে বাফুফের মনে কি আছে।

সামিতের প্রতি শুভকামনা রইল। সে বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করে চলেছে এবং আমরা আশা করি তা ভবিষ্যতেও বহাল থাকবে।

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close