উত্তরাঞ্চলীয় প্রদেশ চিয়াই রাইয়ের থাম লুয়াং নামের এই গুহাটি থাইল্যান্ডের সবচেয়ে বড় গুহা! প্রায় ১০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই গুহার কয়েক মাইল দূরে ন্যাশনাল পার্কে গত মাসের ২৩শে জুন, শনিবার সকাল দশটার দিকে ১১-১৬ বছর বয়সী ১২ জন কিশোর ফুটবলারকে নিয়ে প্রতিদিনের ফুটবল প্রাকটিস গিয়েছিলেন মু পা নামের একটি ফুটবল দলের সহকারী টিম কোচ ২৫ বছর বয়সী এক্কাপোল জানথাওং। প্র্যাকটিস শেষে ফুটবলের দলের একজন সদস্যের জন্মদিন উপলক্ষ্যে সারপ্রাইজ পার্টির আয়োজন করতে তারা ঢুকেছিল গুহার ভেতর। এর আগেও অনেকবার ঢুকেছে তারা, তাদের কোচ এই গুহার নাড়িনক্ষত্র সব চেনেন। কিন্তু সেদিন তাদের ভাগ্য তাদের সাথে খেলেছিল ভয়ংকর এক খেলা!

ফুটবল দলটি গুহার ভেতরে ঢোকার পর থেকেই প্রচুর বৃষ্টি হতে শুরু করে। সেখানে জমে যাওয়া জঙ্গলের পানিও ঢুকে যায় গুহার ভেতরে। পানি এতো বেড়ে যায় যে এক পর্যায়ে বন্ধ হয়ে যায় গুহায় প্রবেশের মুখও। গুহার ভেতরে পানির উচ্চতা খুব দ্রুত বেড়ে গেলে কোচসহ কিশোর ফুটবলাররা ভেতরে আটকা পড়ে যান। আরো উঁচু জায়গা খুঁজতে খুঁজতে তারা চলে যান গুহার আরো গভীরে। এভাবেই তারা আটকা পড়ে সেখানে।

ন্যাশনাল পার্কের একজন কর্মী সর্বপ্রথম দুপুর তিনটার দিকে লক্ষ্য করেন যে গুহার প্রবেশ-মুখের সামনে ১১টি সাইকেল রাখা আছে। পুলিশ ধারণা করে তারা হয়তো গুহার ভেতরে আটকে পড়েছে। গুহার ভেতরে ঢুকতে গিয়ে দেখা গেল, গুহামুখ ডুবে আছে পানির নিচে! আগের বিকেলে তুমুল বৃষ্টিতে বেড়েছে পানি, সেই পানি এসে ভাসিয়ে দিয়েছে গুহার সামনের অংশ, আর ভেতরের অনেকটা জায়গা। জমেছে কাদার ভারী স্তরও। পাওয়া যায় হাতের ছাপ। এরপরেই শুরু হয় সর্বাত্মক উদ্ধার অভিযান! দেশটির নৌবাহিনীর সঙ্গে উদ্ধার অভিযানে যোগ দেয় যুক্তরাজ্য থেকে যাওয়া ডুবুরি দল।

গুহায় যাতে অক্সিজেনের ঘাটতি না হয়, সেজন্য প্রবেশ করানো হয় কয়েকশঅক্সিজেন ট্যাংক। গুহার ভেতরে তৈরি করা হয় একটি বেস ক্যাম্প। আটকে পড়ার নয়দিনের মাথায় ব্রিটিশ ডুবুরি দল সন্ধান পায় কিশোরদের। ২ জুলাই ব্রিটিশ ডুবুরি রিচার্ড স্ট্যানটন ও জন ভলানথেন তাদের সন্ধান পান। অবস্থান জানার পর ১২ কিশোর ও তাদের কোচের জন্য গুহার ভেতরে পর্যাপ্ত অক্সিজেন সরবরাহ করার পাশাপাশি পাঠানো হয় খাবার ও চিকিৎসা সরঞ্জাম। গিয়ে দেখা যায় একটা উঁচু কার্নিশে বসে আছে তারা। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে সাপের মতো প্যাঁচানো এই গুহার ভেতরটা অসংখ্য প্রকোষ্ঠ এবং একেবারেই সরু। একেবারেই অন্ধকারে ঢাকা গুহার ভেতরে প্রায় ৪ কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে কিশোরদের কাছে পৌঁছাতে হচ্ছে অক্সিজেন ও খাবার। পানি বাড়ছে, বাড়ছে ঝুঁকিও।

পাহাড়ের বেশ কয়েক জায়গায় খুঁড়েও যখন তাদের কাছে পৌছানো গেল না, একটাই পথ খোলা তখন সামনে! ডুবসাঁতার শিখিয়ে অক্সিজেন ট্যাংক পিঠে বেঁধে বের করে আনা। ৯০ জন ডুবুরীর একটা দল গঠন করা হলো। যার ৪০ জনই থাই নেভি সিলের সদস্য! পাশাপাশি একজন অভিজ্ঞ সাইক্লিষ্ট ও রানারও ছিলেন তিনি। এই ৪০ জনের মধ্যে একজনের নাম সার্জেন্ট সামান কুনান, যিনি অবসরে চলে গিয়েছিলেন বহু আগেই, কিন্তু দায়িত্বের ডাকে সাড়া দিতে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করতে ছুটে এসেছেন।

গত ৫ই জুলাই বৃহষ্পতিবার অন্যদিনের চেয়ে অবস্থা আরো খারাপ হলো। প্রবল বর্ষণের মধ্যেই ধীরে ধীরে গুহার ভেতর কমে যাচ্ছে অক্সিজেনের পরিমাণ। এক পর্যায়ে গুহার ভেতরে অক্সিজেনের মাত্রা নেমে আসে ১৫ শতাংশে। একজন চিকিৎসক জানান, অক্সিজেনের এ মাত্রায় হাইপক্সিয়ার মারাত্মক ঝুঁকি রয়েছে। উচ্চতার কারণে মানুষের যে অসুস্থতা তৈরি হয় এটাও একই অবস্থার তৈরি করবে।

সার্জেন্ট সামান কুনান সব শোনেন। বাকি ডুবুরীদের মত বুঝতে পারেন এখন গুহায় ঢোকার অর্থ হচ্ছে অক্সিজেনের অভাবে মৃত্যুর সম্ভবনাকে আলিঙ্গন করেই ঢোকা। সব জেনেই তিনি অক্সিজেনের সিলিন্ডার নিয়ে ঢোকেন গুহায়, দীর্ঘ চার কিলোমিটার পেরিয়ে যে অক্সিজেন পৌঁছাতে হবে ১৩ দিন মুক্ত বাতাস শ্বাস নিতে না পারা কিশোরদের। তার কি মৃত্যুর ভয় পেলে চলে?

কিন্তু হায়, ভাগ্য যে সেদিন ভিন্ন কিছু লিখে রেখেছিল তার জন্য! নইলে কেন অক্সিজেনের সিলিন্ডারগুলো কিশোরদের কাছে পৌঁছে দিয়ে ফেরার পথে হঠাৎ করিএ অক্সিজেন সংকটে পড়বেন তিনি? অক্সিজেনের চাপ ক্রমাগত কমতে থাকে, আর একটা পর্যায়ে অক্সিজেনের অভাবে শ্বাস নিতে না পেরে ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে তলিয়ে যান সামান। অ্যা সোলজার ব্রেভলি ডায়েড ইন হারনেস! জীবনের শেষ অক্সিজেনটুকু এই কিশোরদের বাঁচার জন্য দিয়ে গেলেন মানুষটা!

আমরা দেবদূত খুঁজি আকাশের দিকে তাকিয়ে, আমাদের কল্পনার দেবদূতেরা বাস করেন স্বর্গে। অথচ আমাদের আশেপাশে যে কত অসংখ্য সামান কুনানেরা অসামান্য সাহসে স্রেফ আর্তমানবতার ডাকে সাড়া দিয়ে হাসিমুখে নিজের জীবন উৎসর্গ করেন এভাবে, টেরও পাই না আমরা! আমাদের মর্ত্যের দেবদূতেরা ঠিকই তাদের দায়িত্ব পালন করে হারিয়ে যান নিঃশব্দে!

সামান কুনানের মৃত্যর খবর পাওয়ার পর হাওমাও করে কেঁদেছেন তার স্ত্রী ও বাবা। কিন্তু একই সাথে তাদের প্রচন্ড গর্ব হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তারা। আপনজন হারালেও সে যে জীবনের শেষ মুহুর্তগুলোও আর্তমানবতার সেবায় নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছে, শেষ নিঃশ্বাসগুলো উৎসর্গ করেছে এই কিশোরগুলোর জন্য, এটা তাদের কাছে অনেক বড় গর্বের, সম্মানের!

যাদের বাঁচানোর জন্য এতো বড় ত্যাগ স্বীকার করলেন সামান, অবশেষে তাদেরকে উদ্ধার করে আনা হচ্ছে। গত রোববার ও গতকাল সোমবার মোট আটজনকে থাম লুয়াং গুহা থেকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। এখনো সেখানে পাঁচজন আটকা পড়ে আছে। এদের উদ্ধারের পর গুহার অক্সিজেন পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে ও অক্সিজেনের বোতল প্রতিস্থাপনে ১০ ঘণ্টার জন্য উদ্ধার অভিযান স্থগিত করা হয়েছিল। তাদের উদ্ধারে অভিযান শুরু হচ্ছে আজ আবারো! উদ্ধার করা সবাই সুস্থ আছে, তাদের ইতিমধ্যে উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ওপার থেকে দেখে নিশ্চয়ই অসম্ভব আনন্দ হচ্ছে সামানের!

প্রিয় সামান কুনান, যে মানুষের জন্য আপনি আপনার জীবনটা উৎসর্গ করে গেলেন, সেই মানুষেরা আপনাকে চিরদিন মনে রাখবে, শ্রদ্ধায়, ভালোবাসায়!

Comments
Spread the love