সালমান হক, কারো কাছে ‘ধ্রুব’। অণুজীব বিজ্ঞান বিষয়ে অধ্যয়নরত সালমান হক পড়াশুনার চাপ উতরে লিখে যাচ্ছেন একের পর এক বই। এবারের বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছে তার ‘তিন ডাহুক’। বই ও বইমেলাকে ঘিরে কথা হলো তরুণ এই লেখকের সঙ্গে।

: ‘সালমান হক’ ডাকনাম ‘ধ্রুব’, সবচেয়ে বেশি আবেগ জড়িয়ে আছে কোন নামে, কিংবা কোন নামে স্বাচ্ছন্দ্য বেশি?

সালমান হক : ‘ধ্রুব’ নামে ডাকলেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। কাছের মানুষদের কাছ থেকে এই ডাক শুনে অভ্যস্ত যে। পুরো নাম শাহ আল কামাল মোহাম্মদ সালমান হক ধ্রুব, রেললাইনের মতন। অবশ্য এখন ‘সালমান হক’ নামের সাথেও আবেগ জড়িয়ে গেছে, কারণ পাঠকেরা এই নামেই চেনেন।

: একজন লেখকের ভেতর একজন পাঠকও থাকে। পাঠক হিসেবে একজন ‘সালমান হক’ কেমন?

সালমান হক : সর্বভুক, পাঠক হিসেবে আমি সর্বভুক। একদম ছোটবেলায় উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধূরীর কিশোর রামায়ন ও মহাভারত দিয়ে সেই যে ঢুকেছিলাম এই জগতে এখনও বেরুতে পারিনি। বিশেষ দূর্বলতা আছে ক্রাইম ফিকশন এবং ফ্যান্টাসি এই দুটো জনরার প্রতি। মরণমুখী লেখা এবং ট্র্যাজেডি উপভোগ করি সবচেয়ে বেশি। প্রিয় লেখকদের তালিকায় আছেন হুমায়ূন আহমেদ, শহীদুল জহির, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, জীবনানন্দ দাশ, মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন, শরীফুল হাসান, জে কে রাওলিং, রিক রিওর্ডান, হারলান কোবেন, নিল গেইম্যান, হারুকি মুরাকামি, স্টিফেন কিং, জোনাথান স্ট্রাউড, ফিলিপ পুলম্যান… নাম বলে শেষ করা যাবে না।

: লেখালেখির শুরু ও প্রথম পাঠকদের সামনে হাজির হওয়া হয় কিভাবে?

সালমান হক : লেখালেখির শুরুটা একদম হঠাৎ। আগে কেবল ডায়রিতে টুকরো টুকরো কিছু ছোট গল্প লিখতাম। কিন্তু কাউকে পড়তে দেয়া হতো না ওগুলো। কখনও ছাপার অক্ষরে নিজের নাম দেখবো এই ভাবনাটাও আসেনি। জন বয়েনের ‘দ্য বয় ইন দি স্ট্রাইপড পাজামাস’ একদমই ঝোঁকের মাথায় অনুবাদ করা শুরু করি একদিন, আমার খুবই পছন্দের একটা উপন্যাস। কিন্তু পাঠকদের সামনে প্রথম হাজির হই মার্কিন লেখক নিক পিরোগের থ্রি এ এম সিরিজের মাধ্যমে।

: তরুণ লেখকদের বিশাল একটা অংশ এখন থ্রিলার বইয়ের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে। এর পেছনের কারণটা কি মনে হয় আপনার?

সালমান হক : আমাদের দেশে থ্রিলার পাঠকের অভাব কখনোই ছিল না। ছোট থেকেই দেখে আসছি বড়দের কেউ কেউ মাসুদ রানা পড়ছে, আবার একটু কম বয়সী যারা তারা তিন গোয়েন্দা পড়ছে। ফেলুদা এবং কাকাবাবুর ভক্তও কিন্তু কম নেই। সেই তুলনায় আমাদের নিজস্ব থ্রিলার লেখকের সংখ্যা বেশ কম ছিল। এর একটা বড় কারণ হতে পারে ক্রাইম ফিকশনের প্রতি আমাদের দেশের প্রকাশকদের উন্নাসিকতা। তবে এখন ধীরে ধীরে পরিস্থিতির বদলাচ্ছে। জীবনধর্মী এবং রোমান্টিক উপন্যাসের চক্র থেকে বেরিয়ে এসেছেন অনেকে। তাই আগে যারা পান্ডুলিপি পড়ে থাকার ভয়ে থ্রিলার লিখতেন না, তারা কলম তুলে নিয়েছেন আবার।

: থ্রিলার লেখার প্রতি আপনার আগ্রহের প্রধান কারণটা কি ছিল?

সালমান হক : ভালো আর মন্দ এই দুইয়ের মিশেলে পৃথিবী। প্রদীপের নিচে অন্ধকারের মতন আমাদের আশেপাশেও কিন্তু বিরাজ করছে এক আঁধার জগত। আমি সেই জগতের বলতে চেয়েছি।

: অনুবাদক এবং মৌলিক লেখক, নিজেকে কোন পরিচয়ে কেমন অনুভব করেন?

সালমান হক : আমাদের বাংলা সাহিত্য অনেক সমৃদ্ধ। তবে পাঠকসত্ত্বার পূর্ণবিকাশে বিশ্বসাহিত্যেরও দরকার আছে বলে মনে করি। কিন্তু ভাষাগত সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক সময় বিদেশী লেখকদের দারুণ দারুণ বই পড়া সম্ভব হয় না বেশ বিরাট সংখ্যক একটা পাঠকগোষ্ঠীর। সেই আক্ষেপ থেকেই অনুবাদ করা। অনুবাদক পরিচয়ে আমি সন্তুষ্ট। আর মৌলিক লেখা নিজের সন্তানের মতন। এখনও লেখক হিসেবে কিছু অনুভব করার মতন পর্যায়ে পৌঁছুতে পারিনি।

: এই বইমেলায় আপনার কি কি বই পাচ্ছে পাঠক এবং বইগুলো কোন জনরায় লেখা হয়েছে?

: সব ঠিক থাকলে আমার ‘তিন ডাহুক’ এবং ‘প্রলয়’ নামে দু’টো উপন্যাস বেরুবে বাতিঘর প্রকাশনী থেকে। তিন ডাহুক- সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার এবং প্রলয়- স্পাই থ্রিলার।

: বাতিঘর প্রকাশনী থেকেই আপনার ১৩টি বই প্রকাশিত হয়েছে। সবসময় কী বাতিঘরের সাথেই কাজ করার ইচ্ছে নাকি সামনে আরো প্রকাশনীর সাথেও দেখা যাবে আপনাকে?

– আসলে বাতিঘর প্রকাশনী থেকে আমার ১০ টি বই প্রকাশিত হয়েছে, অন্য তিনটি প্রকাশিত হয়েছে বুক স্ট্রিট পাব্লিশিং হাউজ থেকে। সামনে আরও প্রকাশনীর সাথে কাজ করার ইচ্ছে আছে।

: শীঘ্রই আসছে আপনার ‘তিন ডাহুক’, এই তিন ডাহুক নিয়ে পাঠকদের উদ্দেশ্যে কিছু বলার আছে?

সালমান হক : সিরিয়াল কিলিং নিয়ে পশ্চিমা বিশ্বে রচিত হয়েছে অসংখ্য উপন্যাস। সেগুলো পড়ে শিহরিত হয়েছেন অগণিত পাঠক, যার মধ্যে আমি একজন। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সেরকমই একটা উপন্যাস লিখতে চেয়েছি। তিন ডাহুক নায়ক-নায়িকা বিহীন একটি উপন্যাস। ‘ডাহুক’ নামের এক চরিত্রের বর্ণায়ন, যার বিচরণ আঁধার জগতে। পাঠকেরা ডাহুককে কতটা আপন করে নেন, সেটা জানার অপেক্ষায় আছি।

: অণুজীব বিজ্ঞান বিষয়ে অধ্যয়নরত একজন ছাত্রের নিজের পড়াশুনা নিয়েই বাড়তি চাপে থাকার কথা। তার উপর একটার পর একটা বই লিখেই যাচ্ছেন। লেখাগুলোর জন্য আলাদা করে ‘স্টাডি’ও করতে হয় নিশ্চয়ই। কীভাবে সামলে নেন সব?

সালমান হক : পড়াশোনার চাপটা তো ছোট থেকেই আছে, খুব শীঘ্রই সে চাপ কমার কোন সম্ভাবনাও নেই। কিন্তু তার মধ্য থেকেই কিন্ত বই পড়ার জন্যে আলাদা সময় বেছে বের করে নিতাম। এখনও তাই করি, পার্থক্য এটুকুই – যে বাড়তি সময়টুকু পাই তা লেখালেখি এবং বই পড়ার মধ্যে ভাগাভাগি করে নিতে হয়।

: বছর পাঁচ পর নিজেকে কোথায় দেখতে চান?

সালমান হক : আমি একদমই বর্তমানের মানুষ, এক সপ্তাহ পর কি হতে পারে সেটা নিয়েও যতটা সম্ভব কম ভাবা যায় সে চেষ্টা করি। তবে বলতেই যদি হয়, অণুজীববিদ্যার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ থেকে বড় কিছু অর্জন করতে চাই। আর বাংলাদেশের থ্রিলার পাঠকদের চিরদিন মনে রাখার মতো একটা বই উপহার দিতে চাই।

Comments
Spread the love