মনের অন্দরমহলরিডিং রুম

সালমান মুক্তাদির ও ‘হালাল’ বিশেষজ্ঞদের প্রতিক্রিয়া প্রসঙ্গে..

ঘটনা শুরু হয় গত মাসে। সালমান মুক্তাদিরের ইউটিউব চ্যানেলে ইতিমধ্যে দশ লাখ সাবস্ক্রাইবার পূর্ণ হয়েছে। বাংলাদেশে প্রথম প্রতিষ্ঠিত তরুণ ইউটিউবার হিসেবে সালমান বরাবর আলোচনায় ছিলেন। এবার দশ লাখ সাবস্ক্রাইবার হবার পর সালমান ইউটিউবে একটি নতুন ভিডিও দিয়ে ঘোষণা দেন, তিনি আর আগের মতো ভিডিও বানাবেন না। তিনি এতদিন যা করেছেন, সেটা এখন আর এভাবে চালিয়ে নিয়ে যেতে পারবেন না। কারো যদি তার উপর এক্সপেক্টেশন থাকে, তারা যেন হতাশ না হয়, তাই আগেভাগেই এই ঘোষণা দিচ্ছেন।

এত বিশাল খ্যাতি, আলোচনা, ফেইম এসব তিনি ইউটিউবের খাতিরেই পেয়েছেন। কিন্তু এখন তিনি মনে করছেন, এটাই সময় নিজের আসল স্বত্তাকে উপভোগ করার। যা ভাল লাগে সেটাই করবেন এখন থেকে। মানুষকে খুশি করার জন্য টিপিক্যাল ভিডিও আর বানাবেন না। কারো মন চাইলে সে আনসাবস্ক্রাইব করতে পারে। তিনি অল্প কিছু অডিয়েন্সের জন্য ভিডিও বানাবেন, নিজের কথা শেয়ার করবেন, যারা তার কথা বুঝবে। মোট কথা এখন তিনি কোনোরকমে এক্সপেকটেশনের বোঝা মাথায় নিয়ে থাকতে চান না। তার কাছে যা অথেনটিক মনে হবে, তার কাছে যা সত্যি মনে হবে, তার যা কিছু শেয়ার করতে ইচ্ছে হবে সেগুলোই তিনি করবেন। এতে যদি কেউ তার পাশে থাকে ভাল, না থাকলেও ক্ষতি নেই৷

সালমান মুক্তাদিরের এই ভিডিও, নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে তার ভূমিকা, জেসিয়ার সাথে তার সম্পর্ক সব কিছু মিলিয়ে স্যোশাল মিডিয়ায় বেশ কিছুদিন ধরেই আলোচ্য বিষয় হিসেবে থাকছেন সালমান। তার ব্যক্তিজীবন, জেসিয়ার সাথে সম্পর্ক, ইউটিউব নিয়ে তার ভাবনা এসব নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে।

বিশেষত, সালমান কিছুদিন আগে জেসিয়ার সাথে তার সম্পর্ক বিশ্লেষণ করে যে স্ট্যাটাস দিয়েছেন তারপর থেকে অনেকেই সালমানের সমালোচনা শুরু করেছেন। তিনি জেসিয়ার সাথে তার সম্পর্কের কথা শিকার করেন, কিন্তু তিনি এখনো নিশ্চিত না এটাই কি ভালবাসা কিনা। লিখেছিলেন, “Being in a relationship isn’t being in love”।

এদিকে জেসিয়ার সাথে চুমুর ছবি শেয়ার করায় অনলাইনে অনেকে গেল গেল রব তুলেছেন৷ তাদের মন্তব্যের সারমর্ম হলো, সালমান যেহেতু পাবলিক ফিগার, তাই তার এ ধরণের কাজে তরুণরা ভুল শিক্ষা নিচ্ছে। সালমান তরুণদের বিপথগামী করছেন। তিনি পশ্চিমা সংস্কৃতি আমদানি করছেন। তারা ইসলামের প্রসঙ্গ টেনেও বলবার চেষ্টা করছেন, ইসলামে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক হারাম। সালমান যা করছেন, তা বাংলাদেশের মতো দেশে খারাপ উদাহরণ সৃষ্টি করছে।

সালমান বার বার বলে যাচ্ছেন তাকে ভাল না লাগলে এড়িয়ে যেতে, বার বার বলছেন, তিনি কাউকে কিছু শেখানোর দায়িত্ব নেননি, তিনি নিজেকে কোথাও আইডল বলে দাবি করেননি, তিনি নিজেকে কোনোদিন মোটিভেশনাল স্পিকার হিসেবে দাবি করেননি। তার কাছ থেকে কিছুই শেখার নেই। তাই যাদের অনেক শেখার আগ্রহ তারা যেন তাকে এড়িয়ে চলেন, তার কাছ থেকে কোনো এক্সপেকটেশন না রাখেন। এটা তার জীবন, তিনি এই জীবনটাকে নিজের মতো করে উপলব্ধি করতে চান। কিন্তু, যতই সালমান এগুলো বলেন, ততই মানুষ আরো বেশি আলোচনা করে তাকে নিয়ে।

এখন একটু আমাদের সমাজের অবস্থার দিকে তাকাই। প্রত্যেকদিন পত্রিকার পাতা খুললে একটা না একটা ধর্ষণের খবর থাকে। খুনের খবর তো নিয়মিত ঘটনা। বাসে মেয়েরা প্রতিদিন হ্যারেজমেন্টের শিকার হচ্ছে। প্রত্যেকটা সেক্টরে দূর্ণীতি। হাসপাতালে গেলে অনিয়ম। সব কিছুতেই সমস্যা আছেই৷ এই সমস্যাগুলো এড়িয়ে যাওয়ার অভিনব এক পদ্ধতি আবিষ্কার হয়েছে আজকাল। লাইক, শেয়ার, কমেন্ট। কোনো কিছু হলেই আমরা সাময়িকভাবে সেই ইস্যুকে ভয়াবহ ভাইরাল করি, তারপর ধীরে ধীরে চুপশে যাই৷ প্রথম দিকে ধর্ষণের খবরে মানুষ খুব হতাশ হতো, আজকাল সবাই অভ্যস্থ হয়ে গেছে। এগুলো নিয়ে খুব একটা সোচ্চার দেখা যায় না কাউকে। আমাদের অনলাইন প্ল্যাটফর্ম অনেক শক্তিশালী। এখানে চাইলে রাতারাতি কোনো কিছুকে আলোচনায় নিয়ে আসা যায়। কিন্তু, আমরা ইতিবাচক কোনো কিছুর চর্চা না করে, নিজেরা নিজেদের না পালটে আরেকজনকে জ্ঞান দিয়ে বেড়াচ্ছি। কে কি করবে, সেটা শেখাচ্ছি৷ মানুষকে হাদিস কোরানের বাণী শোনাচ্ছি, অথচ নিজেরা কতটুকু নিজের প্রতি সৎ, যা বলছি মানুষের সামনে, সেটা নিজে কতটুকু বিশ্বাস করি তা কি ভেবে দেখেছি কখনো?

সমস্যাটা আসলে কোথায়? সাকিবের বউ পর্দা করছে কি করছে না সেটা নিয়ে আমাদের কেনো মাথাব্যাথা থাকবে? লিটন দাসের ধর্ম নিয়ে আমাদের কেনো চুলকানি থাকবে? আমরা অনলাইনে যে ব্যবহারগুলো করি, এগুলো কোনো সভ্য জাতি করতে পারে না। আমরা প্রতিনিয়ত মানুষকে অনলাইনে বিব্রত করে যাচ্ছি এই অধিকার আমাদের কে দিয়েছে? আমাদের অনলাইন মাতব্বরির সর্বশেষ সংস্করণ হলো, সালমান মুক্তাদির বিষয়ক গবেষণা। সালমান যা করছে সেটা ঠিক কিনা, সেটা ঠিক করে দেয়ার আমরা কেউ না। তবুও, যেহেতু সে পাবলিক পোডিয়ামে নিজের সব কিছু শেয়ার করছে, তাই তার কাজ নিয়ে কথা বলার, গঠনমূলক সমালোচনা করবার জায়গা অবশ্যই আছে। কারণ, সালমানকে তার ভক্তরাই এই পর্যায়ে এনেছে। কিন্তু, তাই বলে গালাগালি কেন?

সালমান সম্প্রতি এসেছিলেন একটা রেডিও শোতে। সেখানে তাকে একজন জিজ্ঞেস করেছে, ইসলামে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক বা লিভ টুগেদার হারাম, তাহলে সালমান কেন এসব করছে?

সালমান প্রশ্নের উত্তরে বলেন, “মিথ্যা বলাও তো মুসলিমদের জন্য এলাউড না, মদ পান করা মুসলিমদের জন্য এলাউড না, ধুমপান করা মুসলিমদের জন্য এলাউড না, মানুষকে খুন করা মুসলিমদের জন্য এলাউড না, রেইপ করা মুসলিমদের জন্য এলাউড না, মানুষকে গালি দেয়া মুসলিমদের জন্য এলাউড না। তাহলে শুধু লিভ টুগেদারের কথা কেন আসছে?”

সালমান প্রশ্ন তুলেছেন, রাস্তায় প্রস্রাব করলে কেউ কিছু বলে না, ঘরের ভেতর লুকিয়ে মদ খেলে কিছু হয় না, নারীদের ধর্ষণ করলে মানুষ শক্ত প্রতিবাদ করে না, শুধু সালমান যা তিনি রিয়েল লাইফে করছেন, সেটাকেই দেখাচ্ছেন বলেই কি মানুষ এমন ক্ষিপ্ত? তিনি এই মানুষগুলোকে সেক্সুয়ালি ফ্রাস্ট্রেটেড হিসেবে অভিহিত করেছেন।

সালমানকে নিয়ে মানুষের চিন্তা দেখে মনে হচ্ছে সালমান বিয়ে করলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। সালমান বিয়ে করলেই, চুমু হালাল হয়ে যাবে। বিয়ে মানেই কি সেক্সের বৈধতা? অবশ্যই সামাজিক প্রেক্ষাপটে বিয়ের গুরুত্ব রয়েছে, কিন্তু, মনের বিরুদ্ধে চাইলেই কি আপনি কারো সাথে শারীরিক সম্পর্কে জড়াতে পারেন, শুধু বিয়ে নামক কাগজের জোরে?

জেসিয়া-সালমান তাদের সম্পর্কে নিয়ে বলেছেন, সাত বছর পরে এই সম্পর্ক নাও থাকতে পারে, মানুষের তো বিয়ের এগারো বছর পরেও সংসার ভাঙ্গে। তারা এখন একটা সম্পর্কে আবদ্ধ কিন্তু, এটার ভবিষ্যৎ তখনই ঠিক হবে যখন তারা সে পর্যায়ে যাবেন যখন কাউকে বলে বোঝানো লাগবে একজন আরেকজনকে ভালবাসেন।

কিন্তু, সালমানের এই সম্পর্ক কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না তারা। কারণ, তারা নাকি সালমানকে আইডল ভেবেছিলেন। সালমান থেকে জাতি ভুল শিক্ষা নিচ্ছে। সালমান জবাব দিয়েছেন, শিক্ষা নেওয়ার এতো ইচ্ছে থাকলে এদেশের যেসব তরুণরা ভাল কিছু করছে তাদের কাছ থেকে কেনো শিক্ষা নিচ্ছে না মানুষ? আয়মান সাদিক, ইয়ুথ অপরচুনিটিজের ওসামা বিন নুরের জীবন থেকে শিক্ষা নিচ্ছেন না কেন তারা?

বাস্তবে উল্টো আয়মান সাদিককেও ট্রলের শিকার হতে হচ্ছে। আয়মান সাদিক এজুকেশনাল কন্টেন্ট বানান, অথচ মানুষ তার কাছে আশা করে সে সব বিষয় নিয়ে নাক গলাবে। সাকিব আল হাসান খেলেন ক্রিকেট, অথচ মানুষের যাবতীয় আগ্রহ থাকে তার ব্যাক্তিজীবন ঘিরে। সমস্যাটা কি শুধুই তাদের? আমরা যখন শিক্ষা পাওয়ার কথা বলি, আমরা যখন বলি অমুকের জন্য আমাদের তরুণরা নষ্ট হচ্ছে, তখন আমরা কেন ওই উদাহরণ নেই না, যেখানে একটা তরুণ এই বয়সে নিজের কাজ দিয়ে গোটা বাংলাদেশকে বিশ্বমঞ্চে উপস্থাপন করছে? আমরা যখন নিজেদের ফ্রাস্ট্রেশন উগড়ে দিয়ে মানুষকে উপহাস করছি, ব্লেম দিয়ে যাচ্ছি প্রতিনিয়ত, তখন আমাদের বয়সী কেউ কেউ দুনিয়া মাত করা কাজ করে বেড়াচ্ছে। কেউ গুগল, ফেসবুকের চাকরি নিচ্ছে৷ কেউ ফিল্ম বানাচ্ছে। কেউ নিজেই স্টার্টআপ দিয়ে স্বাবলম্বী হচ্ছে।

আর আমরা নিজেরা কোনো কাজ না করে শুধু অজুহাত দেখাচ্ছি আর দুনিয়াকে শুনাচ্ছি, সব নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আমরা এই অকর্মার ঢেঁকিরাই কি নষ্টের মূল না? আমরা শুধুই অন্যকে জাজমেন্ট করে বেড়াচ্ছি। কেন? কারো সাথে দ্বিমত থাকলেই কেন গালাগাল দিতে হবে? বাজেভাবে বলতে হবে? লাভটা কোথায় হচ্ছে আসলে! যেটুকু সময়ে সালমান কিংবা অন্যদের পেছনে ব্যয় করি, ততটুকু সময় কেন নিজেরাই একটা ভাল কাজ করে ফেলি না? আমরা কেন সবসময় আশা করি, অন্যরা আমাদের ভাল কিছু শেখাবে? ভাল উদাহরণ সৃষ্টি করার মতো এতটাই কি অযোগ্য আমরা?

সালমান মুক্তাদির বলেছেন, তিনি মানুষের ফেক ইমোশন, মানুষের ভন্ডামি দেখতে দেখতে ক্লান্ত, তার এখন জিদ কাজ করে। তিনি যুক্তি দেখিয়েছেন, যেহেতু মানুষ অন্য কোনো সমস্যা নিয়ে মাথা ঘামায় না, তাই তিনিও তাকে নিয়ে কে কি ভাবলো এগুলো নিয়ে মাথা ঘামান না। তিনি ভুল কিংবা সঠিক যা-ই হন, তিনি সেটা নিয়েই থাকতে চান। কিন্তু, সালমান মুক্তাদির আপনাকে দেখতে হবে এই কথাগুলো আপনি কখন বলছেন? যখন আপনার সম্ভাব্য সবটুকু এটেনশন পাওয়া শেষ, এচিভমেন্ট অর্জন করা শেষ, দশ লাখ সাবস্ক্রাইবার পাওয়া শেষ তখন এসে আপনার এই রিয়েলাইজেশন এসেছে।

আপনার উপলব্ধির জায়গার প্রতি সম্মান রেখেই বলি, আপনি র‍্যান্ডম কেউ হলে এই ব্যাপার নিয়ে কেউ মাথাই ঘামাতো না। যেহেতু, আপনার একটা অবস্থান তৈরি হয়েছে, তাই আপনি যা করবেন তা নিয়েই আলোচনা হবে। আপনি এখন সামাজিক সমস্যাগুলো নিয়ে ভাবতে শুরু করেছেন, আপনার মনে হচ্ছে মানুষের ভাবনার জায়গাগুলো ভুল, এগুলোকে চ্যালেঞ্জ করছেন আপনি আপনার মতো থেকে। কিন্তু, আপনার কি মনে হয় না, আপনি যা মানুষকে বোঝাতে চাইছেন, সেটা অন্যভাবেও বোঝাতে পারেন? আপনি কন্টেন্ট ক্রিয়েটর, আপনার বয়স এখনো ত্রিশ পেরোয়নি, আপনার ক্রিয়েটিভিটি দিয়ে ট্যাবুগুলো ভাঙবার মতো কোনো কন্টেন্ট কি আপনি করতে পারেন না?

আপনি নিজেই বোঝাতে চেয়েছেন, এতদিনের কাজ সব কিছু যে আপনার মন মতো হয়েছে তা নয়, সত্যি বলতে অনেক কাজ খুব হতাশাজনকও ছিল। কিন্তু, ভাল খারাপ সবটা মিলিয়েই আপনি। এটাও আপনারই কথা। কিন্তু, আপনি এর আগেও বিভিন্ন ভিডিওতে সারকাজমের মাধ্যমে বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরেছেন, আপনি যখন সামাজিক প্রেক্ষাপট, সমাজের মানুষের ভাবনার জায়গাগুলো প্রশ্নবিদ্ধ করতে চান, চাইলে সেরকম কোনো টুলস ব্যবহার করতেই পারেন। হ্যাঁ, আপনি বলেছেন, আপনি কাউকে কোনো কিছু শেখাতে চান না, আপনি আপনার নিজের জীবন নিজের মতো দেখতে চান, বুঝতে চান। কিন্তু, খেয়াল করে দেখবেন, আপনি নিজেই কিন্তু প্রতিনিয়ত ব্যাখ্যা দিয়ে যাচ্ছেন। কেন এটা হচ্ছে, কেন ওটা হচ্ছে। তার মানে হচ্ছে, আপনি কারো না কারো কাছে অবশ্যই দায়বদ্ধ। অন্তত, নিজের কাছেও কিছু না কিছু দায় মানুষের থেকে যায়..

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close