‘ইয়া আল্লাহ! এ কোন সাইজ তুমি আমার কপালে দিলে?’

সংলাপটা মনে আছে? যারা এ মানুষটির ভক্ত তারা নিশ্চয়ই সঙ্গে সঙ্গে চিনতে পেরেছেন। হ্যাঁ, এটি আমাদের সবার প্রিয় নায়ক সালমান শাহ অভিনীত ‘এই ঘর এই সংসার’ সিনেমার একটি সংলাপ। ছোট্ট একটি মজার লাইন অথচ কি আশ্চর্য তার প্রভাব! এই একটি লাইনে একইসাথে বিরক্তি, হাস্যরস, গভীরতা, কিছুটা কপট অভিমান, রাগ সব কিছু কি নিখুঁতভাবে তার অভিনয়শৈলী দ্বারা পর্দায় ফুটিয়ে তুলেছিলেন এই ক্ষণজন্মা মানুষটি! নব্বইয়ের দশকে যখন অতি অভিনয়ের প্রচলন ছিল, জোরে জোরে চিৎকার করে কথা বলা, অতিরঞ্জিতভাবে মুখভঙ্গি করাকেই সিনেমার জন্য যথাযথ অভিনয় বলা হতো, সেই সময় প্রথার বাইরে গিয়ে তিনিই একমাত্র ছিলেন যিনি সহজাত, সাবলীল অভিনয় নিয়ে এগিয়ে আসেন। আমরা সাধারণত যখন তাঁর কথা স্মরণ করি সবার আগে তাঁর ফ্যাশন সেন্স আর স্টাইল এর প্রশংসা করি। অথচ তার যে অসাধারণ অভিনয় ক্ষমতা ছিল, এতো ক্ষুদ্র সময় কাজ করেও যে তিনি একটা অন্যরকম শক্তিশালী, জাদুকরী ও অতীব হৃদয়গ্রাহী ছাপ ছেড়ে যেতে পেরেছেন সেটা আমরা কখনো বড়ো পরিসরে তুলে ধরি না। 

মাত্র সাড়ে তিন বছরের ক্যারিয়ার। ২৬/২৭ টি ছবি। যার কোনটিই সেইরকম গল্পভিত্তিক বা মিনিংফুল সিনেমা নয়। যে ধরণের মেইনস্ট্রিম সিনেমা তিনি করেছেন সেগুলোতে কোনো অভিনেতার পক্ষে নিজেকে শক্তিশালী পারফরমার্ বা তুখোড় অভিনেতা হিসেবে প্রমান করা সম্ভব নয়। সিনেমার ইতিহাস ঘেঁটে দেখে নিন- প্রথা এটাই যে বাণিজ্যিক ছবির নায়ক নায়িকাদের ষ্টার বলা হয়, দুর্দান্ত অভিনেতা নয়! তারা প্রথম ৬/৭ বছর চুটিয়ে হিট/সুপারহিট সিনেমা করেন। নিজেদের ষ্টার/ সুপারস্টার পদবি এনজয় করেন। তারপর যখন একই ধরণের ছবি করতে করতে বোর হয়ে যান, তখন তাদের শিল্পী হিসেবে যে খিদেটা থাকে সেটা জাগ্রত হয়! এরপর তারা একটু গল্পভিত্তিক সিরিয়াস সিনেমার দিকে ঝোঁকেন, মূলধারার বাইরে একটু অফবিট কাজ করতে চান, যেখানে নিজেক ভাঙা ও নতুন করে গড়ার সুযোগ থাকে। অনেক পরিশ্রম করে তারা সেই সব ছবি করেন এবং বলেন এটি তার/ তাদের স্বপ্নের চরিত্র এবং সবচেয়ে প্রিয় কাজ। পরবতীতে সেই কাজটি করে তারা জাতীয় পুরস্কার পান এবং ভালো অভিনেত্রী / অভিনেতা হিসেবে নিজের একটি আসন পাকা করে নেন! কম বেশি প্রতিটি শিল্পীর অভিনয় জীবনের ছক এমনই হয়ে থাকে। আমাদের দুর্ভাগ্য আমরা সালমান শাহকেকে অত দিন পাইনি। এই নিষ্ঠুর পৃথিবী থেকে অভিমানী এই মানুষটিকে অকালে চলে যেতে হয়েছে। ঝরে গিয়েছে বাংলাদশের আকাশের সবচেয়ে প্রতিভাশালী ও উজ্জ্বল নক্ষত্রটিকে।

যে মানুষটি একটিও ‘তথাকথিত’ ভালো গল্পের [আর্ট ফিল্ম] ছবি করে যেতে পারেননি, বাণিজ্যিক ধারার সিনেমার গতানুগতিক ধারার মধ্যেই যাকে কাজ করতে হয়েছে তার মধ্যেও যে তিনি তার করা প্রতিটা দৃশ্যকে আলাদা করে ভালো লাগার মতো, মুগ্ধ হওয়ার মতো, রুচিবোধসম্পন্ন মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য করে গিয়েছেন, এর জন্য তার প্রতি অফুরান ভালোবাসা আর বিনম্র শ্রদ্ধা। কতটা গুণী হলে মানুষ এভাবে নিজেকে বারবার প্রমান করতে পারে সেটা ভেবে মুগ্ধ না হয়ে পারা যায় না। পুরো সিনেমাগুলো দেখলে মনে হবে সেই বস্তাপচা, ত্রুটিপূর্ণ এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে হাস্যকরভাবে দুর্বল। কিন্তু শুধু যদি সালমানের অভিনয় দিয়ে আমরা বিচার করি তাহলে তা আজ এই ২০/২২ বছর পরও আকর্ষণীয় এবং যথেষ্টই আধুনিক। এই যুগের সাথে মানানসই। তাঁর কাজ, তাঁর অভিনয়, স্ক্রিন প্রেজেন্স এক মুহূর্তের জন্যও সেকেলে মনে হয় না। পোশাক ও স্টাইলিংয়ের আধুনিকতা বা নিজের সময়ের চেয়ে এগিয়ে থাকার কথা তো ছেড়েই দিলাম, কাজের ক্ষেত্রেও, মানে ২২ বছর আগে তিনি যে স্টাইলে ডায়লগ দিয়ে গেছেন, এক্সপ্রেশন দিয়েছেন, অভিনয় করেছেন সেটাও যেন আমাদের এই বর্তমান যুগকেই রিপ্রেসেন্ট করে।

পৃথিবীর ইতিহাসে এরকম বিরল ক্যারিয়ার গ্রাফ মনে হয় না আর কোনো অভিনেতার আছে। সুপারহিট নায়ক হিসেবে যখন একের পর এক এক ছবি করে যাচ্ছেন, ওই ভয়ঙ্কর ব্যস্ততার মধ্যেই একটি টিভির একটি ধারাবাহিক নাটকে অভিনয়। সত্যি তিনি কি সুপারম্যান ছিলেন? কীভাবে ম্যানেজ করেছিলেন তার সময়কে, ভাবতে গেলে বিস্ময়ের ঘোর কাটতে চায় না। ইতিকথা নাটকটিতে ফেরদৌসী মজুমদার, গোলাম মোস্তফা, আবুল খায়ের, শমী কায়সারদের মতো টিভি ও মঞ্চের তুখোড় শিল্পীদের সাথে পাল্লা দিয়ে কি দুর্দান্ত অভিনয়টাই না তিনি করেছেন! এত বছর পর যখন ইউটিউবে নাটকটি দেখলাম, সত্যি বলছি অবাক হয়ে শুধু তাকেই দেখেছি। কিছুতেই মেলাতে পারছিলাম না ঠিক একই সময় মানুষটা বাণিজ্যিক ছবিতে নাচছেন, গাইছেন, ফাইট করেছেন; আবার এরকম নন-গ্ল্যামারাস একটি নাটকে এসে নিজেকে ভেঙে এমন শৈল্পিকভাবে উপস্থাপন করেছেন! প্রতিটি ফ্রেমে প্রমাণ করেছেন অভিনেতা হিসেবে তিনি কতটা উঁচু দরের, কতটা ক্লাসি। আর সেই অভিনেতা হিসেবেই আমরা মানুষটিকে তার যোগ্য সম্মান দিতে ব্যর্থ হয়েছি। আমরা তাকে ভালোবেসেছি, পরম যতনে হৃদয়ে লালন করে এসেছি, তার কথা মনে হলেই নীরবে কেঁদেছি- এগুলো সবই সত্যি। কিন্তু এ কথা কি অস্বীকার করা যায় যে তাকে আমরা এযাবৎ কেবলই আমাদের স্বপ্নের নায়ক, স্টাইল আইকন, সবচেয়ে গুড লুকিং হিরো এসব উপাধিতে বারবার ভূষিত করে এসেছি; তাঁর করা ও রেখে যাওয়া কাজগুলোকে কি সেভাবে শ্রদ্ধা জানাতে পেরেছি আমরা? তাঁর জীবন কাহিনী, ক্যারিয়ারের নিখুঁত বর্ণনা, তাঁর করা সবগুলো কাজ, এগুলো কি যথাযথভাবে সংরক্ষনের ব্যবস্থা এই এত বছরেও করা গেলো না? একটি সুষ্ঠ পরিকল্পনার মাধ্যমে, সঠিক উপায়ে তাঁর জন্য গঠনমূলক কি কিছু করা যেত না?

প্রতি বছর সেপ্টেম্বর মাস আসলে বিভিন্ন চ্যানেলে তাঁকে নিয়ে কয়েকটি স্মৃতিচারণমূলক অনুষ্ঠান করলেই কি সব দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়? একটা প্রপার আর্কাইভ আজ পর্যন্ত করা হয়নি। তাঁর ভক্তরা বহুদিন ধরে আবেদন জানিয়ে আসছে তাঁর নামে এফডিসিতে একটি ফ্লোরের জন্য- সেটি নিয়েও কারো ভ্রূক্ষেপ নেই। কেন এই অবহেলা? ভক্ত, অনুরাগীদের চাইতেই বা হবে কেন? এই সামান্য সম্মানটুকু তো তাঁর অধিকার, প্রাপ্য। তিন বছরের ফিল্মি ক্যারিয়ারে তিনি কি কিছুই করেননি ইন্ডাস্ট্রির জন্য? সে যুগে কক্সবাজারে সেরকম হোটেলের সুবিধা ছিল না বিধায় তিনি শিল্পীদের সবার শুটিংয়ের সুবিধার জন্য কক্সবাজারে একটি জমির বায়না পর্যন্ত করেছিলেন। অনেক প্ল্যান ছিল তার, অনেক কিছু করার ইচ্ছে ছিল। সবই তো ইন্ডাস্ট্রির কল্যাণের উদ্দেশ্যে। কত মানুষকে কতভাবে সাহায্য করেছেন তিনি, বিপদে তাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। তারা আজ পর্যন্ত কি করেছে তাঁর জন্য? টিভিতে ডাকা হলে, এসে দুটো ভালো লাইন বলে গেলেই কি সব কর্তব্য শেষ হয়ে যায়? কারো কি আর কিছুই করার নেই?

হয়তো তাঁর মৃত্যু রহস্যের মতো এই প্রশ্নগুলোর উত্তরও চিরদিনই অজানা রয়ে যাবে। হয়তো ইন্ডাস্ট্রিতে তিনি এরকম অবহেলিতই রয়ে যাবেন। হয়তো মুষ্টিমেয় কিছু লোক সবসময়ই তাঁকে নিয়ে, তাঁর নাম ব্যবহার করে নিজের লাভের খাতা ভারী করে তুলবেন, আর সেপ্টেম্বর মাস আসলে একই ছাঁচে ঢালা কিছু সাক্ষাৎকার দিয়ে দুঃখ প্রকাশ করেই নিজেদের দায়িত্ব শেষ করবেন, কেউ কেউ আজীবন ভক্তদের বোকা বানিয়ে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধিও করে যাবেন। অথচ যার নাম নিয়ে এসব, সেই আমাদের ভালোবাসার সালমান এখন এই সব কিছুর ঊর্ধ্বে। তিনি তো বহু বছর আগেই এসব থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। তার কর্মই তাঁকে চিরস্মরণীয় করে রেখেছে ও যুগে যুগে তাই রাখবে। আর কেউ কিছু করুক বা না করুক, তাঁকে যারা সত্যিকারের ভালোবাসে, তাঁরা যুগে যুগে তার গুণের কদর করতে কখনো কার্পণ্য করবে না। তাদের ক্ষমতায় যখন যেভাবে কুলোবে তারা এই মহানায়কের নাম অমর করে রাখবে। একটি প্রজন্ম বিদায় নেবে, পরবর্তী প্রজন্ম আসবে, তারাও স্বপ্নের নায়ক সালমানকে সেভাবেই চিনবে, জানবে যেভাবে আমরা চিনি, জানি। ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের সাহায্য, সহযোগিতা ও স্বীকৃতি ছাড়াই এটা আজ পর্যন্ত সম্ভব হয়ে আসছে এবং ভবিষ্যতেও হবে।

এই ঘর এই সংসার, সত্যের মৃত্যু নেই, বিক্ষোভ এবং জীবন সংসার- শুধু এই চারটি ছবিও যদি পরবর্তী প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা দেখে তারা বুঝবে বাংলাদেশে কতটা সমৃদ্ধশালী একজন নায়ক ও অভিনেতা ছিলেন। আরেকটু বেশি সময় যদি জীবন তাকে দিতো তাহলে তিনিই সেই ব্যক্তি হতেন যার হাত ধরে বাংলদেশের চলচ্চিত্র বিশ্বমানের দরজা পেত, এ বিষয়ে আমার অন্তত কোনো দ্বিমত নেই! জানি না তিনি কোন ক্ষোভে সব কিছু অন্ধকার করে দিয়ে চলে গিয়েছিলেন। এটাও জানি না এসব ভেবে কষ্ট পাওয়ার কোনো অর্থ আছে কিনা নেই। তবে এটুকু নিশ্চয়ই জানি তাঁর জন্য আমার ও আমার মতো আরো বহু মানুষের হৃদয়ে সঞ্চিত আছে অনেক অনেক ভালোবাসা, যা আজীবন থাকবে। তিনি যেখানেই থাকেন, যেন অসম্ভব ভালো এবং শান্তিতে থাকেন এটাই আমাদের প্রার্থনা। 

আরও পড়ুন- 
Comments
Spread the love