সালেহীন আরশাদী: সেদিন আমাকে একজন প্রশ্ন করেছিল। বান্দরবানের কোন চূঁড়ায় আমার সবচেয়ে বেশী কষ্ট হয়েছে? এই প্রশ্নের উত্তর দিতে আমার দ্বিতীয়বার ভাবতে হয় না। সাথে সাথেই বলে দিলাম “কির্স তং”। এটা এমন একটা পাহাড় যেটা আমাকে চুম্বকের মত টানে। আমি জানি এই অনুভূতিটা আমার একার নয়। আমি জানি আমার মত আরও অনেকেই কির্স তংয়ের জাদুতে আচ্ছন্ন হয়ে আছেন।

কির্স তং আমাদের ট্রেকিং কমিউনিটির জন্য একটি বিশাল গল্পের খোড়াক। ২০১১ এর এপ্রিলের কাঠফাটা গরমে দুটি টিম একই লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নেমেছিল। সেই সময়কার নিজেদের মধ্যে চলমান প্রচ্ছন্ন প্রতিযোগিতা, পারস্পরিক মান-অভিমান, বিদ্বেষ, ভুল বুঝাবুঝি, ঝগড়া…এই সব মিলিয়ে শুরু থেকেই এই অভিযান নিয়ে বেশ একটা শোরগোল ছিল।

এই দুটি দলের গল্পই হচ্ছে চরম অবস্থায় টিকে থাকার এক মহাকাব্য। একদল হারিয়ে গিয়েছিল চিম্বুকের বিশাল জঙলে। আরেক দল মদকের পাহাড়ে। খাওয়া নাই, পানি নাই, ফেরার কোন রাস্তা নাই। এমন অবস্থায় ঠিকঠাকভাবে তাদের ফেরার গল্প গুলো ও অনেক রোমাঞ্চকর। সবচেয়ে মজার ব্যাপার এত এত লুকোচুরি, ভিন্ন রুট, দুই দিন আগে পরে রওনা দেয়ার পরেও সব কিছু ছাপিয়ে দুটি দল একই দিনে সামিটে পৌঁছে ছিল। আমার মতে সেদিন প্রকৃতিও চায় নাই এরা নিজেদের মধ্যে বিভাজিত হয়ে যাক।

সে যাই হোক, চূড়ায় পৌঁছে আবার ফিরে আসাতেই কিন্তু আমাদের কাজ শেষ হয়ে যায় নি। ফিরে আসার সময় পথ হারিয়ে আমাদের একদিন এক ঘন জঙলে বাধ্য হয়ে ক্যাম্প করতে হয়েছিল। ক্যাম্পের জায়গা খুঁজতে গিয়ে পেয়ে গিয়েছিলাম একটি মৃতপ্রায় জলপ্রপাত। এর মানেই হচ্ছে আমাদের আবার এখানে ফিরে আসতেই হবে…

প্রথম দিকে আমি ঘুরতে যাওয়ার জন্য শুধু ঘুরতাম। অস্বীকার করব না আমার মধ্যেও সেই ‘স্পট’ কভার মানসিকতা পুরোদমে উপস্থিত ছিল। একটা জায়গায় গেলাম, ব্যাস হয়ে গেলো। ছবি টবি দেখাও। দুই এক পাতা লিখে ফেলো… কাহিনী শেষ। কিন্তু এরপর টিওবি’র সাথে আমার পরিচয়। এর মাধ্যমেই পরিচয় হল কয়েকজন মানুষের সাথে। ধীরে ধীরে শুরু হল আমাদের একসাথে উঠা বসা, ঘুরতে যাওয়া। তাদের কাছ থেকে দেখে বুঝেছি ঘুরাঘুরির লক্ষ্য শুধু কোন একটা জায়গায় যাওয়া পর্যন্তই হয় না। সেই জায়গা টিকে দেখার সাথে সাথে, ভালোভাবে জানা আর উপলব্ধি করাও সমান জরুরী। তা না হলে ঘুরাঘুরি সম্পূর্ণ হয় না। এই খারাপ মানুষ গুলা আমাকে হাতে ধরে ঢুকিয়ে দিয়েছে এই এক্সপ্লোরেশনের দুনিয়ায়।

এক্সপ্লোরেশনের মূল লক্ষ্য হচ্ছে ‘জানা’ আর ‘জানানো’। কোন কিছু সম্পর্কে তাই ভালোভাবে না জেনে, জানানো টা আমি অন্যায় বলেই মনে করি। আর এই ‘জানা’র জন্য অনেক সময়ের প্রয়োজন। এই কির্স তংয়ের উদাহরনই দেয়া যায়। কি জানি আমি এই কির্স তংয়ের সম্পর্কে?

এটা চিম্বু্ক রেঞ্জের একটা পাহাড়।
‘কিরসা’ এক ধরনের ছোট পাখি।
মারমা ভাষায় ‘তং’ অর্থ পাহাড়।
কির্স তং- যেই পাহাড়ে ছোট ছোট পাখি উড়ে বেড়ায়।
সবচেয়ে কাছের পাড়ার নাম খ্যামচ্যাং পাড়া, একটি মুরং গ্রাম।
আর কি?

এটি চুম্বক রেঞ্জের সবচেয়ে উচুঁ চূঁড়া। আর বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ প্রমিনেন্ট চূঁড়া। এর উচ্চতা প্রায় ২৯০০ ফিট। প্রথমবার ঘুরে এসে এর বাইরে আসলে আর কোন তথ্য দেয়ার থাকে না। কিন্তু ঐ যে প্রথমবার একটা জলপ্রপাতের কোলে অসহায় অবস্থায় ক্যাম্প করেছিল যে? পরবর্তীতে ঐ জলপ্রপাত টিকেই দেখতে হবে- ঘোর বর্ষাকালে।

এর মাঝে কত কাহিনী হয়ে গেল। দুইজন কে হারিয়ে ফেললাম। দুই পা আর মেরুদন্ড ভেঙে গেল। লক্কর ঝক্কর পায়ে আবার ছুটে গেছি সেই জলপ্রপাতের খোঁজে। দুই বছর পরের সেই ডি-ওয়ের সেই হান্ট ওয়াটার ফল অভিযানে আবার হাজির হয়েছিলাম কির্স তংয়ের বুকে। সেখানে খুঁজে পেয়েছিলাম আমরা “শাইংপ্রা”। আহহ…কত অসাধারন ছিল সেই দৃশ্য। ঘুমিয়ে পরা নিষ্প্রাণ একটি ঝিরি কে কেউ যেন সোনার কাঠি বুলিয়ে জাগিয়ে দিয়েছে। তার তেজের চোটে ভালো ভাবে দাঁড়ানোই যাচ্ছিলো না। একবার কাছে গিয়ে দেখা, আরেকবার দূর থেকে তাকে দেখা। পরেরবার আবার নীচ থেকে দেখা। একই সাথে তার পুরো গতি পথ টাই ঘুরে দেখা।

এই দেখার কোন শেষ নাই। একটা দেখার সময় আরেকটি দেখার জিনিস উঁকি দেয় দিগন্তে। কাছে টানতে থাকে। এই পাগল লোকদের সাথে থাকতে থাকতে আমি একটা জিনিস ই খুব ভালোভাবে বুঝেছি। এক্সপ্লোরেশনের জন্য সবচেয়ে দরকারী জিনিসটি হল ধৈর্য্য। কোন কিছুর জন্য ঘাপটি মেরে অপেক্ষা করা। বারবার চেষ্টা করলে, মন থেকে চাইলে, ধৈর্য্য ধরে অপেক্ষা করলে সেই জিনিস এসে ধরা দিবে। আর পাহাড়ে এই জিনিস টি আরও বেশী সত্য আর প্রকট। এখানে তুমি হতাশ হয়েছ তো শেষ আর অপূর্ণতাটাই এখানে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা। এর সাথে দরকার একটি উৎসুক মন আর লেগে থাকার প্রবৃত্তি।

গত পাঁচ বছরে উত্তর, দক্ষিন, পূর্ব, পশ্চিম চারদিক থেকে কির্স তং কে দেখার সৌভাগ্য হয়েছে। একদিক থেকে উঠে আরেক দিক থেকে নামা হয়েছে। এক নদীর প্রবাহ থেকে আরেক নদীর প্রবাহে যাওয়া হয়েছে। এর খাড়া দেয়াল বেয়ে উঠে গেছি। দুই তিন বার করে কির্স তং কে টপকে (ট্রাভার্স) গেছি। কিন্তু এখনো আমি এর সম্পর্কে তেমন কিছুই জানি না। এখনো অনেক অনেক রহস্য নিয়ে সে ঘাপটি মেরে আছে। এই কিছু না জানাটাই আমাকে আবার তার দিকে নিয়ে যাবে। আর সেই রহস্যগুলোর খোঁজেই আবার হয়ত একদিন বেরিয়ে পড়ব কির্স তংয়ের জঙলে।

ফুটনোট [১]: এটি অনেক আগের লিখা। তখন টিওবি’র মটো ছিল ধরনের অনুসন্ধানী অভিযানের বীজানু আমার মত স্বপ্ন দেখাদের মধ্যে ইনজেক্ট করে দেয়া। এখন টিওবি’র আগের সেই চার্ম আমি খুব বেশী মিস করি। সাজেকের মেঘ আর গোলাপ গ্রামের খুশবুর মধ্যে টিওবির লেগেসি হারিয়ে গেছে।

ফুটনোট [২]: কির্সতং এর চাইতে উত্তর-পশ্চিম দিয়ে দুমলং এর চূড়ায় পৌঁছানোটা আমার মতে বেশী চ্যালেঞ্জিং।

ফুটনোট [৩]: পাহাড়ে যারাই যাবেন সবাই সাথে ছোট পলিথিন রাখবেন। নিজেদের প্ল্যাস্টিকের খোসা, অপচনশীল বর্জ্য এই পলিব্যাগেই জমাতে থাকবেন। আমরা সবাই যদি নিজেদের দলের গারবেজ বা ময়লা গুলো খুব ভালভাবে ম্যানেজ করতে পারি আর আমরা কিভাবে সেই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করলাম সেই পদ্ধতিটা সবার সাথে শেয়ার করি তাহলেই আমাদের এই জায়গাগুলো আর নোংরা হবে না।

Comments
Spread the love