ইনসাইড বাংলাদেশযা ঘটছে

সেন্টমার্টিনে নিষেধাজ্ঞা, নাকি শুভঙ্করের ফাঁকি?

সেন্টমার্টিন দ্বীপে পর্যটকদের জন্যে রাত্রিযাপন নিষিদ্ধ করা হবে আগামী বছরের মার্চ মাস থেকে- গত ২৩ সেপ্টেম্বর এমন একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছে সেন্ট মার্টিন দ্বীপ রক্ষায় গঠিত আন্তমন্ত্রণালয় কমিটি। এই সিদ্ধান্তটার পক্ষে-বিপক্ষে অনেক কথাই হচ্ছে। বাংলাদেশী পর্যটকদের কাছে সবচেয়ে আকাঙ্ক্ষিত স্থানগুলোর মধ্যে সবার ওপরেই থাকে সেন্টমার্টিন দ্বীপের নাম। বেশিরভাগ মানুষই এক কথায় এই দ্বীপটাকে বাংলাদেশের সবচেয়ে সুন্দর পর্যটন স্পট হিসেবে মেনে নেন নির্দ্বিধায়। সাগরের বুকে জেগে থাকা ছোট্ট এই দ্বীপটাকে তাই পর্যটনের মৌসুমে সামলাতে হয় বিপুল সংখ্যক ‘ঘুরতে যাওয়া’ মানুষের চাপ। এদেরকে পর্যটক কেন বলছি না, সেটা লেখার অন্য অংশে বলছি। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আন্তমন্ত্রণালয় কমিটির নেয়া এই সিদ্ধান্তটা কি আসলেই বাস্তবায়িত হবে? নাকি এর আড়ালে কোন শুভঙ্করের ফাঁকি লুকিয়ে আছে?

পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পর্যটনের মৌসুমে(নভেম্বর-মার্চ) প্রতিদিন ১০ থেকে ২০ হাজার পর্যটক সেন্ট মার্টিন দ্বীপে যায় এবং অবস্থান করে। এতে দ্বীপটির জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের পথে। কচ্ছপের প্রজনন ব্যহত হচ্ছে, ধ্বংস হচ্ছে মহামূল্যবান প্রবাল। শেষ হয়ে যাচ্ছে ভূগর্ভের নিচে থাকা পানির সামান্য স্তরটুকুও। এছাড়া সেন্টমার্টিন দ্বীপের পানিতে যে পরিমাণ ব্যাকটেরিয়া পাওয়া গেছে, এই পরিমাণ ব্যাকটেরিয়া ঢাকা শহরের ওয়াসার পানিতেও থাকে না! ছোট্ট একটা দ্বীপে হাজার হাজার মানুষ গিয়ে মাসের পর মাস ধরে মেলা বসালে এমনটাই তো হওয়ার কথা, তাই না? 

সেন্টমার্টিন দ্বীপ, মিয়ানমার, রোহিঙ্গা, পররাষ্ট্রনীতি, বাংলাদেশ

শুধু তা-ই নয়, স্থানীয় সরকার ও প্রকৌশল অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন সংস্থা থেকে নির্মাণ করা রাস্তায় দ্বীপটির ক্ষতি বাড়ছে। পর্যটকদের থাকার জন্যে যেসব হোটেল বা রিসোর্ট নির্মিত হয়েছে, সেগুলোর সবই অবৈধ, কারণ সেন্টমার্টিন দ্বীপে কোন পাকা স্থাপনা নির্মাণের অনুমতি নেই। কমিটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে, দ্বীপে কোন জমি বেচাকেনা করা যাবে না। জেনারেটর ব্যবহারের অনুমতি দেয়া হবে না, জাহাজের সংখ্যা কমিয়ে আনা হবে। আর আগামী বছরের পয়লা মার্চ থেকে দিনে মাত্র পাঁচশোজন করে পর্যটক সেন্টমার্টিনে যাওয়ার অনুমতি পাবেন, অনলাইনে আবেদনের ভিত্তিতে তাদের অনুমতি দেয়া হবে। তবে তারা সেখানে রাতে অবস্থানের অনুমতি পাবেন না। দিনে গিয়ে দিনেই ফিরে আসতে হবে।

সিদ্ধান্তগুলো চমৎকার, তাতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্ত এগুলো বাস্তবায়ন হবে তো? প্রশ্নটা জিভের ডগায় এসে যাচ্ছে একটাই কারণে। সেটা হচ্ছে টাইমিং। সিদ্ধান্তগুলো নেয়া হয়েছে গত পরশু, ৮ তারিখে। সেন্টমার্টিন দ্বীপকে রক্ষার ইচ্ছে যদি কমিটির থেকেই থাকে, তাহলে কেন এক সপ্তাহ বা এক মাসের মধ্যে এই সিদ্ধান্ত কার্যকরের নির্দেশ বা সুপারিশ করা হলো না? 

সেন্টমার্টিন দ্বীপ, মিয়ানমার, রোহিঙ্গা, পররাষ্ট্রনীতি, বাংলাদেশ

কিংবা কেন বলা হলো না যে, এক সপ্তাহ পর থেকে আর কোন পর্যটক বা ‘ঘুরতে যাওয়া’ লোকজন সেন্টমার্টিনে যাওয়ার অনুমতি পাবেন না। পাঁচ মাসের এই সময়টা কাদের সুবিধার্থে দেয়া হলো? এই মাসের শেষ নাগাদ জাহাজ চলাচল শুরু হবার কথা, সেন্টমার্টিনে মানুষের ঢল নামবে আবার। সেটা কেন বন্ধ করা হচ্ছে না? কেন পাঁচ মাস পরের ডেডলাইন দেয়া হলো? এই কয়েক মাসে পর্যটকের যে চাপটা আসবে, তাতেই কি কয়েক বছরের দূষণ একসঙ্গে হয়ে যাবে না? 

ধরে নিন আপনি কখনও সেন্টমার্টিনে যাননি। সেই রূপালী দ্বীপের ফিনিক ফোটা জোছনার গল্প আপনি শুধু শুনেছেন, আর হূমায়ুন আহমেদের বইয়ে পড়েছেন। কিংবা ধরে নিলাম আপনি সেন্টমার্টিনে গিয়েছেন এক বা একাধিকবার, দ্বীপটার সৌন্দর্য্যও উপভোগ করেছেন প্রাণভরে। যখন আপনি শুনবেন যে কিছুদিন পর থেকে এই দ্বীপটাতে কাউকে যেতে দেয়া হবে না, বা রাতে থাকতে দেয়া হবে না- তখন আপনি নিশ্চয়ই চাইবেন ‘শেষবারের মতো’ সেন্টমার্টিন থেকে ঘুরে আসতে, তাই না? আপনার-আমার মতো অনেকেই চাইবে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, পর্যটন মৌসুমের ঠিক আগে কেন এই ঘোষণা দেয়া হলো? সেন্টমার্টিন ভ্রমণের একটা হাইপ তুলে দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে না তো? 

নভেম্বর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত টেকনাফ-সেন্টমার্টিন রুটে জাহাজ চলাচল করে। এই সময় সাগরও বেশ শান্ত থাকে, ফলে এই দ্বীপে ভ্রমণের সেরা সময় এটাই। প্রতিদিন হাজার হাজার পর্যটক দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এসে জড়ো হয় টেকনাফে, সেখান থেকে জাহাজে চড়ে সেন্টমার্টিনে, যেন এই দ্বীপে গেলেই কাঁচা সোনা পাওয়া যাবে! এই হাজার হাজার মানুষের মধ্যে সবার কিন্ত ভ্রমণপিয়াসু মন নেই, সবাই পর্যটক নন। সেন্টমার্টিন দ্বীপে যাওয়া বেশিরভাগ মানুষের কাছেই এই জায়গাটা শুধুই টাইমপাসের একটা জিনিস।

ফেসবুকভিত্তিক ভ্রমণের একটা গ্রুপ ট্রাভেলার্স অফ বাংলাদেশের কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবী দিনকয়েক আগে সেন্টমার্টিনে গিয়েছিলেন ময়লা পরিস্কার করতে। সেখানে গিয়ে তারা যা দেখেছেন, সেটা প্রায় অবর্ণনীয় একটা অভিজ্ঞতা। পুরোটা দ্বীপ যেন ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। চিপসের প্যাকেট, পানি-জুসের বোতল থেকে শুরু করে ছেঁড়া আন্ডারওয়্যার কিংবা কনডমের প্যাকেট- সব ধরণের ময়লা পড়ে আছে সৈকতে, এমনকি ছেঁড়াদ্বীপেও! এগুলো কারা করেছে? সেন্টমার্টিনের সৌন্দর্য্য আহরণ করতে যাওয়া মানুষেরা এসব করেন না, তারা প্রকৃতির গুরুত্বটা বোঝেন। কিন্ত যারা টাইমপাসের জন্যে যায়, তারাই এসব করে, পুরো দ্বীপটাকে আবর্জনার স্তুপে পরিণত করে আসে। এদের সংখ্যা হাজার নয়, লক্ষ লক্ষ। 

এই যে লক্ষ লক্ষ ‘ঘুরতে যাওয়া’ মানুষ প্রতিবছর সেন্টমার্টিনে গিয়ে দ্বীপে আবর্জনা ফেলে আসছে, তারা কেন যাচ্ছে? কারণ সেখানে যাওয়ার জন্যে বিলাসবহুল জাহাজ আছে, আয়েশ করে থাকার জন্যে ভালো মানের হোটেল-রিসোর্ট আছে। অথচ আজ থেকে বিশ বছর আগে, ১৯৯৯ সালেই সেন্টমার্টিনকে পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল, সেখানে কোন পাকা ঘরবাড়ি বা স্থাপনা নির্মাণ পুরোপুরি অবৈধ ছিল। এমনকি দ্বীপের অধিবাসীরাও পাকা বাড়ি বানাতে পারেন না।

অথচ এসব নিয়ম-নীতির কোন তোয়াক্কা না করেই বছরের পর বছর ধরে এই দ্বীপটাতে একের পর এক হোটেল নির্মাণ হয়েছে, দোতলা, তিনতলা, বহুতলা… তখন কেউ নজর দেয়নি, সবাই চোখ বন্ধ করে রেখেছিল ওই সময়ে। দিনের পর দিন গলা টিপে যখন সেন্টমার্টিন দ্বীপটাকে মেরে ফেলা হয়েছিল, তখন কেউ আওয়াজ তোলেনি।

এই যে আইন ভঙ্গ করে এতগুলো স্থাপনা গড়ে তোলা হলো, এত হোটেল-মোটেল বানানো হলো, এগুলো কার অনুমতিতে হয়েছে? দুটো জাহাজের জায়গায় যে পাঁচ-সাতটা জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেয়া হলো, সেটা কার ইশারায়? কারো অনুমতি যদি নেয়া না হয়, তাহলে যাদের ওপর এসব দেখভালের দায়িত্ব ছিল, তারা কি করেছেন সেই সময়ে? সাগরের বুকে জেগে থাকা ছোট্ট একটা দ্বীপে লক্ষ লক্ষ মানুষের আগমন যে সেখানকার জীববৈচিত্র‍্যকে ধ্বংস করে দিতে পারে, দ্বীপটাকে নরক বানিয়ে দিতে পারে, সেটা কি কেউ ভাবেনি এতদিন? কিংবা যারা সেন্টমার্টিনকে ধ্বংস করতে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সাহায্য করেছে, কিংবা অবৈধ সুবিধা নিয়ে মুখ বন্ধ রেখেছে এসব ব্যাপারে, তাদের শাস্তির আওতায় আনার ব্যাপারে কি কিছু ভেবেছেন কমিটির সদস্যরা? 

আগামী পাঁচ মাসে সেন্টমার্টিনে সবকিছুর দাম পাল্লা দিয়ে বাড়বে, হয়তো আকাশ ছোঁবে। বিশ টাকার ডাব তো এমনিতেই সিজনে আশি-একশো টাকায় বিক্রি হয়, এবার নাহয় দুশো হবে। লঞ্চের ভাড়া বাড়বে, বাড়বে হোটেলের ভাড়া। গত বছর যে রুমের ভাড়া ছিল এক হাজার টাকা, সেটা এবার আড়াই হাজার হবে। তবুও লোকজন ছুটবে পঙ্গপালের মতো। কারণ ওই যে, ‘বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘোষণা’! ‘শেষবারের মতো’ নারিকেল জিঞ্জিরার স্বাদ নিতে ছুটবে সবাই, আর এটাই তো চায় বেড়াতে যাওয়া লোকজন দেখলেই ছুরি নিয়ে ওৎ পেতে থাকা কসাই প্রবৃত্তির কিছু ব্যবসায়ী। আগামী পাঁচ মাস ধরে পকেট কাটা হবে মানুষের। শেষবারের মতো সেন্টমার্টিন যাওয়ার কথা ভেবে অনেকে হয়তো এসব গায়েই মাখবেন না!

তবুও স্বপ্ন দেখতে ইচ্ছে হয়, কর্তৃপক্ষের নেয়া এই উদ্যোগগুলো বাস্তবায়িত হবে, সেন্টমার্টিন দ্বীপটা আবার প্রাণ ফিরে পাবে ধীরে ধীরে, ফিরে পাবে তার হারানো সৌন্দর্য্যও। কিন্ত অতীতের স্মৃতিগুলো যে আমাদের স্বপ্ন দেখতে বাধা দেয় বারবার…

ছবি কৃতজ্ঞতা- ট্রাভেলার্স অফ বাংলাদেশ ফেসবুক গ্রুপ।

আরও পড়ুুন- 

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close