ঘটনা এক

কিছুদিন আগের কথা। প্রশ্নফাঁস নিয়ে একটা টিভি টক-শো তে আলোচনা হচ্ছে। অতিথি হিসেবে উপস্থিত আছেন ছাত্রলীগের তৎকালীন সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ। ঐতিহ্যবাহী এই সংগঠনের কর্মীরা নানা ধরণের অপকর্মে জড়িয়ে পড়ে ছাত্রলীগের ঐতিহ্য আর ভাবমূর্তি নষ্ট করছে কিনা, এমন প্রশ্ন ছিল সোহাগের কাছে। উপস্থাপিকা নবনীতা বলেছিলেন, ছাত্রলীগের কিছু কর্মী যে হত্যা, ধর্ষণ বা প্রশ্নফাঁসের মতো অপকর্মের সঙ্গে নিজেদের জড়িয়ে ফেলছে, সেটা সংগঠনের জন্যে বিব্রতকর কিনা।

গত বছরের কথা এটা, প্রশ্নফাঁসের তখন মহামারী চলছে, পিএসসি থেকে শুরু করে এইচএসসি- প্রতিটা পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হচ্ছে দেদারসে। আর লাইভ টিভিতে সাইফুর রহমান সোহাগ দাবী করে বসলেন, আওয়ামী লীগের শাসনামলে নাকি দেশে প্রশ্নফাঁসের ঘটনাই ঘটেনি! উপস্থাপিকা ভাষা হারিয়ে ফেলেছিলেন এই কথা শুনে!

ঘটনা দুই

কোটা সংস্কার আন্দোলন চলছে তখন। সাইফুর রহমান সোহাগ তখনও ছাত্রলীগের সভাপতি। এরই মধ্যে বাংলানিউজ২৪ ডটকমে দেয়া একটা সাক্ষাৎকারে তার কাছে জানতে চাওয়া হলো ছাত্রলীগ কর্মীদের নেতিবাচক কর্মকান্ডের ব্যাপারে। নিজেদের মধ্যেকার কোন্দল-হানাহানি নিয়ে সংগঠনের সভাপতি হিসেবে তিনি বিব্রত কিনা সোহাগ সরাসরি বললেন- “ছাত্রলীগ অতীতেও কোন অপকর্মে জড়িত ছিল না, এখনও নেই! ভবিষ্যতেও থাকবে না!” এই কথা শুনে সাংবাদিক ভদ্রলোক ভাষা হারিয়েছিলেন কিনা, তিনিই ভালো জানেন।

ঘটনা তিন

দুইদিন আগের কথা। নিরাপদ সড়কের দাবীতে আন্দোলন চলছে। রামপুরায় রাস্তা অবরোধ করেছিলেন ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা। সেখান থেকে তাদের সরিয়ে দিতে চালানো হয় হামলা, এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়েও ভাংচুর চালানো হয়। সাংবাদিকদের তোলা ছবিতে দেখা গেছে, পুলিশের সঙ্গে যোগ দিয়ে বহিরাগতরাও হামলা চালাচ্ছে ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে। এমনকি লুঙ্গি পরিহিত এক লোককে দেখা যাচ্ছে পুলিশের সঙ্গে দাঁড়িয়ে ঢিল ছুঁড়তে। অথচ আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বারবার জানানো হয়েছে, এসব হামলার নেপথ্যে ছিল বিএনপি জামায়াত।

এই প্রসঙ্গেই সাইফুর রহমান সোহাগকে প্রশ্ন করেছিলেন উপস্থাপক আবদুর নূর তুষার। তিনিও বারবার বলছিলেন, হামলাকারীরা কেউ ছাত্রলীগের নয়, এরা বিএনপি জামাতের কর্মী। প্রশ্ন ছিল, এরা যদি আওয়ামীলীগের কেউ না হয়, সত্যিই যদি তারা বিএনপি-জামাত হয়ে থাকে, তাহলে পুলিশ তাদের গ্রেফতার করছে না কেন? এবার খানিকটা আমতা আমতা করে সোহাগ বললেন, এরা নাকি ছদ্মবেশী পুলিশও হতে পারে! হেলমেট পরে তারা নাকি আইনশৃঙখলা রক্ষায় নেমেছে! লুঙ্গি পরে এমন মারমুখো হয়ে অ্যাকশনে যেতে আজ পর্যন্ত কোন পুলিশকে কেউ দেখেছেন কিনা, এই প্রশ্নটা আর করলাম না।

রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে মিথ্যাচার বা অস্বীকার করাটা একটা বড়সড় জায়গা দখল করে আছে। কমবেশি সব দেশের রাজনীতিবিদেরাই মিথ্যা বলেন, প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভুলে যান, আবার নিজেদের অপকর্মের কথা বেমালুম অস্বীকার করেন। তবে সেটার একটা মাত্রা থাকে। বাংলাদেশী রাজনীতিবিদেরা সেসব মাত্রা ছাড়িয়ে যান মাঝেমধ্যেই। তারা কি বলছেন, কি বলার দরকার ছিল, সেসব নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামান বলে মনে হয় না। গুজব নিয়ে খুব কথাবার্তা হচ্ছে, ধানমন্ডিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে গুজব ছড়ানো হয়েছে অজস্র; খুন, ধর্ষন বা চোখ উপড়ে ফেলার মতো অবাস্তব গুজব ছড়িয়ে শিক্ষার্থীদের প্ররোচনা দেয়া হয়েছে রাজনৈতিক কার্যালয়ে হামলা চালাতে। এমনকি এক অভিনেত্রীও এমন গুজবের স্রোতে গা ভাসিয়েছেন!

যারা এসব গুজব রটিয়েছে, তাদের আইনের আওতায় আনা হোক, শাস্তির ব্যবস্থা করা হোক। অভিনেত্রী নওশাবাকে যেমন গ্রেফতার করা হলো। কিন্ত সমস্যা হচ্ছে, সরকারদলীয় উচ্চপদস্থ ব্যক্তিরা কি গুজব ছড়াচ্ছেন না? ধানমন্ডিতে যেদিন শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আওয়ামীলীগ কর্মীদের সংঘর্ষ হলো, তথ্য ও প্রযুক্তি মন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলক ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে দাবী করলেন, আহত বা নিহতের কোন ঘটনাই নাকি ঘটেনি! তাহলে পপুলার হাসপাতালে আহতের মিছিল এলো কোত্থেকে? অন্য গ্রহ থেকে নিশ্চয়ই ভেসে আসেনি রক্তাক্ত, আহত ছেলেগুলো।

আবার অনলাইনে একটা তালিকা ভেসে বেড়াচ্ছে ইদানিং। কিছু মানুষের নাম আর ছবি উল্লেখ করে বলা হচ্ছে, এরা গুজব রটনাকারী, এদের ধরিয়ে দিতে। সেখানে সিআইডি’র ফেসবুক পেজ আর ওয়েবসাইটের উল্লেখ করা আছে। অথচ পুলিশ দাবী করেছে, এরকম কোন তালিকা তারা তৈরি করেনি। তাহলে এগুলো ছড়াচ্ছে কারা? কোন উদ্দেশ্যে? ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন আবার এই ছবিগুলো নিজের ফেসবুক প্রোফাইল থেকে শেয়ার করেছেন। এগুলো গুজব রটানো নয়?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মোটামুটি ভাইরাল হয়ে গিয়েছে সাইফুর রহমান সোহাগের টক-শো’র এই বক্তব্যটা। হওয়াটাই স্বাভাবিক। দায়িত্বশীল পদে থাকা একজন মানুষ যখন দিনের পর দিন এমন হাস্যরসাত্নক পর্যায়ের কথাবার্তা বলেন, এমন অদ্ভুত যুক্তি দেন, তখন লোকে হাসবেই। সমস্যা হচ্ছে, এই মানুষগুলোই আমাদের দেশের নেতা হন, মন্ত্রী হন। বিএনপির প্রসঙ্গ এই লেখায় আনছি না, কারণ তাদের নিয়ে কথা বলাটাই শক্তির অপচয়। ওই দলটা ভাঁড়ের দল হয়ে গেছে অনেক আগেই, প্রশ্ন হচ্ছে, আওয়ামী লীগও কি বিএনপির দেখানো পথে হাঁটা শুরু করেছে?

Comments
Spread the love