নিজে জিততে হলে কি অন্যকে হারাতেই হবে?

– এটা কম্পিটিশনের যুগ বুঝলা? একটু কম্পিটেটিভ না হলে টিকতে পারবা না।
– জ্বি বুঝলাম। তা কম্পেটিটিভ হতে হলে কি করতে হবে?
– অন্যরা কি করছে না করছে, তার খোঁজ করতে হবে। তাদের শক্তির জায়গা, দুর্বলতার জায়গাগুলো খুঁজে খুঁজে বের করতে হবে। না হলে টিকতে পারবে না।
– বুঝলাম না। কম্পিটিশনে জিততে হলে অন্যের দুর্বলতা কেন জানতা হবে?
– জানতে হবে না? তোমারতো তার আগে যেতে হবে। তাকে হারাতে হবে। জিততে হবে। তার দুর্বলতা না জানলে জিতবে কি করে? অন্যের দুর্বলতা বুঝেইতো মোক্ষম আঘাতটা করতে হবে।
– কেন? আমাকে জিততে হলে অন্যকে আঘাত করতে হবে কেন?
– আরে বোকা ছেলে! অন্যকে যদি পরাস্তই না করতে পারো, ছোটই না করতে পারো, তাহলে তুমি জিতবে কি করে? তার চেয়ে বড় হবে কি করে?’
– আমি তো তার চেয়ে বড় হতে চাই না।
– চাও না?
– না।
– ইউ আর সাচ আ হোপলেস!
– নাহ! আমি হোপলেস না।
– তাহলে?
– আমি অনেক বেশি হোপফুল। আপনি যা যা, যতটা ভাবছেন, তারচেয়েও হাজারগুণ বেশি হোপফুল।
– কিভাবে?
– আপনি আমাকে একটা স্ট্যান্ডার্ড ঠিক করে দিচ্ছেন, আমার তাকে টপকাতে হবে, তারচেয়ে ভালো করতে হবে, তার সাথে কম্পিট করে জিততে হবে। এবং এসব করতে হলে আমার তাকে ছোট করতে হবে, হারাতে হবে, কিন্তু আমিতো এমন ভাবি না? আমারতো তারচেয়ে বড় হবার কোন প্রতিযোগিতা নেই?’
– তাহলে? কার চেয়ে বড় হবার?
– আমার কারো চেয়েই বড় হবার প্রতিযোগিতা নেই। আমাকে আগে বুঝতে হবে আমার শক্তি জায়গাটা কি? আমার ভালোলাগার জায়গাটা কি? আমি যদি অভিনয়ে ভালো হই, আমার শক্তি যদি অভিনয় হয়, তাহলে আমার কি অভিনয়েই যাওয়া উচিত? নাকি যার সাথে আমার কম্পিটিশন সে বিসিএস ক্যাডার হয়েছে বলে আমার অভিনয় বাদ দিয়ে তাকে হারানোর জন্য আমারো বিসিএস ক্যাডার হয়ে তার চেয়ে ভালো কোন ক্যাডার পাওয়ার চেষ্টা করা উচিত? যেহেতু আমার তাকে হারাতে হবে, সেহেতু আমার শক্তি এবং ভালোলাগার জায়গাটা বাদ দিয়ে আমার তাকে হারানোর জন্য হলেও আমার আগ্রহ নেই এমন একটা জায়গার জন্য ফাইট করা উচিত? তাই তো?’
– এই যে, বুঝলা না! কই বিসিএস? আর কই ধুত্তুরি ছাই একটিং? এইসব বাদ দাও। তার কত পাওয়ার বিসিএস ক্যাডারদের জানো? পুলিশ, ম্যাজিস্ট্রেট! আহা! দেখছ? এইটা পাওয়ারের যুগ। যাও যাও, বিসিএস দাও।
– আচ্ছা, ধরেন ঢাকা থেকে আপনার যাওয়া দরকার বরিশাল আর আমার সিলেট। এখন জাস্ট আপনি যাতে আগে বরিশাল না যেতে পারেন, শুধু এইজন্যই আপনাকে হারাবার জন্য হলেও, আমাকে আমার গন্তব্য বাদ দিয়ে বরিশাল যেতে হবে? যাতে আমি যেন অতি অবশ্যই বরিশাল যাওয়ার দৌড়ে আপনাকে হারাতে পারি? এই জন্য কি আমি আমার গন্তব্য সিলেট বাদ দিয়ে আপনার আগে বরিশাল যাওয়ার প্রতিযোগিতায় শামিল হব?
– না। তা না। তা কেন?
– তাহলে? আমার লক্ষ্য তো বিসিএস না। ইঞ্জিনিয়ার বা ডাক্তার হওয়া না। বা সাংবাদিক হওয়া না। আমার ইচ্ছে ভিন্ন। এখন অমুক এই হলো বলে, আমারো তা-ই হতে হবে? তাকে হারানোর জন্য?
– কাউকে না হারিয়ে নিজে বড় হবে কি করে?আর ধরো যদি একই ট্র্যাকের হও দুইজন? তখন? তখন কিন্তু নিজে তারচেয়ে বড় হতে হলে, তাকে হারাতেই হবে। আর তাকে ছোট না করতে পারলে হারাবে কিভাবে? এইজন্য তার দুর্বলতা খুঁজে বের করতে হবে।
– না ভাই। ভুল। ধরেন আপনি ঘণ্টায় ত্রিশ কিমি দৌড়াতে পারেন। আমি দৌড়াতে পারি ২৮ কিমি। এখন আপনার চেয়ে দৌড়ে আমাকে এগিয়ে যেতে হলে কি করতে হবে? আপনাকে ল্যাং মেরে ফেলে দিতে হবে? যাতে আমি ওই ২৮ কিমি’র গতি নিয়েই ৩০ কিমি গতির আপনার চেয়ে এগিয়ে গিয়ে ফার্স্ট হতে পারি? নাকি আমার চেষ্টা করা উচিত আপনার ৩০ কিমি’র গতির চেয়েও আরও গতি বাড়িয়ে নেয়ার? প্রচুর অনুশীলন, চেষ্টা, যাতে আমি ৩২ কিমি দৌড়াতে পারি। তাই না? তাহলে কিন্তু আমি আমার সামর্থ্যকেই বাড়িয়ে নিচ্ছি। অন্যকে ছোট করে নিজে বড় হচ্ছি না। বরং নিজেকে অন্যের চেয়ে ছাড়িয়ে নিচ্ছি নিজেকে আরো বড় করেই, আরও সামর্থ্যবান করেই তাই না?
– হুম, তা ঠিক? কিন্তু সবাইতো এভাবে নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে পারে না।
– পারে। কিন্তু তারা ভুল জায়গায় ভুল চেষ্টাটা করে। সে তার নিজের শক্তির জায়গাটা বোঝে না। দুনিয়ার সবার সক্ষমতা সব ক্ষেত্রে সমান না। মেসি যেমন ফুটবলে ভালো, কোহলি তেমন ক্রিকেটে। এখন মেসি যদি ক্রিকেট খেলতে আসে, আর কোহলি ফুটবল, তাহলে কি হবে? তাহলে দুইজনই ভাববে, তারা দুনিয়ার সবচেয়ে বড় অথর্ব মানুষ, তাই না? আইনস্টাইন বলেছিলেন, একটা মাছকে যদি গাছ বাইতে বলা হয় তাহলে সে সারাজীবন ধরে গাছ বাওয়ার চেষ্টা করবে, আর ভাববে, এই দুনিয়ায় তারচেয়ে অক্ষম, অথর্ব কেউ নাই। কিন্তু তাকে পানিতে সাতার কাটতে দিলে? তখন সে কি আবিস্কার করবে? এটাই হচ্ছে বিষয়। সবাই কোন না কোন জায়গায় সামর্থ্যবান। কিন্তু তাকে তার সেই শক্তির জায়গাটা বুঝতে হবে। সেটি না বুঝতে পেরে শুধু অন্যের বড় হওয়া দেখে হা পিত্যেশ করলে, তার সাথে অসুস্থ কম্পিটিশনে নামলেতো লাভ নাই!
– হুম তা অবশ্য ঠিক।
– তা অবশ্য ঠিক না। এটাই ঠিক। আমরা সবসময় নিজেকে বড় করতে গিয়ে সবার আগে ভাবি, অন্যকে কিভাবে ছোট করে বড় হওয়া যায়। কিন্তু কখনোই ভাবি না, অন্যকে ছোট না করে, নিজেকেই সত্যি সত্যি বড় কিভাবে করা যায়। আমরা তখন অন্যের সফলতার বিষয়ে কুৎসা রটাই, সন্দেহ পোষণ করি। কেন? কারণ সেই বিষয়ে তারচেয়ে সফল হবার ক্ষমতা আমার নেই। এইজন্য আমি কুৎসা রটিয়ে , সন্দেহ পোষণ করে নিজেকে নিজে বুঝাই, আরে ধুর, এতো অস্থির হবার কিছু নাই। এমন কিছু হয় নাই, সব ভুয়া। বা সে এই, সে সেই। নিজের অক্ষমতাকে পরিতৃপ্ত করার চেষ্টা করি। আর কিছুই না। কিন্তু এতে বরং এই অক্ষমতারা রোজ রোজ বাড়তেই থাকে। বাড়তে বাড়তে, একটা সম্ভাবনাময় মানুষকেও করে ফেলে সঙ্কীর্ণ। তাই না?
– হুম।
– আসলে, সময়। সময় খুব গুরুত্বপূর্ণ। পৃথিবীতে সময়ের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর কিছুই নেই। সুতরাং অন্যের সাথে ভুল প্রতিযোগিতা করে, কুৎসা রটিয়ে, সন্দেহ পোষণ করে নিজেকে আত্মতৃপ্ত না করে, বরং নিজের ভালো লাগার, নিজের শক্তির কাজটি করে নিজের সময়টাকে কাজে লাগানোই বরং সবচেয়ে কাজের। এরচেয়ে বড় কিছু নেই। নিজেকে নিজের ছাড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা। হ্যাঁ, অন্যকে নয়, ছাড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টাটা হোক নিজেকে নিজের। প্রতিযগিতাটাও, অন্যের সাথে না, বরং হোক নিজের সাথেই। নিজের ব্যর্থতার বিরুদ্ধে সফল হবার প্রতিযোগিতা, নিজের ভুলের বিরুদ্ধে শুদ্ধ হবার প্রতিযোগিতা, অন্যের সফলতা সম্পর্কে কুৎসা, সন্দেহ রটিয়ে সময় নষ্ট না করে ওই সময়টুকু নিজেকে আরো শাণিত করার, আরও খানিক শক্তি, চেষ্টা বাড়িয়ে নেয়ার প্রতিযোগিতা। সফলতা আসবেই। আসবে পরিপুর্ণ মানসিক তৃপ্ততাও! এই তৃপ্তির চেয়ে বড় কিছু নেই। কিচ্ছু না।

আপনার কাছে কেমন লেগেছে এই ফিচারটি?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-