অনূর্ধ্ব-উনিশ বিশ্বকাপের পরপরই আমার চারপাশে গুঞ্জন শুরু হয়ে গিয়েছিল, পরিচিত লোকজনের সঙ্গে দেখা হলেই তারা বলতো, আরে তুই তো ক’দিন বাদেই ভারতের হয়ে খেলবি। এই ব্যাপারটা আমার মাথায় গেঁথে গিয়েছিল খুব বিশ্রীভাবে, যেটার ফল আমি আমার ক্যারিয়ারের প্রথম আইপিএলে পেয়েছিলাম। আইপিএল শুরুর আগে আমার মাথায় শুধু এই ভাবনাটাই বারবার হানা দিতো যে, যেভাবেই হোক আমাকে এখানে ভালো খেলতে হবে, নইলে আমি ইন্ডিয়া টিমে সিলেক্ট হবো না।

সেই আইপিএলটা আমার জন্যে বিভীষিকার মতো কেটেছিল। দল ভালো করেনি, আমিও মানচিত্রের কোথাও ছিলাম না। ভারতের এ দলের হয়ে তারপর আমাকে পাঠানো হলো অস্ট্রেলিয়ায়। সেখানেও ভালো করতে পারছিলাম না আমি, দল থেকেও বাদ দেয়া হয়েছিল আমাকে। তখন ভারতীয় দলের প্রধান নির্বাচক ছিলেন দিলীপ ভেংসরকার, তিনি অস্ট্রেলিয়া এসেছিলেন কয়েকটা ম্যাচ দেখতে।

ভেংসরকার যেদিন অস্ট্রেলিয়া এলেন, সেদিন আমাদের ম্যাচ ছিল নিউজিল্যান্ড-এ দলের সঙ্গে। এয়ারপোর্ট থেকে সরাসরি উনি মাঠে চলে এলেন। সেই ম্যাচেও আমার ড্রেসিংরুমে থাকার কথা ছিল। কিন্ত কি মনে করে যেন কোচ আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, আমি ব্যাটিঙে ওপেন করতে চাই কিনা। তখন তো এতকিছু ভাবার ব্যপার ছিল না, আমি খেলতে পারলেই খুশী। নাচতে নাচতে রাজী হয়ে গেলাম।

ভেংসরকার মাঠে ঢুকলেন, তার পনেরো মিনিট বাদেই আমরা ব্যাটিং করতে নামলাম।। নিউজিল্যান্ডের সেই দলটায় ক্রিস মার্টিন ছিল, টিম সাউদি আর কোরি অ্যান্ডারসনও ছিল। শিখর ধাওয়ানের সঙ্গে ওপেনিঙে খেলেছিলাম আমি, ১২০ রান করেছিলাম অপরাজিত থেকে। কাকতালীয় বলে কোনকিছুতে আমি বিশ্বাস করি না, আমার ধারণা সেই দিনটাই আমার ছিল। দিলীপ ভেংসরকার আমার ব্যাটিং দেখলেন, সেটা তার মনে ধরলো, তার হয়তো মনে হলো আমাকে একটা সুযোগ দেয়া দরকার ভারতীয় দলে।

শচীন টেন্ডুলকার, বিরাট কোহলি, ব্যাটিং ঈশ্বর, ভারতের বিশ্বকাপ জয়

জাতীয় দলে ডাক পাবার পরে আমার প্রথম মিশনের নাম ছিল শচীন টেন্ডুলকার! দুইদিন ধরে আমি শুধু এটা ভেবেছি যে প্রথমবার দেখা হওয়ার পর তাকে আমি কি বলবো, কিভাবে বলবো। দলের সিনিয়র প্লেয়ারদের কেউ কেউ এটা জেনে গেলেন যে আমি উনার সাথে দেখা করার জন্যে, কথা বলার জন্যে মুখিয়ে আছি, খানিকটা ভয়ও পাচ্ছি। ওরা তখন প্ল্যান বানিয়ে আমার সঙ্গে মজা নিতে শুরু করলো।

আমাকে বলা হলো, নতুন যে’ই দলে ঢোকে, সে নাকি প্রথমে শচীনের পায়ে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করে! যুবরাজ, হরভজন, মুনাফ প্যাটেল আর ইরফান পাঠান ছিল এই ষড়যন্ত্রের হোতা। মুনাফ তো আমাকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে পুরোপুরি কনভিন্স করে ফেলেছিল, একদম মগজ ধোলাই যাকে বলে। আমিও বিশ্বাস করে নিয়েছিলাম যে এটা সত্যি! পুরো দেশ যাকে ঈশ্বরের মতো সম্মান করে, তাকে দলের খেলোয়াড়েরা মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করতেই পারে।

শচীনের সঙ্গে ড্রেসিংরুমেই আমার প্রথম দেখা হলো, আমি উনাকে হ্যালো বললাম, জবাবে উনি বললেন- ‘হাই!’ তারপর আমি সোজা উনার পায়ের ওপরে গিয়ে পড়লাম, উনি লাফ দিয়ে সরে গিয়ে বললেন, ‘আরে করছো কি এটা!’ আমি তখন বাকীরা আমাকে যেটা বলেছে, সেটা বললাম তাকে। উনি হেসে ফেলে বললেন, ‘ওরা তোমাকে উল্লুক বানিয়েছে। এরকম কিছু কখনও হয়নি, হবেও না।’ এটাই ছিল ওর সাথে আমার ফার্স্ট ইম্প্রেশন!

কয়েক মুহুর্ত পরের কথা, শচীন তখন কিটব্যাগ খুলে জিনিসপত্র দেখেশুনে নিচ্ছিলেন, আর আমি অবাক হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে ছিলাম। আমার বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল সবকিছু, যে মানুষটাকে দেখে আমি ক্রিকেট খেলা শুরু করেছি, খেলাটাকে ভালোবেসেছি, আমার সেই আইডল আমার থেকে নিঃশ্বাস দূরত্বে দাঁড়িয়ে আছেন, আমি হাত বাড়ালেই তাকে ছুঁতে পারি। এই দৃশ্যটা বাস্তব, কোন টিভি স্ক্রিনে ভিডিও দেখছি না আমি! ওই কয়েকটা মিনিট আমার জন্যে ভীষণ স্পেশাল ছিল।

শচীন টেন্ডুলকার, বিরাট কোহলি, ব্যাটিং ঈশ্বর, ভারতের বিশ্বকাপ জয়

ক্যারিয়ারের তিনটা মূহুর্তকে আমি খুব স্পেশাল ভাবি। ঘরের মাঠে বিশ্বকাপ জয়, ২০১৩ সালের চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে চ্যাম্পিয়ন হওয়া, আর তার পরের বছর লর্ডসে টেস্ট জেতা। আমার মনে আছে, ওয়াংখেড়ের ফাইনালে আমি যখন ব্যাট হাতে মাঠে ঢুকছিলাম, আমার আইডলকে দেখছিলাম মাঠ ছেড়ে বেরিয়ে যেতে। পুরো ওয়াংখেড়ে তখন শ্মশ্মানের মতো নীরব। আমার মনে হচ্ছিল ঘরের মাঠে নয়, দর্শকশূন্য কোন বিরান প্রান্তরে বুঝি খেলতে নেমেছি সবাই!

বিশ্বকাপ জেতার পরে আমি কিছু একটা বলেছিলাম, যেটা একদম ভাইরাল হয়ে পড়েছিল। আমার মনে হয় না খুব আহামরি কিছু বলেছি। একুশ বছর ধরে এই মানুষটা আমাদের আশা প্রত্যাশাকে নিজের কাঁধে বয়ে নিয়ে এসেছেন, একটা দিন তো ওকে আমরা নিজেদের কাঁধে নিতেই পারি, তাইনা? আমি আসলেই জানিনা এই লাইনটা কিভাবে মুখ ফসকে বেরিয়ে গিয়েছিল, তখন তো এত ভালো ইংরেজীও বলতে পারতাম না, বুঝতামও না! আমি নিজের আইডলের সঙ্গে একসঙ্গে খেলতে পেরেছি, এটাই তখন আমার কাছে বিশ্বকাপের চেয়েও বড় কিছু ছিল।

তুলনায় আমি মোটেই বিশ্বাসী নই। তবুও আপনি মানুষের সাথে মানুষের তুলনা করতে পারেন। আপনি এমন কারো সাথে আমার তুলনা করতে পারেন না, যাকে দেখে আমি ক্রিকেট খেলা শুরু করেছিলাম। স্কিল লেভেলের দিক থেকে তো তার সঙ্গে কারোই কোন তুলনা চলে না, পুরোপুরি কমপ্লিট একজন ব্যাটসম্যান তিনি। কোন দিক থেকে আপনি তুলনা করবেন বলুন?

আমি সবসময় বলি, ওর রেকর্ডগুলোর দিকে দেখুন, চব্বিশ বছরের দুর্দান্ত ক্যারিয়ারটার দিকে তাকান, যেসব কীর্তি তিনি গড়েছেন, আমাদের তিনি যা যা দিয়েছেন, তাতে অন্তত তার সাথে আমাদের মাপের কারো তুলনা চলে না। তিনি(শচীন) সবার ওপরে। আমি কেন, এই প্রজন্মের কারো অন্তত তার কাছাকাছি যাওয়ার সক্ষমতাটুকুও নেই।

তথ্যসূত্র- ব্রেকফাস্ট উইথ চ্যাম্পিয়ন্স। 

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-