ব্যাটে রান নেই অনেকদিন হলো। মাঝারি বা দলের জন্যে প্রয়োজনীয় কোন ইনিংসও এখনও খেলতে পারেননি ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে। দুই ম্যাচে করেছেন মাত্র ১৫ রান, দ্বিতীয় ওয়ানডেতে শেষ মূহুর্তে আউট হয়ে বরং দলকে ডুবিয়েছেন। সাব্বির রহমান পত্রিকার শিরোনাম হলেই ইদানিং ভয় লাগে, নেতিবাচক কারণ ছাড়া যে আলোচনায় আসেন না বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের এই ব্যাটসম্যান! আরও একবার সেই বিতর্কে জড়িয়েই খবর হলেন সাব্বির, এবার অভিযোগ উঠেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একজনকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেছেন তিনি!

ক্রিকইনফো জানিয়েছে, ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় ওয়ানডেতে ব্যাট হাতে ব্যর্থ হবার পর ফেসবুকে এক বাংলাদেশী ব্যবহারকারী সাব্বিরের পারফরম্যান্সের সমালোচনা করে একটা পোস্ট দেন। সেখানেইই কমেন্টে সাব্বির রহমান রোমান নামের একটা আইডিকে মেনশন দেন আরেকজন। এই ফেসবুক অ্যাকাউন্টেরর ফলোয়ার প্রায় নব্বই হাজারের বেশি, এটাকেই সাব্বিরের মূল অ্যাকাউন্ট বলে মনে করছেন অনেকে। সেই অ্যাকাউন্ট থেকেই পোস্টদাতাকে মেসেজে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করা হয়। সেটার স্ক্রীনশট ছড়িয়ে পড়তে সময় লাগেনি খুব বেশি। 

সাব্বির বীরত্ব, সাব্বির ব্যাটিং, সাব্বির অধিনায়ক

অনলাইনে ভাইরাল হয়ে যাওয়া সেই স্ক্রীনশটটা নিয়ে রিপোর্ট করেছে ক্রিকেটবিষয়ক জনপ্রিয় ওয়েবসাইট ক্রিকইনফো। বিসিবির নজরেও এসেছে সেটা। ক্রিকেট বোর্ডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নিজামউদ্দিন চৌধুরী বলেছেন, তদন্তে ঘটনার সত্যতা পাওয়া গেলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।

ডেইলি স্টারের এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে নিজামউদ্দিন চৌধুরী বলছিলেন-

“ক্রিকেটারদের জানা উচিত ভক্ত বা সমর্থকদের সাথে কেমন আচরন করতে হবে। এই বিষয়ে জাতীয় দলের ক্রিকেটাদের সবাইকেই কমবেশি গাইডলাইন দেয়া হয় আমাদের পক্ষ থেকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম একটা ওপেন প্ল্যাটফর্ম, এখানে অনেকেই যা খুশী বলতে পারে। কিন্ত দায়িত্বশীল একটা জায়গায় থেকে আপনি যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে কথা বলতে পারেন না। সেটা আমরা অ্যালাও করবো না। যেহেতু বিষয়টা প্রকাশ্যে ঘটেছে, এবং আমাদের ডিসিপ্লিনারি কমিটি আছে, তারা এটা তদন্ত করে দেখবেন। কারো দোষ পাওয়া গেলে অবশ্যই নিয়মানুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।”

বিসিবির নজরে আসার পর থেকেই সাব্বির রহমান রোমান নামের সেই ফেসবুক অ্যাকাউন্টটি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না আর, ধারণা করা হচ্ছে, সেটা ডি-অ্যাকটিভ করে রাখা হয়েছে। তবে ইনবক্সে নোংরা আর কদর্য ভাষায় আক্রমণের সেই স্ক্রীনশটটি ঘুরে বেড়াচ্ছে অনলাইনে। 

এমনিতেই এখন বিসিবির নিষেধাজ্ঞায় আছেন সাব্বির। জাতীয় লীগের ম্যাচ চলাকালীন স্টেডিয়ামের গ্যালারী থেকে ধরে এনে এক কিশোর দর্শককে পিটিয়েছিলেন তিনি। সেই কিশোর দর্শক নাকি তাকে কটুক্তি করেছিলেন। সেযাত্রায় ঘরোয়া ক্রিকেট থেকে ছয়মাসের নিষেধাজ্ঞা আর বিশ লক্ষ টাকা জরিমানা গুণেছেন। ভারতে আফগানিস্তানের বিপক্ষে টি-২০ সিরিজ খেলতে গিয়ে সতীর্থ মেহেদি হাসান মিরাজের বাকবিতণ্ডায় জড়িয়েছিলেন বলে জানিয়েছিল ক্রিকবাজ, এমনকি মিরাজের গায়ে তিনি হাত তুলেছেন বলেও খবর এসেছিল!

এর আগে ২০১৬ সালের বিপিএল চলাকালে টিম হোটেলে আচরনবিধি ভঙ্গের অভিযোগে বারো লাখ টাকা জরিমানা গুণত হয়েছিল সাব্বিরকে। সর্বশেষ বিপিএলেও আম্পায়ারকে গালি দিয়ে ম্যাচ ফি’র চল্লিশ পার্সেন্ট জরিমানা দিয়েছেন সাব্বির। ক্রিকেট ইতিহাসের প্রথম ‘ডিমেরিট পয়েন্ট’ পাওয়া খেলোয়াড় তিনি, তিনটি ডিমেরিটাস পয়েন্ট আছে তার নামের পাশে, আরেকটা যোগ হলেই পড়বেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে সাময়িক নিষেধাজ্ঞায়। তবুও সাব্বিরের বিকার নেই, তিনি অবলীলায় জাতীয় দলের সতীর্থের গায়ে হাত তোলেন, মাঠে দর্শক পেটান, ফেসবুকে গালাগালি করেন! এমন নজির তো আমাদের ক্রিকেটে কখনও ছিল না। 

সাব্বিরকে একটা সময়ে তার ভক্তরা তুলনা করতো বিরাট কোহলির সঙ্গে। কোহলির কোন সাক্ষাৎকার কি সাব্বির কখনও দেখেছেন? সতীর্থদের সঙ্গে, দর্শক বা ভক্তদের সঙ্গে কোহলি কেমন আচরণ করেন সেটা কি সাব্বির জানেন? কোহলি নিজেই একবার বলছিলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কোন বক্তব্যই তিনি সিরিয়াসলি নেন না, এমনকি পড়েও দেখেন না। কারণ আজ যে মানুষটা তাকে প্রশংসায় ভাসিয়ে দিচ্ছে, সেই একই মানুষটাই আবার কাল গালি দিতে পারে, যদি পারফরম্যান্সটা খারাপ হয়। এসব জিনিস কেউ কাউকে শিখিয়ে দেয় না সাব্বির, কমনসেন্স ব্যাপারটাই মানুষের মধ্যে এই জিনিসগুলো তৈরি করে দেয়। 

সাব্বির রহমান, ফেসবুক, বিসিবি

সাব্বির, আপনারা জাতীয় তারকা, মাঠে, টিভিতে আপনাদের খেলা দেখার জন্যে অপেক্ষা করি আমরা, সমর্থন যোগাই। সবসময় যে ভক্ত বা দর্শকেরা ভদ্র আচরণ করেন এমনটা নয়, কিন্ত দর্শকের কথা কেউ মনে রাখে না, রাখবে না। আপনি কি করলেন, কি বললেন সেগুলোই খবরে আসবে। দর্শকের নামের পাশে ডিমেরিটাস পয়েন্ট যোগ হবে না, দর্শককে জরিমানা গুণতে হবে না, নিষেধাজ্ঞায় পড়তে হবে না। লাইমলাইটে আপনারা থাকেন, খবরের কাগজের শিরোনাম আপনারাই হন, আর তাই আচার আচরণে আরও অনেক বেশী সতর্ক হওয়াটা আপনাদের জন্যে আবশ্যকীয়। যে অবস্থানে আপনারা আছেন, সেখানে দাঁড়িয়ে অনেককিছু সহ্য করে নিতে হয়, অনেককিছু মেনে নিতে হয়, মুখে হাসি ফুটিয়ে রাখতে হয়। আপনাদের যেকোন কিছু করাটা শোভা পায় না, যা তা বলা মানায় না। আর কত সাব্বির? আর কতবার এমন নিন্দনীয় কারণে খবরের শিরোনাম হবেন? ধৈর্য্য বলে তো একটা ব্যাপার আছে, তাই না?

আগ্রাসনটাকে ক্রিকেটে রাখুন, ব্যাটে বলে সীমাবদ্ধ রাখুন, সেটাকে আম্পায়ার বা দর্শকের ওপর ঝেড়ে দেবেন না প্লিজ। যা করেছেন, যা করছেন, এগুলো কেবল আপনার প্রতি দর্শকের ভালোবাসাটাই কমাবে, আপনাকে ঘৃণার পাত্রে পরিণত করবে।

ভালোবাসাটুকু জয় করে নিন সাব্বির, ঘৃণা কুড়োবেন না প্লিজ!

Comments
Spread the love