এগিয়ে এসে স্টাম্প ঘেষে দাঁড়ালেন কুইন্টন ডি কক। ভারনন ফিল্যান্ডারের আউট সুইঙ্গারে ব্যাট চালিয়ে দিলেন রবিচন্দ্রন অশ্বিন। ব্যাটের কানা ছুঁয়ে বল ডি ককের গ্লাভসে। প্ল্যান, স্কিল আর এক্সিকিউশনের অপূর্ব সমন্বয়!

বারবার বেরিয়ে এসে সুইং কাভার করে খেলছিলেন অশ্বিন। প্ল্যান ছিল তাই তাকে ক্রিজে বেধে রাখা। ফিল্যান্ডারের বলে গতি খুব বেশি না হলেও স্টাম্প ঘেষে কিপিং করার কাজটি সহজ নয়। প্ল্যান করা হলো কঠিন কিছুরই। প্রথম বলেই সাফল্য। ডি ককের স্টাম্প ঘেষে থাকাই হয়ত ভাবাল অশ্বিনকে, চিড় ধরাল মনোযোগে। ১২৭ কিমি গতির বলে ব্যাট ছোঁয়ার পর সেখানেই গ্লাভসে জমিয়ে অসাধারণ ক্যাচ নিলেন ডি কক।

ভুবনেশ্বরের সঙ্গে অশ্বিনের জুটি জমে গিয়েছিল। অধিনায়কের দারুণ পরিকল্পনা, বোলার ও কিপারের দুর্দান্ত স্কিলে পরিকল্পনার সফল বাস্তবায়ন। অশ্বিনের বিদায়েই কার্যত ম্যাচ শেষ। ওই ওভারেই আরও দুটি আউট সুইঙ্গারে স্লিপে দারুণ দুটি ক্যাচ, ম্যাচ এবার সত্যিই শেষ। বোলিং আর ক্যাচিংয়ে যথারীতি স্কিল আর টেকনিকের দারুণ প্রদর্শনী।

লো-স্কোরিং ম্যাচে ৭২ রানের জয় মানে বেশ বড় জয়। যদিও এক ওভারে শেষ তিন উইকেটের আগে একটু টেনশনে পড়ে গিয়েছিল প্রোটিয়ারা। কোচ ওটিস গিবসন পায়চারি শুরু করেছিলেন। হয়ত অস্থিরতায়। তিন উইকেটের জন্য শেষ পর্যন্ত তিনটি ভালো বলই লাগে।

ক্যারিয়ার সেরা বোলিংয়ে ম্যাচ সেরা ফিল্যান্ডার। তবে সামান্য এগিয়ে থেকে আমার ম্যান অব দা ম্যাচ এবি ডি ভিলিয়ার্স। প্রথম ইনিংসে ডি ভিলিয়ার্সের ব্যাটিং আর ফাফ দু প্লেসির সঙ্গে তার জুটিই আমার মতে ম্যাচে মূল পার্থক্য গড়ে দিয়েছে। টস জিতে ব্যাটিংয়ে নামার পর ১২ রানেই নেই ৩ উইকেট। ভ্যাবাচাকা খেয়ে বসেছিল ড্রেসিং রুম। সেই চাপ সরানোর জন্য প্রয়োজন ছিল দু:সাহস। ডি ভিলিয়ার্সের ব্যাট কতবারই তো হয়েছে দু:সাহসের প্রতিশব্দ। হয়ে উঠল আরেকবার। দারুণ পাল্টা আক্রমণে উল্টো চাপে ফেলে দিলেন ভারতকেই। পেসাররা হারিয়ে ফেলল লাইন-লেংথ। উইকেটের ধরণ বুঝে বল করার সহজাত কাজটি ফেলল গুলিয়ে। ১১৪ রানের জুটিতে রান উঠেছে ওভারপ্রতি চারের বেশি। ৭৭ স্ট্রাইক রেটে ডি ভিলিয়ার্স ৬৫। তার রান আর জুটির রান, উইকেট আর ম্যাচের পরিস্থিতি বিবেচনায় দুটিই অবিশ্বাস্য। ভালো বা খুব ভালোর সঙ্গে গ্রেটদের মধ্যে পার্থক্য এখানেই যে অবিশ্বাস্য ব্যাপারগুলি গ্রেটরা অনায়াসে করে। প্রয়োজনের সময় করে।

ম্যাচের রোমাঞ্চ অনেকটা শেষ হয়ে যেত দুই দলের প্রথম ইনিংস শেষেই, যদি না হার্দিক পান্ডিয়া স্পেশাল ইনিংসটি না খেলতেন। ‘বিগ হার্টেড’ ক্রিকেটাররা সবসময়ই বাড়তি শ্রদ্ধার দাবী রাখে। যারা ডরায় না। ভড়কায় না। নিজের সামর্থ্যকে চ্যালেঞ্জ জানায় প্রতিনিয়ত। পান্ডিয়া আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে কতটা সফল হবে, সেটি বলবে সময়। তবে সে বিগ হার্টেড ক্রিকেটার। করে দেখাতে ভয় পায় না। পরিস্থিতি আর প্রতিকূলতাকে চ্যালেঞ্জ জানাতে ভাবে না।

এই কন্ডিশনে তার টেকনিক চলার কথা নয়। তিনি দেখালেন, নিজের মত মানিয়ে নিতে পারলে খুব চলে যায়! শুরুতে নড়বড়ে ছিলেন একটু। ভাগ্যের সহায়তা পেয়েছেন কিছু। তার ধরণের ব্যাটসম্যানের সেটা অনেক সময় লাগে। সেটাকে কাজে লাগানোও কৃতিত্বের। পান্ডিয়া কৃতিত্বটা দাবী করতেই পারেন। তাকে থামাতে দক্ষিণ আফ্রিকার প্ল্যানও ছিল দেখার মত। একের পর এক শর্ট বলের তোপ। সেটিতেই এক পর্যায়ে কাজ হয়েছে।

ম্যাচ শেষ হয়েছে আজ একদিনেই মাত্র ৬৪ ওভারের মধ্যে ১৮ উইকেটের ফয়সালা হয়ে। মাঝে দুই রাত এক দিন উইকেট ছিল কাভারের নীচে। ময়েশ্চার জমে ছিল উইকেটে। পেসারদের আলিঙ্গনের জন্য যেন ছিল প্রস্তুত। ম্যাচ শেষে ডু প্লেসি বললেন, আজ সকালে উইকেট দেখে তার মনে হয়েছে প্রথম দিনের উইকেট!

দুই দলের ব্যাটসম্যানরাই সেই পরীক্ষা উতরাতে পারেনি। দক্ষিণ আফ্রিকা আজ ৬৫ রানে হারিয়েছে ৮ উইকেট। ভারত অলআউট ১৩৫ রানে। এর মধ্যেই ছোট করে নিজের জাত চিনিয়েছেন ডি ভিলিয়ার্স। দুটি করে চার-ছক্কায় তার ৩৫ রানের ইনিংসটি হয়ে উঠেছে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ।

২০৮ রান তাড়া এখানে খুব কঠিন। তার পরও ডেল স্টেইন ছিটকে যাওয়ায় নিশ্চয়ই সম্ভাবনার আলো দেখেছিল ভারত। কিন্তু নিউল্যান্ডসের বরপুত্র তো ফিল্যান্ডার! ৮ টেস্টে ৪৭ উইকেট হয়ে গেল তার এই মাঠে। সহায়ক উইকেটে কী অসাধারণ স্কিলফুল বোলার!

ভারতের দল নির্বাচনে দুটি সিদ্ধান্ত অবাক করেছে। অজিঙ্কা রাহানেকে বাইরে রেখে রোহিত শর্মাকে খেলানো। দেশের মাটিতে সাম্প্রতিক ফর্ম খারাপ হলেও, বিদেশের মাটিতে নি:সন্দেহে তাদের সেরা ব্যাটসম্যান রাহানে। লর্ডসের সবুজ উইকেটে, ওয়েলিংটনের বাউন্স ও বাতাসে, মেলবোর্ন-কিংস্টনে সেই প্রমাণ রাহানে রেখেছে। তাকে বাইরে রাখার সিদ্ধান্ত ছিল বিস্ময়কর। দুই ইনিংসেই বাজে শটে আউট হয়েছেন রোহিত। বিশেষ করে দ্বিতীয় ইনিংসে ভীষণ দৃষ্টিকটু শটে।

দ্বিতীয়ত, উমেশ যাদবকে বাদ দিয়ে জাসপ্রিত বুমরাহকে খেলানোয়। বুমরাহ দ্বিতীয় ইনিংসে ৩ উইকেট পেয়েছেন বটে। তবে প্রথম ইনিংসে এই উইকেট বিবেচনায় মোটেও ভালো করতে পারেননি। তাকে টার্গেট করেই পাল্টা আক্রমণের শুরু করেছিলেন ডি ভিলিয়ার্স। যেটা ম্যাচে বড় পার্থক্য গড়ে দিয়েছে।

জয়ের পাশাপাশি দক্ষিণ আফ্রিকাকে আরেকটা জায়গায় কৃতিত্ব দিতে হয়। দুই ইনিংসেই তারা ব্যাট করেছে এমন সময়ে, যখন ব্যাট করা ছিল সবচেয়ে কঠিন। ময়েশ্চারে ভরা আর ঘাসের উইকেটে টস জিতে ব্যাট নেওয়ার সিদ্ধান্ত ছিল সাহসী। দ্বিতীয় ইনিংসে বৃষ্টির কারণে ঢেকে রাখায় আজ প্রথম ইনিংসের চেয়েও পেস বান্ধব হয়ে উঠেছিল উইকেট। অন্যদিকে, নিউল্যান্ডসে ঐতিহ্যগতভাবে ব্যাটিংয়ের সেরা সময় থাকে দ্বিতীয় দিন। ভারত সেই সুযোগটি নিতে পারেনি। বলা ভালো, নিতে দেয়নি প্রোটিয়া পেস আক্রমণ।

অসাধারণ এক টেস্ট ম্যাচ উপভোগ করলাম। আমি নিশ্চিত, এখানেই শেষ নয়। পরের দুই টেস্টেও আগুণে ক্রিকেট হবে।

তবে একটি ব্যাপার বেশ কৌতুহল জাগানিয়া। ভারতের হারের পর আমার নিউজফিডে যে উল্লাসের প্রতিচ্ছবি দেখলাম, সেটি প্রায় বাংলাদেশের জয়ের মত। কারণটা কি হতে পারে? “২৫ বছরের হিসাব চুকানোর” বিজ্ঞাপনটিই কি মূল কারণ? বিজ্ঞাপন বানিয়েছে ভারতীয় টিভি, তাদের দর্শকের আগ্রহ জাগানোর জন্য। বাংলাদেশের দর্শকের হাসি-তামাশার ব্যাপার নিশ্চয়ই তারা মাথায় রাখবে না! আমাদের ক্রিকেট দর্শকেরা এসব পারে দারুণ!

Comments
Spread the love