কিছুটা ভিন্ন আঙ্গিকে শুরু করা যাক এই লেখাটি। কিছু প্রেডিকশন বা পূর্বানুমানের মাধ্যমে- শিরোনামে ‘গুজব’ শব্দটি দেখেই ‘হা হা’ দেবেন অনেকে। কমেন্ট বক্সেও অনেকে হয়ত লিখবেন, ‘এই লেখাটিও আসলে গুজব!’ অর্থাৎ গুজব জিনিসটি বর্তমানে খুবই সস্তা একটি বিষয়ে পরিণত হয়েছে আমাদের কাছে। পরিণত হয়েছে হাস্যরসের উপাদানে।

যেহেতু আমরা জাতি হিসেবে খুবই রসিক, তাই এতে অবাক হওয়ার কিছুই নেই যে গত কয়েকদিন ধরে বাংলাদেশের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে, বিশেষ করে ফেসবুকে, সবচেয়ে বেশিবার ব্যবহৃত শব্দগুলোর একটি হলো ‘গুজব’। এবং বলাই বাহুল্য, সিংহভাগ মানুষই স্রেফ মজা করতে গিয়ে এই শব্দটিকে ব্যবহার করেছে।

যেমন ধরুন এক ব্যক্তি সকালে উঠে স্ট্যাটাস দিয়েছে, ‘পেটের ভিতরটায় কেমন যেন লাগতেছে। বুঝতেছি না এইটা গুজব নাকি আসলেই টয়লেটে যাওয়া দরকার।’ এ তো তাও খুবই সহজ সরল একটি স্ট্যাটাস। কিছু তথাকথিত শিক্ষিত ফেসবুকার এমনকি ঠাট্টার ছলে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকেও টেনে এনেছে, আমাদের সকল গৌরবকে জনসম্মুখে বিবসনা করে ছেড়েছে। তারা লিখেছে, ‘আসলে ১৯৭১ সালে ৩০ লক্ষ মানুষ শহীদও হয়নি, দুই লক্ষ মা-বোন সম্ভ্রমও হারায়নি। এগুলো সবই আসলে গুজব!’

অনেকে এখন আমার দিকে তেড়ে এসে বলবেন, ‘ধুর মিয়া, সারকাজমও বোঝেন না! এইটা হলো একটা পিওর সারকাজম। যে এইটা লিখেছে সে একেবারে সাচ্চা দেশপ্রেমিক একজন মানুষ। একাত্তরের চেতনা আপনার চাইতে অনেক বেশি পরিমাণে আছে তার ভিতরে। হুদাই সব জায়গায় ত্যানা প্যাচানো বাদ দিয়ে সারকাজমকে সারকাজম হিসেবে নেন, কতটা ক্ষোভ আর দুঃখ থেকে এইসব লেখা হচ্ছে সেটা একটু বোঝার চেষ্টা করেন।’

বোঝার চেষ্টা যে করছি না, তা একদমই সঠিক নয়। বেশ ভালোমতই বোঝার চেষ্টা করছি, এবং বুঝে-শুনে যে সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি তা হলো- রসিক বাঙালি জাতি গুজবের বিষয়টিকে স্রেফ কৌতুক হিসেবে নিয়েই সারা। এর অন্তরালে যে কত বড় হুমকি লুকিয়ে আছে, সেটি নিয়ে কেউ একটিবারের জন্যও ভাবার প্রয়োজনীয়তা বোধ করছে না। তাই আপনাদের কাছে বিনীত অনুরোধ, অন্তত একটিবার একটু গুরুত্বের সাথে বিষয়টা নিয়ে ভেবে দেখুন।

বাঘ আর মিথ্যাবাদী রাখাল বালকের গল্প নিশ্চয়ই সবাই জানেন। কেমন হবে যদি একদিন আমাদের দেশেও সেই গল্পের বাস্তব মঞ্চায়ন ঘটে যায়? কাল হয়ত সত্যিই কোন জায়গায় চারজন কিংবা আরও বেশি শিক্ষার্থীকে মেরে ফেলা হলো, ধর্ষণ করা হলো; কিন্তু ততদিনে আমরা সবকিছুকে গুজব বলে উড়িয়ে দিতে শিখে গিয়েছি, তাই সেদিন আর বিষয়টি নিয়ে কোন উচ্চবাচ্য করলাম না আমরা, সব শুনেও নিশ্চুপ হয়ে বসে রইলাম- এমনটা তো হতেই পারে, তাই না?

সুতরাং গুজব জিনিসটিকে সকলে যতটা হালকাভাবে নিচ্ছেন, এটি মোটেই ততটা হালকা বিষয় নয়। সাম্প্রতিকতম উদাহরণটাকেই একটু তলিয়ে দেখুন না। সারাদেশে এত সুষ্ঠু-সুন্দর, শান্তিপূর্ণ, যৌক্তিক ও ন্যায়সঙ্গত একটি আন্দোলন চলছিল, কিন্তু সেটিরও অকাল মৃত্যু হলো। আর তা কিনা হলো গুজবের কল্যাণে! একটা পচা আপেল যেমন ঝুড়ির সবগুলো আপেলকেই পচিয়ে ফেলতে পারে, ঠিক তেমনই একদিনের গুজবকে ঢাল করে গোটা আন্দোলনকেই হাস্যকর বানিয়ে ফেলা হলো।

অনেকে দোষ দেবেন সরকারের, বলবেন তারা এই গুজবের বিষয়টিকে নিয়ে একটু বেশিই বাড়াবাড়ি করেছে। হ্যাঁ, তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহের অবকাশ নেই। কিন্তু তাদেরকে সেটি করার সুযোগ যে আমরাই করে দিয়েছি, সেই সত্যটিকেও তো অস্বীকার করার উপায় নেই। আমরাই না জেনে, না বুঝে, স্রেফ আবেগতাড়িত হয়ে নিউজফিডে যা দেখেছি সেটিকেই শেয়ার করে ছড়িয়ে দিয়েছি, আমরাই ইনবক্সে ‘ভাইরাল করে দিন’ ক্যাপশনের ভিডিওগুলোকে সত্যি সত্যিই ভাইরাল করে দিয়েছি। এবং এর মাধ্যমে নিজেদের অজান্তেই আমরা এক গভীর ফাঁদে পা দিয়েছি; দিয়ে একেবারে তলিয়ে গিয়েছি। সহজ বাংলায় বলতে গেলে, একটি প্রতিশ্রুতিশীল আন্দোলনের বারোটা বাজিয়ে দিয়েছি আমরা।

সেজন্য গুজব নামক জিনিসটিকে আমরা এখন যতটা হালকাভাবে দেখছি, সেটি একদমই উচিৎ কাজ হচ্ছে না। গুজব নিয়ে একের পর এক মিম, ট্রল আর হাস্যরসাত্মক পোস্ট, কমেন্ট রচনায় একটু বিরাম দিয়ে, এখন আমাদের উচিৎ সিরিয়াসলি বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করা। কীভাবে ভবিষ্যতে কান নিয়েছে চিলে শুনেই চিলের পিছনে না ছুটে প্রকৃত সত্যকে খতিয়ে দেখা যায় সে উপায় বের করা।

এক্ষেত্রে প্রথমত যে কাজটি আমরা করতে পারি তা হলো, চোখ-কান বুজে যা দেখব বা শুনব সেটিকেই বিশ্বাস করে নেব না, বরং নিজেদের কমন-সেন্সকে কাজে লাগিয়ে সত্যাসত্য নিরূপণের চেষ্টা করব। এবং কোন তথ্য পাওয়ামাত্রই সেটিকে ভাইরাল করে দেয়ার তো প্রশ্নই আসে না। সেটি শেয়ারের আগে বারবার ক্রসচেক করতে হবে, পুরোপুরি নিশ্চিত হয়ে নিতে হবে যে যা শেয়ার করছি তা যেন সম্পূর্ণ সত্য হয়।

কোন কিছু শেয়ারের আগে সেটির দিন-তারিখও দেখে নেয়া সমান দরকারি। ধরুন এখন চলছে আগস্ট মাস, কিন্তু আমরা ঝোঁকের মাথায় জানুয়ারি মাসে প্রকাশিত একটি সংবাদকে নতুন করে ভাইরাল করে দিয়ে অযথাই পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করে দিলাম; এগুলোর কোন মানে হয়!

কোন ছবির ব্যাপারে বিস্তারিত জানার জন্য আমরা সাহায্য নিতে পারি গুগল ইমেজ সার্চের। অনেকেই হয়ত জানেন, গুগলের ইমেজ সার্চের অপশনে গিয়ে কোন নির্দিষ্ট ছবি যে উৎস থেকে এসেছে সেটির লিংক কপি-পেস্ট করলে কিংবা সরাসরি সেই ছবিটিকেই সেখানে আপলোড করে দিলে, মুহূর্তের মধ্যেই বেরিয়ে আসবেই সেই ছবির যাবতীয় তথ্যাদি। ধরুন আপনাকে একটি ছবি দেখিয়ে বলা হলো, আজকে সকালেই একটি সড়ক দুর্ঘটনার ছবি সেটি। কিন্তু গুগলের মাধ্যমে আপনি জানতে পারলেন ছবিটি আসলে বেশ কয়েক বছর আগে ঘটে যাওয়া একটি দুর্ঘটনার ছবি। এমনটিই কিন্তু সাধারণত হয়ে থাকে। আগুনে ঘি ঢালার জন্য, পুরনো ছবিকে নতুন বলে চালিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে অনেকেই। কিন্তু একটু মাথা খাটালেই তাদের পাতা এমন সব ফাঁদ পা দিয়ে বিভ্রান্ত হওয়া থেকে বাঁচা যায়।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কোন সংবাদের উৎসের সংখ্যা যাচাই করা। যদি দেখেন যে একটি সংবাদ বেশ অনেক জায়গায় প্রকাশিত হয়েছে, তাহলে ধরে নেয়াই যায় যে সেই সংবাদে কিছুটা হলেও সত্যতা অবশ্যই রয়েছে। কিন্তু যদি শুধুমাত্র একটি বা দুইটি জায়গায় সংবাদটি দেখেন, তাহলে খুব সাবধান! প্রথমেই লক্ষ্য করতে হবে যেখানে সংবাদটি দেখছেন, সেটিকে আদৌ অথেনটিক সোর্স বলা চলে কি না। মূলধারার সংবাদপত্র বা টিভি চ্যানেলে সংবাদটি এলে বিশ্বাস করাই যায়, কিন্তু অখ্যাত নিউজ পোর্টালে পাওয়া সংবাদকে বিশ্বাস করা আর নিজের পায়ে নিজেই কুড়াল মারা প্রায় একই কথা।

সর্বশেষ যে পদ্ধতিটি অবলম্বন করা যেতে পারে, তা হলো কোন সংবাদ বা তথ্য পাওয়ার সাথে সাথেই সেটিকে ভাইরাল করতে লেগে পড়ার চেয়ে, কিছুটা ‘ধীরে চলো’ নীতির অনুসারী হোন। অন্তত এক বা দুই ঘণ্টা অপেক্ষা করুন। ততক্ষণে সংবাদটি সত্য কি না সে সংক্রান্ত পর্যাপ্ত প্রমাণাদি আপনার হাতে চলে আসবে। তখন নির্দ্বিধায় আপনি সংবাদটি শেয়ার করতে পারবেন।

একটি কথা খেয়াল রাখবেন, আমাদের শেয়ার করা কোন সংবাদ পরিস্থিতির উন্নয়নে সাহায্য করতে পারবে এমন সম্ভাবনা খুবই কম। কিন্তু আমাদের শেয়ার করা সংবাদটি যদি ভুল হয়, তবে সেই ভুল সংবাদে বিশ্বাসীর সংখ্যা বেশ কিছু পরিমাণে বেড়ে যাবে। আর তাদের মধ্যে কেউ একজন যে হঠকারি কোন কাজ করে বসবে না, সেই গ্যারান্টি তো দেয়া অসম্ভব।

পরিশেষে আবারও বলছি, দয়া করে গুজবে কান দেবেন না। এটি মোটেই হাসি-ঠাট্টার কোন বিষয় নয়। আপনি-আমি যে পক্ষেরই অনুসারী হই না কেন, গুজবের ফলে দেশের যদি বড় কোন ক্ষতি হয়ে যায়, সে জন্য কিন্তু ভুগতে হবে আমাদেরকেও। তাই অনুগ্রহ করে কোন তথ্য বা সংবাদ কানে আসা বা চোখে পড়া মাত্রই সেটিকে ভাইরাল করে না দিয়ে, আগে সেটির গ্রহণযোগ্যতা যাচাই করে দেখুন। নইলে সত্যি সত্যিই যদি কোনদিন আমাদেরকে বাঘ আক্রমণ করে, সেদিন কিন্তু আমরা বাঁচতে পারব না। আমাদের আর্তচিৎকার শুনে অন্যরা হাসতে হাসতে বলবে, ‘আরে ধুর, গুজবে কান দেবেন না!’

ছবি কৃতজ্ঞতা- যাচাই। যেকোন ছবির সত্যতা যাচাই করুন ‘যাচাই’-এ

আরও পড়ুন-

ছবি কৃতজ্ঞতা- যাচাই

Comments
Spread the love