ফরিদগঞ্জের কাছারি মসজিদ। এক রাতে এই মসজিদের ১১টি ফ্যান চুরি হয়ে গেল। টেবিলের উপর রাখা আমপারাসহ কিছু ধর্মীয় বই এলোমেলো হয়ে আছে। দেখে মনে হচ্ছে এগুলো কেউ পা দিয়ে মাড়িয়ে এলোমেলো করে দিয়েছে। মসজিদের ভেতর রাখা কোরান শরীফও ঠিক জায়গায় নেই। যারা চুরি করতে এসেছে এটা তাদেরই কাজ বলে ধারণা করা হচ্ছে।

মসজিদের এই ফ্যানচোররা ফ্যানগুলো আলাদা আলাদা অংশ বস্তায় ভরে যখন নিয়ে যাচ্ছিল তখন তাদের দেখে ফেলে নৈশপ্রহরী। নৈশপ্রহরী তাদের সন্দেহ করে। কিন্তু, নৈশপ্রহরী কথা বলতে গিয়ে ঝাড়ি শুনলো চোরদের কাছ থেকে। ফলে নৈশপ্রহরী যখন আরো লোক সাথে নিয়ে এসে চোরদের ধরবে ভাবল, ততক্ষণে ফ্যানচোররা পালিয়ে গেল। তাদের পাওয়া গেল না। 

কিন্তু, দুই ফ্যান চোর যখন কয়েকদিনের মধ্যে ধরা পড়ল, গাজীপুরে, তখন ঘুনাক্ষরেও কেউ ভাবতে পারেনি এই চোরদের মধ্যেই আছে এক কুখ্যাত ভয়ংকর সিরিয়াল কিলার, যে সিরিয়াল কিলারের স্বপ্ন ১০১টি খুন করা! ১০১টি খুনের পথে সে ১১টি খুন ইতিমধ্যেই করে ফেলেছে। পুলিশও তাকে খুঁজছে। এই ফ্যানচোরই যে সেই কুখ্যাত সিরিয়াল কিলার, তা জানত না খোদ পুলিশও। কারণ, এর আগে সিরিয়াল কিলারকে দেখেননি ফ্যানচোর ধরা কমিউনিটি পুলিশের সদস্যরা।

কে এই সিরিয়াল কিলার? কী তার জীবন কাহিনী? কীভাবেই বা সে ধরা পড়ল? কী পরিণতি হলো সিরিয়াল কিলারের?

তার নাম রশিদ খাঁ। সিরিয়াল কিলার হওয়ার পর তাকে সবাই জানে রসু খাঁ নামে। সে-ই নাকি বাংলাদেশের প্রথম সিরিয়াল কিলার! এই নৃশংস সিরিয়াল কিলারের বাড়ি চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জে। সীমানা এলাকার এক দরিদ্র পরিবারে তার জন্ম। পিতা আবুল হোসেন ছিলেন নিতান্তই এক দিনমজুর। আবুল হোসেন মারা গেলেন হুট করেই। আকস্মিক মৃত্যুতে পুরো পরিবার দুরবস্থার মধ্যে পড়ে গেল।

এই সময়ে বাবার রেখে যাওয়া ৩০-৩৫ শতক জমি নিয়ে বিরোধের সৃষ্টি হয় প্রতিবেশীদের সাথে। এর মধ্যেই প্রতিবেশিরা আবার রসু খাঁকে ‘চোর-চোট্টা’ বলে ক্ষেপাত। কারণ, সেই দিনগুলোতে টাকার অভাবে ছোটখাটো চুরির সাথে আসলেই সে জড়িয়ে পড়েছিল। এক পর্যায়ে কিছু জমি বিক্রি করে ঢাকায় বড় বোন হাফসা বেগমের বাড়িতে চলে আসে রসু খাঁ।

রসু খাঁর বিয়ের ঘটনাটি তার জীবনে খুব প্রভাব ফেলে। যখন তার বিয়ের কথাবার্তা চলছিল, বিয়ের ঘটক রসু খাঁকে কন্যা দেখাননি। পাত্রী কেমন না জেনেই রসু খাঁ বিয়ে করে ফেলছে, এমন একটি অবস্থা। বিয়ে হয়েও গেল। বাসরঘরেই রসু খাঁ আবিস্কার করলো ব্যাপারটা, তার বউয়ের ডান চোখ নেই। তার প্রচণ্ড খারাপ লাগল। সে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারলো না বউয়ের চোখ নষ্ট থাকার ব্যাপারটা। তার কেবলই মনে হচ্ছিল, সে প্রতারিত হয়েছে। কিন্তু, তবুও দুই বছর ঘর-সংসার ঠিকই করেছে এই বউয়ের সাথেই। যৌন সম্পর্কও রেখেছে। কিন্তু মনে মনে হয়ত বউকে একটুও ভালবাসতো না। এটি তার একরকম প্রতিশোধ কিনা কে জানে! হয়ত এটাও তার অদ্ভুত সাইকোলজিক্যাল খেলা। তা না হলে কেনই বা বিয়ের দুই বছর পর বউকে ছেড়ে চলে যাবে! রসু খাঁ যখন তার স্ত্রীকে ছেড়ে চলে গেল, তখন সেই মেয়েটি ছিল অন্তঃসত্ত্বা!

তবে রসু খাঁর অদ্ভুত প্রতিশোধ এখানেই শেষ না। প্রথম স্ত্রীকে ছেড়ে গিয়ে সে বিয়ে করল তার শ্যালিকা রীনাকে। গর্ভবতী প্রাক্তন স্ত্রীকে শ্বশুরবাড়িতে পাঠিয়ে দিয়ে রীনাকে নিয়ে চলে আসল টঙ্গির নিরসপাড়ায়।

নিরসপাড়ায় রসু খাঁর সরস জীবন শুরু হলো। রীনা ছিলেন গার্মেন্টস কর্মী। কাজেই রীনার কর্মস্থলের সূত্রে বিভিন্ন গার্মেন্টসকর্মীদের সাথে রসু খাঁর পরিচয় হয়। একদিকে রসু এখানেও চুরিদারির সাথে জড়িয়ে পড়ে, আরেকদিকে জড়িয়ে পড়ে নতুন প্রেমে! রীনার গার্মেন্টসেরই এক নারী কর্মীকে দেখে রসু খাঁ প্রবল ভালবাসা অনুভব করে। তাকে ভালবাসার কথা জানায়। রসু খাঁর সাথে প্রণয় জমতে থাকা অবস্থায়ই সে মেয়েটি আরেকজনের সাথে প্রেমে জড়িয়ে পড়ে! 

রসু খাঁ খুবই কষ্ট পায়। নিজে পরকীয়া করছে, সেটা যেন তার মনেই নেই। উলটা কেনো মেয়েটি তার সাথে প্রেমের সম্পর্ক থাকা অবস্থায় আরেকটি ছেলের সাথে সম্পর্ক করল, সেটাই তাকে বেশি ব্যথিত করছিল। রসু খাঁ মেনে নিতে পারল না। প্রেমিকাকে বুঝানোর চেষ্টা করলো, প্রতিবাদ করলো।

এর বদলে মেয়েটি তার নতুন প্রেমিককে জানিয়ে দেয় সব কিছু। সেই প্রেমিক দলবল নিয়ে এসে রসু খাঁকে বেধড়ক মার দেয়। এই মারের কোনো মা বাপ নেই। রসু খাঁ ইতিমধ্যে বিভিন্নভাবে কষ্ট পেলেও এই মারের দুঃখ আগের সব ব্যথাকে ছাড়িয়ে যায়। ভালবাসার পরিণামে এই আঘাত সইতে পারলো না রসু খাঁ। তার মনোজগতে এই ঘটনা খুব ভয়ংকর প্রভাব ফেলে। তার চিন্তাভাবনাই পালটে যায়। ভালবাসাকে বিশ্বাস করতে আর পারছিল না, মেয়েদের উপর তার ঘৃণা চলে এসেছিল।

তখনই রসু খাঁ নিজের জীবনের ভয়ংকর এক সিদ্ধান্ত নিলো। আর ভালবাসাবাসি নয়, তার কঠোর প্রতিজ্ঞা, ১০১টি নারীকে হত্যা করবে, এমনি এমনি হত্যা নয়, ধর্ষণ করে হত্যা। এই সিদ্ধান্তের ফলে আবির্ভাব হলো এক কুখ্যাত, নৃশংস সিরিয়াল কিলারের, বাংলাদেশের প্রথম সিরিয়াল কিলার। ১০১ টি পাপ পূর্ণ করে সে আশা করেছিল সুফি হয়ে যাবে। সুফি হয়ে সিলেটের মাজারে গিয়ে বাকি জীবন ধর্ম কর্মে মন দেবে। কিন্তু এই গল্পের শেষটা হয়েছে অন্যরকমভাবে।

*

পারভীন হত্যার পর পুলিশের কাছে একটি ফোন আসে। যে ফোন দেয় সে পুলিশকে গোপন তথ্য দেয়, কারা পারভীন হত্যার পেছনে দায়ী। লোকটি জানায় মালেক মোল্লা ও শফিকুল নামের দুই ব্যাক্তি এই খুনের সাথে জড়িত। তাদের ধরলেই খুনের আসল ঘটনা বেরিয়ে আসবে।

পুলিশ তদন্তে নামলো। পারভীনের হত্যাটি আলোচিত এক হত্যা, সাধারণত এ ধরণের ক্লু-লেস খুনের জট খুলতে বেশ বেগ পেতে হয় পুলিশকে। কিন্তু, যখন অজ্ঞাতনামা একটি সোর্স ফোন করে সম্ভাব্য দুইজন অপরাধীর নাম বলেছে তাই আসামী সহজেই খুঁজে পাওয়াই উচিত। কিন্তু, আসামী খুঁজতে গিয়ে পুলিশ টের পেল, যাদের নাম ফোন করে বলেছিল অজ্ঞাতনামা সোর্স, সেটা ভুয়া। এর পেছনে অন্য কেউ জড়িত। পুলিশ সন্দেহ করল, যে অজ্ঞাতনামা ব্যাক্তি ফোন দিয়েছে সে-ই হয়ত খুনের সাথে জড়িত। কারণ, যে সিম থেকে ফোন এসেছিল সেটি তারপর থেকেই বন্ধ। পুলিশ অপেক্ষা করছিল, কখন এই সিম খোলা পাওয়া যাবে আবার। কিন্তু, তারপর কেটে গেল বেশ কিছুদিন।

হঠাত একদিন সিম খোলা পাওয়া গেল। এতদিন পরে বন্ধ সিম খোলা পাওয়ায় পুলিশও অবাক। তখন সেই নাম্বারে একশ টাকা রিচার্জ করা হলো। এক নারী সেই নাম্বারে ফোন দিয়ে বলল, ভুলে রিচার্জ চলে গেছে এই নাম্বারে, টাকাটা যেন ফেরত দেওয়া হয়। দুইদিনের মধ্যে সিমের মালিকের হদিশ পাওয়া গেল। তাকে গিয়ে যখন জিজ্ঞাসাবাদ করা হলো, সে বলল, এই সিমটি তার নয়। তাহলে কার? সে জানাল, এটি সে আখ ব্যবসায়ী তাজুর কাছ থেকে পেয়েছে।

পুলিশ তাজুর কাছেই গেল। তাজুকে যখন জিজ্ঞেস করা হলো, তাজু খুব নির্লিপ্ত ভঙ্গিতেই জানাল, স্যার এই সিম আমি পাইছি রসু চোরার কাছে। মসজিদের ফ্যান চুরি যে হইল, ওইখানে যেটা রসু চোরা ওর কাছেই এই সিম আর একটা মোবাইল পাইছি!

পুলিশ তখন যেন দুইয়ে দুইয়ে চার মেলাতে পারল। পারভীন হত্যা, একটি অজ্ঞাতনামা ফোন কল, বন্ধ সিম, মসজিদের ফ্যান চুরি, এবং আবারো বন্ধ সিম চালু হওয়ার সূত্র ধরে যাকে পাওয়া গেল তবে কি সেই রসু চোরাই পারভীন হত্যার সেই আসামী? যে নিজেই ফোন দিয়ে নিজের খুনির নামের জায়গায় নিজের শত্রুদের নাম বলে এতদিন সিম বন্ধ করে রেখেছিল?

অনেক প্রশ্ন। প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে রসু খাঁকে রিমান্ডে নেয়া হলো। রিমান্ডে রসু খাঁ জবানবন্দি দিল, সে নিজ হাতেই পারভীনকে খুন করেছে, এবং এই সিমটিও তার! শুধু এইটুকু হলে হয়ত ব্যাপারটা সাধারণই শোনাত। কিন্তু, রসু খাঁ শুরু করলেন অন্য বৃত্তান্ত। সে একে একে ১১ টি খুনের কথা স্বীকার করল। ধর্ষণ করে সে কিভাবে লাশগুলো জলে ফেলে দিয়েছিল সেরকম জবানবন্দিমূলক বর্ণনা দিল পুলিশের কাছে। পুলিশ তখন ইতিপূর্বে ঘটে যাওয়া ধর্ষণ ও হত্যার ধারাবাহিক ঘটনাগুলোর সাথে রসু খাঁর বিবৃত ঘটনাগুলোর একদম হুবহু মিল খুঁজে পেল। এ যেনো অবিশ্বাস্য এক ঘটনা! এই রসু খাঁই একা একাই এতো গুলো হত্যা ঘটিয়েছে! সবগুলো হত্যার প্যাটার্ন একরকম, একই রকম লাশের অবস্থা, ভিক্টিমও একই ধরণের!

*

২০০৭ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি। রসু খাঁর মন এখন বিষাক্ত। ভালবাসায় তার বিশ্বাস নেই আর। এখন সে পতিতাদের আমন্ত্রণ করে। নিজেও যায়। এতে ভালবাসাবাসি নেই। কিন্তু, তবুও শান্ত হচ্ছিল না রসু খাঁ। সে তখন ভয়ানক এক ফাঁদ পাতল। এই কাজে তাকে সাহায্য করেছে ইউনুস ও শাহীন নামের দুই সঙ্গী। শাহীন টঙ্গীর একটি বাড়ির মালিক। তারা একটি পতিতাকে প্ররোচিত করে টঙ্গি থেকে নিয়ে গেলো ফরিদগঞ্জে। পতিতাকে তিনজন মিলে ধর্ষণ করলো তারা। অতঃপর, ধর্ষণ শেষে দু’পায়ের সঙ্গে দু’হাত বেঁধে গলাটিপে হত্যা করে খালের পানিতে ফেলে দেয় রসু খাঁ। সম্ভবত এটিই তার প্রথম খুন।

একই গ্রামেই মুদি দোকানি বন্ধু মানিকের স্ত্রীর প্ররোচনায় আরেকটি নারীর সাথে সম্পর্ক করে রসু খাঁ। এই মেয়েটি ছিল গার্মেন্টস কর্মী। তাকেও টঙ্গি থেকে ফরিদগঞ্জে নিয়ে যায় রসু খাঁ। তারপর এই নারীকেও ধর্ষণ করে হত্যা করে রসু। হত্যার পর লাশ ফেলে দেয় ডোবায়। দুটি ঘটনাই ঘটেছিল হাঁসা গ্রামে, একইভাবে খুন, খুনের আগে নির্যাতনের চিহ্নগুলোও একইরকম!

২০০৭ সাল, ১৯ জুন। 

এদিন যে হত্যাকান্ড রসু খাঁ ঘটায় সেটি খুনের ভিক্টিম তার নিজের শালার স্ত্রী। তার শালা আব্দুল মান্নান নিজের বউকে বিশ্বাস করতে পারত না। সন্দেহ করত সবসময়। শালার ধারণা তার স্ত্রী যে ছেলেটির সাথে অবৈধ সম্পর্ক করছে সে ছেলেটি হিন্দু। এই যন্ত্রণায় শালা এখন রাতে ঘুমাতে পারে না। রসু খাঁর কাছে শালা মান্নান যখন এই দুঃখের কথা বলে রসু খাঁ তার শালাকে একটি প্রস্তাব দেয়। শালার স্ত্রীকে সে ধর্ষণ করবে। বিনিময়ে সে এই দুশ্চরিত্রা নারীটিকে খুন করে দিবে। শালা রাজি হয়।

এরপর দুজনে মিলে ফরিদগঞ্জের গ্রামের বাড়িতে আসার নাম করে ২০০৭ সালের ১৯ জুন শালার বউকে ফরিদগঞ্জের ৯নং ইউনিয়নের ভাটিয়া গ্রামে ডাকাতিয়া নদীর পাড়ে একটি হিন্দু বাড়ির কাছে নিয়ে যায়। তারপর দুজনে মিলে ফুঁসলিয়ে নদীর পাড়ে তাকে ধর্ষণ শেষে মুখে কাপড় গুঁজে দিয়ে হাত-পা বেঁধে নদীর পানিতে চুবিয়ে ও গলা টিপে হত্যা করে। হত্যা শেষে দুজনে আবার ফিরে যায় ঢাকায়।

তার ১১ জন শিকারের মধ্যে একজন খুলনার দৌলতপুরের সজলা গ্রামের সাহিদা বেগম। ১৯ বছরের পোশাককর্মী সাহিদা বেগমের সঙ্গেও ছলনার আশ্রয় নেয় রসু। বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে চাঁদপুরে নিয়ে এসে ধর্ষণের পর খুন করে লাশ ফেলে পালিয়ে যায় রসু খাঁ। এ ঘটনাটি ২০০৮ সালের।

এভাবে একের পর এক ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা চলতেই থাকে। কিন্তু, রসু খাঁ রয়ে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে। একটার পর একটা ধারাবাহিক খুন চলছেই। একইরকম ভাবে! একজন সিরিয়াল কিলারই যে এতগুলো খুনের পেছনে দায়ী তা বোঝা যায়নি তখনো। তবে, খুনের ধরণে মিল থাকায় এই খুনগুলো বেশ আলোচিতই হয়। তবে রসু খাঁ ঠিকই তখনো মেয়েদের প্রেমের ফাঁদে ফেলে যাচ্ছে, কারণ তার দৃষ্টি ১০১টি খুনে।

কিন্তু, রসু খাঁ ১০১টি খুন করে সুফি হয়ে যাবে, স্বয়ং সৃষ্টিকর্তারও নিশ্চয়ই পছন্দ হওয়ার কথা নয় এটি। তাই রসু খাঁ ছোট্ট একটি ভুলেই সবচেয়ে বড় ধরাটি খেয়েছে। কিভাবে?

রসু খাঁর বর্ণনায় জানা যায়, গাজীপুর বাজারে পারভিনের সঙ্গে পরিচয় হয় তার। পারভীনের সাথে অল্প দিনেই সে সম্পর্ক করে ফেলে। আপাতদৃষ্টিতে এটিকে বলা যায় একটি প্রেমের সম্পর্ক। পারভীন এমনিতে বেশ সহজ সরল একটি মেয়ে। যদিও সে বিবাহিত এবং তিন সন্তানের জননী, তবুও সে রসু খাঁর প্রেমকে বিশ্বাস করেছে। রসু খাঁও তাকে বিয়ের আশ্বাস দিয়ে বিভিন্ন সময় মেলামেশা করে তার সঙ্গে।

২০০৯ সাল, ৭ জুলাই। এদিন রাত ১০টায় রসু খাঁ পারভিনকে ফুঁসলিয়ে নিয়ে যায় ফরিদগঞ্জ উপজেলার সেই হাঁসা গ্রামে। যে গ্রামে এর আগেও সে কয়েকজন নারীকে হত্যা করেছে। পারভীনকে নিয়ে যাওয়ার পথে দেখা হয় সিংহেরগাঁ গ্রামের আপন ভাগিনা জহিরের সাথে। ইউনুস নামের আরেকজন সহযোগীকেও পাওয়া যায়। এরপর তারা তিনজনে মিলে পারভিনকে পালাক্রমে ধর্ষণ করে।

পারভীন সে রাতের মতো এতটা হতবাক, অসহায় আর কখনো হয়নি। সে সব কিছু পুলিশকে জানিয়ে দিয়ে রসুর বিরুদ্ধে মামলা করার হুমকি দেয় এবং চেঁচামেচি শুরু করে। ভড়কে গিয়ে জহির ও সঙ্গী ইউনুস পারভিনের হাত ও পা চেপে ধরে মাটিতে শুইয়ে দেয়। রসু খাঁ সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে পারভীনকে বাঁচিয়ে রাখা যাবে না। সে পারভিনের মুখে পরনের কাপড় গুঁজে দিয়ে গলা টিপে হত্যা করে। তারপর হাত-পা বেঁধে পার্শ্ববর্তী খালের পানিতে ফেলে দেয়।

পরের দিন নিজেকে রিকশাচালক পরিচয় দিয়ে নিজ বাড়িতে বিরোধ আছে এমন দুজনের নাম ( মালেক মোল্লা ও শফিকুল) বলে পারভিনের খুনের সঙ্গে তারা জড়িত বলে ফরিদগঞ্জ থানার ওসিকে জানায়। তারপরই সে ফোন থেকে সিমটি খুলে রাখে। পুলিশ সেই দুইজনকে আটকও করে, দেড় দুই মাস তাদের হাজতেও রাখা হয়। কিন্তু, পুলিশ টের পায় এই দুইজন নয়, খুনের সাথে জড়িত অন্য কেউ।

সেই ‘অন্য কেউ’টাই যে রসু খাঁ, সেটিই খুঁজে পাওয়া যায় মসজিদের ফ্যান চুরির সূত্র ধরে! একটি বন্ধ থাকা সিম কার্ডই শেষমেষ রসু খাঁকে ধরা খাওয়ালো! এভাবেই জট খুললো এক বীভৎস খুনির, যার প্রতিটি ধর্ষণের স্বীকার খুন হওয়া ভিক্টিমের শরীরে কামড়ের দাগ এবং ছুরি দিয়ে বক্ষদেশ ও গোপনাঙ্গে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যেত!

পুনশ্চ- পারভীন হত্যা ও ধর্ষণ মামলায় চাঁদপুরের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আদালতে রসু খাঁ সহ তিনজনের (ভাগিনা জহির ও সহযোগী ‘পলাতক’ ইউনুস) মৃত্যুদন্ডের রায় দেয়া হয় ২০১৫ সালে।

Comments
Spread the love