আপনি যদি ফুটবলপ্রেমী হয়ে থাকেন তবে কালকের সোচির ফিশ্ট অলিম্পিক স্টেডিয়ামে উপস্থিত দর্শকদেরকে আপনার হিংসা করার কথা। নব্বই মিনিটে আপনি ফুটবলের কাছ থেকে যা যা আশা করতে পারেন তার প্রায় সবকটাই ঘটেছে স্পেন বনাম পর্তুগালের ম্যাচটিতে। অসাধারণ ব্যক্তিগত নৈপুণ্য, দুর্দান্ত দলীয় সমঝোতা, টানটান প্রতিদ্বন্দ্বিতা, নাটকীয় ভুল এমনকি রেফারিং সংক্রান্ত বিতর্ক, কী ছিল না আজকের খেলায়?

হুলেন লোপেতেগির চাকরিচ্যুতি সংক্রান্ত বিতর্কের পর স্পেনের বিশ্বকাপে একটা ভালো সূচনার খুব দরকার ছিল। দর্শক ও স্প্যানিশ গণমাধ্যমের উদ্বেগ দূর করতে হলে স্পেনকে নিশ্চিত করতে হতো পর্তুগালের বিরুদ্ধে বিজয়। সদ্য স্পোর্টিং ডিরেক্টর থেকে কোচের দায়িত্ব নেওয়া ফার্নান্দো হিয়েরো শেষ মুহূর্তে তাই দল নিয়ে বিশেষ একটা নাড়াচাড়া করেননি। গোলপোস্টের নিচে ছিলেন ডেভিড ডি হেয়া। রক্ষণভাগে ছিলেন ফুলব্যাক জর্ডি এলবা ও ন্যাচো এবং সেন্টারব্যাক র‍্যামোস ও পিকে। হোল্ডিং মিডফিল্ডারের দায়িত্ব পালন করছিলেন এটলেটিকো মাদ্রিদের কোকে ও বার্সেলোনার সার্জিও বুসকেটস। স্ট্রাইকার ডিয়েগো কোস্তাকে বল বানিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব ছিল সিলভা-ইনিয়েস্তা-ইস্কো ত্রয়ীর উপর। দলে রাইটব্যাক হিসেবে ন্যাচোর অন্তর্ভুক্তি ছাড়া বাকি একাদশটা একরকম আগে থেকেই আন্দাজ করা যেত।

অপরপক্ষে, পর্তুগালের শুরুর একাদশটি বরং অনেকের জন্য একটু আশ্চর্যের কারণ হয়েছিল। গোলকিপার হিসেবে রুই প্যাট্রিসিয়োর অন্তর্ভুক্তি অনুমিতই ছিল। সেড্রিক, পেপে, হোসে ফন্ট আর রাফায়েল গোরেরোকে নিয়ে গড়া রক্ষণভাগের লাইনআপটিও আগে থেকে আন্দাজ করা যেত। রক্ষণাত্মক মিডফিল্ডার ছিলেন ঐ ভূমিকায় পর্তুগালের একমাত্র ভরসা উইলিয়াম কার্ভালিয়োই। তবে এত বড় ম্যাচে অভিজ্ঞ রিকার্ডো কারেজমাকে না খেলিয়ে ব্রুনো ফার্নান্দেজকে খেলানোর সিদ্ধান্তটা বোধহয় একেবারেই অনুমানযোগ্য ছিল না। তাছাড়া পর্তুগাল কোচ ফার্নান্দো স্যান্তোস মূল একাদশে আন্দ্রে সিলভাকেও রাখেননি। বাছাইপর্বে জাতীয় দলের হয়ে ফর্মের তুঙ্গে থাকা সিলভার বদলে আক্রমণভাগে বের্নার্দো সিলভা আর ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোকে সাহচর্য দিতে নির্বাচিত করা হয়েছিল গনসালো গুয়েডেসকে।

বিশ্বকাপ অভিযানকে ঠিক পথে ফিরিয়ে আনতে মরিয়া স্পেনের নিশ্চয়ই আশা ছিল একটা ভালো সূচনার। অবশ্য মানুষ জীবনে যা চায় সব সময় তা পায় না। বিশেষত ফুটবল মাঠে রোনালদোর প্রতিপক্ষেরা তো একবারেই না। তিন মিনিটের মাথায় একটি পেনাল্টি আদায় করে নেন পর্তুগালের ক্যাপ্টেন। ক্লাব সতীর্থ ন্যাচোর উপর ন্যস্ত হয়েছিল রোনালদোকে ঠেকানোর দায়িত্ব। বাম দিক থেকে ডি-বক্সের ভেতর রোনালদো একটি ‘টিপিক্যাল’ দৌঁড় শুরু করায় হকচকিয়ে গেছিলেন ন্যাচো। শেষ মুহূর্তে ট্যাকেল করা থেকে বের হয়ে আসতে চাইলেও তাঁর একটি পা সরাতে পারেননি রোনালদোর পথ থেকে। বলা বাহুল্য, রোনালদোও সুবিধা নিয়ে ছাড়েননি। ডেভিড ডি হেয়াকে ভুল দিকে পাঠিয়ে ম্যাচের চার মিনিটের মধ্যে স্কোরলাইনকে ১-০ পরিণত করেন এই জীবন্ত কিংবদন্তী।

ম্যাচের প্রথম পাঁচ মিনিটের মধ্যে গোল খেয়ে যাওয়া স্পেন যেন খানিকক্ষণের জন্য বিহ্বল হয়ে পড়েছিল। অবশ্য এই স্পেন দলটিতে যে পরিমাণ দক্ষতা, আত্মবিশ্বাস ও অভিজ্ঞতা আছে তাতে একটি গোল খেয়েই তাঁরা খেই হারিয়ে ফেলবেন এমনটা ভাবা বোকামি। আস্তে আস্তে খেলায় ফিরে আসতে থাকে স্পেন। উইলিয়াম কার্ভালিয়োর দুর্দান্ত রক্ষণাত্মক উদ্যমের পরও ধীরে ধীরে খেলায় ইনিয়েস্তা, সিলভা আর ইস্কোদের প্রভাব বাড়তে থাকে। মাঝমাঠে বলের উপর বেশ অনেকটা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ফেলছিল তাঁরা। পজিশন সংক্রান্ত পরিসংখ্যানও সেই কথাই বলে। ১০ ও ২১ মিনিটের মাথায় দুটো হাফ-চান্সও তৈরি করে ফেলেছিল স্পেন। ডেভিড সিলভা অবশ্য সুযোগ দুটোর একটাকেও ঠিকমত কাজে লাগাতে পারেননি।

পর্তুগাল অবশ্য এই অবস্থা নিয়ে খুশিই ছিল। মাঝমাঠে খেলা নিয়ন্ত্রণ করার একাধিক খেলোয়াড় স্পেনের আছে এই সত্য জেনেই তাঁরা মাঠে নেমেছিল। খেলায় এগিয়ে থাকায় আক্রমণ করার প্রয়োজনটা বেশি ছিল স্পেনেরই। এই ব্যাপারটাই পর্তুগালের কাউন্টার অ্যাটাকিং ফুটবলের জন্য সুবিধা করে দিয়েছিল। স্পেনের রক্ষণভাগের খেলোয়াড়রাও সামনে যাওয়ার জন্য উশখুশ করছিলেন। এই জিনিসটাকে কাজে লাগিয়ে দুর্দান্ত দু-একটি কাউন্টার অ্যাটাকের সুযোগ তৈরি করেছিল পর্তুগাল। এর মধ্যে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণটি এসেছিল ২২ মিনিটের মাথায়। স্পেনের পাওয়া একটি কর্নার থেকে উড়ে আসা বল জোরালোভাবে ক্লিয়ার করেন হোসে ফন্ট। বল খুঁজে নেয় পর্তুগালের সবচেয়ে সৃজনশীল মিডফিল্ডার বার্নার্দো সিলভার পা। দ্রুত স্পেন অর্ধের দিকে এগিয়ে যেতে শুরু করেন পর্তুগিজ খেলোয়াড়েরা। লেফট উইংয়ে দৌঁড়োতে থাকা রোনালদোকে খুঁজে নেয় বার্নার্দোর চমৎকারভাবে বাড়িয়ে দেওয়া একটা বল। তাঁর দিকে প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডারকে এগিয়ে আসতে দেখে প্রথম স্পর্শেই রোনালদো বল এগিয়ে দেন ফাঁকা দাঁড়িয়ে থাকা গুয়েডেসের দিকে। কিন্তু প্রথম স্পর্শেই শট নেওয়ার বদলে বিশ্রী একটা টাচ নেন গুয়েডেস। এই সামান্য সুযোগটুকুই দরকার ছিল স্পেন ক্যাপ্টেন র‍্যামোসের। প্রায় উড়ে এসে গুয়েডেসের শটটা ব্লক করে দেন তিনি।

এইসব বড় ম্যাচে গোলের সুযোগ হাতছাড়া করলে সাধারণত তার খেসারত দিতে হয়। পর্তুগালের বেলায়ও নিয়মের ব্যতিক্রম হলো না। ঠিক দুই মিনিট বাদেই মাঝমাঠ থেকে একটা দূরপাল্লার বল কোস্তার উদ্দেশ্য বাড়িয়ে দিলেন বুস্কেটস। পেপের সঙ্গে রীতিমত যুদ্ধ করে বলটা নিয়ন্ত্রণে নিলেন কোস্তা। পেপের বলয় থেকে নিজেকে মুক্ত করতে কোস্তার যতটুকু সময় লেগেছিল এর মধ্যেই দুই দুজন পর্তুগাল খেলোয়াড় কোস্তার সামনে চলে এসেছিল। তাঁদের দুইজনকেই ঘোল খাওয়ালেন কোস্তা। একবার ডান পায়ে শট করার ভঙ্গি করলেন, তারপর বলটিকে সরিয়ে বাম পায়ে নিয়ে বাম পা দিয়ে শট করার ভঙ্গি করলেন। তৃতীয় দফায় দুই ডিফেন্ডার আর গোলকিপারের আওতার বাইরে সামান্য একটু জায়গা শনাক্ত করতে পারলেন তিনি। আর নিয়ে নিলেন বুলেট গতির এক শট। স্কোর, স্পেন ১-১ পর্তুগাল। পর্তুগাল খেলোয়াড়দের অবশ্য অভিযোগ করার অধিকার আছে। গোলটি হওয়ার পথে কোস্তা পেপেকে ফাউল করেছে বলেই বিশ্বাস করেন তাঁরা। ভিডিও রিপ্লে দেখলে স্পষ্ট বোঝা যায় বল শুন্যে থাকা অবস্থাতে পেপেকে শারীরিকভাবে আঘাত দিয়েছিলেন কোস্তা। অবশ্য সেই ধাক্কাটির জোর কতখানি ছিল এই নিয়ে বিস্তর তর্ক হতে পারে। এইরকম অস্পষ্ট সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে সাধারণত ভিডিও সহকারী রেফারি কোনো সিদ্ধান্ত বা পরামর্শ দিয়ে থাকেন না। সেইজন্যই সম্ভবত সিদ্ধান্তটিকে খতিয়ে দেখে পরিবর্তন করা হয়নি। ফাউল নিয়ে বিতর্ক থাকুক আর চাই নাই থাকুক, ম্যাচের প্রথম পচিশ মিনিট মোটামুটি অদৃশ্য থাকা কোস্তার অসাধারণ ব্যক্তিগত নৈপুণ্য অবশ্য তাতে মোটেই কমে যাচ্ছে না।

গোল পাওয়ার সাথে সাথে পুরোনো স্পেনের দেখা মিলতে শুরু করল। ইস্কো আর ইনিয়েস্তা তখন খেলার গতি মোটামুটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিয়েছেন। সাধারণ গতিতে বল নিজেদের মধ্যে পাস করতে করতে সুযোগ বুঝেই ধুপ করে বাড়িয়ে দিচ্ছেন বিপজ্জনক সব বল। আর সেগুলো সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে পর্তুগিজ রক্ষণভাগ। কোস্তার গোলের পরের ১৫-২০ মিনিট খেলা চলে গিয়েছিল পুরোদস্তুর স্পেনের নিয়ন্ত্রণে। সেই আধিপত্যে ছেদ পড়ল আকষ্মিকভাবে। ৪৪ মিনিটের মাথায় পর্তুগালের আক্রমণভাগের ডানদিকে থেকে ডি-বক্সে একটা ক্রস এল। ক্রসটি সামলে নিয়ে রোনালদোর জন্য সুন্দর করে বলটা বাড়িয়ে দিলেন গুয়েডেস। সামনে বেশ কয়েকজন প্রতিপক্ষ খেলোয়াড় থাকায় দেরি করলেন না সিআরসেভেন। আচমকা একটা শট নিয়ে নিলেন। তবে শটটা ঠেকাতে গিয়ে ডেভিড ডি হেয়া যে মাত্রার ভুল করলেন তা অবিসংবাদিত। তর্কযোগ্যভাবে এই মুহূর্তে দুনিয়ার সেরা গোলকিপারের হাত গলে (আক্ষরিক অর্থেই) যে একটা বল চলে যেতে পারে, সামনাসামনি না দেখলে এটা কারো বিশ্বাস হওয়ার কথা না। ডি হেয়ার জঘন্য ভুলে ২-১ গোলের লিড নিয়ে হাফ টাইমে মাঠ ছাড়ল পর্তুগাল।

দ্বিতীয় অর্ধে যেন জেগে উঠল ঘুমন্ত দৈত্য। হাফ-টাইমে স্প্যানিশ সাজঘরে কী আলোচনা হয়েছিল তা তো জানা সম্ভব নয়। তবে যে আলোচনাই হয়ে থাকুক স্পেনের জন্য তা প্রচণ্ড কাজে লেগেছিল। স্পেন দলটিতে যে ভুঁড়ি ভুঁড়ি বিশ্বকাপ, ইউরো ও চ্যাম্পিয়নসলিগ জেতা খেলোয়াড় আছে, এই বোধ যেন সামষ্টিকভাবে অনুভূত হলে শুরু করলে স্পেন দলজুড়ে। দ্বিতীয় অর্ধের প্রথম দিকে রীতিমত আধিপত্য বিস্তার করে খেলতে শুরু করল ২০১০ আসরের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। প্রভাববিস্তারকারী ফুটবলের ফল হাতেনাতেই পেয়ে গেল হিয়েরোর শিষ্যরা। ৫৫ মিনিটে ডেভিড সিলভার মধ্যমাঠ থেকে নেওয়া ফ্রি-কিক ফারপোস্টে দুর্দান্তভাবে খুঁজে নিল সার্জিয়ো বুস্কেটসকে। মাথা দিয়ে বুস্কেটস বলটাকে ঠেলে দিলেন ডি-বক্সের ভেতরে একটা বিপজ্জনক এলাকায়। ঠিক সময় ঠিক জায়গায় ছিলেন ডিয়েগো কোস্তা। অনায়াস এক ট্যাপ-ইনে স্পেনকে আবারও ফিরিয়ে আনলেন সমতায়।

দ্বিতীয়বার সমতায় ফেরা স্পেন খেলাটিকে হাত ফসকে যাওয়া থেকে রোখার ব্যাপারে বদ্ধপরিকর হয়ে উঠল। পর্তুগালকে একেবারেই কোনঠাসা করে ফেলছিল তাঁরা। ৫৮ মিনিটের মাথায় খেলায় প্রথমবারের মতো লিড নিল স্পেন। পর্তুগালের রক্ষণভাগ তাঁদের বক্সের দিকে আসা একটি বল পুরোপুরি ক্লিয়ার করলে ব্যর্থ হলে তা যেয়ে পড়ে ঠিক ন্যাচোর সামনে। ডি-বক্সের বাইরে থেকে বিষ্ময়কর এক ডান পায়ের শটে স্পেনকে ৩-২ গোলের লিড এনে দেন রিয়াল মাদ্রিদের এই রাইট ব্যাক। গোলটিকে আপনি চাইলে প্রথম অর্ধে নিজদের দোষে খাওয়া পেনাল্টির জন্য ন্যাচোর প্রায়শ্চিত্তও বলতে পারেন। কিন্তু তাতে বোধহয় গোলটাকে অপমান করা হয়। ডান পায়ে নেওয়া যেই হাফ-ভলি দেখে যেকোনো ফরোয়ার্ডও ঈর্ষান্বিত হবেন, বলা ভালো সেই শটটি আসলে প্রথম একাদশে সুযোগ করে দেওয়া কোচের আস্থার প্রতি ন্যাচোর প্রতিদান।

দ্বিতীয় অর্ধের শুরুতে যেই পর্তুগাল ২-১ এর লিডে ছিল, দ্বিতীয় অর্ধের খেলা শুরুর ১৩ মিনিটে মধ্যে তাঁরা পিছিয়ে পড়ল ৩-২ গোলে। অতীতের বহু পর্তুগাল দল আছে যারা এই ধাক্কা সামলে উঠতে পারত না। কিন্তু ফার্নান্দো স্যান্তোসের ইউরো চ্যাম্পিয়ান দল সম্পর্কে আমরা যদি দুটি জিনিস জেনে থাকি তার একটি হলো এই দলটির মানসিক দৃঢ়তার কোনো অভাব নেই। আর দ্বিতীয়টি হলো, ওদের আছে রোনালদো। পিছিয়ে যাওয়ার পর পর্তুগাল কোচ বসে থাকেননি। খেলাটিকে ইতিবাচকভাবে বদলানোর যথেষ্ট চেষ্টা করেছেন। বদলি হিসেবে যথাক্রমে নামিয়েছেন হোয়াও মারিও, রিকার্ডো কারেজমা আর আন্দ্রে সিলভাকে। তাঁদের আগমণে পর্তুগালের আক্রমণভাগের ধার খানিকটা বাড়ছিল বটে, কিন্তু বল পায়ে রেখে সময় কাটিয়ে দেওয়ায় ‘ওস্তাদ’ স্পেনের কাছে একবার পিছিয়ে পড়লে যে ফিরে আসা বড়ই মুশকিল। পর্তুগিজরা অবশ্য আস্থা হারায়নি। দুই একটা উজ্জ্বল মুহুর্ত তৈরি হলেও তাতে অবশ্য খুব একটা লাভ হচ্ছিল না পর্তুগালের।

৯০ মিনিট তখন প্রায় শেষ। ডি-বক্সের একটু বাইরে রোনালদোকে একটা ফাউল করে ফেলল জেরার্ড পিকে। ফ্রি-কিকটা পাওয়ার সাথে সাথে বলটা হাতে তুলে নিলেন রোনালদো। বলটাকে রাখলেন জায়গা মতো। রেফারি স্প্যানিশ খেলোয়াড়দের নির্দিষ্ট দূরত্বে দাঁড় করানোর জন্য যখন যারপরনাই কষ্ট করে যাচ্ছেন তখন ক্যামেরা ফোকাস করল রোনালদোর মুখের দিকে। এ যেন কোনো ফুটবল মাঠের দৃশ্য নয়। বরং একজন ধ্যানমগ্ন ঋষির ছবি। সাধনাই যার জীবনের একমাত্র জ্ঞান। গভীরতম মনোযোগ দিয়ে গোলপোস্ট, ডেভিড ডি হেয়া আর স্প্যানিশ দেওয়ালকে শেষবারের মতো দেখে নিলেন রোনালদো। তারপর আরও একবার ডানপায়ের এক শটে দুনিয়াকে হতবাক করে দিলেন। ৮৮ মিনিটের মাথায় রোনালদোর নেওয়া ফ্রি-কিকটি যখন স্প্যানিশ দেওয়ালের মাথার উপর দিয়ে উড়ে গিয়ে প্রায় জ্যামিতিক আকৃতিতে আবার বাঁক খেয়ে গোলে ঢুকল তখন ডেভিড ডি হেয়ার সঙ্গে সোচির চল্লিশ হাজারের মানুষের কোনো তফাৎ থাকল না। সবাই-ই এখানে নেহাৎ দর্শক।

একদিক থেকে দেখতে গেলে ড্র-ই ছিল এই খেলার একমাত্র যোগ্য ফলাফল। স্পেন বা পর্তুগাল কারোরই এই খেলা থেকে শুন্য হাতে ফেরা প্রাপ্য ছিল না। দুই দলই যদি তাঁদের আজকের খেলা ধরে রাখতে পারে তাহলে গ্রুপ পর্ব থেকে উৎরোনো নিয়ে তাদের অন্তত ভাবতে হবে না। বিশ্বকাপের এবারের আসরে এর আগে আরও তিনটা ম্যাচ হলেও এই খেলাটা দিয়েই যেন বিশ্বকাপ জেগে উঠল। এই খেলাটাকে আর এই প্রতিযোগিতাটাকে দুনিয়াজুড়ে এত মানুষ কেন এতটা ভালোবাসে তার একটা সুন্দর উদাহরণ হয়ে রইল ২০১৮ বিশ্বকাপের আইবেরিয়ান ডার্বি।

একটা মজার ব্যাপার হলো, আজকের ম্যাচের আগে ২০০৬, ১০ ও ১৪ বিশ্বকাপ খেলা রোনালদোর বিশ্বকাপে মোট গোলসংখ্যাই ছিল তিন। আজ এক ম্যাচেই সেই সংখ্যাটা দ্বিগুণে চলে গেল। অবশ্য অনেক ‘বিশেষজ্ঞ’ই মনে করেন রোনালদো ফুরিয়ে গেছেন। আদতেই কি তাই? রোনালদোর এমন নৈপুণ্যের পর আর কিছু বলার আছে বলে মনে হয় না!

Comments
Spread the love