খেলা ও ধুলা

কী অপেক্ষা করছে রোনালদোর ভাগ্যে?

ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো নিঃসন্দেহে ‘ওয়ার্ল্ডস টাফেস্ট গাই’দের একজন। সেটি শুধু শারীরিকভাবেই নয়, একইসাথে মানসিকভাবেও। সচরাচর তার চোখে জল দেখা যায় না। নিজের আবেগকে খুব ভালোভাবেই নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা রয়েছে তার। তবু তো জীবনে কিছু কিছু সময় আসে যখন পৃথিবীর সবচেয়ে শক্ত মনের মানুষটির পক্ষেও সম্ভব হয় না চোখের জল ধরে রাখা।

শেষবার রোনালদো এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছিলেন ২০১৬ ইউরোর ফাইনাল চলাকালীন যখন আঘাত পেয়ে মাঠ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন তিনি। সেই ঘটনার প্রায় সোয়া দুই বছর পর বিশ্ববাসী আবারও সাক্ষী হলো বিরলতম ঘটনার, অর্থাৎ রোনালদোর চোখে জল দেখার।

গত বুধবার রাতে ভ্যালেন্সিয়ার বিপক্ষে জুভেন্টাসের জার্সি গায়ে প্রথম চ্যাম্পিয়নস লিগ ম্যাচটি খেলতে নেমে যখন তাকে লাল কার্ড দেখিয়ে মাঠ থেকে বের হয়ে যেতে বাধ্য করা হলো, তখন রোনালদোর স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিক্রিয়া ছিল একদমই শিশুসুলভ। নিষ্পাপ শিশু যখন শাস্তি পেয়ে বুঝে উঠতে পারে না কী তার অপরাধ, আর তখন বিস্ময় ফুটে ওঠে তার চোখে-মুখে, রোনালদোর ক্ষেত্রেও ঠিক সেটিই হয়েছে।

আর তার যুক্তিসঙ্গত কারণও যে রয়েছে। কী এমন করেছিলেন তিনি, যার জন্য তাকে লাল কার্ড দেখিয়ে দিতে হবে? বক্সের ভিতোর দৌড়ে ঢোকার সময় তার মৃদু সংঘর্ষ হয়েছিল ভ্যালেন্সিয়া ডিফেন্ডার জেইসন মুরিলোর সাথে। তখন মুরিলো দাবি করেন যে রোনালদো তাকে লাথি মেরেছেন। এতে রাগান্বিত হয়ে যান রোনালদোও, এবং তাকে দেখা যায় মুরিলোর চুলে আঁচড় কেটে দিতে। এতে ক্ষোভে ফেটে পড়েন মুরিলোও। উঠে এমনভাবে তিনি দাঁড়ান রোনালদোর সামনে যেখান থেকে স্পষ্টই বোঝা যায় কতটা উত্তেজিত হয়ে পড়েছেন তিনি।

সেই উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে দুই দলের বাকি খেলোয়াড়দের মাঝেও। সবাই ছুটে এলে একটি জটলার মত তৈরী হয় রোনালদো ও মুরিলোকে কেন্দ্র করে। আর তখনই গোললাইনের পিছনে দাঁড়ানো অফিসিয়ালের সাথে আলোচনার ভিত্তিতে রোনালদোকে লাল কার্ড দেখিয়ে বসেন জার্মান রেফারি ফেলিক্স ব্রাইচ।

পরবর্তীতে বারবার ঘটনার রিপ্লে দেখে এটুকু অন্তত সকলেই নিশ্চিত যে রোনালদো এমন আহামরি কোনো অপরাধ করেননি যার জন্য তাকে সরাসরি লাল কার্ড দেখিয়ে বসতে হবে। সুতরাং নতুন একটি দলের জার্সি গায়ে ক্লাব ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসরের প্রথম ম্যাচের আধা ঘণ্টা পেরোবার আগেই এভাবে বেরিয়ে যেতে হওয়ায় রোনালদোর প্রচন্ড রকমের আঘাত পাওয়াই স্বাভাবিক, আর সেজন্যই নিজের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেননি তিনি।

লাল কার্ড দেখার পর চোখে জল নিয়ে বেশ অনেকক্ষণ স্তব্ধ হয়ে ছিলেন রোনালদো। অবস্থা এমনই হয়েছিল যে বেশ অনেকটা সময় তিনি নিয়ে নেন মাঠ ছেড়ে বেরিয়ে যেতে। শুধু যে ওই ম্যাচে দুই-তৃতীয়াংশ সময় তিনি মিস করেছেন তা কিন্তু নয়। সরাসরি লাল কার্ড দেখার সুবাদে অটোমেটিক এক ম্যাচের সাসপেনশন ভোগ করতে হবে তাকে। তবে সাসপেনশনের মেয়াদ আরও বাড়ানো হবে কি না, তা জানার জন্য রোনালদোকে অপেক্ষা করতে হবে ২৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত।

রোনালদো নিজে তার নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে আপিল করতে পারবেন না, তবেঁ ২৭ সেপ্টেম্বর সব কিছু বিবেচনা করে নিজেদের সিদ্ধান্ত জানাবে উয়েফার কন্ট্রোল, এথিক্স অ্যান্ড ডিসিপ্লিনারি বডি। যেহেতু এক ম্যাচের সাসপেনশন নিশ্চিত, তাই আগামী ২ অক্টোবর তুরিনে অনুষ্ঠিতব্য ইয়ং বয়েজের বিপক্ষে ম্যাচটিতে রোনালদোর খেলার কোনো সম্ভাবনাই নেই।

কিন্তু সবার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে এখন ২৩ অক্টোবর জুভেন্টাসের পরের ম্যাচটি, যেটিতে তাদের প্রতিপক্ষ ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড। আর ম্যাচটি অনুষ্ঠিতও হবে ওল্ড ট্রাফোর্ডে। তাই রোনালদোর সামনে সুবর্ণ সুযোগ ছিল নতুন ক্লাবের জার্সি গায়ে নিজের পুরনো ক্লাবের মাঠে প্রত্যাবর্তনের। কিন্তু এখন যে অবস্থা, তাতে মনে হচ্ছে রোনালদো সেই সুযোগ হারাতেও পারেন, যদি অটোমেটিক সাসপেনশনের বাইরেও তার নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ এক ম্যাচ দীর্ঘায়িত করা হয়। আর উয়েফা যদি তাকে অতিরিক্ত দুই ম্যাচে নিষিদ্ধ করে, সেক্ষেত্রে তিনি মিস করবেন ৮ নভেম্বর জুভেন্টাসের ঘরের মাঠে রেড ডেভিলদের সাথে ফিরতি ম্যাচটিও।

তবে যেমনটি আগেই বলছিলাম, রোনালদোকে লাল কার্ড দেখানোটা একটু বেশিই নির্দয় আচরণ হয়ে গেছে, সেটির সাথে একমত প্রিমিয়ার লিগের সাবেক রেফারি মার্ক ক্ল্যাটেনবার্গ। ডেইলি মেইলে এক কলামে তিনি লিখেছেন, “সংঘর্ষটি আমার কাছে খুবই হালকা মনে হয়েছে, এবং আমি বুঝতে পারছি না যে অতিরিক্ত সহকারী রেফারি কীভাবে মাত্র ২০ গজ দূরে দাঁড়িয়ে এটিকে সহিংস কিছু বলে মনে করতে পারলেন। আমি যদি ম্যাচটির দায়িত্বে থাকতাম, আমি ভ্যালেন্সিয়াকে একটি ফ্রি কিক দিতাম, আর হলুদ কার্ড দেখাতাম দুইজন খেলোয়াড়কেই। রোনালদোকে এখন এক ম্যাচে নিষিদ্ধ থাকতে হবে। তবে এর বেশি কিছু হলে সেটি অনেক বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে।” 

এদিকে মিরর পত্রিকা জানাচ্ছে, উয়েফার কমিটিও হয়ত রোনালদোর বিষয়টিকে সহানুভূতির দৃষ্টিতেই দেখবে। তাই অটোমেটিক এক ম্যাচ নিষেধাজ্ঞার বাইরে তার অতিরিক্ত শাস্তি পাওয়ার সম্ভাবনা কম। তাই রোনালদো তো বটেই, পাশাপাশি বিশ্বব্যাপী রোনালদোর কোটি কোটি ভক্ত সমর্থক এখন আশায় বুক বাঁধতেই পারেন, ২৩ অক্টোবর ওল্ড ট্রাফোর্ডে সাবেক ক্লাব ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়েই সম্ভবত চ্যাম্পিয়নস লিগে ফিরবেন সিআর সেভেন।

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close