খেলা ও ধুলা

পেরেজের কারণেই রিয়াল ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন রোনালদো!

টালমাটাল একটা সময় পার করছে রিয়াল মাদ্রিদ। এক মৌসুম আগেও যারা ছিল মোটামুটি অপ্রতিরোধ্য, তারাই কিনা এখন খাদের কিনারে দাঁড়িয়ে আছে! দুইদিন আগেই এল ক্লাসিকো-তে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী বার্সেলোনার কাছে ৫-১ গোলে বিদ্ধ্বস্ত হয়েছে দলটা। রিয়ালের গত তিন মৌসুমের সাফল্যের কারিগর ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো এবং জিনেদিন জিদান বিদায় নিয়েছেন গত মৌসুমের শেষেই। দুজনের কারো রিপ্লেসমেন্টই তৈরি করতে পারেনি রিয়াল। হুয়ান লোপেতেগুই পারেননি ডাগআউটে জিদানের ভূমিকাটা পালন করতে, আর রোনালদোর অভাব পূরণ করা তো অসম্ভবই! টানা হারের বৃত্তে ঘুরপাক খেতে খেতে রিয়াল মাদ্রিদের সমর্থকেরা তাই রোনালদোর কথাই স্মরণ করেন সবচেয়ে বেশি। জুভেন্টাসের জার্সি গায়ে রোনালদো যখন গোল করছেন, উদযাপন করছেন সতীর্থদের নিয়ে, তখন বুকের বাঁ পাশে চিনচিনে ব্যাথাটা রিয়াল সমর্থকদের মধ্যেই সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয় বোধহয়।

রোনালদোর রিয়াল ছেড়ে যাওয়া নিয়ে কম গুঞ্জন ওঠেনি। স্পেন ছেড়ে, বিশ্বের সেরা ক্লাবটা ছেড়ে কেন জুভেন্টাসে চলে গেলেন তিনি, সেটা এখনও বোধগম্য নয় অনেকেরই। কেউ কেউ অবশ্য ভাবেন, রোনালদো বোধহয় শুধু টাকার জন্যেই পাড়ি জমিয়েছেন ইতালীতে। তবে রোনালদো শোনালেন অন্য গল্প। রিয়াল।মাদ্রিদ ছাড়ার পরে এই প্রথম তার দলবদলের কারণ নিয়ে প্রকাশ্যে মুখ খুললেন বিশ্বসেরা এই ফুটবলার। রোনালদো বলেছেন টাকা-পয়সা বা চ্যালেঞ্জ, কোনকিছুর লোভেই রিয়াল ছাড়েননি তিনি, বরং তাকে মাদ্রিদ ছাড়তে বাধ্য করেছিলেন রিয়ালের প্রেসিডেন্ট ফ্লোরেন্তিনো পেরেজ! 

ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, রিয়াল মাদ্রিদ, ফ্লোরেন্তিনো পেরেজ

মৌসুমের শুরুতে জুভেন্টাসের সাথে রোনালদোকে নিয়ে রিয়ালের চুক্তিটা যখন হয়ে গেল, তখন মাদ্রিদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, রোনালদো নিজেই নাকি ক্লাবে থাকতে চাইছেন না! মাস ছয়েক পরে এটা নিয়ে মুখ খুলেছেন রোনালদো, আর বলেছেন, শুরু থেকেই তার দলবদল নিয়ে মিথ্যাচার করে এসেছে রিয়াল মাদ্রিদ। তিনি কখনও ক্লাব ছাড়তে চাননি, স্পেনেই নিজের ক্যারিয়ার শেষ করার স্বপ্ন দেখেছিলেন। কিন্ত সেটা সম্ভব হয়নি একজনের কারনে, তার নাম ফ্লোরেন্তিনো লোপেজ।

ফ্রান্স ফুটবলকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারেই এমন বিস্ফোরক তথ্য জানিয়েছেন রোনালদো। গলায় ক্ষোভ ঢেলে দইইয়েই বলেছেন- “‘ক্লাবের প্রেসিডেন্ট আমাকে শুধু একটা ব্যাবসায়িক চুক্তি হিসেবেই বিবেচনা করতো সবসময়। আমি জানি এটা। আমাকে সে যখন যা বলেছে, কোনোটাই তার মন থেকে বলেনি। ওর কাছে আমি একটা দামী খেলনার চেয়ে বেশিকিছু ছিলাম না। পেরেজের আচরণই আমাকে বাধ্য করেছে এমন সিদ্ধান্ত নিতে। হ্যাঁ, তারা আমাকে বলেছে, থেকে যাও। সেইসঙ্গে এটাও বুঝিয়ে দিয়েছে, মাদ্রিদে আমার থাকা বা না থাকায় তাদের খুব বেশি কিছু যায় আসে না। এরপরে সেখানে থাকাটা বোকামী মনে হয়েছে আমার কাছে।’

ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, রিয়াল মাদ্রিদ, ফ্লোরেন্তিনো পেরেজ

মনের আগল খুলে দিয়ে রোনালদো আরও বলেছেন- “ক্লাবের ভেতরে থেকে আমি স্পষ্ট বুঝতে পারছিলাম, সেখানে আমার গুরুত্বটা কমে আসছে। ওরা হয়তো ভাবছিল, আমার সময় ফুরিয়ে এসেছে, এখন আমাকে এত পাত্তা না দিলেও চলে। শুরুতে আমাকে যেভাবে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছিল রিয়ালে, সেটা শেষের দিনগুলোতে মোটেও ছিল না। এবং আমি বুঝতে পারছিলাম যে, ওদের ভবিষ্যত পরিকল্পনায় আমি সেভাবে নেই। রিয়ালে প্রথম চার-পাঁচ বছরে আমার আসলেই মনে হতো, হ্যাঁ আমিই, ‘ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো।’ এরপর থেকে আস্তে আস্তে সেই অনুভূতিটা মুছে গেছে। প্রেসিডেন্টের আচরণও বদলে গিয়েছিল অনেক, সে এমন ভাব করত যে আমাকে না হলেও চলবে তাদের। আমি কী বোঝাতে চাচ্ছি, আশা করি বুঝতে পারছেন!”

ফ্রান্স ফুটবলকে রোনালদো আরও জানিয়েছেন, “হুটহাট খবরে আমি দেখতাম, তারা বলছেন আমি নাকি ক্লাব ছাড়তে চাই! হ্যাঁ, বেতন বা সুবিধাদির পরিমাণ নিয়ে আমাদের মধ্যে দ্বিমত ছিল। কিন্ত সেটা খুব বড় কোন ইস্যু ছিল না। আমি আসলে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছিলাম, আমার সব সময় মনে হতো প্রেসিডেন্ট আমাকে ধরে রাখবেন না।” 

ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, রিয়াল মাদ্রিদ, ফ্লোরেন্তিনো পেরেজ

টাকার লোভে রিয়াল ছেড়ে জুভেন্টাসে গেছেন বলে যারা ভাবেন, তাদের কটুক্তির জবাবও দিয়েছেন রোনালদো। বলেছেন, “আমি টাকার জন্য ক্লাব ছাড়িনি। টাকা কামাতে চাইলে তো আমি চীনেই যেতাম, ইতালীতে নয়। তাহলে এখনের চেয়ে অন্তত পাঁচগুণ বেশি টাকা পেতাম। জুভেন্টাসেও আমি রিয়ালের মতোই টাকা পাচ্ছি, অঙ্কটা বরং কমই হবে হয়তো। শুধু বেতনের জন্যে, বা টাকা পয়সার জন্যে আমার ক্লাব ছাড়ার ঘটনাটা ঘটেনি। জুভেন্টাস আমাকে আসলেই চেয়েছে। আমাকে তারা সেটা দেখাতেও পেরেছে যে তারা আমাকে চায়, যেটা রিয়াল মাদ্রিদ পারেনি।”

আর এসব কিছুই তাকে ক্লাব ত্যাগের সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছে বলে জানিয়েছেন রোনালদো। সেইসঙ্গে জিদানের চলে যাওয়াটাও তার সিদ্ধান্ত নেয়াটাকে একটু সহজ করে দিয়েছে বলে অভিমত রোনালদোর, যদিও তিনি এটাকে ‘খুব ছোট একটা অংশ’ বলেই মন্তব্য করেছেন। এতসব বক্তব্যের ভীড়ে অভিযোগের মূল তীরটা অবশ্যই ফ্লোরেন্তিনো পেরেজের দিকে। এই পেরেজই এককালে রিয়ালে গ্যালাকটিকো যুগ উপহার দিয়েছিলেন, একের পর এক তারকাকে ভিড়িয়েছিলেন ক্লাবে। সেই ফ্লোরেন্তিনো পেরেজ এখন রোনালদোর কাঠগড়ায়, রিয়ালের ভক্ত-সমর্থকদের চক্ষুশূলে পরিণত হতে আর খুব বেশি সময় বাকী নেই বোধহয় তার!

Comments

Tags

Related Articles