খেলা ও ধুলারাশিয়া বিশ্বকাপ ২০১৮

‘রোনালদোকে নিয়ে উচ্ছ্বাস অমূলক, মেসিকে দোষারোপও অনুচিত!’

ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো আর লিওনেল মেসি – দুজনেরই বয়স ত্রিশের কোঠা পেরিয়েছে। রাশিয়ায় চলমান বিশ্বকাপ দুইজনেরই ক্যারিয়ারের সম্ভাব্য শেষ বিশ্বকাপ। কারণ চার বছর পর কাতারে যখন পরবর্তী বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হবে, ততদিনে সময়ের সেরা এই দুই ফুটবলারই হয়ত আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানিয়ে ফেলবেন। এমনকি ক্লাব ফুটবলে খেলা চালিয়ে গেলেও, রিয়াল মাদ্রিদ ও বার্সেলোনার মত শীর্ষ ক্লাবে তাদেরকে খেলতে দেখা যাওয়ার সম্ভাবনা খুবই সীমিত।

এদিকে এই দুই ফুটবলার তাদের ক্লাব ক্যারিয়ারে জিতেছেন সম্ভাব্য সব কিছুই। পাশাপাশি তাদের ব্যক্তিগত অর্জনের শো-কেসও কানায় কানায় পূর্ণ। অথচ বিশ্বকাপটিই জেতা হয়নি দুজনের কারও। চার বছর আগে ব্রাজিল বিশ্বকাপে মেসি তাঁর দলকে তুলেছিলেন ফাইনাল পর্যন্ত। কিন্তু শেষ হাসি হাসা আর হয়নি। অন্যদিকে রোনালদো তো এর আগে তিনটি বিশ্বকাপ খেলে ফেললেও, বলার মত কিছুই করতে পারেননি। তাঁর দলও যেতে পারেনি শিরোপার ধারেকাছে। তাই রাশিয়ায় দুই ফুটবলারই এসেছিলেন অভিন্ন লক্ষ্য নিয়ে। আর তা হলো শেষবারের মত বিশ্বজয়ের চেষ্টা।

গোটা বিশ্বই অধীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছিল দেখতে যে শেষবারের মত বিশ্বমঞ্চে এই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী কী করে দেখাতে সমর্থ হন। এবং ইতিমধ্যেই দুইটি করে ম্যাচ খেলে ফেলেছেন রোনালদো ও মেসি দুজনেই। সেই দুই ম্যাচে রোনালদো ছিলেন যতটা না উজ্জ্বল, মেসি ঠিক ততটাই নিষ্প্রভ।

সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেনের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচেই রোনালদো করেন দুর্দান্ত এক হ্যাটট্রিক। আর তাঁর সেই হ্যাটট্রিকের সুবাদে শক্তিশালী স্প্যানিশদের কাছ থেকে একটি মূল্যবান পয়েন্ট অর্জন করে নেয় পর্তুগিজরা। নিজেদের পরের ম্যাচেও পর্তুগালের জয়ের নায়ক সেই রোনালদোই। তাঁর কর্নার থেকে করা গোলের সুবাদেই মরক্কোকে ১-০ গোলের ন্যূনতম ব্যবধানে হারিয়েছিল পর্তুগাল। সব মিলিয়ে এখন পর্যন্ত দুই ম্যাচে চার গোলে করে রোনালদো যেমন এই মুহূর্তে এবারের আসরের গোল্ডেন বুট জয়ের সবচেয়ে বড় দাবিদার, তেমনি তাঁর দলের পক্ষেও বেশ ভালো সুযোগ রয়েছে স্পেনকে টপকে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হিসেবে দ্বিতীয় রাউন্ডে উত্তোরণের। অনেকে তো মনে করছে, রোনালদোর পায়ে যদি এমন জাদুকরি ফর্ম অব্যহত থাকে, তাহলে ২০১৬ সালে ইউরোতে পর্তুগাল যেমন সব হিসাবনিকাশকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে জিতে নিয়েছিল শিরোপা, ঠিক তেমনই কিছুর পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে রাশিয়া বিশ্বকাপেও। আর তা যদি হয়, তবে রোনালদোর সর্বকালের সেরা ফুটবলার হয়ে ওঠা ঠেকায় কে!

অপরদিকে মেসির এবারের আসরের চিত্রনাট্য একদমই বিপরীত। তিনি যেমন এখন অবধি নিজেকে মেলে ধরতে পারেননি, ঠিক তেমনই তাঁর দলও রীতিমত ধুঁকছে। নিজেদের শেষ ম্যাচে নাইজেরিয়াকে হারানোই তাদের জন্য যথেষ্ট নয়। পাশাপাশি তাদেরকে অপেক্ষা করতে হবে ছোটোখাটো একটি মিরাকলেরও। কেবল তবেই তারা ডিঙাতে পারবে প্রথম রাউন্ডের বাঁধা। নিজেদের প্রথম ম্যাচে তারা ১-১ গোলে ড্র করেছিল নবাগত আইসল্যান্ডের সাথে। সে ম্যাচে দশবার গোলে শট নিয়েও কাজের কাজ করে দেখাতে পারেননি মেসি। এরপর ক্রোয়েশিয়ার কাছে দ্বিতীয় ম্যাচে তো আকাশী-নীল জার্সিধারীরা বিধ্বস্তই হয়েছে বলা চলে। মড্রিচ, রাকিটিচরা একে একে তিনবার বল জড়িয়েছে তাদের জালে। বিনিময়ে তারা একটি গোলও শোধ দিতে পারেনি। আর দলের সমান ব্যর্থ ছিলেন মেসিও। গোটা ম্যাচেই যেন নিজেকে হারিয়ে খুঁজেছেন তিনি। পুরো ম্যাচে মাত্র ২০ বার বল স্পর্শ করার সুযোগ পেয়েছেন তিনি। আর উল্লেখযোগ্য কৃতিত্ব বলতে কেবল ছয়বারের চেষ্টায় পাঁচটি ড্রিবল সম্পন্ন করা। অথচ তাঁর কাছ থেকে তাঁর দলের চাওয়া আরও কতই না বেশি। সেসবের কিছুই পূরণ করতে পারেননি তিনি। তাই তো ভক্তমহলের একাংশে আবারও রব উঠেছে, আবারও যেন অবসরের ঘোষণা দেন। এবং এবার একদম সত্যি সত্যিই। অবসর ভেঙে ফিরে আসার কোন দরকারই নেই আর। অর্থাৎ আরও একবার বিশ্বমঞ্চে আর্জেন্টিনার ব্যর্থতা আর মেসির কিছু করতে না পারার দায় একই মোহনায় এসে মিলেছে, এবং মেসিকে কাঠগড়ায় তুলতেও বাঁধছে না অনেকেরই।

তবে যে যাই বলুক, এখনও কিন্তু উল্টো সুরেই গান গাইছেন সেস্ক ফ্যাব্রেগাস। স্পেনের এই মাঝমাঠের খেলোয়াড় এবারের বিশ্বকাপ স্কোয়াডে ডাক পাননি। তাই মাঠের বাইরে থেকেই তিনি পালন করছেন ফুটবল বিশ্লেষকের ভূমিকা। এবং সেই ভূমিকা পালন করতে গিয়েই বিবিসি স্পোর্টের জন্য লেখা বিশেষ কলামে তিনি দাবি করেছেন, এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপে পর্তুগালের সাফল্যে রোনালদোকে একক কৃতিত্ব দেবার কিছু হয়নি। ঠিক একইভাবে আর্জেন্টিনার ব্যর্থতার জন্য শুধু মেসিকেই দোষারোপ করাটাও উচিৎ কাজ হচ্ছে না। ফ্যাব্রেগাসের ভাষ্যমতে, রোনালদো ভালো খেলছেন ঠিকই, কিন্তু তাঁকে নিয়ে যতটা উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠেছে সকলে, সেটির দাবিদার নন তিনি। কেননা এখন পর্যন্ত তাঁর গোলগুলো এসেছে ‘সেট পিস থেকে, পেনাল্টি থেকে, অথবা গোলরক্ষকের ভুলের কারণে।’

অপরদিকে নিজের সাবেক বার্সেলোনা সতীর্থ মেসির প্রশংসা করে ফ্যাব্রেগাস বলেন, মেসি তাঁর যথাসাধ্য চেষ্টা করে যাচ্ছেন। কিন্তু আর্জেন্টিনা স্কোয়াডে তাঁকে পর্যাপ্ত সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেবার মত কেউ নেই বলেই আইসল্যান্ডের বিপক্ষে ড্র করতে হয়েছে, আর ক্রোয়েশিয়ার কাছে হেরে গিয়ে তাদের সামগ্রিক প্রতিযোগিতা থেকেই ছিটকে পড়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে।

‘ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে ম্যাচেও দেখা গেছে একই চিত্র। কিন্তু এখানে মেসির একার কোন দোষ আমি দেখি না। যেমনটি আমি আমার টিভি বিশ্লেষণে বলেছি, আর্জেন্টিনাকে দেখে মনে হয়েছে তারা নেহাতই একটি ভেঙে পড়া দল। আর তাই এরকম একটি দলের হয়ে খেলা মেসির জন্য খুবই দুরূহ হয়ে উঠছে। তাঁর অন্তত একজন ভালো সতীর্থের প্রয়োজন ছিল, যে তাঁকে সাহায্য করতে পারতো, তাঁর জন্য খেলা তৈরি করে দিতে পারতো,’ এভাবেই মেসির বর্তমান অবস্থার ব্যাখ্যা দেন ফ্যাব্রেগাস।

একই লেখায় রোনালদোর খেলা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, মেসিকে দলের জন্য যতটা কঠোর পরিশ্রম করতে হচ্ছে, রোনালদোকে তা করতে হচ্ছে না। আর এটিই রোনালদোর এত ভালো খেলার পেছনে প্রধান রহস্য। ‘আজকাল রোনালদোকে পর্তুগালের জন্য একদমই ভিন্ন কিছু ভূমিকা পালন করতে হয়। সে মূলত অগ্রভাগে দাঁড়িয়ে থাকে, এবং আপনি আজকাল আর তাঁকে দেখবেন না গোটা মাঠজুড়ে দৌড়ে বেড়াতে। সে বড় তারকাদের মধ্যে অন্যতম যে রাশিয়ায় খুব ভালো একটা সূচনা করতে পেরেছে, এবং অবশ্যই তা গোলের হিসাবে।

‘হ্যাঁ, সে (রোনালদো) খুবই ভালো খেলছে। কিন্তু আপনি যদি একবার ভালো করে খেয়াল করেন সে কী কী করেছে… সে পেনাল্টি থেকে একটি গোল করেছে, ফ্রি কিক থেকে একটি গোল করেছে, কর্নার থেকে একটি গোল করেছে, এবং বাকি একটি গোল করেছে শটের মাধ্যমে, যে শটটি ডেভিড ডি গিয়ার অবশ্যই ঠেকানো উচিৎ ছিল। আপনি কখনোই বলতে পারবেন না সে এবং পর্তুগাল নিজেদের মধ্যে দারুণ সমন্বয় দেখিয়েছে, বা টিকিটাকার মত অসাধারণ ফুটবলের প্রদর্শন করে ওই গোলগুলো করেছে। আপনি তাঁকে ক্রেডিট দেবেন অবশ্যই, কিন্তু তাঁর গোলগুলো এসেছে সেট পিস থেকে, পেনাল্টি থেকে, কিংবা ভুলের খেসারত হিসেবে।’

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close