ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো যে রিয়াল মাদ্রিদ ছেড়ে জুভেন্টাসে পাড়ি জমিয়েছেন, তা বোধহয় আর জানতে বাকি নেই কারোই। বেশ কয়েকদিন ধরেই গুজব ডালপালা মেলছিল। কিন্তু গত মঙ্গলবার যখন রিয়াল মাদ্রিদের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এলো যে বিদায় নিচ্ছেন রোনালদো, আর তারপর রোনালদো নিজেও ভক্তদের উদ্দেশে এক আবেগঘন খোলা চিঠি প্রকাশ করলেন, তারপর থেকে দিনের আলোর মতই পরিষ্কার হয়ে যায় সব কিছুই।

কিন্তু একটি বিষয় কি লক্ষ্য করে দেখেছেন, জুভেন্টাসে যোগ দেয়ার, কিংবা আরও ভালো করে বলতে গেলে রিয়াল মাদ্রিদ ছাড়ার, খবরটি নিশ্চিত করতে ঠিক কোন সময়টিকে বেছে নেয়েছেন সিআর সেভেন? ঠিক সেই দিনটিকেই, যেদিন অনুষ্ঠিত হয়েছে চলতি বিশ্বকাপের প্রথম সেমিফাইনাল ম্যাচটি। তাও আবার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছেন ম্যাচটি শুরু হওয়ার মাত্র ঘণ্টাখানেক আগে!

তাই না চাইতেও একটি সন্দেহ মনের কোণে উঁকি দিয়ে যায়, এই গোটা বিষয়টি কি রোনালদোর পূর্ব-পরিকল্পিত ছিল যে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের মত একটি গুরুত্বপূর্ণ দিনেই বোমাটি ফাটাবেন তিনি? এর পেছনে কি বরাবরের মতই রোনালদোর সব আকর্ষণ নিজের দিকে টেনে নিয়ে যাওয়ার প্রবণতা কাজ করেছে?

খেলোয়াড় হিসেবে রোনালদো যে কতটা অসাধারণ তা আর নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। সময়ের সেরা হিসেবে লিওনেল মেসির সাথে একবাক্যে উচ্চারিত হয় তার নামও। এমনকি অনেকের কাছেই তিনি তো শুধু বর্তমান সময়েরই সেরা নন, এমনকি সর্বকালের শ্রেষ্ঠতম ফুটবলারও!

তবে ব্যক্তি রোনালদোকে যারা চেনেন, তার মাঠের বাইরের কথাবার্তা বা কার্যকলাপ থেকে, তারা এতদিনে নিশ্চয়ই বুঝে গেছেন যে শুধু মাঠের খেলায় সেরা হয়েই তিনি সন্তুষ্ট থাকেন না, বরং তিনি যে সত্যিই সেরা এবং বাকি সকলের থেকে এগিয়ে, সে বিষয়টি সবসময় শুনতে ও শোনাতে পছন্দ করেন তিনি। আরও পছন্দ করেন তার প্রতি গণমাধ্যমের নিরন্তর আগ্রহ।

রোনালদোর চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী মেসি কখনোই নিজের মুখে নিজেকে সেরা বলে দাবি করেননি। কিন্তু তিনি একেবারেই ব্যতিক্রম। গণমাধ্যমের সামনে একাধিকবার নিজেই নিজের মাথায় শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট পরে নিয়েছেন তিনি। নিজেকে দাবি করেছেন বিগত বিশ বছরের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে। তার থেকে এগিয়ে নেই যে আর কেউই, এ কথা তিনি দাবি করেন কোনো রকম সংকোচ না করেই।

এমনকি তার আত্মাভিমানের কথাও কারও অজানা নয়। এখনও হয়ত নিজের মুখে রিয়াল মাদ্রিদ ছাড়ার পেছনের প্রকৃত কারণ খোলাসা করেননি তিনি। তারপরও কারণগুলো কমবেশি সকলেই আন্দাজ করতে পারে। প্রথমত মাদ্রিদে তিনি যে বেতন পেতেন, তা মেসির বেতনের প্রায় অর্ধেকই শুধু নয়, এমনকি পুরো ১৪ মিলিয়ন ইউরো কম নেইমারের থেকেও। তার মাপের একজন খেলোয়াড়ের জন্য বিষয়টি অপমানজনক বৈ কি! তাছাড়া রিয়াল মাদ্রিদ সভাপতি ফ্লোরেন্তিনো পেরেজের নেইমারকে নিয়ে অত্যাধিক উচ্ছ্বাসও সহ্য করতে পারেননি তিনি। নেইমার যদি বার্নাব্যুতে আসেন তাহলে তার গুরুত্ব কিছুটা হলেও কমে যাবে, এমন আশঙ্কাও করেছিলেন তিনি। এসব কারণেই শেষ পর্যন্ত জুভেন্টাসে পাড়ি জমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি।

তাহলে বুঝতেই পারছেন, নিজেকে নিয়ে ব্যক্তি রোনালদোর মানসিকতা ঠিক কী রকম। অনেকে তো তাই তাকে সময়ের সবচেয়ে নার্সিসিস্ট ফুটবলার হিসেবেও দাবি করে! তাই কারও কারও মনে প্রশ্ন জাগা অস্বাভাবিক কিছু নয় যে, বিশ্বকাপ নিয়ে পুরো বিশ্বব্যাপী যে মাতামাতি শুরু হয়েছে, তাতে পাদপ্রদীপের আলো থেকে ক্রমশ সরে যাচ্ছিলেন বলেই কি ঠিক সেমিফাইনালের দিনই ক্লাব ছাড়ার সংবাদটি প্রকাশ্যে আনলেন তিনি? যাতে আবারও সকল আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠেন তিনি! নতুন করে সব আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক চলতে থাকে তাকে ঘিরেই!

এমন ধারণার পেছনে বেশ কিছু যুক্তিও উত্থাপন করা যায়। বিশ্বকাপে রোনালদোর দল পর্তুগাল বিদায় নিয়েছে রাউন্ড অফ সিক্সটিন থেকেই। অর্থাৎ প্রায় দশদিন আগে। কিন্তু তার বিদায়ের পরও এতটুকু রঙ হারায়নি বিশ্বকাপ। ফুটবলপ্রেমীরা প্রবল উচ্ছ্বাসের সাথে মেতে ছিল কিলিয়ান এমবাপে, রোমেলো লুকাকু, এডেন হ্যাজার্ড, লুকা মড্রিচ, হ্যারি কেইনের মত খেলোয়াড়দেরকে নিয়ে। পত্রিকার শিরোনামও হচ্ছিলেন এই সকল খেলোয়াড়ই। রোনালদোর ক্লাব ছাড়ার গুঞ্জন নিয়েও মাঝেমধ্যে টুকটাক খবর আসছিল বটে, কিন্তু তা বিশ্বকাপ উন্মাদনার কাছে একেবারেই নস্যি।

অর্থাৎ রোনালদোর মনে হতেই পারে যে তার উপর থেকে আলো কিছুটা হলেও সরে গেছে। সেই আলো ফিরিয়ে আনতেই হয়ত বা ঠিক বিশ্বকাপের প্রথম সেমিফাইনালের দিনই নতুন ক্লাবে যোগ দেয়ার ঘোষণা দিলেন তিনি। নাহলে এ ঘোষণা দেয়ার আরও ভালো সময় হতে পারত বিশ্বকাপ পরবর্তী সপ্তাহটি। যেহেতু বিশ্বকাপ শেষ, তাই গোটা বিশ্বের নজর আবারও ফিরে আসতো আসন্ন মৌসুমের উপর, এবং তারা নতুন করে মেতে উঠত ট্রান্সফার উইন্ডো নিয়ে। কোন দল কোন খেলোয়াড়কে দলে ভিড়াচ্ছে, কোন খেলোয়াড় আগের ক্লাব ছেড়ে চলে যাচ্ছেন, এসব নিয়ে প্রচুর জল্পনা-কল্পনা শুরু হতো। ঠিক সেই সময়ে রোনালদোর রিয়াল মাদ্রিদ ছেড়ে জুভেন্টাসে যোগদানের খবরের চেয়ে মূল্যবান আর কিছুই হতে পারত না।

কিন্তু এতটা তর যে রোনালদোর সইল না! তিনি বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে পড়ে গ্রীসে পরিবারের সাথে ছুটি কাটাবেন, আর সেই ফাঁকে সংবাদের শিরোনাম হতে থাকবেন অন্য সব তারকা ফুটবলাররা, এ বিষয়টি হয়ত সহ্য হলো না তার। সম্ভবত সে কারণেই অনুমিত সময়ের আগেই তড়িঘড়ি করে নতুন ক্লাবে যোগ দেয়ার বিষয়টি পাকা করে ফেললেন তিনি।

তবে এখন প্রশ্ন হলো, আসলেও যদি রোনালদো স্রেফ প্রচারের আলোয় থাকার জন্যই কাজটি করে থাকেন, সেক্ষেত্রে কি তিনি আদৌ সফল হয়েছেন? তা আংশিক সফল তো তাকে বলাই যায়। রিয়াল মাদ্রিদ থেকে তার বিদায়ের সংবাদ ছড়িয়ে পড়া মাত্রই গোটা বিশ্ব মেতে ওঠে তাকে নিয়ে। বিশ্বের সব গুরুত্বপূর্ণ সংবাদমাধ্যমেরই প্রধান শিরোনাম হয়ে ওঠেন তিনি।

কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি এই যে, তা খুবই স্বল্প সময়ের জন্য। বেলজিয়াম-ফ্রান্স ম্যাচটি শুরু হওয়া মাত্রই কিন্তু সকলের মনোযোগ আবারও ফিরে আসে মাঠের খেলায়। বেলজিয়ামের বিদায় ও ফ্রান্সের ফাইনালে উত্তরণ নিয়ে পুরো চব্বিশ ঘণ্টা মেতে থাকে ফুটবল বিশ্ব। আর পরদিন যখন ক্রোয়েশিয়ার কাছে হেরে বিদায় নিল ইংল্যান্ড, তখন থেকেই আবার সকল আলোচনার শীর্ষে এই ম্যাচটিই। ইংল্যান্ডকে নিয়ে হাসি-তামাশা আর ক্রোয়েশিয়ার মড্রিচ, রাকিটিচ, পেরিসিচ, মানজুকিচদের বন্দনায় ব্যস্ত সবাই। আর সেই সমান্তরালে চলছে তুমুল হিসাব-নিকাশও, কে হবে এবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন – ফ্রান্স নাকি ক্রোয়েশিয়া?

এখনও রোনালদোকে নিয়ে চর্চা হচ্ছে অবশ্যই। কিন্তু সেটি কেবল রোনালদোর ভক্তদের, আর রিয়াল মাদ্রিদ ও জুভেন্টাসের সমর্থকদের মাঝেই সীমাবদ্ধ। বিষয়টি যতটা সার্বজনীন হওয়ার কথা ছিল, বিশ্বকাপের ডামাডোলে তা হচ্ছে না। সুতরাং রোনালদো যে উদ্দেশ্য নিয়ে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের দিন ঘোষণাটি দিয়েছিলেন, সে উদ্দেশ্য মোটামুটি ব্যর্থই বলা চলে।

আর এ থেকে নতুন করে আবারও প্রমাণ হয়ে গেল, দিনশেষে ফুটবলই সবথেকে এগিয়ে। রোনালদো যত বড় মাপের খেলোয়াড়ই হন না কেন, ফুটবলের থেকে বড় তিনি নন। এমনকি ফুটবলের থেকে বড় নন মেসিও। তাদের পূর্বসূরী পেলে বা রোনালদোও নন। কেউই আসলে বড় নন ফুটবলের থেকে। ফুটবলের একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী শুধুই ফুটবল। এবং যতদিন মাঠের ফুটবল তার অসাধারণত্বের ধারা অব্যহত রাখবে, তাকে টপকাতে পারবে না কেউই।

(ইউএসএ টুডে অবলম্বনে)

Comments
Spread the love