কয়েকদিন আগে মাদ্রিদ ফ্যানদের এক আড্ডাতেই আমরা মেসিকে নিয়ে কথা বলছিলাম। বলছিলাম এরকম খেলোয়াড় দূরে থাকে, পৃথিবীতে এরকম মানুষই খুব কম আছে। একটা প্লেয়ারের এরর লেভেল রীতিমত শূন্যের কাছাকাছি। ঈশ্বরপ্রদত্ত প্রতিভা কিংবা সামর্থ্যের দিক থেকে মেসি যে বিশ্বসেরা, তা নিয়ে আসলে আমাদেরও কোন সন্দেহ নাই।

তাহলে রোনালদো-বন্দনাটা আসলে কিসের? এইটার উত্তর আমার কাছে দুইটা আছে। প্রথম- সেলফ মোটিভেশনের দিক থেকে রোনালদো অদ্বিতীয়। সে নিজের সামর্থ্য আর সীমাবদ্ধতার ব্যাপারে অবগত এবং নিজের ঘাটতিগুলোকে দুর করবার জন্য সে সবসময়ই যুদ্ধ করে যাবে। শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ে সে অনেকটাই পিছিয়ে গিয়েছিলো একবার।

২৮ বছর বয়সে রোনালদোর ব্যালন ডি’র সংখ্যা ১, যেখানে মেসি জিতেছে ৪ টি। আমরা ভেবেছি, এই বুঝি রোনালদোর শেষ! মেসিকে সর্বকালের সেরা মুকুট পড়িয়ে দিয়ে ‘কে সেরা?’, তা নিয়ে লড়াই বন্ধ করতে পারি। কিন্তু পৃথিবীতে একটা মানুষই সেদিন সে কথা মেনে নেয়নি এবং সেটা হচ্ছে স্বয়ং রোনালদো নিজে। তাই এই ৩৩ বছর বয়সে এসে ৫-৫ সমতায় এনেছে। যে সময় খেলোয়াড়রা নিজের ক্যারিয়ার গুটিয়ে নেওয়ার প্ল্যান করে, তখন সে ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জটা কাঁধে নিয়েছে এবং সেটি সফলতার সাথেই পূরণ করে যাচ্ছে!

নিজেকে বেস্ট দাবি করে বলে অনেকেই রোনালদোকে পছন্দ করেন না, অনেকে হেইট করেন ব্যাপারটা। কিন্তু আগেই বলেছি, রোনালদো নিজেকে প্রচুর পরিমাণে মোটিভেট করে এবং নিজেকে শ্রেষ্ঠ দাবি করে যাওয়াটা তারই অংশ। এই মোটিভেশনের শক্তি যে কত, সেটা আমরা মাঠে দেখতে পারি। শুধু নিজে না, নিজের দলের মধ্যেও সে এই স্পৃহার সঞ্চারণ ঘটায়। চিয়ারলিডিং বলে অনেকে হাসিতামাশা করতে পারেন, কিন্তু ইউরো ফাইনালে ব্যান্ডেজ পায়ে রোনালদোর ছুটোছুটি দলকে যে কতটা অনুপ্রেরিত করেছে, তা স্বয়ং গোলদাতা এডারই স্বীকার করেছে। এটা রোনালদো পারে! রোনালদোর কাজ।

রোনালদোর মাঝে হেরে না যাওয়ার অদম্য শক্তি সবসময়ই আমরা দেখতে পারি। কালকে যে সে বাইসাইকেল কিকে গোল দিল, সেটির কথাই ধরুন। রোনালদো প্রথম ব্যক্তি নয় যে করেছে। কিন্তু এই বাইসাইকেল কিক নিয়ে রোনালদোকে নিয়ে কম হাসাহাসি হয়নি। অসংখ্যবার সে চেষ্টা করেও গোল দিতে পারেনি এভাবে। হয়তো অন্য কেউ হলে হাল ছেড়ে দিত। কিন্তু রোনালদো ক্লাবের হয়ে শেষ পর্যন্ত সফল হল এই ৩৩ বছর বয়সে, তাও ৭ ফুট ৭ ইঞ্চি উচ্চতা থেকে। এটি যে ঝরেবগে হয়নি, তাও জানা যায় আগের দিনের প্র্যাক্টিসের ছবি থেকে, যেখানে দেখা গিয়েছে রোনালদো ওভারহেড শট প্র্যাকটিস করছে। মানে এইভাবে গোল দেওয়াটাও সে একটা চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছিল।

দ্বিতীয়ত, আমি ২০০২ থেকে রিয়েল মাদ্রিদ সাপোর্ট করি। গত দশকের প্রায় পুরোটা সময় কি পরিমাণ লজ্জা আর হতাশার মধ্যে আমাদের কেটেছে, সেটি বলে বুঝানো সম্ভব নয়! লীগের বাজে পারফর্মেন্স তো আছেই, যে ইউসিএল রীতিমত নিজেদের করে ফেলেছি, সেই টুর্নামেন্ট থেকে টানা ছয় সিজন সেকেন্ড রাউন্ড থেকে বাদ! ইউসিএলে কোন রিলাভেন্ট টিমই ছিল না রিয়েল মাদ্রিদ। সবাই ধরেই নিত সেকেন্ড রাউন্ডের পর আমরা বাদ পড়ে যাব। সেইখান থেকে বের হয়ে আসার জন্য মরিনহোর অবদান তো অবশ্যই আছে, তবে সবচেয়ে বড় অবদান বোধ করি রোনালদোরই। চার সিজনে তিনবার ইউরোপ সেরা হওয়াটা চাট্টেখানি কথা না। রোনালদোর নকআউট স্টেজের রেকর্ড দেখুন, বুঝবেন কিভাবে সম্ভব হয়েছে সেটি।

২০১২-তে রোনালদো বলেছিল, রিয়েল মাদ্রিদ আমার কাছে একটি ফাইনাল পাওনা, সে কথা রেখেছে তিনটে ফাইনাল জিতিয়ে। উলফ্‌সবার্গের সাথে ২-০ তে পিছিয়ে পড়ার পর রোনালদো যখন বলে বার্নাব্যুতে আমরা নতুন মাদ্রিদকে দেখবো, তখন সে কথায় আমরাও ভরসা পাই, যার প্রতিদান রোনালদো দেয় হ্যাট্রিক করে। বার্সেলোনার কাছে অসংখ্য হারের লজ্জায় যখন আমরা কুঁকড়ে যাচ্ছিলাম, তখনই রোনালদো আমাদের সিডিআর জেতালো। পরের সিজনে চুপ হয়ে গেল ক্যাম্প ন্যু। আমরা এখন অনেকটাই স্বীকার করেই নেই, রোনালদো পারলে আমরা পারবো। রোনালদো না পারলে আমরা পারবো না।

মানুষ উদ্ধত ব্যক্তিত্ব পছন্দ করে না। আত্মপ্রশংসা আর মাঠে দাপুটে চরিত্রের জন্য রোনালদোর হেইটারও অনেক বেশি। তবে মাঠের বাইরে ব্যক্তি রোনালদোকে বিশ্লেষণ করলে তারও উত্তর মিলবে। তারপরও আসলে রোনালদোকে হেইট করার কারণটা কি? শুধুমাত্র রাইভালরি? নাদাল-ফেদেরারের ফ্যানবেইজকে দেখুন। পরস্পরের প্রতি সম্মান রেখেও নিজেদের পছন্দের প্লেয়ারকে যে সাপোর্ট করা যায়, তার প্রমাণ তো পাওয়াই গিয়েছে। রোনালদোকে শ্রেষ্ঠ বলার দরকার নেই, কিন্তু আপনার চোখে দ্বিতীয় শ্রেষ্ঠ হলেও তাকে প্রাপ্য সম্মানটা বেশিরভাগ মেসি কিংবা বার্সেলোনা ফ্যানরা দিতে চায় না। আসলেই খুব খারাপ লাগে জিনিসটা।

কালকেও দ্বিতীয় গোলটির আগ পর্যন্তও ইউভের ফ্যানরা রোনালদোকে দুয়োধ্বনি দিচ্ছিল। হয়তো গোলটি তাদের মনে করিয়ে দিয়েছে কি অসাধারণ এক খেলোয়াড়কে তারা দেখছে! তাই মুহূর্তের মধ্যে মাঠজুড়ে সব দুয়োধ্বনিগুলো পরিণত হল করধ্বনিতে।

তাকে গড না মানুন, কিন্তু হার না মানার অদম্যতা আর কঠোর সাধনা শক্তির রোনালদো অবশ্যই অনন্য। প্রায় যুগ ধরে নিজের ভাগ্য নিজে তৈরি করে আসা রোনালদোর বন্দনায় তাই আমরাও মাতি বার বার। প্রতিবার ভাবি রোনালদো হয়তো এই সিজনেই শেষ, কিন্তু হার না মানা রোনালদো বয়সকেও হার মানিয়ে যাচ্ছে প্রতিবার। আমরাও তাই চলেছি মুগ্ধ হয়েই।

Comments
Spread the love