একজন মানুষের জীবন কতটা দুঃখের হতে পারে? একজন মানুষ জীবনে কতটা সংগ্রাম করতে পারে? গল্প-উপন্যাস-সিনেমাতে আমরা মানুষের জীবনের যে দুঃখ-কষ্ট-যন্ত্রণা-সংগ্রামের চিত্র দেখি সেটা কতটা তীব্র হতে পারে? একজন সাহিত্যিক বা ফিল্মমেকারের একটি চরিত্রকে কাহিনীর প্রয়োজনে যথেষ্ট পরিমাণে কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে নিয়ে যাওয়ার স্বাধীনতা থাকে কিন্তু অনেক বাস্তবের রক্ত-মাংসের মানুষের জীবনের যন্ত্রণা-সংগ্রামের কাহিনী অনেক সময় আমাদের কল্পনাকেও হার মানায়। ‘একাত্তরের জননী’ রমা চৌধুরী সেরকমই একজন মানুষ।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় রমা চৌধুরী তিন সন্তানের জননী। তাঁর স্বামী তখন ভারতে। থাকতেন পৈতৃক ভিটা পোপাদিয়ায়। ১৩ মে সকালবেলা পাকিস্তানি হানাদাররা আক্রমণ করে তাঁর বাড়িতে। হানাদারদের নির্যাতনের শিকার হন তিনি। তাঁর দুঃখ ও সংগ্রামের অন্তহীন জীবনের শুরুটা তখন থেকেই।  সম্ভ্রম হারানোর পর তাদের হাত থেকে পালিয়ে পুকুরে নেমে যখন আত্মরক্ষার জন্য লুকিয়েছেন, তখন হানাদাররা গানপাউডার লাগিয়ে পুড়িয়ে দেয় তাঁর ঘরবাড়িসহ যাবতীয় সহায়-সম্পদ। ঘরবাড়িহীন বাকি আটটি মাস তাঁকে তিনটি শিশুসন্তান আর বৃদ্ধ মাকে নিয়ে জলে-জঙ্গলে লুকিয়ে বেড়াতে হয়েছে। রাতের বেলায় পোড়া ভিটায় এসে কোনোমতে পলিথিন বা খড়কুটো নিয়ে মাথায় আচ্ছাদন দিয়ে কাটিয়েছেন। এসব ঘটনার বিবরন পাওয়া যায় তার লেখা একাত্তরের জননী  গ্রন্থে।

নয় মাসের সংগ্রামের পর দেশের বিজয়ের সূর্য উদিত হলেও রমা চৌধুরীর জীবনের কোন পরিবর্তন ঘটেনি। ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের আগের রাতে ১৫ ডিসেম্বর থেকে শ্বাসকষ্ট শুরু হয় তাঁর সন্তান সাগরের। ২০ ডিসেম্বর রাতে মারা যায় সাগর। একাত্তরের জননী গ্রন্থের ২১১ পৃষ্ঠায় রমা চৌধুরী লিখেছেন, “ঘরে আলো জ্বলছিল হ্যারিকেনের। সেই আলোয় সাগরকে দেখে ছটফট করে উঠি। দেখি তার নড়াচড়া নেই, সোজা চিৎ হয়ে শুয়ে আছে সে, নড়চড় নেই”। একই অসুখে আক্রান্ত দ্বিতীয় সন্তানও। ১৯৭২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি অর্ধউন্মাদিনী রমা চৌধুরী নিজের ছেলে টগরকে ওষুধ খাওয়াতে গিয়ে অসাবধানতাবশত তার শ্বাসরোধ হয়ে যায়। এতে মারা যায় টগর। প্রথম সংসারের পরিসমাপ্তির পরে দ্বিতীয় সংসার বাঁধতে গিয়ে প্রতারণার শিকার হন। দ্বিতীয় সংসারের ছেলে টুনু ১৯৯৮ সালের ১৬ ডিসেম্বর বোয়ালখালীর কানুনগোপাড়ায় সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান।

রমা চৌধুরীর শুরুটা কিন্তু এমন ছিল না। তিনি পড়াশুনা করেছেন অনেক দূর। তিনি দক্ষিণ চট্টগ্রামের প্রথম নারী স্নাতকোত্তর (এমএ) নারী। তিনি ১৯৬১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। রমা চৌধুরী ১৯৬২ সালে কক্সবাজার বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষিকার দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে পূর্ণাঙ্গ কর্মজীবন শুরু করেন। পরে দীর্ঘ ১৬ বছর তিনি বিভিন্ন উচ্চবিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষিকার দায়িত্ব পালন করেন। স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে তিনি মূলত লেখালেখিকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। নিজের বই নিজেই পায়ে হেটে ফেরি করে বেড়াতেন। এটাই ছিল তাঁর জীবিকার প্রধান উৎস। প্রচণ্ড আত্মমর্যাদাবোধ সম্পন্ন রমা চৌধুরী কারো থেকে কোন রকম সাহায্য নিতেন না। কেউ তাঁর বই কিনলেই শুধু তাঁকে সাহায্য করা হত। প্রবন্ধ, উপন্যাস ও কবিতা মিলিয়ে বর্তমানে তিনি নিজের ১৮টি গ্রন্থ প্রকাশ করেছেন।

একাত্তরের বীরাঙ্গনা, সংগ্রামী রমা চৌধুরী এখন চিকিৎসা করাতে পারছেন না অর্থের অভাবে! গত ১০ জুন রাতে নগরীর একটি বেসরকারি ক্লিনিকে ভর্তি হয়েও চিকিৎসার অতিরিক্ত ব্যয়ভার বহন করতে না পেরে ক্লিনিক ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। আবারো চট্টগ্রাম নগরীর মোমিন রোডে চেরাগী পাহাড়ের লুসাই ভবনের ছোট্ট একটি খুপরিতেই আশ্রয় নিয়েছেন।

তার একমাত্র জীবিত ছেলে জহর লাল চক্রবর্তী সাংবাদিকদের বলেন, “তিনি খালি পায়ে হেঁটে হেঁটে বই বিক্রি করেই চলেছেন এতদিন। জীবনে কারো কাছ থেকে তিনি কোনো আর্থিক বা বৈষয়িক সাহায্য নেননি এখন পর্যন্ত। শুধু তার কাছ থেকে বই কিনলেই টাকা নিয়েছেন, এ ছাড়া নয়। কিন্তু তিনি এখন খুব অসুস্থ। তার নিয়মিত সেবা-শুশ্রূষা প্রয়োজন। হাসপাতালে চিকিৎসাকালে শেষদিকে প্রতিদিন প্রায় ২২ থেকে ২৫ হাজার টাকা করে খরচ হচ্ছিল। যা আমাদের পরিবারের পক্ষে নির্বাহ করা সম্ভব নয়। তিনি কোনোদিন কারো কাছ থেকে কোনো সাহায্য নেননি। কিন্তু এখন তার অবস্থা ভালো নয়। তার চিকিৎসা করানোর জন্য সরকারি সহায়তা প্রয়োজন”।

এদেশে এক সময় রাজাকার দেশদ্রোহীদের গাড়িতে পতাকা উঠলেও, যে লাখ লাখ মানুষের রক্ত এবং অশ্রুর বিনিময়ে, অপরিসীম কষ্টের বিনিময়ে এই স্বাধীনতা আমরা পেয়েছি তাদের আমরা অবহেলা করেছি সব সময়। রমা চৌধুরীও আমাদের সেই অকৃতজ্ঞ অবহেলার শিকার। কেউ কি নেই, যে জীবনের এই শেষ মুহুর্তে রমা চৌধুরীর পাশে গিয়ে বলবে- ‘মা আমরা আছি আপনার পাশে’। সমগ্র জীবন কল্পনাতীতভাবে কষ্ট সহ্য করে, এই শেষ সময়ে তিনি কি এই দেশ থেকে এটুকু শান্তি আশা করতে পারেন না? বলেছিলাম, রমা চৌধুরী নিজের বই নিজেই ফেরী করে বেড়াতেন। যেটা বলিনি, তিনি পথে পথে হেঁটে বেড়াতেন খালি পায়ে! যে মাটিতে তাঁর তিন সন্তান শুয়ে আছে, সেই মাটিতে তিনি জুতা পরে হাঁটবেন না- এটাই ছিল তাঁর প্রতিজ্ঞা।

শুধু সরকার নয়, শুধু প্রধানমন্ত্রীর সাহায্য নয়- এই দেশের নাগরিক হিসেবে এটা এখন আমাদের দায়বদ্ধতা- রমা চৌধুরীর পাশে দাঁড়ানো। জীবন সায়াহ্নে এসে এই মানুষটি অন্তত দেখে যাক, এদেশের মানুষ তাঁর ত্যাগ-তীতীক্ষা ভুলে যায়নি। এটুকু আশা করা কী খুব বেশি বাতুলতা হবে?

Comments
Spread the love