সিনেমা হলের গলি

গাড়ি ওড়ানো মুখের কথা নয়!

লোকে আমাকে প্রায়ই বলে, কেন আপনি গাড়ি আকাশে ওড়ান? গাড়ি তো প্লেন নয়, তার তো পাখা নেই, যেটা রাস্তায় থাকার কথা সেটাকে বাতাসে ভাসিয়ে কি মজা পান আপনি?

প্রথম প্রথম এসব প্রশ্ন শুনলে মেজাজ খারাপ হতো খুব, রাগ করতাম প্রচণ্ড। বুঝিয়ে বলতেও পারতাম না, কারণ আমি যেভাবে দেখি, একই জিনিসটা শ্রোতা ব্যাক্তি হয়তো সেই চোখে দেখছেন না। আমার কথাগুলো তিনি বুঝতে পারবেন না, যদি না আমার ভিশনটা সম্পর্কে ওর কোন ধারণা না থাকে।

কমেডি সিনেমা করলেও, অ্যাকশানটা আমার সবচেয়ে পছন্দের জায়গা। আমি প্রতিটা সিনেমায় অ্যাকশনের ক্ষেত্রে আমার আগের কাজকে ছাপিয়ে যেতে চাই, আগের চেয়ে আরও ভালো কিছু করতে চাই, যেটা করে থিয়েটারে নিজের সিনেমাটা দেখতে বসলে দর্শক হিসেবে আমি তৃপ্তি পেতে পারি। আর আমার কাছে অ্যাকশনের কোন নির্দিষ্ট সীমা-পরিসীমা নেই, কখনও ছিল না।

ছোট্ট একটা উদাহরণ দিয়ে শুরু করি। একটা অ্যাকশন দৃশ্য, আপনাদের ভাষায় গাড়ি ওড়ানোর দৃশ্য; দুই সেকেন্ড গাড়িটা মাটির উপরে ভাসবে, সেটা ক্যামেরায় ধারণ করার জন্যে কতগুলো মানুষ লেগে থাকে জানেন? মাঝখানে শুটিং চলে, দুই পাশে থাকে ফায়ারবিগ্রেডের গাড়ি আর অ্যাম্বুলেন্স। এই দুটো গাড়ির সাইরেন যখন একসঙ্গে বেজে ওঠে, তখন অন্তরাত্মা খাঁচা ছেড়ে বেরিয়ে আসার অবস্থা হবে অনেকের। এটা শুধু এইজন্যে যে, ঈশ্বর না করুন, কোন দুর্ঘটনা ঘটলে যেন সবার আগে আমরা মানুষের জীবনের নিশ্চয়তাটা দেয়ার চেষ্টা করতে পারি।

দেড়শো থেকে দুশো মানুষের টিম থাকে আমাদের, অ্যাকশন টিম। একদম নগণ্য হিসেবটা বললাম। সেই টিমে প্রফেশনাল ফাইটার আছেন, দারুণ স্কিলফুল ড্রাইভার আছেন, কুংফু-কারাতে জানা দক্ষ লোকজন আছেন। সিনেমায় নায়কের হাতে এরা মার খায় দেখে ওদেরকে চুনোপুটি ভাববেন না মোটেও, এদের যে কারো বিরাশি সিক্কার একটা ঘুষি আমার আপনার চেহারার মানচিত্র পুরোপুরি পাল্টে দিতে পারবে।

রোহিত শেঠি, গাড়ি ওড়ানো, বলিউডিউ অ্যাকশন, স্ট্যান্টম্যান

আপনারা গাড়ি ওড়ানোটা দেখেন, কেউ কেউ হাসাহাসি করেন। কিন্ত এটার পেছনে আমাদের টিমের কত কঠোর পরিশ্রম মিশে আছে, সেটা কাউকে বলতে শুনি না। এটা খুবই দুঃখজনক মনে হয় আমার কাছে। এমন নয় যে আমরা মার্কেট থেকে গাড়ি কিনলাম, একজনকে সেটার ভেতরে বসিয়ে ক্যামেরা অন করে দিলাম আর গাড়ি আপনাআপনি বাতাসে ভাসা শুরু করলো। রাতের পর রাত, দিনের পর দিন সেই গাড়িগুলো নিয়ে গবেষণা করতে হয় আমাদেরকে। ফিজিক্স কেমিস্ট্রি গুলে খেয়ে ফেলতে হয়। আর এসবকিছুই করা হয় গাড়ির ভেতরে যে মানুষটাকে আমরা বসাচ্ছি, তার জীবনের ওপর যাতে কোন হুমকি না আসে, সেটা নিশ্চিত করতেই। ভেতরে থাকা মানুষটার সঙ্গে যেকোন কিছু ঘটতে পারে, আমাদের চেষ্টা থাকে, দূর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা যতোখানি কমিয়ে আনা যায়।

দর্শককে সুস্থ বিনোদন দেয়াটা খুব কঠিণ কিছু নয়, আবার একদম ছেলের হাতের মোয়াও নয়। আমার সঙ্গে প্রফেশনাল লোকজন আছে, তারা দক্ষ, অভিজ্ঞও। তবুও ওপরে বসে থাকা অন্তর্যামীর সাহায্য আপনার দরকার হবেই। নইলে নিজেকে প্রচণ্ড অসহায় মনে হবে। আমি শুধু তাকে বারবার বলি, ভাই আমার কাজ আমি করেছি, বাকীটা আপনি একটু দেখেন।

একশোর বেশী স্পিডে আপনি গাড়ি চালাচ্ছেন, হুট করে আপনার সামনে একটা স্পিডব্রেকার পড়লো, আর আপনি সেটাতে ধাক্কা খেয়ে গাড়ি বাতাসে ভাসিয়ে ফেললেন- এই সময়টায় একজন সাধারন মানুষের হার্টবিট এত বেশী বেড়ে যায় যে মনে হয় তাকে ৪৪০ ভোল্ট বিদ্যুতের ধাক্কা দেয়া হয়েছে। এই কাজটাই আমার টিমের লোকজন হাসিমুখে করছে দিনের পর দিন, বারবার করছে, কখনও হাসতে হাসতেই গাড়ি থেকে বেরিয়ে আসছে, কখনও আহত হয়ে হাত বা কাঁধ চেপে ধরে খোঁড়াতে খোঁড়াতে আসছে- এই ব্যপারগুলো তো হেসে উড়িয়ে দেয়ার মতো কিছু নয়। আমার কাছে তো নয়ই।

স্ট্যান্টম্যানের গাড়ির পেছনে আরেকটা গাড়িতে আমি থাকি, যে গাড়ির শুটিং করা হচ্ছে সেটার পাশে ক্যামেরা নিয়ে লোকজন থাকে। একশোর বেশী স্পিডে ছোটে পুরো দলটা। আমার মাথায় তখন এটা থাকে না যে সামনের গাড়িটা উল্টে আমাদের গাড়ির ওপরে পড়তে পারে, বা ক্যামেরার ট্রলির ওপরেও পড়তে পারে। আমি শুধু এটাই ভাবি যে, গাড়িতে যে স্ট্যান্টম্যান বসে আছে, সে যেন নিরাপদে বেরিয়ে আসতে পারে। আমার পুরো টিমের সবার মাথাতেই এই জিনিসটাই কাজ করে তখন।

রোহিত শেঠি, গাড়ি ওড়ানো, বলিউডিউ অ্যাকশন, স্ট্যান্টম্যান

এটা বলা অনেক সহজ যে রোহিত শেঠি সব সিনেমায় গাড়ি ওড়ায়। এটা কেউ দেখে না, সেই গাড়িটা ওড়ানোর প্রস্ততি কিভাবে নেয়া হয়েছিল, কিভাবে কাজ চলেছিল, কিভাবে সেটাকে হালকা করে প্রস্তত করা হয়েছিল, কিভাবে নিরাপদে শুটিংটা শেষ করেছিলাম আমরা। এসব নিয়ে কাউকে বলতে শুনিনা, লিখতে দেখিনা। আমাদের পরিশ্রমটা কেউ সামনে নিয়ে আসতে চায় না।

কখনও যে দূর্ঘটনা ঘটে না সেটা দাবী করবো না। কোনদিন টাইমিঙ- এ গড়বড় হয়ে যায়, মাথায় চোট পায় কেউ কেউ, অ্যাকশন সিকোয়েন্স করার সময় কারো গায়ে আগুন ধরে যায়, কেবল ছিঁড়ে গিয়ে মাটিতে পড়ে হাত-পা ভাঙাটা তো খুবই স্বাভাবিক হয়ে গেছে ওদের মধ্যে। গায়ে কাঁচ ঢুকে যাচ্ছে, হয়তো একটা দুর্ঘটনা কারো পুরোটা ক্যারিয়ারই শেষ করে দিচ্ছে। তবুও গায়ে দুই তিনটা জ্যাকেট চড়িয়ে, হাঁটুতে নি-ক্যাপ লাগিয়ে ওরা কাজে নেমে যাচ্ছে নির্ভিকভাবে- এই ডেডিকেশনগুলো তো ফেলনা নয়। শুধু পারিশ্রমিক বা সিনেমার বক্স অফিস কালেকশন দিয়ে এগুলোকে আপনি মাপতে পারবেন না।

আমার টিমে এমন একজন আছেন, যিনি ১৯৭৩ থেকে সিনেমায় স্ট্যান্টম্যানের কাজ করছেন। ভুলত্রুটি তো মানুষেরই হয়, তারও হয়েছিল। গাড়িতে আগুন লেগে গিয়েছিল, ভেতরে ছিলেন তিনি। শরীরের চামড়াগুলো পুড়ে কয়লার মতো কালো হয়ে গিয়েছিল। প্রায় পাঁচ ছয় বছর কোন কাজই করতে পারতেন না তিনি, হাত দিয়ে একটা গ্লাসও ধরতে পারতেন না পানি খাওয়ার জন্যে, গাড়িটাড়ি চালানো তো অনেক দূরের কথা। পরিবারের মানুষগুলো ছাড়া তার জন্যে কাঁদার বাড়তি কেউ ছিল না।

পরে তিনি আমার টিমে যোগ দিয়েছেন, তার মুখেই শুনেছি ঘটনাটা। হান্ড্রেড পার্সেন্ট নিঁখুত হয়ে গেলে তো আমরাই খোদা হয়ে যাবো। কিন্ত আমরা মানুষ, ছোটবড় ত্রুটি আমাদের থাকবেই, তাই ভয়ও থাকে। আর সেজন্যেই সর্বোচ্চটুকু দিয়ে চেষ্টা করতে হয়, আমাদের টিমের প্রতিটা মানুষ যাতে নিরাপদ থাকে। একটা দৃশ্য তিনবার চারবার পাঁচবার রিশ্যুট করতে কোন আপত্তি নেই আমার, আমি শুধু চাই গাড়ি থেকে আমার লোকটা যেন হাসিমুখে থাম্বস আপ দেখিয়ে বেরিয়ে আসতে পারেন। তবুও দশমিকের ভগ্নাংশে হলেও রিস্ক থাকে, আর সেটাই আমাদের কাজের উত্তেজনা বাড়িয়ে দেয় বহুগুণে।

রোহিত শেঠি, গাড়ি ওড়ানো, বলিউডিউ অ্যাকশন, স্ট্যান্টম্যান

আমারও ভুল হয়, এটা তো বইয়ে পড়া কোন কাজ নয় যে লাইন বাই লাইন ফলো করে আমরা নিঁখুতভাবে কাজ করতে পারবো। ডিরেক্টর থেকে শুরু করে স্ক্রীনপ্লে, মিউজিক থেকে নিয়ে কোরিয়াওগ্রাফার- সবাইকে নিয়েই কত কথা হয়। কিন্ত অ্যাকশনের পেছনে থাকা মানুষগুলোর কথা যেন সবাই ভুলে যান। অথচ একটা সিনেমার পেছনে এরা রক্ত ঢেলে কাজ করেন! স্ট্যান্টম্যানের জীবনে ইনজুরি জিনিসটা খুবই স্বাভাবিক, ডালভাতের মতো হয়ে গেছে। সকালে যখন ওরা ঘর থেকে বেরিয়ে কাজে আসে, ওদের পরিবার তো দূরের কথা, ওরা নিজেরাও জানে না রাতে বাড়ি ফেরার সময় শরীরটা আস্ত থাকবে কিনা।

সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পরেও, প্রতিটা অ্যাকশন দৃশ্যের শুটিং মানেই কমপক্ষে কয়েকফোঁটা রক্তের প্রবাহ। সিনেমা হলে আপনারা যখন নায়ককে ভিলেনের মাথায় কাঁচের বোতল ভাংতে দেখে শীষ বাজিয়ে ওঠেন, সেই দৃশ্যটার শুটিং করার সময়েই আমার বুক কাঁপতে থাকে। ভুলে না একটা কাঁচের টুকরা মানুষটার শরীরে ঢুকে যায়, টাইমিঙের গড়বড় হলে হিরো’র হাতটা না স্ট্যান্টম্যানের মাথার নরম কোন জায়গায় আঘাত করে ফেলে! এসব সুক্ষ্মাতিসুক্ষ্ম হিসাব মাথায় রেখে কাজ করতে হয় আমাদেরকে, পুরোটা সময়ই অদ্ভুত একটা সুতোর ওপর দুলতে থাকে এই মানুষগুলোর জীবন।

ব্যপারটা প্রশংসার নয়, ব্যপারটা আসলে সম্মানের। আপনি প্রশংসা করলেন, দুইদিন পরে ব্লাডি স্ট্যান্টম্যান বলে গালি দিলেন, তাহলে লাভটা কি হলো? এখানে, এই কাজগুলো যারা করে, অ্যাকশনের সাথে ওদের ইমোশন জুড়ে আছে, ওরা ভালোবাসে এই কাজটাকে, এই মার খাওয়া কিংবা প্রাণটা হাতে নিয়ে গাড়িগুলো বাতাসে ভাসানোকে। ওরা অ্যাকশন ব্যপারটাকে সম্মান করে, নিজেদের দুঃসাহস আর সামর্থ্যের সবটুকু ঢেলে দিয়ে কাজ করে। ওরা আমার ওপর বিশ্বাস রেখে কাজ করে, ওদের কাজের ওপর আমি পুরোপুরি ভরসা করতে পারি অন্ধের মতো। আর তাতেই আমাদের টিমটা জমে উঠেছে।

আমার কাজ আপনার ভালো না লাগতে পারে, আমি যে ভিশনটা মনে ধারণ করি, সেটা আপনি না’ও করতে পারেন, বা আমি যে কাজগুলো করি সেগুলো আপনার পছন্দ না হতে পারে, কোন সমস্যা নেই। কিন্ত আমার ঝালটা আপনি ওদের ডেডিকেশনের ওপরে ঝাড়তে পারেন না, না জেনে না শুনে শুধু গাড়ি কেন মাটি থেকে ওপরে, সেটা নিয়ে হাসিঠাট্টা করা মানায় না একদমই। একটা কাজের পেছনে কি পরিমাণ শ্রম আর কষ্ট লেগে আছে, সেটা ফেলনা কিছু নয় মোটেও।

তথ্যসূত্র- রোহিত শেঠির সাক্ষাৎকার।

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close