রোহিত শেঠি, ভারতের ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যবসাসফল পরিচালকদের একজন। তাঁর ছবি মানেই বক্স অফিসে সুপার ডুপার হিট। আয়ের দিক থেকে ১০০ কোটি ছাড়ানো তাঁর জন্য যেন ডাল-ভাত। আর যেই ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক সিরিজটির মাধ্যমে তিনি প্রথম সফলতার চূড়ায় আহরণ করেন, সেটি হলো ‘গোলমাল’। এর আগে এই সিরিজের তিন কিস্তি মুক্তি পেয়েছে। এবং এই মুহূর্তে তিনি প্রস্তুতি নিচ্ছেন সিরিজের চতুর্থ কিস্তি ‘গোলমাল এগেইন’ মুক্তি দেয়ার। আগামী ২০ অক্টোবর মুক্তি পাবে ছবিটি, যেটিকে দাবি করা হচ্ছে একটি হরর কমেডি হিসেবে।

একজন পরিচালক হিসেবে রোহিত সাধারণ দর্শকের কাছে যতটা নন্দিত, সমালোচক মহলে ঠিক ততটাই নিন্দিত। তাঁর ছবি মুক্তি পেলেই যেন সমালোচকদের মধ্যে সাজ সাজ রব পড়ে যায়, কে কার চেয়ে বেশি ভুল ধরবেন! তবে রোহিত কিন্তু এসবে থোড়াই কেয়ার করেন। ইতিপূর্বেও তিনি বেশ কয়েকবার বলেছেন, তাঁর ছবি বানানোর প্রধানতম উদ্দেশ্য হলো সাধারণ দর্শককে বিনোদন দেয়া, এবং সমালোচকরা তাঁর ব্যাপারে কি বলল না বলল তা নিয়ে তিনি বিন্দুমাত্র মাথা ঘামান না।

সম্প্রতি inuth নামের একটি ভারতীয় ওয়েবসাইটে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন রোহিত, যেখানে তিনি কথা বলেছেন কমেডি ছবি বানানোর চ্যালেঞ্জ, বলিউডে দুই নায়কের ছবির স্বল্পতা, সালমান খানের সাথে ছবি করার সম্ভাবনা সহ আরও অনেক বিষয়েই। এগিয়ে চলোর পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো সেই সাক্ষাৎকারের চুম্বক অংশ।

* আরও একটা ‘গোলমাল’ নিয়ে আসতে এত দেরি করে ফেললেন যে?
– ‘গোলমাল ৩’ করার সময় থেকেই আমাদের মাথায় আইডিয়াটা ছিল, কিন্তু আমরা যেমনটা চাচ্ছিলাম, সেই লেভেলে আইডিয়াটা কাজ করছিল না। আমাদের মাথায় একটা প্রাথমিক ধারণা ছিল ঠিকই, কিন্তু ততদিনে আমরা ‘সিংহাম’, ‘বোল বচ্চন’, ‘চেন্নাই এক্সপ্রেস’ আর অন্যান্য ছবি বানাতে শুরু করে দিয়েছি। যখন ‘সিংহাম রিটার্নস’ বানাচ্ছিলাম, তখন আমরা অনুভব করি যে আরও একবার ‘গোলমাল’ করাটা জরুরি হয়ে পড়েছে। তাই আমরা এটি নিয়ে ফের কাজ করতে আরম্ভ করি, এবং সব কাজ গুছিয়ে আনতে আমাদের দুই থেকে তিন বছর সময় লেগেছে। আমাদের মধ্যে সবসময়ই এই চিন্তা ছিল যে ‘গোলমাল’ এর চতুর্থ কিস্তি হবে একটি হরর কমেডি।

* হরর কমেডি লেখার ক্ষেত্রে কোন জিনিসটি আপনাকে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রাণিত করেছে?
– আমার মুখ, আমার চেহারা। আমি যখন আয়নার দিকে তাকাই, আমি একটি হরর কমেডি বানাবার প্রয়োজনীয়তাটা অনুভব করি (হাসি)। অনেকদিন হয়ে গেছে বলিউডে খুব বড় পরিসরে, নামি দামি অভিনেতাদের নিয়ে কোন হরর কমেডি হয়েছে। কিন্তু দক্ষিণে সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কিছু ব্যবসাসফল হরর কমেডি হয়েছে। কিন্তু আমাদের এখানে এই জনরাতা এখনও নতুন, এবং আমার মনে হয় এটা কাজ করবে। যদি আপনি এই ছবিটার প্রোমো দেখে থাকেন, আমরা যে ইতিবাচক সাড়া পেয়েছি তার অধিকাংশই কিন্তু হরর উপাদানগুলোর কারণেই।

* একই ঘরানার ছবি চতুর্থবারের মত বানানোর অভিজ্ঞতা কেমন?
– লেখার দিক থেকে বলতে গেলে আমাদের জন্য এটিই ছিল ‘গোলমাল’ সিরিজের সবচেয়ে কঠিন ছবি। যেমনটা আমি বললাম একটু আগেই, এটি লিখতে আমাদের দুই থেকে তিন বছর সময় লেগেছে। আমি চেয়েছি এটিকে আগের চেয়েও বড় ও ব্যাপক করে তুলতে, কারণ আমি চাইনি দর্শক যেন এটির সাথে ‘গোলমাল ৩’ এর কোন মিল খুঁজে পায়, যেটি আজ থেকে সাত বছর আগে মুক্তি পেয়েছিল। আমরা যদি শুধু টাইটেল আর চরিত্রগুলোর উপরই নির্ভর করে থাকতাম, তাহলে দর্শকদের সাথে সুবিচার করা হতো না। তাই স্ক্রিপ্ট তৈরী ছাড়াও ছবির টেকনিক্যাল দিকগুলোকেও আমরা আগের চাইতে উন্নত করার চেষ্টা করেছি।

* ভারতীয় সিনেমা বড় বড় মাল্টি-স্টারার (একসাথে অনেক বড় তারকাকে নিয়ে নির্মিত ছনি) এর জন্য সুপরিচিত। কিন্তু আজকাল সেরকম ছবি নিয়মিত তৈরী হয় না কেন?
– আমি জানি না তারকারা কেন একসাথে কাজ করছেন না। মাল্টি-স্টারার হওয়ার দরকার আছে, কারণ এরকম ছবি ব্যবসায়িক দিক থেকে নিরাপদ হয়। দর্শকরা চায় দুইজন নায়ককে এক সাথে কাজ করতে, এবং এটি অবশ্যই তাদের মাঝে বাড়তি সাড়া ফেলে। অজয় দেবগন, অক্ষয় কুমার, সুনীল শেঠীরা অসংখ্য ‘টু-হিরো’ ফিল্ম করেছেন। তাই আমার মনে হয় তরুণ অভিনেতাদেরও উচিৎ এমন ছবিতে কাজ করা। দিন শেষে ছবিটি কেমন সেটিই আসল, কিন্তু তারপরও ‘টু-হিরো’ ফিল্ম অবশ্যই অনেক বেশি দর্শককে আকৃষ্ট করে।

* আপনার কি মনে হয় যে ভারতীয় সিনেমা কী সে বিষয়ে তরুণ অভিনেতাদের মধ্যে কোন ভুল ধারণা আছে?
– আমি বরুণ (ধাওয়ান)-এর সাথে কাজ করেছি, তার সাথে অনেক মিশেছি, কথা বলেছি। সে এমন একজন অভিনেতা যে আমাদের সিনেমাটাকে বোঝে। আবার সে তার কাজকে ব্যালান্সও করছে ‘জুদা’র মত ছবি করে। সে ছাড়াও আরেকজনের কথা বলতে হয়, রনবীর (সিং)। আমি খুব শীঘ্রই তার সাথে কাজ করব। আমি এই দুইটি ছেলেকে ব্যক্তিগতভাবে চিনি, এবং তাদের মধ্যে ছবি সম্পর্কে সচেতনতার বিষয়টি আছে। বরুণ, রনবীর, এবং সেই সাথা অর্জুনও (কাপুর), এরা সঠিক পথে আছে। তারা জানে তাদের কখন কোন ঘরানার ছবি করা উচিৎ।

* আপনার সালমান খানের সাথে একটি ছবি করা উচিৎ…
– আপনি ১০,০০০তম ব্যক্তি যিনি আমাকে এই কথাটি বললেন যে আমাদের উচিৎ সালমান খানকে নিয়ে ছবি করা। সবাই বলে আমার আর সালমানের মধ্যে একটা দুর্দান্ত, ভয়ংকর কম্বিনেশন হবে। কিন্তু আমি এখনও সঠিক স্ক্রিপ্টের অপেক্ষায় আছি। যেদিন আমার হাতে একটি ভালো স্ক্রিপ্ট আসবে, আমি অবশ্যই তার সাথে কাজ করব।

* কিন্তু আপনার কি কখনও সিংহাম আর দাবাংকে একসাথে করে ছবি করার চিন্তা মাথায় আসেনি?
– হ্যাঁ, এটি আমার মাথায় আছে। কিন্তু সেটি ঠিক কেমন তা আমি আপনাকে বলব না। একদিন এরকম কিছু করার ইচ্ছা আছে, এবং এটি হওয়া উচিৎ একটি ‘ক্রস ব্র্যান্ড’ ফিল্ম। দক্ষিণে যেটি হচ্ছে, একসময় আমাদের এখানেও তা হবে। কিন্তু এখনও আমার হাতে কোন স্ক্রিপ্ট প্রস্তুত নেই। তাই আমি আপনাকে বলতে পারছি না কবে এটি হবে। .

* ‘রাম লক্ষ্মণ ২.০’ এর কি খবর?
– আমরা একটি খসড়া তৈরী করেছি। কিন্তু আমি এটির জন্য খুব বড় দুইজন নায়ককে চাচ্ছিলাম, যেটি এখন সম্ভব না। তাই আপাতত সে চিন্তা থেকে আমি সরে এসেছি। কিন্তু একদিন আমি অবশ্যই এই ছবিটি বানাব।

* আপনি ভারতের সবচেয়ে ব্যবসাসফল পরিচালকদের একজন। এটি কি আপনার উপর কোন বাড়তি চাপ যোগ করে?
– হ্যাঁ, চাপ তো আছেই। কিন্তু কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে আপনাকে চাপ জয় করতে হবে। আমি চাপে আছি যে ‘গোলমাল এগেইন’ দর্শকের কাছ থেকে কেমন প্রতিক্রিয়া পাবে। কিন্তু ছবিটির কনটেন্ট নিয়ে আমি কোন চাপেই নেই। আমি এই ছবিটির পেছনে অনেক খেটেছি। আমার কাজে অনেক সততা ছিল। এখন বাকিটা বিবেচনার দায়িত্ব দর্শকদের।

* ‘গোলমাল ৫’ হওয়ার কি কোন সম্ভাবনা আছে?
– নির্ভর করছে শুক্রবারের উপর। যদি দর্শক ‘গোলমাল এগেইন’ পছন্দ করে, তাহলে অবশ্যই পরের পর্বও নির্মিত হবে। আমার মনে হয় ছবিটি বেশ ভালো একটা ফাঁকা সময়ে মুক্তি পাচ্ছে, এবং পরিচালক হিসেবে আমি এজন্য খুশি। দর্শক যে ছবিটি উপভোগ করবে, এ ব্যাপারে আমি আত্মবিশ্বাসী। আমি মনে করি বাচ্চারা হলো আমার সবচেয়ে বড় দর্শক শ্রেণী, এবং তাদেরকে আমি কখনোই হতাশ করতে চাই না।

* ‘জুদা ২’ এর সাফল্য কি কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস বয়ে এনেছে? কারণ এর আগের কিছু ছবির ক্ষেত্রে তো সাফল্য ঠিক ব্যাটে বলে মিলছিল না।
– আমরা (অজয় এবং আমি) চেয়েছিলাম যাতে ‘জুদা ২’ ভালো করে, কারণ এটি আমাদের জন্য কেবল একটি শুরু। ‘জুদা’ ছিল গোটা ব্যাপারটা নতুন প্রেক্ষাপটে শুরু করার সূচনা। আপনি যদি চান আপনার ছবি একটা বাজে সময়েও ভালো করে, তবে আপনি অবশ্যই চাইবেন তার আগে যেন অন্য একটি ছবিও ভালো করে, যাতে দর্শকরা ফের হলমুখী হতে শুরু করে। ‘জুদা’ আমাদের জন্য সেই রাস্তাটা তৈরী করে দিয়েছে। আমি সত্যিই অনেক খুশি যে এটি ভালো করেছে।

* আপনার ছবি প্রায় সবসময়ই বক্স অফিসে ভালো করে। তারপরও মিডিয়ায় একটি শ্রেণী আছে যারা আপনার ছবির কট্টর সমালোচক, আপনার ছবি নিয়ে মজা করে। এ ব্যাপারে আপনার কি বলার আছে?
– আমি হলাম সেই বাবা যে দিনশেষে ঘরে টাকা নিয়ে আসে, কিন্তু তারপরও পরিবারে তার কোন কদর নেই। আমি মনে করি যেদিন আমাদের ইন্ডাস্ট্রির দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আসবে, সেদিন বাকি সব কিছুই পাল্টে যাবে। সেদিন লোকে আর এমনটি বলবে না যে, ‘আরে, পয়সা কামিয়েছে তো কী হয়েছে?’, কারণ বিষয়টি আসলে টাকা পয়সার না। বিষয়টি হলো, কতজন মানুষ আপনার ছবিটি দেখল।

* এমন নির্দিষ্ট কোন অভিনেতা আছেন যার সাথে আপনি কাজ করতে চান?
– একজন ব্যক্তির সাথে আমি কাজ করতে চাই। তিনি মিস্টার বচ্চন। যেদিন আমার হাতে একটি সঠিক স্ক্রিপ্ট আসবে, দেখবেন আমি কী করি। আমি সেই সঠিক স্ক্রিপ্টের অপেক্ষায় আছি।

(সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন Himesh Mankad, কৃতজ্ঞতা তার কাছে সাক্ষাৎকারটি অনুবাদ করার অনুমতি দেওয়ার জন্য।) 

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-