সাম্প্রতিক সময়ে যতগুলো ইস্যুর মুখোমুখি আমরা হয়েছি, রোহিঙ্গা ইস্যুর মতো এত কনফিউজিং ইস্যু আর কোনটাই ছিলো না। টিভিতে খবরে ছোটছোট বাচ্চার লাশ পানিতে ভেসে আসতে দেখে বুক ভেংগে যায়। বর্ডারে অসংখ্য হতদরিদ্র মানুষের চোখেমুখে আতংক নিয়ে অপেক্ষা করতে দেখে মাথায় প্রশ্ন আসে- আমার জন্ম যদি রোহিংগা হয়ে হতো, কী করতাম আমি এখন? কী অপরাধে তাদের সাথে এই মানবিক বিপর্যয়?

আবার পরের দৃশ্যেই পাহাড় কেটে কেটে ছোট ছোট খুপড়ি বানাতে দেখে অস্বস্তি লাগে। পত্রিকায় শত শত একর বনাঞ্চল কেটে সেখানে তারা বস্তি স্থাপন করছে- রিপোর্ট পড়ে খটকা লাগে। ১৯৯১-৯২ সালে যে ৫ লক্ষ রোহিঙ্গা এদেশে এসেছিলো। তাদের বর্তমান কর্মকাণ্ড ও বাংলাদেশী পাসপোর্ট নিয়ে বিদেশে গিয়ে সংঘটিত কুকর্মের হদিস পড়ে মনে কুডাক দেয়। আর ফেসবুকে রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে জ্ঞান অর্জন করতে চাওয়াটা বিপদজনক। এখানে নানা মতের নানা মানুষ নিজেদের এংগেল থেকে মতামত দিচ্ছে।

এক পক্ষ আছে- তারা ডিরেক্ট এদের গুলি করে মেরে ফেলতে চায়- অবিশ্বাস্য হলেও সত্য। Its simple- we kill them all.- এরকম মানসিকতারও লোকজন আছে। তাদের লিখায় রোহিঙ্গারা এদেশে এসে কি কি সমস্যা করে শুধু তারই বর্ণনা। তাদের সাথে অত্যাচারের কোন বর্ণনা পাওয়া যায় না, এই অসহায় মানুষদের জন্য কোন সহানুভূতিও নাই।

আরেক পক্ষ- এরা সংখ্যায় বেশি- পারলে পুরো রোহিঙ্গা জাতিকে একরাতে বর্ডারের এই পাশে নিয়ে আসে। তারপর মায়ানমারের সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করে। এবং এদের মধ্যে আরো উগ্রপন্থী আছে- তারা এদেশের বৌদ্ধদের দেখা মাত্র ফেলে দেওয়ার ডাক দেয়- কারণ তাদের রোহিঙ্গা মুসলিম ভাইদের উপর নাকি বৌদ্ধরা মুসলিম হবার কারণে অত্যাচার করছে!

অথেন্টিক তথ্য পেতে তাই পত্র-পত্রিকা, উইকিপিডিয়া ঘাঁটা শুরু করতে হলো। পুরো রোহিঙ্গা ইস্যুতে খুব চমৎকার একটা বিস্তারিত লিখা পাওয়া গেলো কারেন্ট এফেয়ার্সের রাজিশাহী বিভাগীয় প্রধাণ এস এম আতিকের একটা আর্টিকেলে। সেটা “সংক্ষিপ্ত সম্পাদকীয়” নামক একটা ম্যাগাজিনে ছাপা হয়েছে। সেটা পড়ে যা বুঝা গেলো-

১. রোহিঙ্গারা রাখাইন রাজ্যের প্রাচীন আদিবাসী না। ৭৮০-৮১০ সালের ভিতর বিভিন্ন আরব দেশ থেকে মুসলিমরা এখানে এসে বসবাস শুরু করে। নানা জাতির সাথে সংমিশ্রনেই রোহিঙ্গা জাতির উদ্ভব।

২. ১৭৮৪ সাল পর্যন্ত আরাকান ছিলো স্বাধীন। এরপর বার্মার রাজা বোডপায়া আরাকান দখল করে নেয় ও মায়ানমারের অংশ করে ফেলে।

৩. ১৯২৪ সালে বার্মা বৃটিশ শাসনের অধীনে চলে যায়। তখন বার্মার ১৩৯টি জাতি গোষ্ঠীর তালিকা করা হলেও তাতে স্থান হয়নি রোহিঙ্গাদের। সেটাই মূলত রোহিঙ্গাদের দুঃসময়ের সূচনা। বার্মায় আরো মুসলিম জাতি আছে। রোহিঙ্গাদের বাদ পরার ইস্যু তাহলে ধর্মীয় বলা যাচ্ছে না। আর রোহিংগা জাতিদের মধ্যে হিন্দুও আছে (wiki)।

৪. ১৯৩৯-৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মান বাহিনীর আগ্রাসনে প্রায় ২২হাজার রোহিঙ্গা পালিয়ে চট্টগ্রামে চলে আসে।

এতটুকু পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের কোন দোষ পাওয়া যায় না। কিন্তু ১৯৪৭ সালে ভারত পাকিস্তান সৃষ্টির সময় তারা বিরাট এক ভুল করে বসে। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জিন্নাহের সাথে একাধিক বৈঠক করে পাকিস্তানের সাথে থাকার ইচ্ছা ব্যক্ত করে। আর শুরু হয় রোহিংগাদের কপাল পোড়া। তাদের এই কাজটা আরাকানের অন্য জাতিগোষ্ঠিরা মেনে নিতে পারে নি। তাদের কপালে “বেঈমান” তকমা লেগে যায়। এদিকে জিন্নাহ শেষমেশ অস্বীকৃতি জানায়। তখন তারা নিজেরাই রোহিঙ্গা মুসলিম পার্টি গঠন করে আরাকান স্বাধীন করার জন্য সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করে। আর তারা একদম ব্ল্যাকলিস্টেড হয়ে যায় বার্মার সরকারের কাছে।

১৯৭৮ সালে অনেক রোহিঙ্গারা আশ্রয় নেয় বাংলাদেশে

১৯৬২ সালে সামরিক সরকার বার্মায় ক্ষমতা পেলে রোহিঙ্গাদের উপর অত্যাচার বেড়ে যায়। ১৯৭৮ আর ১৯৯২ সালে দুইবার তাদের উপর সামরিক অভিযান চালানো হলে মেজর জিয়া ও পরে খালেদা জিয়ার সরকার দুইবারই রোহিঙ্গাদের এদেশে আশ্রয় দেয়। সংখ্যাটা প্রায় ৫ লাখ- তারা আর ফিরে যায় নি। এদেশেই রয়ে গেছে। সাম্প্রতিক সময়ে ২০১২ সালে এক রাখাইন মেয়েকে তিনজন রোহিঙ্গা মিলে ধর্ষণ করে হত্যা করেছে- এই অভিযোগে আড়াই হাজার বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। ৯০ হাজার রোহিঙ্গা এদেশে উদ্বাস্তু হয়। আর ২০১৬ সালের ৯ অক্টোবর রোহিঙ্গা সশস্ত্র দল একটা সেনা ক্যাম্পে আক্রমণ করে ৯ জন সেনাকে মেরে ফেললে আবার শুরু হয় নির্যাতন। এবার প্রায় এক লাখ রোহিংগা এদেশে চলে আসে, যেটার স্রোত এখনও চলছে।

১৯৯২ সালে বাংলাদেশে রোহিঙ্গারা

এখানে খুবই ইম্পর্ট্যান্ট একটা পয়েন্ট- ১৯৮২ সালে মায়ানমার সরকার নতুন নাগরিকত্ব আইন করলে তাতে রাখাইন প্রদেশেরই কামান নামক মুসলিমরা নাগরিকত্ব পেলেও রোহিঙ্গারা পায় নি। কারণ সেই একটাই- তাদের বিশ্বাসঘাতক মনে করে মায়ানমার অথরিটি।

মোটামুটি তাহলে ক্লিয়ার হয়ে গেলো- রোহিঙ্গা ইস্যুটা মুসলিম বৌদ্ধ লড়াই না। বার্মার অধিবাসী হয়েও পাকিস্তানের সাথে হাত মেলাতে চাওয়াটাই তাদের কপালে শনি হয়ে এসেছে। রাখাইন প্রদেশের অন্য সব জাতি তাদের বিশ্বাসঘাতক জাতি হিসেবে দেখে। তাই তারা শিক্ষা, চাকুরি সব কিছুতেই বঞ্চিত, কিছুদিন পরপরই চলে তাদের উপর নির্যাতনের ছুতায় মায়ানমার থেকে তাড়িয়ে বাংলাদেশে পাঠানো। গত কয়েকদিনে তারা যেন ফেরত না যেতে পারে তাই মায়ানমার বর্ডারে ফিল্ড মাইন পুঁতছে সেনাবাহিনী!

এবার আসি আন্তর্জাতিক চাপের ব্যাপারে- পরিষ্কারভাবেই বুঝা যাচ্ছে- ভারত, চীন, আমেরিকা- সবাই নিজ নিজ স্বার্থে মায়ানমারের পক্ষেই থাকবে। কারো গ্যাস তেলের লোভ, কারো নতুন বিনিয়োগের সুরক্ষা। জাতিসংঘ আর মুসলিম বিশ্ব মাঝে মাঝে বাণী দিয়েই খালাস, কার্যকর কোন চাপ মায়ানমারকে কেউ দিচ্ছেই না। আর সবচেয়ে হাসি পায় তুরস্কের হম্বিতম্বি দেখে- কুর্দি ও আর্মানিয়ান গণহত্যার মতো মতো বড় বড় মানবতাবিরোধী ঘটনায় যাদের হাত রঞ্জিত, তারা যখন গণহত্যার বিরুদ্ধে ফাঁকা বুলি ছাড়ে, তার মতো কৌতুকময় কিছু হতে পারে না।

দিনশেষে মনে হচ্ছে মায়ানমারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে। অংসাং সুচি নির্লজ্জের মত যথারীতি রোহিঙ্গাদের উপর কোন নির্যাতনের ঘটনাই স্বীকার করছে না। তারা জিতে যাচ্ছে, বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী আন্তর্জাতিক মহল জিতে যাচ্ছে, কে জানে, রোহিঙ্গাদের অস্ত্র দিয়ে, ট্রেনিং দিয়ে যারা নিজের গভীর সুদুরপ্রসারী প্ল্যান বাস্তবায়ন করতে চাচ্ছে, তারাও জিতে যাচ্ছে। হেরে যাচ্ছে শুধু মানবতা আর অলরেডি নিজেদের নানা অভ্যন্তরীণ সমস্যায় জর্জরিত বাংলাদেশ। কি গভীর ষড়যন্ত্র হচ্ছে তাকে নিয়ে কে জানে?

রাখাইন রাজ্যের আর বাকি জাতিগোষ্ঠির মতামতের তোয়াক্কা না করে স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্র গঠনের উচ্চাভিলাষ এখন লক্ষ লক্ষ নিরাপরাধ মানুষকে ঘর ছাড়া করছে। অল্প কয়েকজন গিয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামের নামে গিয়ে একটা অঘটন ঘটায়, আর তার ভুক্তভোগী হয় বাকি রোহিঙ্গারা। বাংলাদেশ সরকারকে এখন কঠোর হতেই হবে। রোহিঙ্গারা সোনার খনির সন্ধানে স্রোতের মতো এদেশে ঢুকছে- এটা আখেরে ভালো ফল আনবে না। তারা অশিক্ষিত, অদক্ষ। অপরাধে তাদের জড়িয়ে ফেলানোটা খুব সহজ। অস্থিতিশীল অবস্থা তৈরীতে তাদের ব্যবহার করা যাবে খুব সহজেই।

আর তাদের স্বাধীনতা সংগ্রামেও সাহায্য করেও খুব একটা লাভ হবে বলে মনে হয় না। রাখাইন রাজ্যে আরো অনেক জাতিগোষ্ঠী আছে। তারা এই সংগ্রামে সাপোর্ট দিবে না। মাঝে দিয়ে পুরো রোহিঙ্গা জাতিটাই উদ্বাস্তু হবে। আর তাদের সাহায্য করতে গিয়ে মায়ানমারের সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে গেলে সেটা আমাদের দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি, শান্তি সবকিছুর উপরই আঘাত করবে।

আর এদেশের অতিআবেগী ভাইদের বলছি- রোহিঙ্গাদের ধর্মবিশ্বাস আজ মুসলিম না হলে আপনাদের এই মানবিকতা কই থাকতো তা জানা আছে। নাসিরনগরে ফোটোশপ করে মিথ্যা অভিযোগে যখন কয়েকশ সংখ্যালঘু পরিবারকে উদ্বাস্তু করা হয় তখন আপনাদের কোন রা শুনা যায় নি। আজ রোহিঙ্গারা মুসলিম না হলে তাদের বর্ডার পেরোতে না দিতে আপনারাই আওয়াজ তুলতেন সব যুক্তি দিয়ে। সিলেক্টিভ মানবিকতার পারাকাষ্ঠা যাকে বলে! রোহিঙ্গাদের জন্য মানবিক হতে গিয়ে “মুসলিম” পরিচয়টা ব্যবহার করে বরং গ্রহণযোগ্যতা হারাচ্ছেন যেখানে তারা নিজেরাই দাবী করছে এটা ধর্ম যুদ্ধ নয়, জাতীগত সংঘাত! যে হিন্দু রোহিঙ্গারা উদ্বাস্তু হচ্ছে তাদের জন্য মানবতা নেই? তাহলে তাদের মুসলিম হিসেবে পরিচয় দেওয়াটার যৌক্তিকতা কি?

আর যারা এদেশের বৌদ্ধদের উপর হামলা চালাতে জিহাদি জোস তুলেন- বৌদ্ধ ধর্মে জীব হত্যা মহাপাপ। কাজেই, সারা দুনিয়ায় আল্লাহু আকবর বলে জংগি হামলা চালানো মুসলিম নামধারীরা যেমন সহিহ মুসলিম না তেমনই রোহিঙ্গা দের উপর অত্যাচার চালানো বৌদ্ধরাও সহিহ বৌদ্ধ না। যুক্তি তো তাই বলে, না? আমাদের দেশের মুসলিম, বৌদ্ধ, হিন্দু, খ্রিস্টান সবাই আমাদের মানুষ, আমাদের ভাই। অন্য দেশে কে কি করলো সেই ধোয়া তুলে এদেশের মানুষের উপর কোন হামলা চালানোর উস্কানি দিলে তাকে সহিহ জংগি বলা ছাড়া উপায় নেই। দেশে একটা সাম্প্রদায়িক দাংগা লাগানোর উপায় খুঁজছে যেন এরা! আর এদেশের বৌদ্ধদের যারা মায়ানমারে পাঠিয়ে দিয়ে সেই জায়গায় রোহিঙ্গাদের রাখার প্রস্তাব দেন- সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সকল বাংলাদেশি মুসলমান, ইন্ডিয়ার ২০ কোটি মুসলমানের অর্ধেক যদি এরকম কোন ছুতায় এদেশে পাঠিয়ে দেয় তখন মেনে নিবেন তো? বাস্তবে ফিরে আসুন, সমস্যাটা অনেক জটিল।

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-