রাজীব হাসান

আন্দোলন শেষ হয়। যে যার ঘরে ফিরে যায়। কিন্তু কেউ কেউ ঘোর থেকে মুক্তি পায় না। যেমন পায়নি আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধুটা। তছনছ হয়ে গেছে, শুধু সে নিজে তো নয়, তার পরিবারও!

১৪ বছর আগে। মাত্রই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছি। কী সৌভাগ্য, সহপাঠী হিসেবে পেয়েছি শৈশবের সবচেয়ে কাছের বন্ধুকেও। কত স্বপ্ন, রোমাঞ্চ! কিন্তু সেদিন ৩ মার্চ, এলোমেলো হয়ে গেল সব। ক্যাম্পাস সেদিন উত্তাল। হুমায়ূন আজাদ স্যারের ওপর হামলা নিয়ে প্রতিদিনই আন্দোলন চলছিল। কিন্তু সেদিন আন্দোলন একেবারে তুঙ্গে।

উন্মত্ত পশুর মতো আক্রমণ হলো বিক্ষোভকারী ছাত্রদের ওপর। আমার বন্ধু রকেটকে ঘিরে ধরল দশ-বারোজন পুলিশ। হাতের মোটা লাঠি দিয়ে পেটাতে লাগল অমানুষের মতো। চলল বুটের লাথি। 

রকেটের গাল বেয়ে রক্ত নামছে। দরদর করে। কান বেয়ে নামছে রক্ত। কী আশ্চর্য, রকেট কাঁদছে না। বাঁচাও বাঁচাও বলে চিৎকার করছে না। শুধু অবাক শূন্য চোখে তাকিয়ে আছে। যেন ভাবছে, কেন মারছে আমাকে? আমি তো কেবল স্লোগানে কণ্ঠ মিলিয়েছিলাম। বলেছিলাম, বিচার চাই, বিচার চাই। আর কিছু তো করিনি। বিচার চাওয়া কি অপরাধ?

আমাদের বন্ধুদের মধ্যে সবচেয়ে প্রতিভাবান ছিল রকেট। ক্লাস ফাইভে বৃত্তি পেয়েছিল। এসএসসিতে একটুর জন্য স্ট্যান্ড করেনি। এইচএসসিতেও দুর্দান্ত রেজাল্ট। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

খুব ভালো লিখত।অসাধারণ মঞ্চ নাটক করত। জাতীয় পর্যায়ে স্বর্ণপদক পেয়েছিল উপস্থিত বক্তৃতা, সাধারণ জ্ঞানে। বিতর্কে ছিল চ্যাম্পিয়ন।

নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের সব আশা, সব স্বপ্ন তাকে ঘিরে। তার বাবা, আমাকেও যিনি রকেটের চেয়ে কম স্নেহ কোনো দিন করেননি; পৌর বাজারে সামান্য একটা সাইকেল গ্যারেজ চালাতেন। ক্লাস সিক্সে বা সেভেনে পড়ার সময় রকেট এমন অনেক কিছু জানত, পড়ত; আমরা পড়িনি। জানিনি। তবে আমরা জানতাম, আমাদের বন্ধুদের মধ্যে রকেট সবচেয়ে ভালো জায়গায় যাবে। সবচেয়ে প্রতিষ্ঠিত হবে। 

শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ হেলমেট

এর কিছুই হয়নি। রকেট আর ঢাকাতেই থাকল না। চলে গেল রংপুরে! আমরা বন্ধুরা শত চেষ্টাতেও ঢাকায় ফেরাতে পারলাম না তাকে। ওকেই দোষ দিলাম। কেন ঠিকমতো ক্লাস করে না, পরীক্ষা দেয় না। কেন থাকে না ঢাকায়। কেন পড়ে থাকে রংপুরে!

অনেক বছর পেরিয়ে এসে বুঝেছি, মাত্রই পরিবার ছেড়ে ঢাকায় আসা, গায়ে কৈশোরের গন্ধ মেখে থাকা সদ্য তরুণকে বেদম মার মেরে পুলিশ নামের দানবের দল তার মনোজগৎ চুরমার করে ফেলেছিল। রকেটের শরীরের ক্ষত শুকিয়েছে, মনের ক্ষত আজও শুকায়নি। শুকাবে না হয়তো কোনো দিনই।

সেদিন থেকে নিজেকেই অপরাধী লাগে। একই আন্দোলনে আমিও তো ছিলাম। স্লোগান দিয়েছি পাশাপাশি। আমার বন্ধু রকেট, দুজনের শার্ট আর স্বপ্ন বহুবার অদলবদল করা দুটি অভিন্ন সত্তার আমরা দুই মানুষ, কী করে দুই রকমের জীবন যাপন করছি! আলোর বিস্ফোরণ ঘটিয়ে মহাকাশ ফুঁড়ে ছুটে চলার কথা ছিল তার। আজ রকেট অচেনা আঁধারে।

অথচ বাংলাদেশের এ প্রজন্মের সবচেয়ে বড় লেখক হতে পারত। কিংবা আরও অনেক কিছু, অন্য কিছু। অপরাধী লাগে, রকেটের পাশে আরও বেশি করে না দাঁড়িয়ে আমরা তাকে পরিহাস করেছি। অথচ এই জীবন রকেটের প্রাপ্য ছিল না।

রকেটের বাবা মারা গেলেন এই সেদিন। আমি জানতাম, বড় ছেলেকে নিয়ে কত স্বপ্ন ছিল তার। কী এক হাহাকার নিয়ে মারা গেলেন ঠিক রকেটের মতো দেখতে ছোটখাটো মানুষটা! ছেলেটা কত কিছু হতে পারত..এই দীর্ঘশ্বাস হয়তো শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সঙ্গে ছিল তার। 

রকেট এখন কেমন আছে আমি জানি না। দোষ আমারই। রকেটের সঙ্গে আমার কথা হয় না। শুধু ওর ছোট ভাইয়ের সঙ্গে মাঝে মধ্যে কথা হয়। তবে আমি কেমন আছি, এটা নিয়ে সুনীল অনেক আগেই লিখে গেছে- 

আমি কীরকম ভাবে বেঁচে আছি তুই এসে দেখে যা নিখিলেশ
এই কী মানুষজন্ম? নাকি শেষ…

রকেট, বন্ধু আমার, আমাদের কখনো ক্ষমা করিস না। আমরা তার যোগ্য না। 

ছবি কৃতজ্ঞতা- প্রথম আলো।

Comments
Spread the love