মনের অন্দরমহলরিডিং রুম

আমি কি এই শিক্ষাই দিয়েছিলাম!

আমি একবার রোবট বিশ্ববিদ্যালয়ের টিচার হলাম। অনেক রোবট একসাথে ক্লাস করে। সুন্দরী ছাত্রী রোবটরাও শিখতে আসে। তাদেরই শেখার আগ্রহ বেশি। এটেন্ডেন্সের ব্যবস্থা আছে। তারা নিয়মিত ক্লাস করতে আসে। কেন আসে জানি না। ছাত্রী রোবটের সাথে ভাবসাব করার জন্য নাকি এটেন্ডেন্সের কারণে কে জানে!

রোবট বিশ্ববিদ্যালয়ের দিনগুলো সুখেই কাটছিল আমার। বাংলাদেশে স্কুল, কলেজের টিচারদের খুব বেশি সম্মান না থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হলে সম্মানের সাথে বিবিধ সুযোগ সুবিধা পাওয়া যায়। সবচেয়ে বড় কথা রোবট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হলে শিক্ষার কল্যাণে বাইরে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকচার দেয়ার ডাক আসে। সেখানে অনেক টাকা পয়শা দেয়া হয়। কিন্তু টাকা উপার্জন তো আর আমার মূল লক্ষ্য নয়। দেশের শিক্ষার প্রসার বাড়ানোই মূল লক্ষ্য। রোবটের মতো রোবট বানানোই আমার উদ্দেশ্য। 

রোবট বিশ্ববিদ্যালয়ে যেহেতু আমার পার্মানেন্ট চাকরি, তাই এখানে তো চাকরি চলে যাওয়ার ভয় নেই। জবাবদিহি করতে হয় না, কেন করতে হবে! ক্লাস যে নেই এটাই তো বেশি, না নিলে কি হতো! রোবট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা প্রায় ফ্রি। এখানে রোবটদের তেমন খরচ করতে হয় না পড়ালেখার জন্য। কিন্তু, বাইরে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে লাখ লাখ টাকা খরচ করে অনেকে রোবট হওয়ার শিক্ষা নিতে আসে। সেখানে আমার যখন ডাক আসে তখন আমি উপেক্ষা করতে পারি না। খেপ মারতে চলে যাই।

আমার আবার ছোটকাল থেকে খেপ খেলার অভ্যাস। কলেজে থাকতে আমাকে ডেকে নিয়ে যেত ফুটবল ম্যাচ হলে, খেপ খেলার জন্য আমি খেলতাম অফসাইড পজিশনে। টাকা পয়শার গন্ধ আমার ভালো লাগে। যদিও সেটা মুখ্য উদ্দেশ্য না। যাই হোক, শিক্ষক হওয়ার পর আবার খেপ খেলার সুযোগ এসেছে। বাইরে অনেক জায়গা থেকেই রোবট পড়ানোর জন্য ডাক আসে। আমি তাদের পড়াই। মোটামুটি সব রোবটই সেম। গাধা গরু টাইপের রোবট। কিছু পারে না। এসাইনমেন্ট দিলে উইকিপিডিয়া থেকে কপি করে জমা দেয়। 

রোবটদের টিচার হওয়ার সুবিধা হলো, বেশি প্যারা নিতে হয়না। একটা বই খুলে অনুবাদ করে পড়িয়ে গেলেই হয়। সেদিন দেখলাম আমার ক্লাসে একটা রোবট চোখ বন্ধ করে আছে। নিজের প্রতি এতো গর্ব হলো, বলার মতো না। আমার অনুবাদ এতোটাই ভালো যে, শুনতে শুনতে তারা চোখ বন্ধ করে কল্পনার জগতে চলে যায়। রাতে বউয়ের সাথে এই গল্প করতেই বউ বললো, আমি যা ভাবছি সেটা সত্য না, রোবটরা নাকি আমার অনুবাদে বিরক্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে।

বউ মানুষের কথা, লাখ কথার এক কথা। এরপর থেকে ক্লাসে বই পড়ানোই বাদ দিলাম। শুরু করলাম তাং ফাং গল্প। রোবটরা প্রথম প্রথম গল্পের সাথে তাল মিলায়, হাসে, কাঁশে, পরের দিকে ঝিমাতে থাকে। আমার তো গর্বের সীমা নাই। আমার গল্পের পিনিক লেভেল কোন পর্যায়ের যে রোবটরা হাসতে হাসতে ঘুমিয়ে যায়! ভাবতেসি যাদের অনিদ্রা রোগ আছে তাদের জন্য ক্লাস নিবো। আমি পড়াবো, পড়া শুনতে শুনতে তারা ঘুমাবে। ওয়াও! এই আইডিয়া ভাবতে পেরেই খুশি খুশি লাগছে। আমার মাথা থেকে কিভাবে যে এসব ভাবনা আসে! 

অনেকে আমার কাছে বিভিন্ন সুপারিশ নিয়ে আসে। একদিন এক রোবটের মা আসলো আমার কাছে। বললো, আমার মেয়েটাকে আপনার হাতে তুইল্যা দিলাম। আপনি ওরে রোবটের মতো রোবট বানায় দেন। আমি নিরলসভাবে রোবট বানানোর পেশায় নিজেকে উজাড় করে দিচ্ছি। প্রতি সপ্তাহে ছয়টা এসাইনমেন্ট ধরিয়ে দেই। তাও দেখি তারা রোবট হয় না। এরপর ১০ চ্যাপটার পড়িয়ে একদিন ধুম করে এক্সামের ডেট দিয়ে দেই। এবার যাবি কই বাপু? রোবট তোমারে হতেই হবে। 

সেদিন পঞ্চম সেমিস্টারের কিছু পরীক্ষার খাতা দেখছিলাম। খাতা দেখার মতো মজার কাজ আর নেই। কারণ, নিজে একটা বিশেষ স্টাইলে খাতা দেখি। যে খাতার ওজন বেশি সেই খাতায় নম্বর বাড়িয়ে দেই। ওজন বেশি মানে লুজ শিট বেশি, লুজ শিট বেশি মানে অনেক বেশি লিখা খাতার ভিতরে। আমার রোবট ছাত্রদের মধ্যে দুই একটা স্বর্ণেএ টুকরা রোবট ছাত্র আছে। তারা এক পৃষ্ঠায় পাঁচ ছয় লাইন করে লিখে। ফলে তাদের অনেক লুজ শিট লাগে। মেধাবী আর কাকে বলে! আমার জন্যেও এসব খাতা দেখা সুবিধা। ওজন মেপে নাম্বার দেই। ভিতরে কি লেখা আছে এত কিছু পড়ার সময় কোথায়!

দুইটা রোবট ইদানিং ক্লাসে আমার যেকোনো কথায় একমত হয়। তারা ফেসবুকে আমার পোস্টে কমেন্ট করে আমি নাকি তাদের অনুপ্রেরণা। আমার খুব ভালো লাগে। এরাই বড় হয়ে বিশাল মাপের রোবট হবে। এদের মধ্যে তেলবাজি নেই। তারা শিক্ষককে সম্মান দিতে জানে। আমিও এদের একটু বাড়িয়ে নাম্বার দেই। যাতে তারা ভবিষ্যতে ভাল রেজাল্ট করে আমার মতো রোবট টিচার হতে পারে। মেধাবীদের সাহায্য করতে পারলে আমার ভালই লাগে।

যাই হোক, সেদিন ৪ বছর পর একদিন রাস্তায় দেখলাম এক পুরানো স্টুডেন্টকে। জিজ্ঞেস করলাম, রোবটের ডিগ্রী নিয়া কি হইছো? রোবট বললো, “স্যার মানুষ হইছি।” শুনে ধাক্কা খেলাম। আমার ছাত্র মানুষ হইছে মানে? আমি কি এই শিক্ষাই দিয়েছিলাম! কিভাবে মানুষ হইছো? বললো, “স্যার আমি এখন শুধু ঘুরি খাই এবং মজা করি। ফাঁকে ফাঁকে ছবি তুলি। একজন আলোকচিত্রী বলতে পারেন। এই কাজটাই আমি ভালো পারতাম। অথচ, আমাকে বাবা মা বানাইতে চাইলো আদর্শ রোবট। আমার বন্ধুদের অনেকেই বড় বড় পর্যায়ে রোবট হিসেবে সুনাম কুড়াচ্ছে। আমি ভুল করে মানুষ হয়ে গিয়েছি।

কথাগুলো শুনে কিছুটা অপমানিত বোধ করছি। সারাজীবন কষ্ট করে রোবট বানানোর ব্রত পালন করলাম। এদের বাপ মাও টাকা খরচ কইরা রোবট বানাইতে পাঠায় আর এরা কিনা মানুষ হইতে চায়। আদিখ্যেতার শেষ নাই! এদের শখগুলোরে মাডি চাপা দিয়া দেয়া দরকার। নাহ, এদের ভালমতো ঘুম পাড়াতে হবে যেন রোবট হওয়া ছাড়া অন্য কিছু ভাবতে না পারে। খাড়া শালার পুত, এমন লেকচার রেডি করতেছি, না ঘুমাইয়া যাবি কই! ফাঁকিবাজগুলা সব!

আরও পড়ুন-

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close