শহরে নতুন একটা রেস্টুরেন্ট হয়েছে। এটাকে দেশের প্রথম রোবট রেস্টুরেন্ট বলা হচ্ছে। মানুষের বদলে রোবট খাবার পরিবেশন করবে। বিষয়টা খারাপ না। এই খবর পড়ে আমি খুবই খুশি। খোদ আমেরিকাতে ৭০% চাকুরিজীবি হুমকির মুখে আছেন। সবকিছু অটোমেশনে চলে যাবে। মানুষের কাজ রোবট করবে। একটা বড় অংশ চাকরি হারাবে ২০৩৫ সালের মধ্যেই!

যেদিকে তাকাই আজকাল দেখি মানুষ খুব মূল্যবান কিছু করছে না। তারা সেই কাজটাই কষ্ট করে করছে যা কিছুদিন পর রোবট করবে। মানুষ নতুন কিছু শিখছে না। কিন্তু, পড়ালেখা এবং চাকরির বাজারে ম্যাসিভ চেঞ্জ আসবে। সেটা অবধারিত। দিন এমন আসবে যে, রেজিস্টার ভবনের অফিসার টাইপের আরামের চাকরি বলে কিছু থাকবে না পৃথিবীতে। অটোমেশনে চলে গেলে অটোমেটিক ওসব খটোমটো পাবলিক চাকরি হারাবেন। এটাই নিয়তি হতে যাচ্ছে। 

আমাদের এখানে উদ্যোক্তা শব্দটা অনেকটা অকর্মণ্য বুঝাতে ব্যবহার করা হয়। যেমন: কেউ একজন জিজ্ঞেস করলো, ভাই আপনি কি করেন? জবাব আসলো, “আমি একজন উদ্যোক্তা।” সেই লোক তখন রিপ্লাই দিয়েছিলো, “আরেহ ভাই উদ্যোক্তা তো বুঝলাম,কিন্তু কোনো চাকরি বাকরি করেন না? সংসার চলে কিভাবে?”

কিন্তু ভবিষ্যৎ পৃথিবী সাহসীদের হবে। এখন যারা বিভিন্ন ক্ষেত্রে নতুন আইডিয়া নিয়ে কাজ করছেন নতুন উদ্যোগে, ১০ থেকে ১৫ বছর পর রোবট অটোমেশন যখন আরো জনপ্রিয় হবে তখন এই মানুষগুলোর টিকে থাকার সম্ভাবনাই বেশি থাকবে। বিশেষ করে টেকনোলোজি খাতে যারা দক্ষতা অর্জন করছেন,বিনিয়োগ করছেন সামনে তাদের সুসময় এটা বলা বাহুল্য। আপনি এখন এই লেখাটি পড়ছেন অনলাইনে। একটা সময় কাগজের পত্রিকা একেবারেই উঠে যাবে। এখন টেলিভিশন দেখার চেয়ে মানুষ ইউটিউব বেশি দেখছে। মানুষকে এখন কর্মক্ষেত্রেও যেতে হয় না। ফ্রিল্যান্সিং করে ঘরে বসেই মানুষ অর্থ উপার্জন করছে। পড়ালেখা এখন ইন্টারনেটে।

অথচ, আমাদের কোনো প্রস্তুতি নেই ভবিষ্যৎ নিয়ে। এই যে তিন চার রুম ভাড়া নিয়ে স্কুল হচ্ছে হাজার হাজার, এক ফ্লোর দুই ফ্লোর ভাড়া নিয়ে হাজার হাজার কলেজ আর প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে এদের দ্বারা কি শিক্ষা ব্যবস্থা আদৌ লাভবান হচ্ছে? ঢাকা শহরের এমন অবস্থা, একটা বাস এক্সিডেন্ট করলে ৬০ জনের মধ্যে ৫০ জনই থাকবে বিবিএ স্টুডেন্ট। “এত বিবিএ লইয়া আমরা কি করিবো” টাইপের অবস্থা!

কোনো লাইব্রেরির মধ্যে যান। বেশি দূরে না, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এর সেন্ট্রাল লাইব্রেরিতে গেলেই দেখতে পাবেন। শত শত মানুষ বিসিএস এর প্রস্তুতি নিচ্ছে। কোথাও বসে আপনি যে একটা গল্পের বই পড়বেন, কোনো গবেষণামূলক বই বা প্রবন্ধ পড়বেন সে উপায় নেই। পুরা লাইব্রেরি চাকরির প্রস্তুতির জায়গা হয়ে গেছে।

যে জিনিসটা গুগলসার্চ করলে এক মিনিটে বের করা যায়, বাংলাদেশে সেগুলোই মুখস্থ করতে হয় বছরের পর বছর। তারপর যা পায় মানুষ বিনিময়ে সেটাকে নাকি আদর করে ক্যারিয়ার বলা হয়। এগুলার দিনও শেষ হবে। এতো বিবিএ’র তো দরকার নেই। এতো শর্ট সার্টিফিকেট কোর্স, সান্ধ্যকালীন কোর্সেরও দরকার নেই। বাস্তবমুখী শিক্ষা চালু করা প্রয়োজন। 

উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্য যদি চাকরি হয় তাহলে উচ্চশিক্ষা সবার জন্য দরকার নেই। যারা নতুন কিছু তৈরি করতে চায়, যারা শিখতে ও শেখাতে চায় তারা বাদে বাকিদের উচ্চশিক্ষার দরকার নেই। এমনিতেও বেকার তো কম না দেশে, তার উপর অটোমেশন যুগে এমন কত বিবিএ ডিগ্রিধারী ভাবওয়ালা লোকজন বেকার বসে থাকবে শুধু কারিগরি জ্ঞ্যান না থাকার কারণে! সেটার প্রস্তুতি নিয়ে রাখা ভালো।

শুধু চেহারা দেখিয়ে চাকরি পাওয়ার দিন ফুরিয়ে যাচ্ছে। শুধু পায়ের উপর পা কেচকি মাইরা বইসা বিশাল হনু তনু সেজে থাকার দিন ও ফুরাবে। খুব অল্প সংখ্যক মানুষের সেই যোগ্যতা থাকবে। বাকিরা স্ট্রাগল করবে এবং সেটাই স্বাভাবিক।

যে রোবট রেস্টুরেন্ট চালু হয়েছে এটা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একটা উল্লেখযোগ্য ঘটনা।

ভবিষ্যত পৃথিবীর জন্য আমাদের কারোই তেমন প্রস্তুতি নেই। অথচ, রোবট কিংবা অটোমেশনের কারণে বিশাল পরিমাণ কর্মসংস্থান বিলুপ্ত হয়ে যাবে সেটা খুব বেশি দূরে না। এম্পিথ্রি আর উইকিপিডিয়া থেকে এসাইনমেন্ট কপি পেস্টের বাইরেও যে বিশাল পৃথিবী, সেটা ফেস করার মতো লোকের বড় অভাব। এজন্যেই পৃথিবীর মোট সম্পদের অর্ধেক অংশ মাত্র এক শতাংশ মানুষের দখলে। বাকিরা হাম তাম করে আর “মানি ক্যান নট বাই হ্যাপিনেস” উক্তি ঝাড়ে…  

Comments
Spread the love