দুয়ারে বিশ্বকাপ। এবারের বিশ্বকাপে আলো ছড়াতে পারেন এমন ১০ জন তারকাকে নিয়ে আমাদের নতুন ধারাবাহিক। প্রথম পর্বে থাকছে পোল্যান্ডের রবার্ট লেভানডস্কিকে নিয়ে বিশেষ রচনা—

বেশিরভাগ ফুটবলারের জীবন দারিদ্র আর বঞ্চনার গল্প। এই গল্পটি তেমন নয়। সোনার চামচ মুখে নিয়েই জন্মেছেন বলা যায়। বাবা ছিলেন দেশসেরা জুডো খেলোয়াড়, মা পেশাদার ভলিবল খেলোয়াড়। মার পথ ধরে মেয়েও খেলেছেন ভলিবল। এই পরিবারের ছেলে খেলোয়াড় হবেন, ধরেই নেয়া যায়। তা তিনি হয়েছেন, পরে বিয়েও করেছেন এক কারাতে চ্যাম্পিয়নকে। পুরোদস্তুর ক্রীড়া পরিবার যাকে বলে আর কি। যেনতেন খেলোয়াড় যে হয়েছেন তাও নয়, বরং তর্কসাপেক্ষে দেশের ইতিহাসের সেরা ফুটবলার তিনি। রাশিয়া বিশ্বকাপেও দেশের ৪ কোটি মানুষ স্বপ্ন দেখছেন তাকে ঘিরেই। পোলিশ অধিনায়ক রবার্ট লেভানডস্কির কথা বলছিলাম।

বিখ্যাত পরিবারে জন্ম বলেই হেসেখেলে আজকের অবস্থানে পৌঁছেছেন বললে ভুল হবে। মেসি নেইমারের মত স্কিলফুল ছিলেন না যে প্রথম দর্শনেই সবার চোখ ছানাবড়া হয়ে যাবে। বরং ক্যারিয়ারের শুরুতে অধিকাংশ কোচ তাকে পাত্তাই দিতে চাননি। বিখ্যাত পোলিশ ক্লাব লেক পোজনানের কোচ ট্রায়ালে তাকে দেখে অবজ্ঞাভরে ”এই গাছকে কেন দলে নেব” বলে একরকম তাড়িয়েই দিয়েছেন।

লেভাও হার মানার পাত্র নন। পোলিশ তৃতীয় বিভাগ থেকে শুরু করেছেন, এরপর জার্সি বদলেছে, গোলের সামনে লেভা আরও ভয়ংকর হয়েছেন। তৃতীয় বিভাগ আর দ্বিতীয় বিভাগে সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছেন। যেই লেক পোজনান থেকে হতাশ হয়ে ফিরেছিলেন, পরে সেখানে খেলেই টানা দুই মৌসুম গোলের পর গোল করেছেন, ২০০৯-১০ মৌসুমে পোলিশ লীগের সর্বোচ্চ গোলদাতাও ছিলেন। তারপরেও ভাগ্য বদলায় নি। স্প্যানিশ দল গিহন থেকে প্রস্তাব পেয়েও পরে প্রত্যাখ্যাত হন। ইংলিশ ক্লাব ব্ল্যাকবার্ন রোভার্স তাকে প্রায় সই করিয়েই ফেলেছিল, কিন্তু আগ্নেয়গিরির ধোঁয়ায় ইংল্যান্ডগামী ফ্লাইট বাতিল হয়ে গেলে যাওয়া হয়নি সেখানে। এমনও ভাগ্য হয়! 

লেভানডফস্কি, পোল্যান্ড, বায়ার্ন মিউনিখ, বিশ্বকাপ ফুটবল

কিন্তু যিনি জিততে এসেছেন, তাকে বেঁধে রাখে সাধ্য কার। মাত্র সাড়ে ৪ মিলিয়নে পাড়ি জমালেন জার্মান ক্লাব বরুশিয়া ডর্টমুণ্ডে। এখানেও শুরুতে বেঞ্চে বসেই কাটিয়েছেন। এই সময় ভাগ্য অবশেষে মুখ তুলে তাকালো। দলের মেইন ফরোয়ার্ড লুকাস ব্যারিয়স আহত হলেন, একাদশে সুযোগ মিললো মৌসুমের শেষাবধি। লেভাও মুঠোভরে এই সুযোগ কাজে লাগালেন। লীগে ২২ গোল করে দলকে লীগ জেতালেন, নিজে হলেন তৃতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতা।

এরপর লীগে টানা ১২ ম্যাচ গোল করেছেন, বছরের সেরা পোলিশ ক্রীড়াবিদ হয়েছেন। কিন্তু তারপরেও লেভা ঠিক তারকা হয়ে ওঠেননি। ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল। ডর্টমুণ্ড চ্যাম্পিয়নস লীগের সেমিতে খেলতে নেমেছে রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে। লেভানদস্কি গুনে গুনে চার গোল দিলেন রিয়ালের জালে। চ্যাম্পিয়নস লীগের সেমিফাইনালে যা আগে পরে কখনো ঘটেনি। এই ম্যাচটা লেভার ক্যারিয়ারের টার্নিং পয়েন্ট। এরপর আর কখনও পেছনে ফিরে তাকাননি রবার্ট লেভানডস্কি। 

লেভানডফস্কি, পোল্যান্ড, বায়ার্ন মিউনিখ, বিশ্বকাপ ফুটবল

কালক্রমে বায়ার্নে গিয়ে পড়লেন মাস্টার ট্যাক্টিশিয়ান পেপ গার্দিওলার হাতে। দুর্দান্ত পোচার তো তিনি ছিলেনই, বায়ার্নে যোগ দিয়ে ট্যাকটিক্যালিও হয়ে উঠলেন দুর্দান্ত। এই চার বছরে লেভানডস্কি ঠিক কি কি করেছেন, সেটা দিয়ে আলাদা একটা লেখাই লিখে ফেলা যায়। কিছু কিছু রীতিমত বিস্ময়কর। উলফসবার্গের বিপক্ষে দল পিছিয়ে ছিল ১ গোলে। সাব হিসেবে নেমে ৯ মিনিটে করলেন ৫ গোল! একইসাথে দ্রুততম হ্যাট্রিক ও ডাবল হ্যাট্রিকের রেকর্ডও হল। অবিশ্বাস্য বললেও কম বলা হবে। এই মৌসুমে লীগ সর্বোচ্চ ২৯ গোল করেছেন। দ্বিতীয়জন করেছেন মাত্র অর্ধেক (১৫ গোল)। 

পোল্যান্ডের হয়েও জাল খুঁজে পেতে সমস্যা হয়নি কখনই। দেশের হয়ে ৫০ গোল করেছেন, লেভা এখন দেশের সর্বোচ্চ গোলদাতা। এবারের বিশ্বকাপ কোয়ালিফায়ারে রেকর্ড ১৬ গোল করেছেন, এমনকি সেরা ফর্মের ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোও এখানে তাঁর পেছনে। বিশ্বকাপেও গোল করাতে তিনিই মূল ভরসা পোল্যান্ডের।

লেভানডফস্কি, পোল্যান্ড, বায়ার্ন মিউনিখ, বিশ্বকাপ ফুটবল

একজন নাম্বার নাইনের যা দরকার, সবকিছুই তাঁর আছে। কিছু জন্মগত, কিছু পরিশ্রম করে পাওয়া। শারীরিকভাবে যথেষ্ট শক্তিশালী হওয়ায় বল ধরে রেখে টিমমেটদের জন্য স্পেস ক্রিয়েট করতে পারেন, উচ্চতা ভালো বলে হেডিং বিশ্বমানের, দুপায়েও সমান স্বচ্ছন্দ। পাশাপাশি পজিশনিং ও মুভমেন্ট নিখুঁত, তাই গোলের সুযোগও পান অনেক বেশি। তাঁর ওয়ার্ক রেটও দুর্দান্ত, দলের প্রয়োজনে অনেক নিচে নেমে খেলেন, ডিফেন্সেও সাধ্যমত অবদান রাখেন। সব মিলিয়ে লেভানদস্কি নিঃসন্দেহে বর্তমান সময়ের অন্যতম সেরা ফরোয়ার্ড।              

পোল্যান্ডের নামগুলো সাধারণত একটু বিদঘুটে ধরণের হয়, ইংরেজিতে যাকে বলে “টাংটুইস্টার”। বাবা ছেলের নাম রেখেছিলেন “রবার্ট”, যাতে মানুষ সহজে বলতে পারে। বাবা তো জানতেন না, মানুষ ভালবেসে লেভানডস্কি নামটাই বেছে নেবে। ফুটবলকে এভাবে পোষ মানাতে পারলে নামে কি বা এসে যায়।

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-