অনুপ্রেরণার গল্পগুচ্ছতারুণ্য

এভাবে যদি সবাই ভাবতে পারত…

শীর্ষেন্দুর পার্থিব উপন্যাসে একটি চরিত্র ছিল, রশ্মি রায়। সে বিলেত থেকে পড়াশুনা করে দেশে ফিরেছে, ফিরে একটা অজপাড়াগাঁয়ের স্কুলে চাকরি নিয়েছে। এটা অনুপ্রেরণার গল্প হবার কথা ছিল, অথচ হেমাঙ্গ নামে আরেকটি চরিত্র সেই স্কুলে অডিট করতে গিয়ে দেখে এই অল্পবয়সী তরুণীকে, খুশী হবার বদলে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে, বিলেত থেকে ফিরে কেউ এমন কাজ করে না। রশ্মি কেন করছে? রশ্মি তার ক্ষুদ্র জীবনে অসংখ্যবার এই প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছে। ভারতবর্ষে মানুষের সাইকোলজি মেনেই নিতে পারে না, কেউ বিলেতে যাবে এবং ফিরে এসে অজপাড়াগাঁয়ে মাস্টারি করবে কিংবা অন্য কোনো কাজ করবে। এটাকে ধরে নেয়া হয় প্রতিভার অপচয় হিসেবে।

উপন্যাসের কথা থাকুক বইয়ের পাতাতেই। বাস্তবতা বলি। আমাদের পারিপার্শ্বিক অবস্থা কি খুব বেশি বদলেছে আসলে? আমরাও কেন যেন মানসিকভাবে অপ্রস্তুত হয়ে যাই, যখন দেখি খুব প্রতিভাবান মানুষ দেশের কোনো কোনায় বসে কিছু একটা করছে। আমরা ভেবেই নেই, এটা প্রতিভার অপচয়। বরং, কেউ বাইরের কোনো জায়ান্ট কোম্পানির চাকুরি পেয়েছে সেটাই আমাদের কাছে বড় সংবাদ, যেন প্রতিভার যোগ্য মূল্যায়ন হয়েছে। আমরাই তখন ওসব খবর শেয়ার করে বলি, এদেশে প্রতিভার মূল্যায়ন হয় না, এই দেশে প্রতিভা বিকাশের সুযোগ নেই ইত্যাদ ইত্যাদি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাস্তবিকভাবেই এমন ঘটনা ঘটলেও আসলে আমরা মানসিকভাবে হীনমন্যতায় ভুগি আজকাল, আমাদের কাজের জন্য অন্যদের এপ্রোভাল খুঁজতে হয়। আমরা সহজ রাস্তাটা বেছে নিতে যাই, যে পথ মাড়ালে সাফল্য ধরা দেবে নিশ্চিতভাবে। লোকে গুণগান গাইবে, কদর করবে।

অনুপ্রেরণার গল্প, আইনে পড়ে কৃষি কাজ, গরুর খামার, রাহাত খান,
রাহাত খান

তবে কেউ কেউ থাকেন, যারা এসব গুণের কদর পাওয়ার অপেক্ষায় থাকেন না। সাফল্যকে মানুষের প্রচলিত মানদণ্ডে মেপে নিজের ইচ্ছা, ভাল লাগাকে মেরে ফেলেন না। অন্তর থেকে তাড়না অনুভব করেন যে কাজটার জন্যে, সেটাই করার জন্য লড়ে যান। তেমনি একজন অসম্ভব সুন্দর মনের মানুষের গল্প এটা। মানুষটার নাম রাহাত খান

ভারতের দার্জিলিং থেকে ও লেভেল করার পর দেশে আসেন। এ লেভেল শেষ করে আবার চলে যান যুক্তরাজ্যে। নিউক্যাসেল শহরের নর্থ অ্যাম্ব্রিয়া ইউনিভার্সিটি থেকে আইন নিয়ে পড়াশুনা করেন। তাকে জিজ্ঞেস করলাম, যারা বাইরে যায় আজকাল সবাই সেসব উন্নত দেশ, উন্নত জীবনে অভ্যস্থ হয়ে যেতে চায়। দেশে ফিরতে চায় না। রাহাত খান বললেন, তার সবসময়ই ইচ্ছে ছিল দেশে ফিরে আসবেন। তার স্বপ্নপূরণের কাজটা বাংলাদেশেই বসে করবেন।

কি স্বপ্ন তার? কৃষিকাজ। হ্যাঁ, তিনি কৃষক হতে চান। যে কৃষক কাদামাটিতে লুঙ্গি, গামছা পড়ে কাজ করছে বলে লোকে তুচ্ছ করে তিনি বিলেত ফেরত তরুণ সেই এগ্রিকালচার সেক্টর নিয়েই কাজ করতে চান! তিনি দেখতে পান কৃষকরাই আমাদের জীবনজুড়ে প্রত্যক্ষ পরোক্ষভাবে অবদান রেখে চলেছে। কল্পনা করে দেখুন, তো যদি সব কৃষক আজ থেকে কাজ বন্ধ করে দেয়, তাহলে কি হবে? কৃষকরা সেটা করবেন না হয়ত কখনো। কারণ, এটাই তাদের কাজ, তাদের জীবন। কিন্তু, এই জীবনগুলোকে কতটা গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে? কতটা দেয়া হচ্ছে তাদের শ্রমের মর্যাদা? কৃষকদের অবদানকে ‘ট্যাকেন ফর গ্রান্টেড’ হিসেবেই যেন ধরে নেয়া হচ্ছে। অথচ, কৃষকদের যদি প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেয়া যায়, এখানে যদি টেকনোলজির ব্যবহার আনা যায়, উন্নত শিক্ষাকে কাজে লাগিয়ে কৃষি কাজকে এগিয়ে নেয়া যায় তাহলে দেশ কতটা দ্রুত এগিয়ে যাবে কল্পনাও করা সম্ভব না।

অনুপ্রেরণার গল্প, আইনে পড়ে কৃষি কাজ, গরুর খামার, রাহাত খান,
নিজের গড়া ‘আর কে এগ্রো’তে রাহাত খান।

রাহাত খানের পুরো নাম রাহাতুল খান। বাড়ি বগুড়ায়। সবাই ভেবেছিল আইনের ছাত্র দেশে এসে কোর্ট কাচারির মামলা নিয়ে পড়ে থাকবে। ইংল্যান্ড ফেরত একটা ছেলের কাছে সমাজ যা আশা করে রাহাতের কাছেও সবার তেমনই প্রত্যাশা। তবে, রাহাতুল খানের মনে হয়েছে তিনি যদি এগ্রিকালচারাল সেক্টরে কাজ করার সু্যোগ পান, তিনি আরো বেশি মজা নিয়ে কাজটা করবেন, কারণ, এই কাজটাকে মন থেকেই ভালবাসেন তিনি।

বাংলাদেশের তরুণরা যখন বাইরে গিয়ে পড়েন তখন তারাই দুনিয়ার সবরকম কাজ করেন। যে ছেলে দেশে নিজে ভাতের প্লেটটাও পরিষ্কার করে না, সে বিদেশে গিয়ে কখনো কখনো সেই কাজটাকেই পেশা হিসেবে নেয়। কারণ, তারা তখন বুঝতে পারে কোনো কাজই ছোট নয়। রাহাত খান বলেন, বাংলাদেশে তরুণরা বাইরে অনেক কষ্ট পরিশ্রম করার যে মানসিক দৃঢ়তা দেখান, দেশে এরকম না। দেশে আজকাল দেখা যাচ্ছে সবাই চাকুরির পেছনে ছুটছেন। কিন্তু, তার কি কখনো ভেবে দেখেছেন সারাজীবন যে বিদ্যা শিখেছেন তা কেন তারা অন্যের প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করছেন? এই মেধাটুকু দেয়ার জন্য তারা দিনের পর দিন বেকার বসে থাকতেও পারেন। নিজের স্বপ্নের কাজটাকেও বিশর্জন দেন শুধু সমাজের চোখে ভাল নিজেকে ভাল প্রমাণ করার জন্য। এই মানসিকতা পালটানো জরুরি৷

সত্যি বলতে রাহাত খানও যে বিলেত থেকে ফিরে একদম সহজে নিজের ভাল লাগার কাজে নেমে যেতে পেরেছেন এমন নয়৷ বাবা মা আশা করেছিল, ছেলে আইন পেশায় যোগ দিবে। কিন্তু, তিনি শুরু করলেন মাছের খামার, গরুর খামার। বাবা মাকে বোঝালেন, কিছুটা সময় দিতে। এই এগ্রিকালচার নিয়ে কাজ করার অনেক কিছু আছে।

অনুপ্রেরণার গল্প, আইনে পড়ে কৃষি কাজ, গরুর খামার, রাহাত খান,
রাহাত খানের আর কে এগ্রো।

দেড় লাখ টাকায় দুইটা বাছুর কিনে শুরু হয় রাহাত খানের গরুর খামার। এর আগে মাছের খামার দিয়ে শুরু করেছিলেন। বর্তমানে খামারে ৪৮টি বিদেশী জাতের গরু আছে। সর্বশেষ কোরবানির ঈদে শুধু খামারের গরু বিক্রি করেই লাভ হয়েছে প্রায় দেড় কোটি টাকা!

অথচ, ২০১৪ সালে যখন দেশে ফেরেন তখনও ভাবা যায়নি এই ভালো লাগার প্রিয় কাজটা একদিন করতে পারবেন। পারিবারিক ব্যবসা আছে বাবার। সেখানে কিছুদিন সময় দিতে হয়েছে। কিন্তু, তার মনে পড়ে থাকে পুকুরে, মাঠে। ২০১৪ সালে নিজেদের পুকুরেই মাছ শুরু করেন। ইন্টারনেট ঘেঁটে তথ্য নেন, উন্নত পদ্ধতিতে কিভাবে মাছ চাষ করা যায় সেসব তথ্য নিয়ে খামার শুরু করেন। অল্পদিনে বুঝতে পারেন বেশ ভাল ফলাফল পাওয়া যাচ্ছে। অতঃপর খামার থেকেই মাছ বিক্রি শুরু করেন। দেশী মাছের চাহিদা বগুড়ায় এমনিতেই বেশি, তিনি মাছের ছবি অনলাইনে দেন, এবং সেখান থেকে পাইকাররা তাকে খুঁজে পেয়ে মাছ নিয়ে যায়।

গরুর খামার শুরু করেন পরে, তার পেছনের ইতিহাস হলো, তিনি একবার বাজারে মোটা, নাদুস নুদুস এক গরু জবাই দেখলেন। মাংস কিনলেন শখ করে। খাওয়ার পর বুঝলেন, সাধ নেই, চর্বি দিয়ে ভরা। অল্প সময়ে লাভ করার জন্য মোটাতাজাকরণ ঔষধ ব্যবহার করায় এই অবস্থা। তাই ভাবলেন, নিজেই শুরু করবেন গরুর খামার। এখানেও তিনি দেশজ পদ্ধতিতে গরু পালন করলেন এবং গত ঈদে বিক্রি করলেন ৫০ টি গরু, যার বাজারমূল্য এক লাখ থেকে আট লাখ টাকা৷

অনুপ্রেরণার গল্প, আইনে পড়ে কৃষি কাজ, গরুর খামার, রাহাত খান,
রাহাত খানের আর কে এগ্রো।

তিনি যে শুধু নিজেই খামার করছেন, কৃষি বিষয়ে জানছেন তা নয়, গ্রামের তরুণদেরও অনুপ্রাণিত করছেন। রাহাত খানের পথ ধরে এখন অনেকেই উৎসাহিত হচ্ছে, তারাও স্বাবলম্বী হবার জন্য খামার শুরু করেছে। কৃষিকাজকে ভালবাসতে শিখেছে।

রাহাত খান বললেন, কৃষিকাজের সম্ভাবনা অনেক। এই কাজটাকে কেউ যদি ভালবেসে করে তাহলে এখান থেকে পাওয়ার অনেক কিছু আছে। আর সবচেয়ে মূল পয়েন্ট যেটা বলেছেন তিনি, তার মতো দুই একজনকে নিয়ে আলোচনা করলেই আসলে এগ্রিকালচার সেক্টর আগাবে না। আমাদের রুট লেভেলের কৃষকদের সম্মান জানাতে হবে, তাদের কাজের স্বীকৃতি থাকতে হবে, কষ্ট শ্রমের উপযুক্ত দাম দিতে হবে। পুরো বিশ্বেই এখন জমিজমা কমে যাচ্ছে। ফাঁকা জমি পেলেই সেখানে স্থাপনা নির্মাণের ধুম। কারণ, জনসংখ্যা বাড়ছে। জায়গা তো ছাড়তেই হবে। তাই, বৈজ্ঞানিক উপায়ে যদি বর্তমান জমিগুলোকে কাজে লাগানো না যায় তাহলে, শিক্ষিত লোকজন যদি এটার প্রতি অনীহা দেখায়, উন্নত প্রযুক্তি দিয়ে কৃষকদের সাহায্য করা না যায় তাহলে সামনের দিনগুলোতে সবাইকেই স্ট্রাগল করতে হবে। অথচ, কৃষিকাজে বিনিয়োগ করলে, মাটির সাথে প্রেম হলে মাটি কখনো বিশ্বাসঘাতক হয় না। রাহাত খান আশাবাদী মানুষ। তিনি আশা দেখেন, বদলে যাবে কৃষক নিয়ে ধারণা, কৃষকদের সম্মান করার গুরুত্বটা সবাই বুঝবে।

অনুপ্রেরণার গল্প, আইনে পড়ে কৃষি কাজ, গরুর খামার, রাহাত খান,
রাহাত খানের আর কে এগ্রো।

যান্ত্রিক এই সময়ে সবাই ছুটছে অনির্ধারিত এক যাত্রায়, যে যাত্রায় আরো একটু ভাল থাকা, আরো একটু চকচকে জীবনের খোঁজ পাওয়ার চেষ্টা। রাহাত খান এই যান্ত্রিকতার যুগে, শেকড় গেড়েছেন মাটিতে। নিজে যে কাজটা ভালবাসেন সেই কাজেই নেমে পড়লেন। কেউ কেউ অবাক হয়, বিলেত ফেরত তরুণ কৃষি কাজে নামছে, অবাক হবারই কথা। রাহাত খান সেদিনের অপেক্ষায়, যেদিন সবাই অবাক হবে না, স্বাভাবিক হবে। স্বাভাবিক হয়ে সব কাজকে সমান মনে করবে।

আরও পড়ুন-

Comments

Tags

Related Articles