জুলাই, ২০০৯। ১৮ বছর বয়সী হাড্ডিসার এক তরুণের দুচোখ নিঃসৃত জলের ধারা গাল বেয়ে নেমে যাচ্ছিল। জন্মভূমি থেকে শত মাইল পাড়ি দিয়ে আসার পর ছেলেটি জানতে পারল তার ফুটবলার হবার স্বপ্নভঙ্গ হতে চলেছে।

ফ্রান্সের চতুর্থ সারির ক্লাব কুইম্পার। রিয়াদ মাহরেজ সেখানে এক মাস যাবত ট্রায়াল দিচ্ছে। এতদিন পর দলটির কোচ রোনান সালাউন জানালেন মাহরেজকে সাইন করা তাদের পক্ষে সম্ভব না। মাহরেজকে নিতে কোচ যথেষ্ট আগ্রহী, কিন্তু বিপত্তি ঘটল ক্লাবের হর্তাকর্তারা মনে করলেন এরকম চর্মসার এক ছেলের জন্য মাসপ্রতি ৭৫০ ইউরো খরচ করার কোন মানে হয় না। ক্লাবের কর্তা ব্যক্তিদের সাথে আলোচনায় বসে এক প্রকার জোর করেই মাহরেজকে দলে রাখলেন রোনান। মাহরেজ সহ মোট বিশজন প্লেয়ার সে সময় ট্রায়াল দিলেও আর কাউকেই মনে ধরেনি রোনানের। শেষ পর্যন্ত সেপ্টেম্বরে চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয় রিয়াদ মাহরেজ কুইম্পারে থাকছেন।

জুভেন্টাস স্টার পল পগবার ছোট ভাই মাথিয়াস পগবার সাথে এক ফ্ল্যাটে থাকার জায়গা হয় মাহরেজের। কিন্তু কুইম্পারের সন্দেহ তখনও কাটে নি। ফ্রান্সের সপ্তম সারির এক ক্লাবের বি দলে মাহরেজকে কিছুদিনের জন্য লোনে পাঠিয়ে দেয় কুইমপার।

মূলত কুইম্পার ক্লাবের কর্তারা জানত মাহরেজের ফুটবল প্রতিভা বিকশিত হয়েছে বাড়ির ধারের ফুটপাথে। রাস্তার ধারে প্রতিবেশী ছেলেদের সাথে অগণিত সময় বল নিয়ে কারিকুরি করার মাধ্যমে এ পর্যন্ত এসেছে সে। সে চমৎকার ড্রিবলার, দু পায়েই সমান পটু। কিন্তু ফুটবলের ট্যাকটিকাল ব্যাপার মাহরেজ কিছুই জানত না। তার উপর সে সুঠামদেহী না, মাঠে শারীরিক শক্তি প্রদানের কাজটি তাকে দিয়ে হবে না। সুতরাং তার মত এক প্লেয়ারকে সাইন করানো এবং প্রতি মাসে এতগুলা টাকা খরচ করা কুইম্পারের জন্য বেশ ঝুকিপূর্ণ।

যাকে নিয়ে ক্লাবের এত সন্দেহ সেই মাহরেজের এসব নিয়ে বিন্দুমাত্র দুশ্চিন্তা ছিল না। তার বিশ্বাস ছিল ক্লাবে একবার সুযোগ পাওয়া গেলে সবার ধারনাকে সে ভুল প্রমান করতে পারবে। ছোটবেলা থেকে মাহরেজ বয়সে বড় ছেলেদের বিপক্ষে খেলে অভ্যস্ত। দশ বছর বয়সে সে পনের বছরের ছেলেদের বিপক্ষে নিয়মিত খেলত। তার মাঝে আত্মবিশ্বাসের কমতি ছিল না। ক্লাবের এত সন্দেহের পরেও একটি বারের জন্যেও তার মনে হয় নি যে সে ব্যর্থ হবে।

নিজের জাত চেনাতে মাহরেজ ২০০৯-১০ সিজনের দ্বিতীয় হাফকে বেছে নিলেন। কিন্তু পঞ্চম সারিতে অবনমন ঘটল কুইম্পারের। সে সময় লে হার্ভে রিজার্ভ দল কুইম্পারের সাথে চতুর্থ ডিভিশনে খেলত। সিজনে মাহরেজের ১৩ গোল তাদের নজর এড়ায় নি। লে হার্ভের ইয়ুথ সিস্টেমে আকৃষ্ট হলেন তিনি। পিএসজি, মার্সেই’র মত দলের অফার পায়ে ঠেলে লে হার্ভে রিজার্ভ দলে যোগ দিলেন মাহরেজ। শুরু হল আরেক পরীক্ষা। লে হার্ভের মূল দলে জায়গা করে নিতে অপেক্ষা করতে হল আরো আঠার মাস।

রিয়াদ মাহারেজ, লেস্টার সিটি, ইংলিশ প্রিমিয়ার লীগ

আলজেরিয়ান বাবা আর মরোক্কান মায়ের ঘরে ১৯৯১ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি রিয়াদ মাহরেজের জন্ম। প্যারিসের উত্তরে অবস্থিত সারসেলেস শহরটি ১৯৫০ এবং ৬০ এর সময়ে আলজেরিয়া যুদ্ধে আশ্রয় নেয়া অভিবাসীদের অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। ছয় বছর বয়স থেকে বাবার সাথে পাশ্ববর্তী মাঠে ফুটবল খেলতে যেত মাহরেজ। বাবা আহমেদ মাহরেজ আলজেরিয়া এবং ফ্রান্সের অপেশাদার কয়েকটি ক্লাবে খেলেছিলেন। ছোট্ট মাহরেজের ফুটবলের একমাত্র অনুপ্রেরণা ছিল তার বাবা। মাহরেজের ১৫ বছর বয়সে তার মা এবং তিন ভাই বোনকে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মধ্যে ফেলে হার্ট অ্যাটাকে মারা যান আহমেদ মাহরেজ। ফুটবলার হবার স্বপ্নে বিভোর মাহরেজের জন্য এটি অনেক বড় ধাক্কা। তবুও দমে যাননি মাহরেজ। বাবার স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করতে চেষ্টা অব্যাহত রাখেন। সারসেলেস ক্লাবের বি দলে জায়গা করে নেন কিছুদিনের মধ্যেই। কিন্তু দৈহিক গঠনে ছোট এবং ভগ্ন স্বাস্থ্যের কারনে মূল দলের নজরে আসতে পারেন নি। সিনিয়র দলে সুযোগ পেতে মরিয়া মাহরেজ তারপর ক্লাবের ইনডোর গ্রাউন্ডে গভীর রাত পর্যন্ত ট্রেনিং শুরু করেন। কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে রাত চারটা পর্যন্ত প্র্যাকটিস চালিয়ে যান মাহরেজ। তার পরিশ্রম বৃথা যায় নি। সারসেলেস মূল দলে জায়গা করে নিয়েছিলেন কিছুদিন পরেই।

মাহরেজের লেস্টার সিটিতে যোগ দেয়ার ঘটনা বেশ মজার। ২০১২ এর জুলাইতে একজন উইংগারের খোঁজ করছিল লেস্টার। ২২ বছর বয়সী রায়ান মেনডেসকে পরখ করতে স্কাউট স্টিভ ওয়ালস ফ্রান্সে যান। লে হার্ভে ২-১ গোলে সিজনের প্রথম ম্যাচ হেরে বসে। ম্যাচের ৭৩ মিনিটে মাহরেজকে মাঠ থেকে তুলে নেন কোচ। কিন্তু ততক্ষণে ওয়ালসের নজর কেড়ে নিতে সক্ষম হয়েছেন তিনি। ওয়ালসের পরামর্শে চিফ স্কাউট ডেভিড মিলস তাকে ফলো করা শুরু করেন। মিলসের গ্রিন সিগনাল পেয়ে শেষবারের মত মাহরেজকে দেখতে ফ্রান্সে যান ওয়ালস। জোলা, দ্রগবা, এসিয়েনের মত তারকাদের চেলসিতে নিয়ে আসার কারিগর ওয়ালস আরো একটি সঠিক সিদ্ধান্ত নেন। ২০১৪ এর জানুয়ারিতে সিজনের মাঝপথে ৪৫০০০০ পাউন্ডে লেস্টার সিটিতে যোগ দেন রিয়াদ মাহরেজ।

লেস্টার যখন মাহরেজকে সাইন করাতে চাইল তখন অন্য কোন দলই তার প্রতি আগ্রহ দেখায় নি। ফলে ফাকা মাঠে গোল দিয়ে দেয় লেস্টার। এদিকে লেস্টার সম্পর্কে মাহরেজের বিন্দুমাত্র ধারনা ছিল না। প্রথমবার লেস্টারের নাম শোনার পর সে ভেবেছিল এটি বুঝি কোন রাগবি ক্লাব, কেননা লেস্টার তখন চ্যাম্পিয়নশীপ খেলত। কিন্তু লেস্টারের সুযোগ সুবিধা চোখে দেখে মত পরিবর্তন করেন মাহরেজ। লে হার্ভের হয়ে ২০১৩-১৪ সিজনের প্রথম অর্ধেক খেলে চার গোল ছয় অ্যাসিস্ট করা উইংগার পাড়ি জমান ইংল্যান্ডে- যেখানে আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে।

এরপর কল্পকাহিনীর মত কেটে যেতে লাগল লেস্টারে মাহরেজের দিনগুলো। চ্যাম্পিয়নশীপে ১৯ ম্যাচ খেলে ৩ গোলের সাথে ৫ অ্যাসিস্ট করে দলটির প্রিমিয়ার লিগে উত্থানে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন তিনি। তবে প্রিমিয়ার লিগে যাত্রাটা সুখকর হয় নি। লিগে ৩০ ম্যাচ খেলে ৪ গোল আর ৩ অ্যাসিস্ট করেন তিনি। ৪১ পয়েন্ট নিয়ে ১৪ তম অবস্থানে থেকে সিজন শেষ করে লেস্টার। এফএ কাপ এবং লিগ কাপে একটি করে ম্যাচ খেললেও গোলের খাতা খুলতে পারেন নি মাহরেজ। গত সিজনের শোধ নিতেই যেন এবারে জ্বলে উঠেছেন তিনি। ইপিএলের ইতিহাসে “লেস্টার সিটি রূপকথা” লিখতে শুরু করলেন স্বমহিমায়। ৩৪ ম্যাচ খেলে করেছেন ১৭ গোল ১০ অ্যাসিস্ট। সতীর্থ জেমি ভারডিকে সাথে নিয়ে তছনছ করেছেন প্রতিপক্ষের রক্ষণব্যুহ। ট্রান্সফার মার্কেটে শত মিলিয়ন পাউন্ড খরচ করা বড় দলগুলোকে হতাশার সাগরে নিমজ্জিত করে প্রিমিয়ার লিগের শিরোপা উচিয়ে ধরেছে অখ্যাত লেস্টার। লেস্টারের শিরোপা যাত্রায় সামনে থেকে নের্তৃত্ব দেয়ার ফলস্বরূপ মাহরেজের হাতে উঠেছে প্রিমিয়ার লিগের সেরা প্লেয়ারের সম্মাননা।

রিয়াদ মাহরেজের বাবার স্বপ্ন ছিল তার ছেলে একদিন নামী ফুটবলার হবে। মাহরেজের আজকের অবস্থান দেখে ওপারে হয়ত গর্বের শেষ নেই তার বাবার! কিশোর বয়সে মাহরেজ তার বন্ধুদের বলে বেড়াতেন তার স্বপ্ন বার্সেলোনায় খেলার। মুখ টিপে হাসত তার বন্ধুরা। আজ ফুটবল দুনিয়ার নামীদামী অনেক ক্লাব মাহরেজকে পাবার আশায় চেক রেডি করে বসে আছে। মাহরেজের সামর্থ্য নিয়ে সন্দেহ ছিল অনেকেরই। আজ সেই সন্দেহবাদীদের সবাই তার গুণকীর্তনকারী বনে গেছেন। কত উঁচুতে উঠলে আকাশ ছোঁয়া যায় জানা নেই। তবে ফুটপাথের ফুটবলার রিয়াদ মাহরেজ আকাশ ছুঁয়েছেন- এতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই।

Comments
Spread the love