“রাইফেল, রোটি ও আওরাত” থেকে…

”কিন্তু কোনো আশা সেই রাতের ত্রিসীমানা ঘেঁসতে সাহস করেনি। কেউ আশা করেনি যে, ছাব্বিশে মার্চের সূর্যোদয় দেখবার জন্য এই রাতটুকু সে বেঁচে থাকবে। এবং অনেকেই যে বেঁচে আছেন সেটা সুদীপ্তর কাছে পরম বিস্ময় ব’লে মনে হয়েছিল। অনেকে যাঁরা মরেছিলেন তাঁরা যেন খুব স্বাভাবিক একটি কর্ম করেছেন। অতএব সকলেই তাঁদের সম্পর্কে একটা অদ্ভুত অসাড়তা অনুভব করেছিলেন। কিন্তু জীবিতদের নিয়ে বিস্ময়ের অন্ত ছিল না।

‘আপনি বেঁচে আছেন!’

‘ভাই আল্লাহ বাঁচিয়েছেন। আপনি?’

‘আমাদের বিল্ডিংয়ে পাঁচজন গেছেন। আমি যে কী ক’রে বাঁচলাম আল্লাহ্‌ জানে।’

সুদীপ্তর এখনো মনে হয়, কি ক’রে যে বেঁচে আছেন তা তিনি জানেন না। আল্লাহ্‌ জানেন। তবে হাঁ, যাঁরা ম’রে গেছেন, তাঁরা ঠিকই গেছেন, ওটা কোনো সংবাদ নয়। সংবাদ হয় কোন্‌টা? স্বাভাবিক ঘটনাধারার মধ্যে যেটা খাপ খায় না, যা হয় কিছুটা অস্বাভাবিক কিংবা সাধারণের গন্ডিকে যা অতিক্রম করে তাকেই মানুষ গ্রহণ করে একটা সংবাদ ব’লে। কিন্তু সেই পঁচিশের রাত থেকে মৃত্যুটা কি কোনো সংবাদ? মৃত্যু এখন তো অতি সাধারণ অতি স্বাভাবিক আটপৌরে একটি ঘটনা মাত্র।”

*

“শহীদ মিনারের সামনে এতো কী দেখার ছিল সুদীপ্তর? চৌত্রিশ নম্বর বিল্ডিংয়ের দক্ষিণ দিকে রাস্তার ওপাশে শহীদ মিনার। বিচূর্ণীকৃত শহীদ মিনারের সামনে সুদীপ্ত কাল সম্বিৎ ফিরে পেয়েছিল ফিরোজের আহবানে। মাত্র গত কালের কথা। কিন্তু সুদীপ্তর এখন মনে হচ্ছে সে কথা কত কালের। গাড়িতে উঠবার সময় সুদীপ্ত কোনো কথা বলেন নি। কেবল ফিরোজ বলেছিলেন, যাক, তোমাকে পেলাম তা’হলে।’

সুদীপ্তকে যে পাওয়া যাবে ফিরোজ সে আশা করেন নি। ফিরতি পথে তিনি তখন সুদীপ্তর সন্ধানেই যাচ্ছিলেন। আর ভাবছিলেন, ওরা কি আছে! কী অবস্থায় না জানি দেখতে হবে ওদেরকে! ভাবতে ভাবতেই সুদীপ্তকে সামনে পেয়েছিলেন। শহীদ মিনারের সামনে দাঁড়িয়ে কাঁদছে। এই জন্যই পাগলটার সাথে এতো বন্ধুত্ব ফিরোজের। কী কান্ড দেখ দেখি। ছত্রিশ ঘন্টা কারফিউয়ের পর কোথায় বৌ-ছেলে ফেলে মিনারের সামনে এখন কাঁদতে এসেছে। শহীদ মিনারের শোকটাই তাঁর কাছে বড়ো হয়েছে। কিন্তু অস্বাভাবিকতা হয়েছে কি? একটুও না। শুধু সুদীপ্ত কেন। কোন বাঙালি আজ এই পথে যেতে চোখের পানি মুছছে না? মেডিক্যাল কলেজের পথে এইখানে ফিরোজও তো কেদে গিয়েছেন তখন।”

*

“সময় জীবনটাকেই একটা তীব্র বিদ্রূপ ব’লে সুদীপ্তর মনে হ’ল যখন তিনি জগন্নাথ হলের মাঠে সদ্য পুঁতে দেওয়া নারী-পুরুষের কারো হাতের আঙ্গুল, কারো পায়ের কিয়দংশ মাটি-ফুঁড়ে বেরুনো বৃক্ষ-শিশুর মতো মাথা তুলে থাকতে দেখলেন। কতো শব এইখানে পুঁতেছে ওরা? এবং এমনি কতো স্থানে? তবু এখনো ঘরে-বাইরে এতো! মেরেছে তাহ’লে কতো! ঢাকা শহরে কতো মানুষ মেরেছে এই জানোয়ারের দল?- প্রশ্নটা একটা হাতবোমার মতো এসে ফেটে পড়ল ফিরোজের চিন্তার মধ্যে।

না, বেশি মারে নি। সংখ্যাটা হাজারের ঘরে ছাড়িয়ে লাখের ঘরে ওঠে নি। সেনাপতির আদেশ পুরোপুরি পালন করা ওদের সৈনিকদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। কী আদেশ ছিল ওদের প্রচন্ড সেনাপতির? সুদীপ্ত কিংবা ফিরোজ কেউই তা জানেন না। কল্পনা করতে বললেও তাঁরা ফেল মারবেন। সেনাপতি টিক্কা খাঁ আদেশ দিয়েছিল-বাঙালিদের তোমরা হত্যা কর, তাঁদের দোকানপাট লুট কর, বাড়ি-ঘর জ্বালিয়ে দাও, তাঁদের মেয়েদের ধর্ষণ কর। এই আদেশ দেবার আগে ছোট একটি ভূমিকাও দিয়েছিল টিক্কা খাঁ—জওয়ান ভাই সব, তোমাদের জন্য প্রেসিডেন্ট স্বয়ং তোমাদের গর্ব বোধ করেন। তোমরা পাকিস্তানের গৌরব। পাকিস্তান ও ইসলামকে রক্ষার মহান দায়িত্ব তোমাদের উপর। এই যে সব বাঙালিদের দেখছো, এরা শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ইসলামকে ভুলে গিয়ে সকলে হিন্দু হয়ে যাচ্ছে। অতএব এদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ সাধারণ যুদ্ধ হবে না, তা হবে পুরোপুরি জেহাদ।

জেহাদের সওয়াব লাভে উদ্বুদ্ধ হয়ে পাক-জওয়ানরা ঝাঁপিয়ে পড়েছিল বাঙালিদের উপর। কয়েক লক্ষ নিরস্ত্র বাঙালিকে মারতে বেরিয়েছিল আধুনিকতম মারণাস্ত্রে সুসজ্জিত বীর পুরুষের দল – পাকিস্তানি বীর পুরুষ।”

*

“কিন্তু এতো দেখা যায় না! হায় হায়, বর্বরের দল বস্তিগুলো সব পুড়িয়ে দিয়েছে গো। গতকাল পালিয়ে আসার সময় এ সব তো চোখে পড়েনি। হয়ত গাড়িতে আসার জন্যই চোখে পড়েনি। নীলক্ষেতের পরিত্যক্ত রেললাইনের দু’পাশে বাস করত হাজার হাজার গরীব মানুষ। নানা সময়ে ঝড়ে-বন্যায় গ্রাম বাংলার লক্ষ লক্ষ বাস্তুহারা শহরে এসেছে-তারাই এখানে এসে হয়েছে বস্তিবাসী। সেই গরীব মানুষের বস্তি পুড়িয়ে অশেষ বীরত্ব দেখিয়ে গেছে পাক ফৌজ। আর পুড়িয়েছেও ঠিক বীর পুরুষের মতোই। কই তুমি আগুন দিয়ে এমন ক’রে পোড়াও দেখি। টিনও যে এমন হয়ে পুড়ে গ’লে যায় সেটা নিজে না দেখলে সুদীপ্ত কখনও বিশ্বাস করতেন না। একটা টিনের কৌটাও কোথাও পড়ে নেই, তার ফাঁপা কোটরে বাতাসের হাহাকারও নেই। শ্মশানেও তো কিছু থাকে পোড়া বাঁশ-কাঠ, আধপোড়া কাথা-বালিশ কতো কি থাকে। একটা দীর্ঘস্বাসকে, একটা মর্মবেদনাকে জানান দেয় তাঁরা। এখানে পোড়া ইটের গায়ে জমা হয়ে আছে বৃক্ষের তীব্র ক্ষত, দু’চোখের প্রচন্ড ক্রোধ। হাতের কাছে আর কিছু না থাকে ঐ পোড়া ইট ছুঁড়ে মার শত্রুর মুখে।

হায় হায়, আস্ত মরদেহ আগুনে ঝলসে রোস্ট হয়ে আছে। এখনো আছে! কেবল সরিয়ে নিয়ে গেছে পথে পথে গুলি-ক’রে মারা মানুষগুলিকে। ঘর এয়াগুন লাগলে মানুষো পথে বের হয়। বস্তির মানুষেরা পথে বেরিয়েছিল। আর পথে বেরিয়েই গুলি খেয়েছিল। ভারি সুন্দর রণকৌশল জানে পাক-ফৌজের দল। প্রথমে আগুম জ্বালিয়ে দাও, তারপর লোক পথে বেরুলে কারফিউ-ভঙ্গের অপরাধে গুলি কর। নরহত্যা হালাল হয়ে যাবে। বাঙালিরা সব কাফের হয়ে গেছে, অতএব তাদ্রকে হত্যা করা হালাল। এই যুক্তিতে হাজার হাজার নরহত্যার প্রত্যেকটিই হালাল করে নিয়েছিল পাকিস্তানিরা। না ক’রে উপায়ও ছিল না। তাঁরা ইসলামের বড়াই ক’রে থাকে না! এবং ইসলাম যদি শান্তির ধর্ম হয় তবে এতো অশান্তি সৃষ্টির এতো ধ্বংশলিলার একটা কারণ দেখাতে হবে তো।”

*

“রেল লাইন অতিক্রম ক’রে তাঁদের নীলক্ষেত আবাসিক এলাকার গেটের কাছে পৌঁছতেই একটা মিলিটারি জিপ এসে সুদীপ্তর সামনে দাঁড়াল। সুদীপ্ত একবার মনে মনে আল্লাহ্‌কে ডাকলেন, এবং মুহূর্তের মধ্যে সামনের সদ্য পাতা গজানো দেবদারু গাছটিতে চোখ বুলিয়ে নিলেন। চ’লে যাবার সময় যদি জীবনে এসেই থাকে তবে তৈরি হয়ে নেওয়াই ভালো। মনকে তিনি তৈরি ক’রে নিলেন। দেবদারুর সারা অঙ্গ ভ’রে বাংলার রূপ। এও রূপের পাথেয় নিয়ে পরকালের যাত্রাকে মধুময় ক’রে নেওয়া যায় না? ঘরের মধ্যে রাতের অন্ধকারে ইঁদুরের মতো ম’রে প’ড়ে থাকাটা তিনি যে এড়াতে পেরেছেন সেই জন্যই তিনি নিয়তিকে ধন্যবাদ দিয়েছেন। এখন এই উজ্জ্বল সকালে দেবদারু গাছের ছায়াতে ম’রে যেতে আর আপত্তি নেই।”

*

“সর্বত্রই হানাদারদের কার্যক্রমের মধ্যে এই একটা মিল ছিল ভারি সুন্দর। যা পার লুটে পুটে নাও, যুবতীদের হরণ কর, অন্যদের হত্যা কর। না, সব ঘরেই তারা ঢোকে নি। কিন্তু যেখানেই ঢুকেছে এই কার্যধারায় কোন ব্যতিক্রম ঘটে নি। ব্যতিক্রম শুধু ঘটেছিল সুদীপ্তর ঘরে। সেখানে হরণের জন্য নারী পায় নি, লুটপাটের যোগ্য কোনো বস্তুও পায় নি। কেননা যেদিকে তাঁরা তাকিয়েছিল শুধু দেখেছিল বই। আর বই। ধুত্তোর বই। বই দিয়ে হবেটা কি শুনি। কাগজের বুকে হিবিজিনি আঁক কাটা যতো সব আবর্জনা। এই আবর্জনায় হাত দিয়ে পাক-সৈন্যরা না-পাক হ’তে চায় নি। হাত যেখানে-সেখানেই দেওয়া যায় নাকি। হাত দেওয়া যায় রোটি ও রাইফেলে। আর আওরাতের গায়ে। দুনিয়ার সেরা চিজ আওরাত, আওর রাইফেল। রোটি খেয়ে গায়ের তাকাত বাড়াও, রাইফেল ধরে প্রতিপক্ষকে খতম কর, তারপর আওরাত নিয়ে ফূর্তি কর। ব্যাহ্‌, এহি জিন্দেগী হ্যায়। এই তো জীবন। জীবন সম্পর্কে এই ধারণায় আমনের আস্থা নেই, কোনো বাঙ্গালিরই নেই।”

রাইফেল, রোটি ও আওরাত – শহীদ বুদ্ধিজীবী আনোয়ার পাশা

Comments
Spread the love