ঈদ আর স্মৃতিদের বাড়ি!

Kazi Tahmina

একেবারে ছোটবেলার ঈদগুলো ছিল অন্য রকম। সেই সব ঈদগুলোর ছিল নিজস্ব ঘ্রাণ-নিজস্ব রঙ-উজ্জ্বল, অথচ চাকচিক্যবিহীন – বছরের পর বছর একই রকম একঘেয়ে, অথচ তারপরও অদ্ভুত প্রাণময়! আমার আব্বুর বাড়িপ্রীতির কারণে বছরের দুই ঈদসহ সাকুল্যে তিন/চারবার বাড়ি যাওয়া হতো। ফরিদপুরের প্রত্যন্ত গ্রামে ছিল আমাদের বাড়ি। রাস্তাঘাট খুব একটা সুবিধাজনক ছিল না, বাসগুলোও ছিল মুড়ির টিন মার্কা। আমাদের তিন ভাই বোনের ছিল কুম্ভকর্ণের ঘুম-টেনে পিটিয়ে ও তোলা যেতো না। কনিষ্ঠা অনন্যা, আমার বারো বছরের ছোট বোন, তখনো জন্মায়নি।

আম্মার টানাটানিতে বিরক্ত হয়ে, ভোর ৪ টা থেকে ডাকলে ৫/৫.৩০ টায় উঠে আলো-অন্ধকারের ভোরে ঘুমঘুম চোখে তৈরি হতাম। ৬টা নাগাদ আম্মার শাড়ি পরা উজ্জ্বল মুখ, কোলে উজ্জ্বল, আমাদের ভাই- আব্বুর হাত ধরে একজন, আর একটু বড় ও দুরন্ত আমি ছুটে ছুটে বাড়ির দিকে রওনা হতাম। রিকশা,বাস, লঞ্চ/ফেরি , আবার লক্কড় ঝক্কর আরেক বাস, সবশেষে ভ্যানগাড়ি – সব কিছু ডিঙ্গিয়ে বিকালের একটু আগে বাড়িতে এসে পৌছাতাম। আমরা বাড়ি পৌঁছার সঙ্গে সঙ্গে ব্যাপক হইচই শুরু হয়ে যেত। কেউ হাচড়ে-পাচড়ে ডাবগাছে উঠে একগাদা ডাব পেড়ে আনতো, কেউ দৌড়ে গিয়ে টিউবওয়েলের ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা পানি এনে দিত হাত মুখ ধোয়ার জন্য। ছোটখাটো একটা ভীড় জমে যেত কালাম সাহেবের ছানাপোনা আর কালাম সাহেবকে দেখার জন্য।

কোরবানি ঈদ হলে সন্ধ্যা নামার আগেই দেখতাম দড়ি হাতে মুরব্বি আর কাজিনদের দল গরু নিয়ে হাজির। সেই গরুকে আদর-যত্ন করার জন্য বাড়ির পিচ্চিরা ব্যস্ত হয়ে এই পাতা সেই পাতা নিয়ে ঘুরাঘুরি করতাম। সেইসব রাতে চাঁদের আলোয় উঠান ভেসে যেত।আমার মত উচ্চমাত্রার কল্পনাপ্রবণ শিশুদের দল পরী আর জ্বিন ভুতের কল্পিত চেহারা উঠোনের কোণে কোণে দেখতে পেয়ে শিউরে শিউরে উঠতাম। দাওয়ার সামনে বড় উঠানে বাড়ির সব বাচ্চাকাচ্চারা মিলে কত নাম না জানা খেলা খেলতাম। কুপির আলোয় রান্না হত-তারপর হ্যারিকেনের মায়াবী আলোয় দলবেধে খাওয়া দাওয়া। নানুবাড়িতে গেলে পাটি পেতে উঠানে বসতো গল্পের আসর।কখনো কখনো আমরা শহুরে শিশুরা নেচে গেয়ে,ছড়াগান, কবিতা পড়ে, অসীম প্রতিভা প্রদর্শন শেষে ক্লান্ত হয়ে কখন যেন ঘুমিয়ে কাদা হয়ে যেতাম! তারপর এক ঘুমে রাত কাভার!

kaziভোরে কি এক উত্তেজনায়,অচেনা শব্দে অপরিচিত ম্লান আলোয় তাড়াতাড়ি ঘুম ভাঙত। ঘুম ঘুম চোখে কয়লা দিয়ে দাঁত মাজতে যেতাম কলের পাড়। আব্বুর সাথে পুকুরে নেমে সাতার শেখার তালিম নিতাম কোন কোন ঈদের সকালে। সকাল সকাল সেমাই পায়েস খেয়ে ভালো জামা(ভালো জামা মানে,অপেক্ষাকৃত নতুন যেটা,প্রতি ঈদে নতুন জামা পেতামনা) পরে আব্বুর পিছনে পিছনে ঈদগাহে দিতাম দৌড়। বাড়ির ছেলেরা নামাজ পড়তো, আমরা অনাথের মত ঈদগাহের আশেপাশে ঘুরঘুর করতাম। নামায শেষ হতেই আব্বু আমাদের হাতে খুচরো পয়সা দিতেন, বিলোবার জন্য-বিলোতাম ঠিকই-অথচ সেইসব মুহুর্তে আমার নিজেরই টিনের থালা হাতে ভিখিরি হয়ে যেতে ইচ্ছে করতো। বাড়ি ফিরে সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়তো কোরবানির আয়োজনে।

গরু নিয়ে পরিবারের বড়রা এসে বাড়ির পাশের ক্ষেতে হাজির হত। বাড়ির বড় মেয়েরা একটু দূর থেকে কোরবানি দেখত। আমরা ছোট মেয়েরা অবশ্য সামনে থেকেই দেখতে পারতাম। মাংস কেটে ভাগ-বাটোয়ারায় অনেক সময় পার হয়ে যেত-প্রায় বিকেলবেলা তিনভাগ করে একভাগ বাড়িতে পাঠানো হত। বড় ডেকচিতে মাংস রাধা হত। আরেক ডেকচিতে মাংস জ্বাল দিয়ে রাখা হত। টানা কয়েকদিন চলতো সেই মাংস খাবার মহোৎসব। ঈদের পরদিন ছিল ছিত রুটি দিয়ে ঝুরা মাংস। তখন কারেন্টও ছিল না। ফ্রিজ ও ছিল না, কেউ সারাবছর জমা রেখে কোরবানির মাংস খাওয়ার চিন্তাও করতো না। মেজবানি করার উপযুক্ত সময়ও ছিল এটা- রাজ্যের আত্মীয় -স্বজন, বেলায় বেলায় রান্না- এক ডেগ নামলো, তো চুলার পর আরেক পাতিল উঠলো -এই ছিল তখনকার পরিচিত দৃশ্য।

এ তো গেল খাওয়া দাওয়ার কথা-হই হুল্লোড়, চালে, ডালে চড়ুইভাতি, মাছ ধরা, পুকুরময় দাপাদাপি, দিনমান দৌড় ঝাপ,বেহিসাবি রাত দিনের অবাধ স্বাধীনতা – কি সব রূপকথা দিন- কি ছিলনা সেইসব ঈদে? সেসব লিখতে গেলে আজ রাত ভোর হয়ে যাবে। ঈদ এলেই আব্বুর কথা মনে পড়ে-ঈদ না এলেও মনে পড়ে। সুখের সময়ে যেমন তেমন, অসুখের কালে আরো বেশি মনে পড়ে। আমাদের সেইসব স্মৃতির বাড়ি ভেঙে খানখান হয়ে গেছে- আব্বু নাই,আব্বুর বাড়িও নাই হয়ে গেছে! গতকাল থেকে ফুড পয়জনিং-ঘুমও আসেনা। পেটে কামড়, মশার কামড়ের পাশাপাশি স্মৃতিরাও কামড় দেয় কুটুস-কাটুস। ঝিঁঝিঁর ডাক চারপাশে, ফিনিক ফোটা জোছনায় ইনিয়ানার দাদুবাড়ির পিছনের কলাগাছেরা ভূতগ্রস্তের মত দাঁড়িয়ে আছে। কি সুন্দর চারপাশ। অথচ পৃথিবী তো জানি কাঁচের ঘর; সম্পর্করা, এমনকি রক্তের সম্পর্করাও উড়ান চড়ুই-ফুড়ুৎ করে উড়ে চলে যাবে পলক ফেলবার আগেই!

ঘুমাওনা কেন, ঝিঁঝিঁ পোকারা!

কাজী তাহমিনা, শিক্ষক, ইংরেজি বিভাগ, ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি

আপনার কাছে কেমন লেগেছে এই ফিচারটি?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-