‘ক’ অনেকের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দিল। তারপরের দিন সে দোষের জন্য ক্ষমাও চাইল।

এদিকে ক্ষমা চাওয়ার পরের দিন ‘ক’ মহাঅপরাধ করেছে এই অভিযোগে তার ধর্মের অনুসারী ‘খ’ ‘গ‘ ‘ঘ’ সহ আরো প্রায় দেড়শ মানুষের বাড়িঘর ভেঙে দেওয়া হল, লুটপাট করা হল। যারা ঘটনার সাথে জড়িত হওয়া তো বহুদূরের কথা, জানতোও না কোন কিছু। এরপর তাদের ১৫ টা উপাসনালয়ে হামলা চালানো হল। সেখানেও ভাংচুর, লুটপাট করা হল। সবই দিনের বেলা, প্রকাশ্যে। ‘ক’ কে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গ্রেফতারও করে নিয়ে গেল।

‘ক’ ‘খ’ ‘গ’ ‘ঘ’ যে দেশে থাকত সে দেশটার বেশীরভাগ মানুষই নাকি আবেগী, প্রতিবাদী । তাঁদের প্রিয় ক্রিকেটারকে একজন দর্শক জড়িয়ে ধরলে সে দেশের মানুষ আবেগে আপ্লুত হয়, পাশের দেশে তার সমধর্মের মানুষের উপর অত্যাচার হলে তারা অনলাইন অফলাইনে প্রতিবাদ জানায়, এমনকি ভৌগলিক অবস্থানে বহুদূরের দেশেও সমধর্মের মানুষ আঘাতপ্রাপ্ত হলেও তাঁরা অনলাইনে হ্যাশট্যাগ দিয়ে সাধ্যমত প্রতিবাদ জানায়। কেউ কেউ তেমন ঘটনায় ব্যানার নিয়ে রাস্তায়ও নেমে যায়।

অথচ এই মানুষগুলোই কেন যেন নিজ দেশে যখন ‘খ’ ‘গ’ ‘ঘ’ এর মত কয়েকশ মানুষের বাড়িতে হামলা হল, তাদের উপাসনালয় ভাঙা হল তখন নিশ্চুপ বনে গেল। যেন কোথাও কিছু হয়নি। কেউ কিছু শুনেনি। কেউ দেখেওনি।

‘খ’ দরিদ্র ছিল। তার কোথাও যাওয়ার জায়গা ছিল না। সে সেভাবেই মুখ বুজে থেকে গেল সে দেশে। ‘গ’ এর বাড়িঘর তো সেদিনই শেষ হয়ে গিয়েছিল। তারপরেও নতুন কুড়ে ঘর তুলে বাঁচার চেষ্টায় ছিল। কিন্তু কিছুদিন পরে এক নির্বাচনের সময় ভিন্ন দলকে ভোট দিয়েছে এ অভিযোগে তার বাড়িতে আবারো হামলা হল। তার ১৩ বছরের মেয়েটাকে একসাথে প্রায় ১৫ জন মিলে পালাক্রমে ধর্ষণ করল। ‘গ’ এর বউ শুধু বলেছিল -“বাবা, তোমরা একজন একজন করে যাও। ও তো অনেক ছোট। মারা যাবে নাহলে।”

যেহেতু সেদেশের মানুষের মন আবেগে ভরা তাই তারা একজন একজন করে যেয়েই ধর্ষণ করেছিল মেয়েটাকে সেদিন। এরপরে মেয়েটা কিছুটা সুস্থ হলে ‘গ’ চক্ষুলজ্জায় পাশের দেশে একেবারে চলে যায়। এদিকে ‘ঘ’ অবস্থা সম্পন্ন ছিল। তাই তাদের বাড়িতে হামলা হবার কিছুদিন পরেই সে বাড়িঘর বিক্রি করে পরিবার নিয়ে ইউরোপের এক দেশে চলে যায়।

‘গ’ ‘ঘ’ দেশ ছেড়ে চলে যাবার পরের দিন অত্র এলাকার ক্ষমতাবান এক লোক তার বাড়ির জায়গাটা দখল করে নিল। তারপর সেখানে দারুণ একটা বাড়ি তুলল। বাড়িটা বানানোর সমস্ত ব্যয়ভার বহন করলো তার ইউরোপ নিবাসী ছেলে। বাড়ির উদ্বোধনের দিন আশেপাশের অনেক লোক এল। তখন তাদের উদ্দেশ্যে সে লোকটি বলল- ” ‘খ’ ‘গ’ এর আসলে দেশপ্রেম ছিল না। দেশপ্রেম থাকলে কি কেউ নিজ দেশ ছেড়ে যেতে পারে? “

উপস্থিত জনতা একসাথে- “ঠিক, ঠিক” বলে হাসিমুখে সহমত জানালো। সবার মুখে হাসি দেখে সদ্য বাড়ি বানানো লোকটার মুখেও হাসি ফুটে উঠল। সে আরো উৎসাহী হয়ে জনতার উদ্দেশ্যে প্রশ্ন ছুড়ে দিল “পৃথিবীর বুকে এমন অসাম্প্রদায়িক দেশ আর আছে কোন?”

সবাই আবারো দ্বিগুণ উৎসাহে জবাব দিল -“নাই, নাই”।

‘খ’ খানিকটা দূরে দাড়িয়ে শুনছিল সব। সে কিছু একটা বলতে চাইল। তারপর নিজেই নিজেকে বলল- থাক! কি লাভ হবে বলে? এখানেই তো থাকতে হবে, ছেলেটার জন্য হলেও বাঁচতে হবে….

(গল্পের দেশ, কাল, চরিত্র সব কিছুই কাল্পনিক। কারো সাথে কোনভাবে কিছু মিলে গেলে সেটা কাকতালীয় মাত্র)

আপনার কাছে কেমন লেগেছে এই ফিচারটি?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-

এই ক্যাটাগরির অন্যান্য লেখাগুলো