২০১৮ সালে মুক্তি পাওয়া হলিউডের মুভিগুলোর মধ্যে অন্যতম আকাঙ্ক্ষিত ছিলো কিংবদন্তি স্টিভেন স্পিলবার্গের পরিচালনায় “Ready player one” মুভিটা। আর্নেস্ট ক্লাইনের একই নামের সারা জাগানো বই এর মুভি এডাপটেশন ছিলো বইটা। পুরো কাহিনী ২০৪৫ সালের ভবিষ্যত পৃথিবী নিয়ে যেখানে বাস্তব আর ভার্চুয়াল জগৎ মিলে মিশে একাকার হয়ে গেছে- মানুষ বাস্তব জগতের চেয়ে “ওয়াসিস” নামক ভার্চুয়াল রিয়ালিটিতেই বেশির ভাগ সময় থাকে- জেমস হ্যালিডে নামক এক মহা প্রতিভাবান মানুষের তৈরী অসীম এক জগৎ যেখানে যে কেউ যে কোন রূপ ধারণ করে যা খুশি তাই করতে পারে!

মুভিটা সেই ৮০ দশক থেকে শুরু করে বর্তমান পর্যন্ত নানা পপ কালচার রেফারেন্স যেমন জনপ্রিয় গান, মুভি, গেইম, কমিকস ও অন্যান্য রেফারেন্সে ঠাসা- এত বেশি যে সেটা গুনে শেষ করা সম্ভব না। ইউটিউবে এই মুভিতে কি কি রেফারেন্স ইউজ করা হয়েছে তার উপর অনেক ভিডিও অলরেডি আছে- ছোট্ট হ্যালো কিটি থেকে শুরু করে ব্যাটম্যান, রবোকপ, ডেডপুল। ফ্ল্যাশ, হি-ম্যান, মরটাল কমব্যাট, হ্যালো, স্টার ওয়ার্স, টিনেজ মিউট্যান্ট নিনিজা টার্টল, আয়রন জায়ান্ট, গডজিলা, জুরাসিক পার্ক, কিংকং, ব্যাক টু দা ফিউচার- মোটামুটি তিনশোর উপর রেফারেন্স খুঁজে পাওয়া যাবে মুভিটায় যেগুলো দর্শক ও ভক্তদের চরম নস্টালজিয়ার আনন্দ দিয়েছে। চোখ ধাঁধানো গ্রাফিক্স আর দারুন গতিময় কাহিনি ও টানটান উত্তেজনার মুভিটা দারুন উপভোগ্য হলেও মুভির গল্পে একটা সমান্তরাল দুঃখ, বিষন্নতার গভীর একটা ছাপ আছে- আর এখানেই স্পিলবার্গের মুন্সিয়ানা।

মুভিতে ওয়াসিসের সৃষ্টিকর্তা যে হ্যালিডেকে দেখা যায় সে যেন পৃথিবীর সব প্রতিভাবান অথচ ইন্ট্রোভার্ট, মানুষের সাথে মিশতে না পেরে নিজের জগতে বুঁদ হয়ে থাকা খেয়ালি নিঃসঙ্গ মানুষদের প্রতিনিধি। ছোট বেলা থেকেই সে নিজের ঘরে ভিডিও গেইমস, কমিকস, মুভি এসব নিয়েই নিজের মত বন্দি হয়ে থাকতো। তাই সে বড় হয়ে ওয়াসিস তৈরী করে যেখানে মানুষ নিজের মত করে তার জগৎ সাজাতে পারে, বন্ধু তৈরী করতে পারে। বাস্তব জগতে একবার এক মেয়েকে সে ভালোবেসেছিলো, কিন্তু সাহস করে বলা হয়নি সেই ভালোবাসার কথা- এটা তার আমৃত্যু আক্ষেপ ছিলো। তার ওয়াসিস তৈরীর সময়কার পার্টনার ওগডেন মোরোর সাথেও তার একসময় ওয়াসিস নিয়ে মতোবিরোধে সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়, সেটাও ছিলো তার জীবনের বড় এক ট্রেজেডি- একমাত্র বন্ধুকে হারানো। হ্যালিডে চরিত্রে অস্কার বিজয়ী মার্ক রাইলেন্স অসাধারণ অভিনয় করেছেন।

মুভিটায় আত্মভোলা হ্যালিডের নিঃসঙ্গতাই তাকে কল্পনার অবিশ্বাস্য জগৎ তৈরীর দিকে নিয়ে যায়। সে পুরো গেমে তিনটা লুকানো চাবি খুঁজে বের করার একটা খেলা দিয়ে রাখে, যে তিনটা চাবি খুঁজে বের করতে পারবে, সে পাবে একটা “ইস্টার এগ” বা লুকানো সোনার ডিম এবং রিয়েল লাইফে পুরো ওয়াসিস গেমের মালিকানা যার মূল্য ট্রিলিয়ন ডলার! এভাবেই মুভিটায় কল্পনার আর বাস্তব জগতে মিলে মিসে এক করে ফেলা হয়েছে- ভার্চুয়ালের একটা গেম বাস্তব জগতের নিয়ন্ত্রণ বদলে দিতে পারে! কারণ, হ্যালিডে একসময় বুঝতে পেরেছিলো তাকে বাস্তবের কাছে একসময় ফিরতে হবেই, কারণ- বাস্তব, বাস্তবই।

এই মুভির আরেকটা জিনিস নিয়ে কথা না বলে পারছিনা, সেই মিগ থার্টি থ্রি চ্যাটিং থেকে শুরু করে বর্তমানের ফেসবুক- অনলাইনে কারো চেহারা না দেখে, আসল পরিচয় না জেনে প্রেমে পড়ার মত অদ্ভুত ঘটনা ঘটছে। মুভিতে এই প্লটটা দারুন ভাবে দেখানো হয়- মুভির নায়ক, ওয়েড, যে কিনা ওয়াসিসের ভিতর “পারযিভাল” নাম নিয়ে ঘুরে, আরথ্রিমাস নামক এক মেয়ে এভাটারের প্রেমে পড়ে যায়- অথচ সে বাস্তব জগতে বিশাল মোটা একটা ছেলেও হতে পারে যার নাম হয়তো চাক! অনেক চড়াই উতড়াই পেরিয়ে বাস্তবের ওয়েড আর আরথ্রিমাস, যার আসল নাম সামান্থা, তাদের দেখা হয়। ভার্চুয়াল জগতে ভালো লাগা কাউকে বাস্তব জগতে অবশেষে দেখা পাওয়ার অনুভূতি, আবেগটা খুব সুন্দর ভাবে দেখানো হয়েছে। হয়তো অনেকে এটা নিয়েও নস্টালজিক হয়ে যাবেন।

রেডি প্লেয়ার ওয়ান মুভিকে তাই শুধু স্পেশাল ইফেক্টে বোঝাই একশন এডভেঞ্চার সাইফাই বললে অন্যায় করা হবে, এটা একই সাথে মানবিকতা ও সম্পর্কের গল্পও বলে যেটা শুধু ২০৪৫এই না, আরো হাজার বছর পরও একই রকম থাকবে।

Comments
Spread the love