চান্দিমাল পুরোপুরি বোকা বনে গেলেন। সাদাসিধে বলটা যে এমন ভয়াবহ টার্ণ করতে পারে, সেটা ধারণাতেও ছিল না লঙ্কান অধিনায়কের। মাত্রই উইকেটে এসেছেন, প্রথম বলটাই যে এমন নাচিয়ে ছাড়বে তাকে, বুঝতেই পারেননি হয়তো। আগের দিনই সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, স্পিনিং উইকেটে ভয় নেই তাদের। সেই চান্দিমাল প্রথম বল শেষেই ভাঙা স্ট্যাম্পের দিকে মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে রইলেন, কয়েক মূহুর্তের একটা দুঃস্বপ্ন দেখলেন যেন! বিদায়ঘন্টা বেজে গেছে তার, মাত্র এক বলেই!

মিরপুরে একজন তখন আকাশে উড়ছেন, দু’হাত ছড়িয়ে বাতাসে ভেসে যেতে চাইছেন পাখির মতো। তার তো আকাশেই ওড়ার কথা, পেঁজা তুলোর মতো ভেসে বেড়ানোর কথা। চার বছর পর টেস্ট দলে ফিরেছেন, সাদা জার্সিটা গায়ে জড়িয়েছেন, ফিরে আসাটা এমন দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে রাঙিয়ে দেয়ার পর তিনি উড়তে চাইতেই পারেন!

তিনি আবদুর রাজ্জাক, ধারাভাষ্যকারদের ভাষায় বাংলাদেশ দলের সিনিয়র সিটিজেন! চার বছর পরে দলে ফিরেই দেখালেন নিজের কার্যকারিতা। খানিকটা আফসোসও কি উপহার দিলেন না? অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ এমন একজন দুর্দান্ত স্পিনারকে গত চার বছর ধরেই ব্যবহার করতে পারেনি বাংলাদেশ, দিনের পর দিন স্পিন আক্রমণ অনভিজ্ঞ হয়েছে, তবুও রাজ্জাককে ডাকা হয়নি, তিনি শুধু ঘরোয়া ক্রিকেটেই আলো ছড়িয়ে গেছেন এই সময়টায়, তবুও জাতীয় দলে তাকে ব্রাত্য করে রেখেছিলেন তৎকালীন কোচ আর নির্বাচক প্যানেল।

সকাল থেকেই দুর্দান্ত বোলিঙের পসরা সাজিয়েছেন তিনি, যোগ্য সঙ্গ দিয়েছেন তাইজুল ইসলাম। টসে জিতে ব্যাটিঙে নামা শ্রীলঙ্কাকে চেপে ধরেছেন দুজনে মিলে। শুরুতেই করুণারত্নেকে বুদ্ধিদীপ্ত এক ডেলিভারীতে স্ট্যাম্পিঙের ফাঁদে ফেলেছেন রাজ্জাক। তবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অনেকদিন পরে ফেরার সুরটা পাওয়া যাচ্ছিল বোলিঙে, লাইন-লেন্থের ঘাটতিটা চোখে পড়ছিল হুটহাট। আবার একইসাথে দারুণ সব ডেলিভারি উপহার দিয়েছেন, মিরপুরের স্পিনিং উইকেটে প্রথম দিনেই বলকে ইচ্ছেমতো ঘুরিয়েছেন রাজ্জাক। গুণাথিলাকা বল তুলে দিয়েছেন আকাশে, দুর্দান্ত ক্যাচ নিয়েছেন মুশফিক। এরপর চান্দিমাল আর ডিকওয়েলাকে আউট করেছেন দুটো ম্যাজিকাল ডেলিভারিতে, রিস্ট স্পিনারদের জন্যে গর্ব করার মতো উইকেড় হতে পারে এই দুটোই।

বাংলাদেশ বনাম শ্রীলঙ্কা টেস্ট সিরিজ, আবদুর রাজ্জাক, তাইজুল ইসলাম

প্রথম সেশনটা বাংলাদেশের করে দিয়েছেন রাজ্জাক। পুরনো চাল ভাতে বাড়ার রেসিপিটা আরও একবার তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন বল হাতে। দ্বিতীয় সেশনের শুরুতেই ডিকওয়েলাকে বোল্ড করে লঙ্কান শিবিরে ধাক্কা দেয়া বজায় রেখেছেন। এরপর আবার তাইজুলের জোড়া আঘাতে বেসামাল হয়েছে লঙ্কান শিবির, মাঝে সপ্তম উইকেটে ৫২ রানের পার্টনারশীপ গড়েছেন রোশান সিলভা আর দিলরুয়ান পেরেরা। শ্রীলঙ্কা দল দ্বিতীয় সেশন শেষে আট উইকেট হারিয়ে করেছে ২০৫ রান। এতগুলো রানও হয় না, সহজ ক্যাচগুলো মিস না হলে। কিন্ত পুরনো এই রোগ তো সহজে যাওয়ার নয়।

উইকেটে স্পিন ধরছে একদম সকাল থেকেই। ফিরে এসে আলো ছড়িয়েছেন রাজ্জাক, জ্বলে উঠেছেন তাইজুলও। চট্টগ্রামে ভুলে যাওয়ার মতো রেকর্ড গড়ে এসেছিলেন, সেটাকে মাটিচাপা দিয়েছেন ঢাকায়। জুটি গড়তে দেননি শ্রীলঙ্কার ব্যাটসম্যানদের, উইকেটের সাহায্যটা ব্যবহার করতে পেরেছেন পুরোপুরি। তবে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের জন্যেও কঠিণ পরীক্ষা অপেক্ষা করছে, যদিও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে উইকেট ব্যাটিঙের জন্যে সহজ হচ্ছে বলেই মনে হয়েছে। দেখা যাক, রাজ্জাকের দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তনটা বাংলাদেশ দল দারুণ পারফরম্যান্সে স্মরণীয় করে রাখতে পারেন কিনা।

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-