সিনেমা হলের গলি

Ratsasan- তামিল সিনেমা এমনও হয়!

তামিল সিনেমা বললেই একটা সময় চোখে ভাসতো নায়ক আকাশে ভাসতে ভাসতে গুণ্ডাদের লাঠিপেটা করছে, নায়িকার কাজ গানের তালে তালে নেচে যাওয়া আর ওভার দ্য টপ কিছু কমেডিয়ানের নিয়মিত ভাঁড়ামো। কিন্তু এখন থেকে তামিল সিনেমা বললেই আমার রাতচাসান সিনেমার কথাই মনে পড়বে। সাইকো থ্রিলার জনারটা উপমহাদেশে খুবই অবহেলিত সিনেমা, নাটক কিংবা গল্পের দিক দিয়ে। সিরিয়াল কিলিং নিয়ে কিছু কাজ তো হয়’ই কিন্তু আপ টু দ্য মার্ক হয় না সেগুলো কোনটাই। কারণ রহস্য ঠিকমতো গড়ে তুলতে পারে না নির্মাতারা। সেদিক থেকে রাতচাসান এক সুন্দর ব্যতিক্রম। সিরিয়াল কিলিং নিয়ে হয়তো উপমহাদেশেরই অন্যতম সেরা সাইকো থ্রিলার সিনেমা। কী নেই এতে? ভায়োলেন্স, গোর, প্লট টুইস্ট, টাইট স্ক্রিনপ্লে, সবকিছুই। আর এতেই রাতচাসান হয়ে গেছে যেন তামিল থ্রিলারের নতুন মুখ।

রাতচাসান যার ইংরেজি অর্থ করলে দাঁড়ায়- ডেভিল। এক শয়তানরূপী সিরিয়াল কিলারকে নিয়ে গল্প। যদিও গল্পের শুরুতে সিরিয়াল কিলার নয় আমরা দেখা পাই অরুন কুমারের, যে কিনা দিন রাত স্বপ্ন দেখে সে একদিন নির্দেশক হবে আর থ্রিলার সিনেমা বানাবে। সিরিয়াল কিলিং নিয়ে সে সিনেমা বানাতে চায় তাই তার রুমভর্তি বিশ্বের সব সিরিয়াল কিলারের নিউজ পেপার কাটিং। অরুন সেসব সিরিয়াল কিলারদের কিলিং প্যাটার্ন, মনস্তত্ত্ব স্টাডি করে একটা স্ক্রিপ্টও রেডি করে ফেলে তাঁর ফিল্মের জন্য। তার বোন ও পুলিশ ইন্সপেক্টর দুলাভাই তাকে মানা করে এসব বাজে কাজে সময় নষ্ট করতে কিন্তু স্বপ্ন তো স্বপ্নই। অরুন ছোটাছুটি করতে থাকে এক প্রোডিউসারের কাছ থেকে আরেক প্রোডিউসারের কাছে। কিন্তু কেউই রাজি হয় না কারণ এমন থ্রিলারের দর্শক কই? একজন বলে ফ্যামিলি অডিয়েন্স এসব নিতে পারবে না, আরেকজন রোম্যান্টিক এঙ্গেল চায়। শেষমেশ স্বপ্নভঙ্গে বিমর্ষ হয়ে দুলাভাইয়ের কথা শুনে অরুন পুলিশ একাডেমিতে ভর্তি হয় ও পুলিশে চান্সও পেয়ে যায়।

অরুনের দুলাভাই তার স্টেশনেই অরুনের পোস্টিং করায়। ঠিক সেই সময়টাতেই একটা কিলিং কেস খুব প্রচার প্রচারণা পাচ্ছিল, কিছুদিন আগে একটা লাশ পাওয়া গিয়েছিল ১৪-১৫ বছরের এক মেয়ের। লাশ দেখে সবাই আঁতকে উঠেছিল কারণ মৃত্যুর আগে অনেক নির্যাতন করে মেয়েটার চেহারা-আকৃতি সব বিগড়ে দিয়েছিল খুনি। তার কিছুদিন পরই আবার এক ১৪-১৫ বছরের মেয়ের কিডন্যাপ হবার খবর পাওয়া গেল। যেখান থেকে কিডন্যাপ হয়েছে মেয়েটি সেখানে একটা গিফট বক্সও রেখে গিয়েছে কিডন্যাপার যেখানে একটা পুতুলের মুন্ডু বিকৃতভাবে কাঁটাছেঁড়া অবস্থায় ছিল। পুলিশ কোন ক্লুই পাচ্ছে না। অরুন মাত্র নতুন জয়েন করেছে, সেও বুঝে উঠতে পারছে না কিছু। পরের দিন সে মেয়েটির লাশ পাওয়া যায় এক পানির পাইপের ভেতরে। পুরো শহরজুড়ে আতঙ্কে মানুষ, কী হচ্ছে এসব। কেউই কোন কূলকিনারাই খুঁজে পাচ্ছে না। এরই মাঝে হুট করে একদিন অরুনের ফিল্মমেকার সত্তা ওকে কিছু ক্লু ধরিয়ে দেয়। অরুন চলে যায় তার ক্লুগুলো নিয়ে ঊর্দ্ধতন কর্মকর্তার কাছে, কেউ একজন সিরিয়াল কিলিং করছে একটা প্যাটার্ন ধরে। সে প্যাটার্ন অনুযায়ী অনুসন্ধান করলে হয়তো ধরে ফেলা যাবে সেই কিলারকে। কী ছিল সেই ক্লুগুলো? কে সেই সিরিয়াল কিলার? কী জন্যই বা সে এতো নির্যাতন করে মারছে ১৪-১৫ বছরের স্কুলপড়ুয়া মেয়েগুলোকে? জানতে হলে দেখতে হবে রাতচাসান।

এই সিনেমার নির্দেশক-নায়ক জুটি এর আগে একসাথে মুনদাসুপাত্তি নামের এক দারুণ রোম্যান্টিক কমেডি ফিল্ম উপহার দিয়েছিলেন। সে সিনেমা বানানোর পরই নির্দেশক রামকুমার ভাবলেন যে তাকে এবার একটা সিরিয়াস সিনেমা করতে হবে তা নাহলে তকমা লেগে যাবে যে একই ধাঁচের সিনেমা বানান তিনি। এরই মাঝে তার চোখে পড়ে একটা নিউজ, এলেক্সান্ডার নিকোলাইভিচের সিরিয়াল কিলিং স্টোরি। এই নিউজটা পড়েই রামকুমার অনুপ্রাণিত হন যে তিনি এবার সিরিয়াল কিলিং নিয়ে সিনেমা বানাবেন, লেখা শুরু করেন স্ক্রিপ্ট। নায়ক অরুন কুমারের চরিত্রে নেন তার আগের সিনেমার নায়ক বিষ্ণু বিশালকে। সাইকো থ্রিলার জনারটাই আনএক্সপ্লোরড আমাদের এই উপমহাদেশে, সেই জনার নিয়ে কাজ করা; আবার রোম্যান্টিক কমেডি যার অভিজ্ঞতার ঝুলিতে তার কাছ থেকে কেমন স্ক্রিপ্ট আসে সেটা দেখার বিষয় ছিল।

কিন্তু স্ক্রিপ্ট হোক আর স্ক্রিনপ্লে রাতচাসান যেন দুর্দমনীয় দু’ক্ষেত্রেই। গল্প দারুণ, যদিও প্রেডিক্টেবিলিটি বেশি কিন্তু স্ক্রিনপ্লে এতোই টাইট যে নিঃশ্বাস নেবার সুযোগ দেবে না তা দর্শককে। বাজেট আরেকটু বেশি হলে প্রস্থেটিক হয়তো আরেকটু ভালোভাবে কাজে লাগানো যেত কিন্তু গল্পই যেখানে নায়ক সেখানে আর কিছু কী লাগে নাকি! এজন্যই অভিনয়ের অপরিপক্কতাকেও মাফ করে দেয়া যায়। অভিনেতা বিষ্ণু বিশাল পাকা অভিনেতা না হলেও কেন যেন তাকে মানাচ্ছিল খুব অরুন কুমারের চরিত্রে। তার এক্সপ্রেশনলেস চেহারা কেমন যেন দ্বিধায় ফেলে দিচ্ছিলো বারবার। রহস্য বুননে আর সেট ডিজাইনে রাতচাসান অনন্য ছিল। গল্প এমন যে কোনসময় শিরদাঁড়া বেয়ে শঙ্কার শীতল স্রোত বেয়ে নেমে যাবে টেরও পাওয়া যাবে না।

মালয়লাম সিনেমা বদলে গেল, তামিল সিনেমা বদলে গেল, কলকাতার সিনেমা তো এখন বদলাচ্ছে দারুণ ভাবে, বলিউডেও নতুন কন্টেন্টের জোয়ার যেন। আর আমরা কেবল আটকে আছি পাঙ্কু জামাই, নায়কে। কবে রাতচাসানের মতো থ্রিলার বানাবো আমরা! বাজেটের চেয়েও যেখানে গল্প বেশি ম্যাটার করে। কবে আমাদের সিনেমাহলে এমন সিনেমা দেখবো যা দেখে তাক লেগে যাবে সবাই, যেমনটা লাগলো রাতচাসান দেখতে গিয়ে। থ্রিলার জনরাকে নতুন করে চেনাতে রাতচাসান ভূমিকা রাখবে তামিল ইন্ডাস্ট্রিতে এই কামনাই করি। যারা দেখেননি এখনও, দেখে ফেলুন আজই। দেখতে দেখতে জানালার পাশ দিয়ে কেউ হেঁটে গেলে, শার্সিতে বক্সে করে পুতুলের কাঁটা মুণ্ডু রেখে গেলে ভয় পাবেন না যেন।

আরও পড়ুন-

Comments

Tags

Related Articles