জন্মের পর যুদ্ধ দেখেছেন, দেখেছেন রক্ত; বন্ধু আর স্বজনদের মৃতদেহ। বোমার আওয়াজে ঘুম ভেঙে যেতো রাতে, বারুদের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে থাকতো চারপাশ, ভারী হয়ে উঠতো বাতাস। বড়ভাইয়েরা বাড়ির উঠোনে ব্যাট বল নিয়ে ক্রিকেট খেলতো, তিনিও ছুটে যেতে চাইতেন সেখানে। কিন্ত বছর চারেকের সেই ছোট্ট ছেলেটাকে চোখের আড়াল হতে দিতেন না মা, যদি বোমারু বিমান থেকে হামলা করা হয়, এই আশঙ্কায়।

সাত ভাইয়ের মধ্যে তিনি ষষ্ঠ, তার ছোট ভাইটার জন্ম হবার পরে মা ব্যস্ত হয়ে পড়লেন ছোট ছেলেকে নিয়ে, আগেরজন তখন বাঁধনহারা স্বাধীনতার দেখা পেয়ে গেছেন! বকা দেয়ার কেউ নেই, কেউ ধমক দিচ্ছে না, দুপুরের রোদে পুড়ে যতো খুশী ক্রিকেট খেলো, কেউ কিচ্ছু বলবে না। যে ছেলেটাকে মা নিজের আঁচলে বেঁধে রাখতে চাইতেন একটা সময়ে, সেই ছেলেটা এখন ক্রিকেট মাঠ দাপিয়ে বেড়ায়। বাঘা বাঘা ব্যাটসম্যানদের যম সে, বিশ্বের সবচেয়ে বড় ফ্র্যাঞ্চাইজি টি-২০ টুর্নামেন্টে তার দাম ওঠে নয় কোটি রূপি, আইসিসির বোলারদের র‍্যাঙ্কিঙে সবার ওপরে জ্বলজ্বল করে তার নামটা। তিনি আফগানিস্তান ক্রিকেটের ভবিষ্যত, নাম তার রশিদ খান।

গত পরশু আইসিসির র‍্যাঙ্কিঙের হালনাগাদ হয়েছে। সেখানেই একটা রেকর্ড গড়েছেন এই আফগান তরুণ। সর্বকণিষ্ঠ ক্রিকেটার হিসেবে বোলারদের র‍্যাঙ্কিঙে এক নম্বর জায়গাটা দখল করেছেন তিনি। র‍্যাঙ্কিঙের নতুন হালনাগাদের দিন কাগজে কলমে রশিদের বয়স ছিল উনিশ বছর ১৫৩ দিন। ক্যারিয়ারসেরা ৭৮৭ রেটিং পয়েন্ট নিয়ে ভারতীয় পেসার জসপ্রিত বুমরা’র সঙ্গে শীর্ষস্থানটা ভাগাভাগি করছেন রশিদ।

অনেকে তাকে ডাকেন আফগান ক্রিকেটের সুপারহিরো বলে। ছোট দলের বড় তারকা তকমাটার সার্থক উদাহরণ রশিদ খান। শেন ওয়ার্ন বা অনিল কুম্বলেদের ঘরানার বোলার তিনি, ডানহাতি লেগস্পিনার। দুর্দান্ত টার্ন আর বোলিং অ্যাকুরেসি তার মূল সঙ্গী। লেগস্পিনার হলেও, লুজ ডেলিভারি দিতে রশিদের বেজায় আপত্তি। লাইনটা তার বরাবরই নিখুঁত থাকে, তবে সবচেয়ে দুর্বোধ্য বোধহয় তার বোলিং লেন্থটা। কখনও ফুল লেন্থে বল ফেলছেন, কখনও বা শর্টে, আবার পরের বলটাই লো ফুলটস দিয়ে ব্যাটসম্যানকে মারতে প্রলুব্ধ করছেন। গুগলিতে বোকা বানাচ্ছেন, আর কুইকার ডেলিভারিটা তো তার মোক্ষম এক অস্ত্র!

সতেরোতম জন্মদিনের অল্প কয়েকদিন আগে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক হয়েছিল রশিদের। ২০১৫ সাল থেকে এখন পর্যন্ত আফগানিস্তানের জার্সি গায়ে ৩৭টা ওয়ানডে ম্যাচে তার উইকেটসংখ্যা ৮৬টি! মিচেল স্টার্ক ৫২তম ওয়ানডেতে পেয়েছিলেন শততম উইকেটের দেখা, ভেঙেছিলেন সাকলাইন মুশতাকের উনিশ বছরের পুরনো রেকর্ড। কিন্ত স্টার্কের রেকর্ডটা দুই বছরও টিকবে বলে মনে হচ্ছে না, সেটা ভাঙার লক্ষ্যে দুরন্ত গতিতে এগিয়ে যাচ্ছেন রশিদ।

রশিদ খান, আফগানিস্তানের ক্রিকেট, লেগস্পিন, সানরাইজার্স হায়দরাবাদ

ফ্র্যাঞ্চাইজি টি-২০ লীগগুলোতে তিনি এখন হটকেক। শুরুটা হয়েছিল বাংলাদেশেই, বিপিএলে কুমিল্লা ভিক্টরিয়ান্সের হয়ে। ২০১৬ সালে মাশরাফির শিরোপাজয়ী দলটার অন্যতম প্রধান অস্ত্র ছিলেন রশিদ। তবে এর মাস দুয়েক পরেই জীবনের সবচেয়ে বড় সুসংবাদ, কিংবা বিস্ময়ের মুখোমুখি হয়েছিলেন তিনি। গতবছরের ফেব্রুয়ারীতে আফগানিস্তানের হয়ে ওয়ানডে সিরিজ খেলতে রশিদ গেছেন জিম্বাবুয়েতে। আইপিএলের নিলামের তারিখ পড়লো তখন, নিলামের দিন একটা উত্তেজনা তো ছিলই, তবুও পরেরদিন প্র্যাকটিস সেশন থাকায় ঘুমিয়ে পড়েছিলেন রাতে। ভারতে তখন নিলাম শুরু হয়ে গেছে। বাড়ি থেকে রশিদের মা ফোন করলেন তাকে, জানালেন একটু পরে তার নাম তোলা হবে, তিনি টিভি খুলে বসলেন সেটা শুনে। খানিক পরেই চক্ষু ছানাবড়া হয়ে গেল তার, পঞ্চাশ লক্ষ রূপি ভিত্তিমূল্যের রশিদকে চার কোটিতে কিনে নিয়েছে সানরাইজার্স হায়দরাবাদ! কয়েকটা মূহুর্তের ব্যবধানে জীবন মানুষকে এভাবে বিস্ময় উপহার দিতে পারে, সেদিনের আগে এমনটা রশিদ খান বিশ্বাসই করতেন না হয়তো।

সেই আইপিএলে ১৪ ম্যাচে ১৭ উইকেট নিয়েছিলেন রশিদ, আগের আসরের বিস্ময় মুস্তাফিজকে দর্শক হয়ে থাকতে হয়েছিল তার উপস্থিতির কারণে। দল শিরোপা না জিতলেও, বল হাতে ভীতি ছড়িয়েছেন তিনি। একই বছরে গায়ানার হয়ে সিপিএল মাতিয়েছেন, সিপিএলের ইতিহাসে প্রথম হ্যাটট্রিকটা তার। গত সেপ্টেম্বরে বিগ ব্যাশে পড়েছিল তার পায়ের ছাপ, অ্যাডিলেড স্ট্রাইকার্সের হয়ে শিরোপা জিতেছেন সেই টুর্নামেন্টে, ছয় ম্যাচে শিকার করেছেন এগারো উইকেট।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটেও রশিদের জাদুকরী বোলিঙের সাক্ষী হয়েছে দর্শকেরা। সাঁইত্রিশ ম্যাচের ক্যারিয়ারেই তিনবার পাঁচ বা এর বেশী উইকেট শিকার করেছেন, প্রতিবারই ভিন্ন ভিন্ন প্রতিপক্ষের বিপক্ষে। ক্যারিয়ার গড় মাত্র ১৩.৭২, ঈর্ষা জাগানোর মতোই বটে! ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে সেন্ট লুসিয়ায় আঠারো রানে শিকার করেছিলেন সাত ব্যাটসম্যানকে, সেটাই তার ক্যারিয়ারসেরা বোলিং। আইপিএলের দল সানরাইজার্স হায়দ্রাবাদ এই মৌসুমেও ধরে রেখেছে রশিদকে, পারিশ্রমিকটা বেড়ে হয়েছে দ্বিগুণেরও বেশী, এই মৌসুমে তার মূল্য নয় কোটি রূপি! ন্যাটওয়েস্ট টি-২০ ব্লাস্টে খেলার জন্যে ডাক পেয়েছেন সাসেক্সের হয়ে, পিএসএলে খেলবেন কোয়েটা গ্লাডিয়েটর্সে। মেধা আর পরিশ্রমের মূল্য পাওয়া যায়, আগে হোক কিংবা পরে; সেটা রশিদ প্রমাণ করেছেন।

রশিদ খান, আফগানিস্তানের ক্রিকেট, লেগস্পিন, সানরাইজার্স হায়দরাবাদ

তার খাতা-কলমের বয়সটা নিয়ে অনেকের আপত্তি আছে। তবে এশিয়ান দলগুলোর জন্যে এটা নতুন কিছু নয়। এখানে ক্রিকেটারেরা সঠিক বয়সটা খুব কমই স্বীকার করেন, বোর্ডও বয়সভিত্তিক দলে খেলানোর জন্যে খেলোয়াড়দের বয়স কমায়। তবে আলোচনা রশিদের বয়স নিয়ে হবার কথা নয়, আলোচনা করা উচিত তার দুর্দান্ত বোলিং নিয়ে, প্রতিভার সাথে মেধাকে মিশেল করার দারুণ সক্ষমতা নিয়েই কথা বলাটা সমীচীন। আইসিসির অলরাউন্ডারদের র‍্যাঙ্কিঙে এখন চারে আছেন তিনি, ব্যাট হাতে মন্দ নন, ওয়ানডেতে ক্যারিয়ার গড় প্রায় তেইশ, আছে দুটো হাফসেঞ্চুরীও।

এখনকার ক্রিকেট অনেক বেশী প্রযুক্তিনির্ভর, কেউ একজন ভালো করলে তাকে আটকাতে প্রতিপক্ষ দলে গবেষণা হয় নিরন্তর, তার খেলার ভিডিও ফুটেজগুলো আতস কাঁচের নীচে ফেলে কাটাছেড়া করে বের করা হয় খুঁত। সময়ের সঙ্গে নিজেকে পরিবর্তন কিংবা পারফরম্যান্সের উন্নতি না ঘটালে সেই বোলার বা ব্যাটসম্যানকে পড়ে ফেলা এখন সময়ের ব্যপার। সেখানেই এখনও পর্যন্ত দারুণ ব্যতিক্রম রশিদ খান। অভিষেকের আড়াই বছর পরেও ব্যাটসম্যানদের কাছে নিজেকে দুর্বোধ্য করে রেখেছেন, নিজের সেরা অস্ত্রগুলোর পরিমিত ব্যবহার আর বোলিঙে দারুণ বৈচিত্র্যের কারণেই অনন্য হয়ে উঠছেন তিনি। তার লাইনটা মাপা, কিন্ত বলটা কোথায় ফেলবেন সেটা তিনি ছাড়া কেউ জানে না, আন্দাজ করেও লাভ হয় না খুব একটা। রানের জন্যে হাঁসফাঁস করতে করতে উইকেট বিলিয়ে দিয়ে আসা ছাড়া রশিদের বিপক্ষে খুব বেশী কিছু করারও থাকে না ব্যাটসম্যানের। র‍্যাঙ্কিঙের এক নম্বর বোলারের স্থানটায় তাই এই মূহুর্তে তার নামটাই সবচেয়ে মানানসই।

পাকিস্তানের শহীদ আফ্রিদিকে দেখে যে ছেলেটা ক্রিকেটার হতে চেয়েছিল, অনিল কুম্বলের বোলিং দেখে যে হাত ঘোরানো শিখেছিল, সেই রশীদ খান একদিন হয়তো তার আইডলদেরও ছাড়িয়ে যাবেন কৃতিত্বে। ব্যাটিং গড়ে আফ্রিদীর ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছেন; আফগানিস্তান টেস্ট স্ট্যাটাস পেয়েছে, একদিন হয়তো নামের পাশে কুম্বলের চেয়ে বেশী উইকেট থাকবে তার, সর্বকালের সেরা লেগস্পিনার হিসেবে শেন ওয়ার্নের নামের পাশে হয়তো কোন একদিন উচ্চারিত হবে রশিদ খানের নাম। ক্যারিয়ারে বড় কোন ইনজুরি হানা না দিলে রশীদকে নিয়ে এমন স্বপ্ন দেখাটা বাতুলতা নয় মোটেও।

বাড়ির সামনে টেপ টেনিস বল দিয়ে ভাইদের সঙ্গে ক্রিকেট খেলা সেই ছোট্ট ছেলেটা এখন আন্তর্জাতিক তারকা, ক্রিকেটবিশ্বেই যার দারুণ চাহিদা, আফগান ক্রিকেটভক্তদের আশা ভরসার পুরোটাই এখন উনিশ বছরের এই তরুণের কাঁধে। ক্রিকেটের মহাসাগরে যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তানের সাম্পান এগিয়ে যাচ্ছে দ্রুতগতিতে, সেই সাম্পানের হাল ধরে আছেন রশিদ খান নামের এক তরুণ তুর্কী।

ছবি কৃতজ্ঞতা- ইএসপিএন ক্রিকইনফো

Comments
Spread the love