গ্যালারীর চারপাশে প্যানেলগুলোতে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে নানা ধরনের বেশ কয়েকটি পোশাক। যার মধ্যে প্যান্ট, পাজামা, স্নান স্যুট, স্পোর্টস ড্রেস, একটি শিশুর স্কুল ইউনিফর্ম, পুলিশের ড্রেসসহ রয়েছে আরও নানাবিধ পোশাক। সম্প্রতি বেলজিয়ামের ব্রাসেলসে “What Were You Wearing?” শিরোনামে হয়ে গেল এমনই আলোচিত এক প্রদর্শনী। সারা বিশ্বব্যাপী যারা ধর্ষণে ধর্ষকের সাথে সাথে ধর্ষিতাকেও পোশাকের জন্য আংশিকভাবে দোষারোপের চেষ্টা করে থাকেন, তাদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনে অভিনব এই প্রদর্শনী আয়োজন ছিল মোক্ষম এক জবাব। নারীর প্রতি সহিংসতাকে ইতিপূর্বে পৃথিবীর নানা প্রান্তে নানাভাবে তুলে ধরা হলেও এই আয়োজনটি অন্যসব আয়োজন থেকে একেবারেই ভিন্নতর।

ধর্ষণের সময় ধর্ষিতরা কি পোশাক পরিহিত অবস্থায় ছিল তা তুলে ধরাই ছিল ব্রাসেলস প্রদর্শনীর মূল উপপাদ্য। যদিও এই ধারণাটা প্রথম তারা পায় যুক্তরাষ্ট্রের কানসাস ইউনিভার্সিটির একদল শিক্ষার্থীর গবেষণা থেকে। যেখানে তারা যুক্তরাষ্ট্রের ধর্ষণ কেসে ভিক্টিমের পোশাক কতটা দায়ী বা আদৌ দায়ী কিনা তা তুলে আনার চেষ্টা করে। সেই সাথে কোন নির্দিষ্ট পোশাকের জন্য ধর্ষিত হবার সম্ভাবনা বের করার কোন উপায় আছে কিনা সেটিও খতিয়ে দেখতে চায়। এখানে উল্লেখ্য যে ২০১৫ সালে, VRT এর De Redactie ওয়েবসাইটে বলা হয়েছিল যে, দেশটিতে নারী ও পুরুষ মোট ধর্ষণের মাত্র ১০% ঘটনা পুলিশের রিপোর্টে অন্তর্ভুক্ত হয়। এবং যার ভেতর প্রতি দশটির মধ্যে মাত্র একটি ক্ষেত্রে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করে সাঁজা দেয়া হয়। এই গবেষণার ফলাফলে গবেষক দল আলামত সংগ্রহে যখন পোশাকগুলো জমা করেন, তখন স্কুলের বাচ্চা থেকে শুরু করে বৃদ্ধ পর্যন্ত বহু বয়সের নানা ধরনের পোশাক দেখতে পান। ইউএসে এই গবেষণার প্রতিবেদন প্রকাশিত হবার পরই বেলজিয়ামের এই আয়োজক কমিটি ঘটনাস্থলের ধর্ষিতাদের পোশাকের হুবহু কপি জনসম্মুখে তুলে ধরতে সম্মত হন। যেখানে আগত অতিথিরা ধর্ষণে নারীর পোশাককে দায়ী করার ক্ষেত্রে সমাজের প্রচলিত স্টেরিওটাইপ ভাঙ্গতে পারবেন বলে তারা মনে করেন। প্রদর্শনীর আয়োজনকারীরা পোশাকের আদলে অনুরূপ পোশাক তৈরির দায়িত্ব দেয় সিএইউএইচ ইস্ট ব্র্যাবেন্ট নামক একটি কোম্পানিকে।

তবে বেলজিয়ামে অভিনব এরকম একটি প্রদর্শনীটির আয়োজন করতে কিন্তু তাদের কম চড়াই-উতরাই পার হতে হয়নি। কর্তৃপক্ষের অনেকেই শুরুতে উত্তেজক পোশাককে হিংসাত্মক যৌন অপরাধের একটি ফ্যাক্টর হিসেবে ভেবে এরকম আয়োজনের বিরোধিতা করে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আয়োজকরা প্রমাণ করতে পারে যে ধর্ষণের শিকার ব্যাক্তি এক্ষেত্রে সম্পূর্ণ নির্দোষ এবং তার পোশাক কিংবা চলাফেরা এর জন্য কোনভাবেই দায়ী নয়। ভিক্টিমের পরিহিত কাপড় যে নিছকই এক টুকরো কাপড়, তা কোন প্রলুপধকারক নয় সেটি তারা স্পষ্টত তুলে ধরতে সমর্থ হন বলেই এই আয়োজনের অনুমতি মেলে। জানুয়ারির ১৬ থেকে ২০ তারিখ পর্যন্ত চলে এই বিচিত্র ধরনের প্রদর্শনীটি। আয়োজনটি ব্যাক্তির জীবনে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন বাজে অভিজ্ঞতার বিনিময় এবং তার আলোকে শিক্ষাগ্রহণ ও বদ্ধমূল স্টেরিওটাইপকে চ্যালেঞ্জ করতে পারবে বলে আয়োজকরা বিশ্বাস করেন। আয়োজকদের একজন গোসেন্স সমগ্র ইউরোপের চারপাশে এরকম প্রদর্শনীর আয়োজন ছড়িয়ে পরবে বলেও আশা করেন। সেই সাথে তিনি এটিও মনে করেন যে এ বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টি করতে চাইলে একটি স্কুল কিংবা একটি বিশ্ববিদ্যালয়ও নিজেদের উদ্যোগে এরকম আয়োজন করতে পারে।

প্রদর্শনীটিতে একটি বাচ্চা মেয়ের ‘আমার লিটল পনি’ শিরোনামে একটি টিশার্টও ঝোলানো ছিল। যেটি নিয়ে আয়োজকদের পক্ষ থেকে মিস কেনেস বলেন, এই শতাব্দীতে এখনও “যৌন নিন্দা করা” যৌন হামলা মামলায় একটি সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভিক্টিমের রাতে বাইরে চলাফেরা করা, ফ্লার্ট করা, বা সঙ্গী ছাড়া একাকী ঘুরে বেড়ানোর জন্য সবসময়ই দোষারোপ করা হয়। এই বর্বরতাকে সমর্থনেও যারা পোশাককে দায়ী করে তাদের কাছে আমার একটাই প্রশ্ন। একটি বাচ্চা মেয়ের টিশার্টও কি তবে ধর্ষকদের প্রলুব্ধ করেছিল? ধর্ষণে প্রকৃত দোষী কে এবং কীভাবে তা রোধ করা যায় এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, “There is only one person responsible, one person who could prevent rape: the perpetrator.”

দর্শনার্থীরা মনে করেন, এরকম প্রদর্শনীর আয়োজন নিঃসন্দেহে জনগণের মানসিকতা পরিবর্তন করতে সহায়ক হতে পারে, যা ধর্ষণের ক্ষেত্রে কেবলমাত্র ধর্ষককেই সহিংসতা ও যৌন নির্যাতনের জন্য দায়ী করবে। ধর্ষণকে ভিন্ন কোন খাতে কিংবা পোশাককে দায়ী করবে না।

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-