অনলাইন-সোশ্যাল মিডিয়া নির্বিশেষে গত ক’দিন ধরে চারিদিকে চলছে ব্লু হোয়েল আর ফুটবল উন্মাদনা! আর্জেন্টিনা রাশিয়া বিশ্বকাপে খেলতে পারবে কিনা, আর্জেন্টাইন সমর্থকেরা কতটা চাইল্ডিশ ইত্যাদি নানা আলোচনার ভেতরে একটা ঘটনা সম্ভবত আমাদের চোখ এড়িয়ে গেছে। সেটা হচ্ছে ভারতের দিল্লিতে মাত্র ১১ মাসের একটা শিশুকে মায়ের কোল থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে দু’ঘন্টা ধরে ধর্ষণ করেছে ৩৬ বছর বয়সী এক নরপশু। পুলিশের হাতে ধরা পড়ার পর সেই নির্মাণশ্রমিক দোষ স্বীকার করে বলেছে, ফুটপাতে ঘুমন্ত ওই নারীর কোল থেকে তার ঘুমিয়ে থাকা বাচ্চাটাকে তুলে নিয়ে পাশের ঝোপে প্রায় দু’ঘন্টা ধরে ধর্ষণ শেষে যখন শিশুটির প্রবল রক্তপাত হতে হতে অচেতন হয়ে পড়ে, তখন সে শিশুটি মারা গেছে ভেবে তাকে ঝোপের ভেতর ছুঁড়ে ফেলে পালিয়ে যায়। শিশুটি বর্তমানে পশ্চিম দিল্লির দ্বীন দয়াল উপ্যাধ্যায় হাসপাতালে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে! ১১ মাস বয়সী একটা ছোট্ট বাচ্চা, ৩৬ বছর বয়সী এক শতক সমর্থ যুবক, ২ ঘন্টা ধরে ধর্ষণ! শুনতে কি অবিশ্বাস্য লাগছে?

দুঃখিত, আপনার সদয় অবগতির জন্য জানাচ্ছি এটা মোটেও অবিশ্বাস্য কিছু নয়। সেই সাথে আপনারা যারা এই ইস্যুতে ধর্ষণের প্রতিবাদ না করে বরং ভারতকে রেপ+ইন্ডিয়া বা রেন্ডি+ইয়া= রেন্ডিয়া বলে গালি দেওয়ার জন্য কোমর বেঁধে প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তাদের অবগতির জন্য আরেকটা ধর্ষণের খবর দেই! হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার দেউন্দি চা বাগানের এক নারীকে ধর্ষণ করা হয়েছে সেই একই দিনে। অদ্ভুত ব্যাপারটা কি জানেন? সেই নারীর বয়স ১১৫ বছর! শিশু ধর্ষনে অভ্যস্ত হয়ে পড়া আমরা এবার ছাড় দেইনি অতিশীপর বৃদ্ধাকেও। ভাবতে পারেন?

ধর্ষণের শিকার ঐ বৃদ্ধাকে কিন্তু সাথে সাথে হাসপাতালে নেওয়া হয়নি। ঘটনার প্রায় পাঁচদিন কেটে গেলেও প্রভাবশালীদের ভয়ে পুলিশের কাছে যায়নি পরিবারটা। শেষ পর্যন্ত মঙ্গলবার দুপুরে ওই বৃদ্ধা নারীকে নিয়ে চুনারুঘাট থানায় হাজির হন তার পরিবার। পরে পুলিশ বিষয়টি আমলে নিয়ে বৃদ্ধার চিকিৎসার জন্য হবিগঞ্জ সদর আধুনিক হাসপাতালে পাঠিয়ে দেয়। শেষ পর্যন্ত বিকেল ৩ টার দিকে মুমূর্ষু অবস্থায় হবিগঞ্জ সদর আধুনিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয় ওই বৃদ্ধাকে। পরে তিনি সাংবাদিকদের জানান, গত সপ্তাহের বৃহস্পতিবার দিনগত মধ্যরাতে একই বাগানের প্রণব মুরার ছেলে অনুলাল মুরা (২৫) ঘরের দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে। পরে সে ওই বৃদ্ধাকে অস্ত্র দিয়ে ভয় দেখিয়ে ধর্ষণ করে পালিয়ে যায়। পরে ঘটনাটি এলাকায় জানাজানি হলে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান শামীম মিয়াসহ মাতবররা সালিশ বৈঠকের মাধ্যমে মীমাংসার উদ্যোগ নেন। যার নমুনা- পাঁচদিন পর আশংকাজনক অবস্থায় বৃদ্ধাকে হাসপাতালে ভর্তি!

একটু কনফিউজড? কোন অংশের প্রতিবাদ করবেন আর কোন অংশটা এড়িয়ে যাবেন? আচ্ছা, প্রত্যেকটা ধর্ষণের পরেই কেন আমরা ধর্ষণের প্রতিবাদ করার আগে পরে “কিন্তু/যদিও/তবে” ইত্যাদি শব্দ জুড়ে দিয়ে ধর্ষিতার কাপড়চোপড়ের দোষ, রাতে একলা বাইরে বের হওয়ার দোষ, পরপুরুষের সাথে বের হওয়ার দোষ, ছিলা কলা/খোলা মিষ্টি ইত্যাদি হবার দোষ, ভারতের নাগরিক হওয়ার দোষ, ভারতের দোষ ইত্যাদি অসংখ্য দোষের প্রতিবাদ শুরু করি এবং আমাদের এই দ্বিতীয় প্রতিবাদের তোড়ে আসল ধর্ষণের প্রতিবাদ তলিয়ে যায় কোন অতলে! অথচ নারী কিংবা পুরুষ না, একজন সত্যিকারের মানুষ হিসেবে আমাদের উচিৎ ছিল ধর্ষণের কারণ খোঁজার আগে ধর্ষণের প্রতিবাদ করা, ধর্ষকের বিচার চাওয়া- ধর্ষিতার দোষ খোঁজা নয়, ধর্ষিতা কোন দেশের সেটা দেখা নয়, কোন দেশকে রেন্ডিয়া বলা নয়। ধর্ষণের মত এমন নির্লজ্জতম পাশবিক অপরাধের কথা শুনে একজন সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষের যেখানে প্রবল ক্রোধে ফেটে পড়ার কথা, সেখানে আমরা কিছু মানুষ হয়তো দুর্বল গলায় প্রতিবাদ করি ঠিকই, কিন্তু বাকীরা সবাই সেফ সাইডে চলে গিয়ে সবার আগে আঙ্গুল তুলি ধর্ষিতার দিকে, নিশ্চয়ই তার কোন সমস্যা ছিল, সে কোন অপরাধ করছে, ভালা মাইয়ারা তো রেইপ হইব না, তাই না?

দিল্লির ঐ ১১ মাস বয়সী নিষ্পাপ শিশুটার কি অপরাধ করতে পারে, কি দোষ করতে পারে, উগ্র কাপড় পড়তে পারে কিনা, তা আমরা জানি না। ঠিক তেমনি ১১৫ বছর বয়সী অতীশিপর বৃদ্ধা মা’কে ঘরের ভেতর ঢুকে পাশবিক নির্যাতন চালাতে কতটা ঘৃণ্য কীট হতে হয়, সেটাও আমাদের চিন্তায় ধরে না। গত কয়েক মাস ধরে দেশে যে শিশু ধর্ষণের উৎসব চলছে, ২-৩-৪ বছর বয়সী বাচ্চাদের একের পর এক ধর্ষণ করা হচ্ছে, মেরে ফেলা হচ্ছে নির্দ্বিধায়, এবং এসব ঘৃণ্য অপরাধের পর যেভাবে আমরা চুপচাপ দেখেও না দেখার ভান করে এড়িয়ে যাচ্ছি, তাতে আমাদের ভেতর আদৌ মনুষ্যত্ববোধ বলে কিছু অবশিষ্ট আছে কিনা, সেটা আবার নতুন করে ভাবতে হচ্ছে। ক’দিন আগেই রূপা নামের একটা মেয়েকে চলন্ত বাসের ভেতর শেষ যাত্রী হওয়ার অপরাধে গণধর্ষণের পর ঘাড় মটকে মেরে ফেলা হলো। ক’বছর আগে ভারতেও ঠিক একইভাবে নির্ভয়া নামে এক তরূণীকে বাসের ভেতর গণধর্ষণের পর ঘাড় মটকে মেরে ফেলা হয়েছিল। ভারতবাসী বিচারের দাবীতে নেমে এসেছিল রাস্তায়, হাজার হাজার লাখ লাখ মানুষের তীব্র প্রতিবাদ আর আন্দোলনের মুখে শেষপর্যন্ত ধর্ষকরা গ্রেফতার হয়েছিল, বিচার শেষে ফাঁসীর রায় হয়েছিল তাদের। ভারতবাসী ফাঁসী কার্যকরের পর শান্ত হয়েছে, নির্ভয়ার জন্য কেঁদেছে, বিচার নিয়েই তারা ফিরেছে ঘরে। আর ভারতীয়দের উঠতে বসতে রেন্ডিয়া বলে গালাগালি দেওয়া আমরা রুপার ধর্ষণের পর দু’দিন অনলাইনে তীব্র প্রতিবাদ করেই দায়িত্ব শেষ করেছি, অন্য ইস্যু বা অন্য টপিক আমাদের হারিয়ে গেছে আমাদের বিচারের দাবী, দুর্ভাগা রুপার ধর্ষণের নির্মম ঘটনাটি আরও কয়েক হাজার বা কয়েক লক্ষ ধর্ষণের ঘটনার মত মিলিয়ে গেছে। রূপাকে ভুলে গেছি আমরা কত সহজে!

এই দেশে যত ধর্ষণ হয়, যত নির্যাতন হয়, চার বছর বয়সী শিশু কিংবা ৮০ বছর বয়সী বৃদ্ধা, মর্ডান ফ্যাশনেবল নারী কিংবা বোরকা-হিজাবে ঢাকা মেয়েটা, সবার ক্ষেত্রেই সব সময়ই দোষটা স্রেফ মেয়েটার। ধর্ষক সবসময়ই পরিস্থিতির শিকার, তার সামনে একটা আস্ত মেয়ে থাকলে(সে যেভাবেই থাকুক না কেন) সে কেন ধর্ষণ করবে না? কেন শিশ্ন নিয়ে হামলে পড়বে না। অথচ এই আমরাই নিজেদের একুশ শতাব্দীর সভ্য মানুষ বলে পরিচয় দেই। সৃষ্টির সেরা আশরাফুল মাখলুকাত বলে পরিচয় দেই। একটুও লজ্জা করে না? একটা মুহুর্তের জন্যও না?

ভারতের সেই ১১ মাস বয়সী বাচ্চাটার ধর্ষক নরপিশাচকে কিন্তু পুলিশ গ্রেফতার করেছে তৎক্ষণাৎ! তারা কিন্তু সালিশ করে মিটিয়ে ফেলার চেষ্টা করেনি। অথচ ১১৫ বয়সী অতিশীপর বৃদ্ধা মা’কে ধর্ষণ করে যাওয়া ঐ নরপশুকে এখনো গ্রেফতার করতে পারিনি আমরা। ওরা আমাদের কাছে রেন্ডিয়া হিসেবে পরিচিত হয়েও ধর্ষককে অন্তত বিচারের মুখোমুখি করছে, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিচ্ছে, আমরা কি করছি? স্রেফ ইস্যুভিত্তিক ফেইসবুকিং?

আপনার কাছে কেমন লেগেছে এই ফিচারটি?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-

এই ক্যাটাগরির অন্যান্য লেখাগুলো