সিনেমা হলের গলি

রনবীর যেভাবে ‘সাঞ্জু’ হয়েছিলেন!

বলিউড এখন আক্রান্ত ‘সাঞ্জু’ জ্বরে। বলিউডের সর্বকালের সবচেয়ে বিতর্কিত অভিনেতাদের একজন সঞ্জয় দত্তের জীবনের উল্লেখযোগ্য কিছু ঘটনা অবলম্বনে রাজকুমার হিরানী নির্মাণ করেছেন এই সিনেমা। সঞ্জয় দত্তের চরিত্রে অভিনয় করেছেন রনবীর কাপুর। পুরো সিনেমাতেই দুর্দান্ত অভিনয় করেছেন তিনি, অনেকের মতে, রনবীরের ক্যারিয়ারের সেরা অভিনয় এটা। সিনেমা দেখে মাল্টিপ্লেক্স বা থিয়েটার থেকে বের হয়ে আসা দর্শক প্রশংসায় ভাসাচ্ছেন রনবীরকে, চলচ্চিত্র সমালোচকেরাও মেতে উঠেছেন রনবীর বন্দনায়।

টিজার আর ট্রেলার দেখে রনবীর কাপুর কি করবেন সেটার একটা আন্দাজ পাওয়া গিয়েছিল। সঞ্জয়রূপী রনবীর তো জানিয়েই দিয়েছিলেন, শক্ত হয়ে বসুন, তুফান আসছে! তুফান নিয়ে এসেছেন রনবীর কাপুর নিজেই। একটা মানুষের চরিত্রে এভাবে ঢুকে যেতে পারে, একটা চরিত্রের সাথে নিজেকে মিশিয়ে একাকার করে ফেলতে পারে, সেটা সাঞ্জু না দেখলে, রনবীরের অভিনয় না দেখলে বোঝা সম্ভব নয়। এমন দুর্দান্ত ট্রান্সফরমেশন রনবীরের চাইতে ভালো এই মূহুর্তে বলিউডে আর কেউ করে দেখাতে পারবেন না বোধহয়।

সাঞ্জু’র মাতাল অবস্থার দৃশ্যগুলো, আর প্রথমবার জেল খাটার সময়টায় রনবীরের অভিনয় প্রতিটা দর্শকই উপভোগ করেছেন তারিয়ে তারিয়ে। ড্রাগের জন্যে একটা মানুষ কতটা বেপরোয়া হতে পারে, সেটা একজন ড্রাগ অ্যাডিক্ট ছাড়া আর কেউ বুঝবে না। পর্দায় রনবীরকে দেখে একবারও মনে হয়নি তিনি মাতাল নন। কোকেন না পেয়ে মৃগিরোগীর মতো খিঁচুনী উঠছে তার, সেই দৃশ্যগুলোতে তিনি কি অসাধারণ অভিনয়টাই না করলেন!

সাঞ্জু, রাজকুমার হিরানী, রনবীর কাপুর, সঞ্জয় দত্ত, বায়োপিক

অভিনয় জিনিসটা শুধু ঈশ্বরপ্রদত্ত প্রতিভার ব্যাপার নয়। সেটার জন্যে ডেডিকেশন লাগে, কঠোর সাধনা আর অমানুষিক পরিশ্রমও দরকার হয়। কিভাবে সাঞ্জু হয়েছিলেন রনবীর? কতটা কষ্ট করতে হয়ছিল তাকে, এই চরিত্রটার ভেতরে ঢোকার জন্য?

পরিচালক রাজকুমার হিরানী নিজেই জানিয়েছেন, সাঞ্জু’র রোলে অভিনয়ের জন্যে মেকাপ নিতে প্রতিদিন প্রায় পাঁচ-ছয় ঘন্টা সময় লাগতো। রনবীর রাত তিনটায় এসে হাজির হয়ে যেতেন সেটে, কোন অভিযোগ-অনুযোগ ছাড়াই। ভোর আটটা থেকে শুটিং শুরু হতো, বাকীদের চেয়ে পাঁচঘন্টা আগে এসে সেটে বসে থাকতেন রনবীর। কোনদিন ভোরবেলায় হয়তো হিরানী একটু আগেই চলে এসেছেন, দেখতেন কোথাও কেউ নেই, শুধু একটা মিনি ভ্যানের ভেতরে আলো জ্বলছে, সেখানে মেকাপ টিমের কয়েকজন কাজ করছেন রনবীরকে নিয়ে। সেই পরিশ্রমের সুফলটার দেখা মিলেছে সাঞ্জুতে। প্রতিটা ডায়লগে, প্রতিটা সিকোয়েন্সে আপনি সঞ্জয় দত্তকে খুঁজে পাবেন, রনবীর কাপুরকে নয়।

বছর দুয়েক আগের কথা। রনবীর আগেই শুনেছিলেন, রাজকুমার হিরানী সঞ্জয় দত্তের বায়োপিক বানানোর কাজে নামতে যাচ্ছেন। কাজেই তার মোবাইলে যেদিন হিরানীর নাম্বার থেকে মেসেজ এলো, যে হিরানী রনবীরের সাথে দেখা করতে চান, রনবীরের প্রথম প্রশ্নটা ছিল- “তুমি নিশ্চয়ই সাঞ্জু নিয়ে কথা বলার জন্যে ডাকবে না আমাকে?”

সাঞ্জু, রাজকুমার হিরানী, রনবীর কাপুর, সঞ্জয় দত্ত, বায়োপিক

রনবীর নিজেকে কখনও সাঞ্জু হিসেবে নিজেকে কল্পনা করেননি। কারণ দুজনের ব্যক্তিসত্ত্বায় আকাশ-পাতাল পার্থক্য। যেন দুটো ভিন্ন গ্রহের মানুষ দুজনে। আর রনবীরের চিন্তা ছিল, একজন নায়ক যিনি এখনও কাজ করছেন, অভিনয় করছেন, তাকে নিয়ে বায়োপিক বানালে দর্শক সেটা কিভাবে নেবে? সিনেমার গল্পটা শুনেও পুরোপুরি বিশ্বাস হয়নি রনবীরের। কয়েকটা জায়গা অতিরঞ্জিত মনে হয়েছিল তার কাছে। রনবীর হিরানীকে জিজ্ঞেসও করেছিলেন, তুমি নিশ্চয়ই এই জায়গাটা নিজে লিখেছো, বা এই টুইস্টটা নিশ্চয়ই তোমার বানানো? হিরানী জবাব দিয়ছেন, স্ক্রীপ্টে যা আছে সবটাই সত্যি, সবকিছুই সঞ্জয়ের জীবনে ঘটেছিল!

সঞ্জয় দত্তের জীবনের ছয়টা আলাদা আলাদা সময়কে ধারণ করা হয়েছে সিনেমায়। একুশ বছর বয়স থেকে একদম বর্তমান বয়স- পুরোটাই উঠে এসেছে সিনেমায়৷ বিভিন্ন বয়সের সঞ্জয়কে পর্দায় উপস্থাপনের জন্যে তার জীবনের অনেকগুলো অধ্যায়কে বাধ্য ছাত্রের মতো মুখস্ত করে ফেলতে হয়েছে রনবীরকে। সঞ্জয় কিভাবে হাঁটেন, কিভাবে কথা বলেন, কিভাবে গাল চুলকান, মাথার চুলগুলো কিভাবে ওপরের দিকে উঠিয়ে দেন, রেগে গেলে সঞ্জয়ের মুখভঙ্গি কেমন পরিবর্তন হয়, সবকিছু তিনি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে আত্মস্থ করেছেন। আশি আর নব্বই দশকে সঞ্জয় দত্ত যতোগুলো সিনেমা করেছেন, প্রায় সবগুলোই রনবীর দেখে ফেলেছেন, শুধু নিঁখুতভাবে সঞ্জয়কে অনুকরণ করবেন বলে!

সাসাঞ্জু, রাজকুমার হিরানী, রনবীর কাপুর, সঞ্জয় দত্ত, বায়োপিকঞ্জু, সঞ্জয় দত্ত, রনবীর কাপুর, রাজকুমার হিরানী

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল বডি ট্রান্সফরমেশনের ব্যাপারটা। সিনেমার শুটিং যখন শুরু হয়েছে, রনবীর তখন জাজ্ঞা জাসুসের কাজ শেষ করেছেন সবে। তার ওজন তখন সত্তর কেজি। হিরানীর সিনেমায় অভিনয়ের জন্যে নব্বই কেজি পর্যন্ত ওজন বাড়াতে হবে, সঞ্জয়ের বর্তমান বয়সের চরিত্রটা ফুটিয়ে তোলার জন্যে। রনবীর গেলেন আমির খানের কাছে। দাঙ্গালে আমির খানের বডি ট্রান্সফরমেশনটা তো বলিউডে বিখ্যাত হয়ে গেছে। আমিরই রনবীরকে পরামর্শ দিয়েছিলেন, আগে ওজন বাড়িয়ে ধীরে ধীরে কমাতে। নইলে সিনেমা শেষ হলে আর ওজন কমানোর আগ্রহ থাকবে না।

রনবীর সেই পরামর্শ মেনেই কাজ করেছিলেন। পুরো সিনেমাটা তাই রিভার্স শুট হয়েছে। প্রথমে সঞ্জয়ের বর্তমান বয়সের অংশটার শুটিং করা হয়েছে, তারপর ধীরে ধীরে মধ্যবয়স, তরুণ বয়সের দৃশ্যগুলো ধারণ করা হয়েছে ক্যামেরায়। ওজন বাড়ানোর জন্যে দিনে সাত-আটবেলা খেয়েছেন রনবীর, রাত তিনটায় উঠে কড়া মিষ্টি করে বানানো মিল্কশেক গিলেছেন। মাসল বানানোর জন্যে মাসের পর মাস দিনমান জিমে পড়ে থেকেছেন। অভিনয় জিনিসটা যে সহজ কিছু নয়, সেটা সাঞ্জু’র রনবীরকে দেখলেই বোঝা যায়।

সাঞ্জু, রাজকুমার হিরানী, রনবীর কাপুর, সঞ্জয় দত্ত, বায়োপিক

এরপরেও যখনই দরকার পড়েছে, সঞ্জয়কে একটা ফোন করেই তার বাড়িতে ছুটে গিয়েছেন রনবীর। কোন বিষয়ে খটকা লাগলেই পরামর্শ নিয়েছেন৷ পরদিন হয়তো সিনেমার প্রিমিয়ারের সেই দৃশ্যটার শুটিং হবে, আগের দিন রনবীর উপস্থিত হয়েছেন সঞ্জয়ের ফ্ল্যাটে। পাশের ফাঁকা সিটটা দেখে কেমন লেগেছিল সঞ্জয়ের? প্রথম সিনেমা মুক্তির আনন্দ, আর মা’কে হারিয়ে ফেলার কষ্ট- এই দুটো মিলিয়ে সঞ্জয়ের মানসিক অবস্থা কেমন ছিল সেদিন? সেই গল্পগুলো সঞ্জয়ের মুখ থেকেই শুনেছেন রনবীর, প্রস্তত করেছেন নিজেকে।

এই কষ্টের ফলটাও হাতেনাতে পেয়েছেন রনবীর। তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় হিট হতে চলেছে সাঞ্জু। সিনেমাটা মুক্তির প্রথম পাঁচ দিনে শুধু ভারত থেকেই আয় করেছে ১৬০ কোটি রূপির বেশি। তবুও রনবীর এটার কৃতিত্ব নিতে নারাজ৷ তার মতে- “সাঞ্জু সবার পছন্দ হয়েছে, মানুষ দেখতে আসছে, এটা অবশ্যই পরিচালকের কৃতিত্ব৷ সবাই জানে এটা রাজকুমার হিরানীর সিনেমা, তার ওপরে সঞ্জয় দত্তের বায়োপিক। এই দুটোই সিনেমার সাফল্যের সবচেয়ে বড় কারণ। তার পরে যদি কোন কারণ থেকে থাকে সিনেমাটা দেখার, তাহলে সেটা হয়তো আমি হতে পারি…”

কষ্টে নাকি কেষ্ট মেলে। যারা কথাটায় বিশ্বাস করেন না, তারা চাইলে রনবীরকে দেখতে পারেন৷ রনবীর কাপুর প্রমাণ করেছে, সাফল্য অর্জনের কোন শর্টকাট রাস্তা নেই। সেটার জন্যে নিজেকে উজাড় করে দিয়ে পরিশ্রম করতে হবে। তবেই মিলবে কাঙখিত সাফল্য।

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close