সিনেমা হলের গলি

রনবীর কাপুর- নেপোটিজমের আঁধারে আলোর দিশারী (শেষ পর্ব)

প্রথম পর্বের পর…

রনবীর কাপুর…ক্যারিয়ারের শুরুটা যার হয়েছিল ‘কাপুর’ নামের ছায়া নিয়ে। বছর পাঁচেক পর সে ছায়া অনেকটাই অস্তাগত তখন। রনবীরকে রনবীরের নামেই চিনছে সবাই, চিনছে তার অভিনয় দিয়ে। ব্যক্তিগত জীবনে স্ট্রাগল করা রনবীর তখন অনেকটাই বিধ্বস্ত যেন, অভিনয়ই তাকে সুযোগ করে দেয় কেবল এস্কেপিস্ট হবার। কিন্তু এই বিষণ্ণতা আর প্যাশনটাই তখন দরকার ছিল ইমতিয়াজ আলির। তার ‘রকস্টার’ সিনেমার স্ক্রিপ্টে এক এস্পায়ারিং সিঙ্গারের কথা বলা হয়েছে, যে শিল্পী হতে গিয়ে প্রেমিক হয়ে যায় আর প্রেমিক হতে গিয়ে শিল্পী। আর সে স্ক্রিপ্টে তিনি চান রনবীরই কাজ করুক। ভালবাসায় ব্যর্থতার কষ্ট যে ফুটিয়ে তুলতে পারবে, পারবে ভেতরের আগ্রাসনটাকে গানের মাধ্যমে বের করে আনতে। রনবীর রাজি হয়ে যান, রাজি হয়ে যান এ আর রেহমানও। মিউজিকের এই মায়েস্ত্রোও হয়তো ধারণা করতে পেরেছিলেন যে একটা ইতিহাস গড়তে যাচ্ছেন তারা।

রনবীর নিজেকে যেন ঢেলে দিলেন জর্ডান ক্যারেক্টারে। জিম মরিসন থেকে অনুপ্রাণিত হওয়া জনার্দনের মিউজিকের প্রতি প্যাশন প্রথমে খুবই মিষ্টি লাগে, তারপর ভালোবাসায় প্রত্যাখ্যাত হয়ে আর পরিবার থেকে চ্যুত হয়ে বাস্তবতার আঁচ পাওয়া জনার্দন যখন জর্ডান হয়ে ওঠে তখন সে গল্প আমাদের কাঁদায়। কাঁদায় হতাশ রনবীরের ঈশ্বরের কাছে কুন ফায়া কুন বলে আত্মসমর্পণ, কাঁদায় রনবীরের সাড্ডা হাক বলে ব্যর্থ ভালবাসার চিৎকারটাও। রনবীর জনার্দন হোক জর্ডান দুই চরিত্রকেই যেন গিলে খেয়ে নিয়েছিলেন। এতটা সাবলীল অভিনয় মাত্র পাঁচ বছরের অভিনয় আয়ু নিয়ে কী আদৌ সম্ভব! মোহিত চৌহানের কণ্ঠ যেন আদতেই রনবীরের কণ্ঠ হয়ে ওঠে, এ আর রেহমানের হৃদয়চেড়া সঙ্গীত মুগ্ধ করে দেয়। আর আমরা পাই আরও পরিণত রনবীরকে। যে রনবীর ‘কাপুর’ লেগ্যাসি থেকে গা ঝাড়া দিয়ে এখন রনবীর লেগ্যাসি স্থাপন করতে প্রস্তুত।

এরপর রনবীরের কাছে এলেন অনুরাগ বসু। এই বঙ্গ নির্মাতা এতোদিন ধরে নিজের মনমতো করে কিছু বানাতে পারছিলেন না যেন। বড় বড় প্রোডাকশন হাউজগুলো তার ক্রিয়েটিভিটিকে যেন ধামাচাপা দিয়ে রেখেছিল। তাই এবার তার মনমতো কিছু বানাতে চাইলেন তিনি, সঙ্গী কে হল তার? হ্যাঁ, সেই রনবীর কাপুর। এক মূক ও বধির চরিত্রে অভিনয় করার জন্য রনবীর সাহস পেলেন হয়তো তিনি রনবীর বলেই। তার বিপরীতে প্রিয়াঙ্কা চোপড়া অটিস্টিক মেয়ের চরিত্রে, আর সাথে নবাগতা ইলিয়ানা ডিক্রুজ। ডিজএবেল চরিত্রের কথা শুনলেই হয়তো আন্দাজ করা যায় খুব দুঃখের কোন সিনেমা হবে, কিন্তু না। অনুরাগের স্বভাবসুলভ হাস্যরসই যেন এই সিনেমার মূল বাহন। ‘বারফি’ নামের এই সিনেমায় রনবীর একটা কথা উচ্চারণ করা ছাড়াই দর্শকদের মন জয় করে নেন। দারুণ মিষ্টি একটা গল্প, কলকাতার নৈসর্গিক প্রেক্ষাপটে পড়ে যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে। রনবীর নিজ চরিত্রের জন্য অনুপ্রেরণা নেন চার্লি চ্যাপলিন আর রবার্তো বেনিগনির কাছ থেকে। বারফি একইসাথে দর্শকের ভালোবাসা আর সমালোচকদের প্রশংসা দুটোই কুড়ায়। আর রনবীর আবারও দুর্দান্ত, অদম্য অভিনয় দিয়ে সব পুরস্কার বাগিয়ে নেন।

২০১৩ তে এসে রনবীর তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় বক্স অফিস সাকসেস লাভ করেন তার বন্ধু আয়ান মুখার্জীর নতুন সিনেমা ‘ইয়ে জাওয়ানি হে দিওয়ানি’ দিয়ে। আয়ান সবসময়ই চেষ্টা করেন একটু ভিন্ন এঙ্গেল থেকে গল্প বলার। ওয়েক আপ সিডের আলসে, অকর্মণ্য সিড এখন বানি হয়ে পুরো পৃথিবী জয়ের স্বপ্ন দেখে। তরুণদের জন্য একটা ইয়ুথফুল সিনেমা আর সুপারহিট মিউজিক, সব ফর্মুলাই ছিল। তারই ফল পাওয়া গেল বক্স অফিসে। ধুন্ধুমার হিট এবার যেন রনবীরকে সুপারস্টার তকমা লাগিয়েই দেয়। আর এমনই যখন ছিল সময়টা তখনই ক্যারিয়ারে পতন শুরু রনবীরের। আর সেই শুরুটা হল ‘বেশরম’ সিনেমা দিয়ে।

আত্মবিশ্বাস হয়তো অতি আত্মবিশ্বাস হয়ে গিয়েছিল, তাই রনবীর দাবাং খ্যাত অভিনব কাশ্যপের নতুন সিনেমা দিয়ে আবারও মাতাতে চাইলেন বক্স অফিস। কিন্তু খুব বাজেভাবে বক্স অফিসে মুখ থুবড়ে পড়লো সিনেমাটি, সমালোচনা হল রনবীরের লাউড অভিনয়েরও। তারপর এক বছর বিরতি দিয়ে এলো রনবীরের নতুন সিনেমা ‘রয়’, যদিও রনবীরের উপস্থিতি সিনেমায় স্পেশাল এপিয়েরেন্স বলে চালিয়ে দেয়া যায়। কিন্তু প্রমোশোনে রনবীরকে মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার করার ফলে সিনেমার ব্যর্থতার দায়ও তাকেই নিতে হয়েছে। আবারও লম্বা বিরতি, কারণ তর্কযোগ্যভাবে বলিউডের সেরা নির্মাতা অনুরাগ কশ্যপের নতুন বিগ বাজেট সিনেমার জন্য রনবীর চুক্তিবদ্ধ হলেন। ‘বোম্বে ভেলভেট’ নামের এই সিনেমা নিয়ে অনেক আশাবাদী ছিল দর্শক-সমালোচক সকলেই। কিন্তু সারাজীবন কম বাজেটে দারুণ দারুণ সিনেমা বানানো অনুরাগ হয়তো বাজেটের আধিক্যেই খেই হারিয়ে ফেললেন। বলিউডের ইতিহাসের অন্যতম বড় ফ্লপ হিসেবে নাম লেখালো ‘বোম্বে ভেলভেট’। রনবীরের ক্যারিয়ারে তখন শনির দশা চলছে।

এতো ব্যর্থতার মাঝেও রনবীর নিজেকে হারিয়ে ফেলেন নি। ইমতিয়াজ আলিই আবার এলেন যেন ত্রানকর্তা হয়ে। তার নতুন সিনেমা ‘তামাশা’য় চুক্তিবদ্ধ হলেন রনবীর ও দীপিকা। বক্স অফিসে যদিও অসফল হয় তামাশা, কিন্তু রনবীরের অভিনয় যেন আবারও মনে করিয়ে দেয় অভিনেতা রনবীরকে। স্বপ্নের পেছনে ছোটা ভেদের গল্পে আমরা যেন নিজেদেরকেই খুঁজে পাই, যারা জীবনের প্রতি পদে পদে নিজেদের স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে আসছি। নিজেদের অস্তিত্বকে বিলীন করে দিচ্ছি সিকিউরড জীবনের আকাঙ্ক্ষায়, জীবন নামের তামাশার অংশ হচ্ছি। রনবীর যেন আবার ফিরে পেলেন তার ট্র্যাক। করন জোহরের নতুন সিনেমায় চুক্তিবদ্ধ হলেন ঐশ্বরিয়া আর আনুশকার সাথে। অজয় দেভগনের ‘শিভে’র সাথে ক্ল্যাশ করেও বক্স অফিসে সফল হয় ‘এ দিল হ্যা মুশকিল’। এই সিনেমার ‘চান্না মেরেয়া’ গানে রনবীরের অভিনয় যেন সকল ব্যর্থ প্রেমিকের আর্তনাদ হয়েই ধরা দেয়। এই তো সেই রনবীর, সেই চিরচেনা রনবীর।

অনুরাগ বসুর সাথে যৌথ প্রযোজনায় রনবীর তার ড্রিম প্রজেক্ট ‘জাজ্ঞা জাসুস’ নিয়ে কম ভোগান্তিতে পড়েন নি। বারবার শুটিং থেমে গেছে, বারবার নতুন থেকে শুরু করতে হয়েছে। তাই হয়তো বরফির সাফল্য আবার অনূদিত হয়নি জাজ্ঞা জাসুসে। কিন্তু রনবীরের অভিনয় এই সিনেমাতেও মন মাতানো ছিল। ক্যারিয়ারের এই পর্যায়ে ক্রাইম মিউজিক্যাল করার সাহসই বা কজন করতে পারে। এরপরই হঠাৎ বলিউডে গুঞ্জন ওঠে, রাজকুমার হিরানির নতুন সিনেমায় অভিনয় করতে পারেন রনবীর, তাও আবার সঞ্জয় দত্তের ভূমিকায়। সবার মনে তখন ভয়, আবার কোন ভুল করছেন না তো রনবীর। কিন্তু ডিরেক্টর রাজকুমার হিরানি বলেই কেমন যেন একটা আত্মবিশ্বাসও ছিল। সঞ্জয় দত্তের ব্যক্তিত্ব, বাচনভঙ্গি এগুলো আয়ত্ত করা কী মুখের কথা নাকি! তারপর কেবল অপেক্ষা, মাঝে মাঝে কিছু লিকড হয়ে যাওয়া ছবি দেখে মুগ্ধতা আর আশঙ্কা। অবশেষে কিছুদিন আগে বহুল প্রতীক্ষিত ‘সঞ্জু’ সিনেমার টিজার দেখে নিশ্চিন্ত সকলে, মুগ্ধও বটে। সেখানে সঞ্জয় দত্তকে কপি করেন নি রনবীর, তার গলাকে ভারী করে সঞ্জয়ের মতো কথা বলারও চেষ্টা করেন নি। বরং আয়ত্ত করেছেন সঞ্জয়ের ম্যানারিজম আর ভয়েসের টোনালিটিকে। সঞ্জুর এক্সপ্রেশনকে আয়ত্ত করেছেন অবলীলায় যেন, সাথে শরীরের ওপর চালিয়েছেন অকথ্য অত্যাচারও। আর তারই ফলস্বরূপ রনবীর নামের সঞ্জয় দত্তে অবাক হওয়া। এরকম অবাক তো রনবীর অনেকবারই করেছেন।

রনবীর কাপুর বলিউডে সহজে আসতে পেরেছেন হয়তো তার ‘কাপুর’ সারনেমের কারণেই। কিন্তু বলিউডে তিনি টিকে থাকতে পেরেছেন ও পারবেন স্বমহিমায় তার অভিনয় দিয়েই। আর অভিনেতা রনবীরকে দেখা সবসময়ই ‘ট্রিট ফর আইজ’। তাই আশা করবো রনবীর কাপুর এভাবেই তার অভিনয় দিয়ে মুগ্ধ করে যাবেন দর্শকদের আর নিজেকেও ভাঙবেন-গড়বেন এসব চরিত্রের মধ্য দিয়েই। ক্রমাগত প্রতিভাহীন হতে থাকা অন্ধকার বলিউডে তিনি যে এক উজ্জ্বল আলোক শিখা…

প্রথম পর্ব পড়ুন এই লিংকে ক্লিক করে
Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close