গতকাল। দুপুর তখন একটার একটু বেশী। রামপুরা ব্রিজ পার হয়ে সামনেই রাস্তায় মানুষের জটলা। জটলায় দাঁড়িয়ে দূরে ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটিতে টিয়ারশেলের ধোয়া দেখা যায়। রামপুরার মূল সড়ক থেকে শুরু করে আফতাব নগর রোডের গেইট অব্দি অন্তত দেড়শ পুলিশ-বিজিবি কয়েক স্তর করে দাঁড়ানো। তাদের সামনে এবং পিছনে লাঠিসোটা হাতে যারা দাঁড়ানো, এদের অধিকাংশই শ্রমিক গোছের। সাথে টোকাই ও হেলমেট পরাও আছেন বেশ কয়েকজন।

রাস্তায় দাঁড়িয়ে পরিস্থিতি দেখছিলাম, গলায় এগিয়ে চলোর আইডি কার্ড ঝুলানো। কয়েকজন স্টুডেন্ট ভেবে বললো, আইডি কার্ড খুলে ফেলেন। আইডি কার্ড পরিহিত কিংবা স্টুডেন্ট দেখলেই মারছে। আইডি কার্ড খুলে হাতে নিয়ে একটু সামনে এগুতেই দেখি, দূরে ক্যাম্পাসের গেইটে লাঠি হাতে দৌড়াতে দৌড়াতে ছাত্রদের মারছে শ্রমিক-টোকাই-হেলমেট পরারা। পুলিশ-বিজিবি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে। বস্তির ছেলেরা ভার্সিটি ভাঙ্গছে, ছাত্রদের পেলেই মারছে, পুলিশ-বিজিবি তাদের বাঁধা না দিয়ে ইউনিভার্সিটির ভিতরে টিয়ারশেল ছুঁড়ছে- নিজের চোখকে বিশ্বাস করাতে পারিনি। হাঁসফাঁস লাগছিল। হেঁটে রামপুরা ব্রিজের উপর এসে দেখি মিডিয়ার গাড়ি, সাংবাদিক কেউ নেই। সময় টিভির ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করলাম তাদের সাংবাদিক কই? তারা কি এসব কিছু দেখছে না? উত্তর এলো, তারা ভিতরে!

রামপুরা ব্রিজের পাশ দিয়ে বনশ্রী ঢুকার পথে র‍্যাবের ৬-৭ টি ভ্যান দাঁড়া করানো, র‍্যাব ভর্তি। এরা কিছুক্ষণ আগেই মেরুল বাড্ডার দিক থেকে এসেছে। হেটে সামনে এগুতেই দেখি নোংরা পানির খালের ঐ পাশে আবাসিকের গলিতে কয়েকজন স্টুডেন্টকে মারতে মারতে খালের নোংরা পানিতে ফেলে দিয়েছে, পানিতে পড়েও রক্ষে হয়নি! ঝোপে লুকিয়ে আছে দেখে, সেখানেও ইট-পাটকেল ছুঁড়ছে। কি ভয়ংকর নির্মমতা!

রাস্তা ক্রস করে অন্যদিকে এসে ফোনে কথা বলছিলাম। পিছন থেকে দৌড়ে এসে পুলিশ ব্যাগ ধরলো। বাকী পথচারীরা সামনে দিক-বেদিক ছুটছে। গলায় থাকা আইডি কার্ড দেখালাম, প্রেস বললাম। লাভ হলো না। কেবল পেটানো বাকী ছিল, টেনেহিঁচড়ে পুলিশ ভ্যানের দিকে নিয়ে গেলো। মোবাইল দেখতে চাইলো, স্ক্রিনে তখন পঙ্কজ দে- এর তোলা (একটা পিচ্চি ছেলের সামনে পুলিশ) সেই আইকনিক ছবিটা দেয়া। তারা ভালোভাবে দেখেনি বোধহয়, আমি সুযোগ পেয়ে স্ক্রিন থেকে সেটি সড়িয়ে অন্য ছবি দিলাম। আইনের প্রতি শ্রদ্ধা থেকেই প্রচণ্ড শান্তভাবে নিজ থেকেই জিজ্ঞেস করলাম, ভ্যানে উঠবো? তিনজন কন্সটেবল দাঁড়ানো সামনে, কিছুটা বোধহয় অবাক হলেন। উনারা বললেন, ‘না। স্যার আসুক’।

তাদের স্যার তখন বাহিনীসহ সামনে রাস্তায় হাঁটা পথচারীদের ধাওয়া করছিল। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে একজন কন্সটেবলসহ স্যারের দিকে গেলাম। সেখানেও কয়েকজন ছাত্রকে কলার ধরে গালাগালি করে হেনস্ত করছিল পুলিশ। ছাত্ররা বলছিল, পরীক্ষা ছিল, বাসায় যাচ্ছি- শুনেনি তারা। আমাকে দেখেই আরও খানিকটা বোধহয় রেগে গেলেন ‘স্যার’। তুই এখনও যাস নাই? -এই প্রশ্ন দিয়েই জীবনে প্রথম পুলিশের হাতে হেনস্ত হওয়ার শুরু! তার চোখেমুখে যেন আগুন, আমি যেন সন্ত্রাসী! পুলিশ কন্সটেবলকে দেখিয়ে বললাম, ‘উনি আপনার কাছে নিয়ে এসেছে।’ কে কার কথা শুনে! ‘তোর বাসা কই?’, ‘এখানে কি করস’ প্রশ্ন করতে করতেই গলা টিপে ধরলো। কি তার এত ক্ষোভ, জানি না! বললাম, ‘প্রেস। সামনেই আমার অফিস, অফিসে যাচ্ছি।’ আইডি কার্ড টান দিয়ে ছিঁড়ে বললো, ‘খানকির পোলা ছবি তোলস? এইখান দিয়ে চলে যা।’ বললাম, অফিস সামনে। তাও উলটো পথেই ফেরত পাঠালো। সেখানের বাকী ছাত্রদের ভাগ্যে আর কি জুটেছে দেখিনি।

রিক্সায় করে আবাসিকের ভিতর দিয়ে অফিস যেতে যেতে আমার রাগের বদলে বরং কান্না পাচ্ছিলো ভীষণ। অসহায় লাগছিল, পরাধীন লাগছিল। নর্দমার খাল পেড়িয়ে ঐ পাশে আফতাব নগরের সড়কে যখন ছাত্রদের বহিরাগতরা মারছিলো, তখন পুলিশ তাদের প্রোটেকশন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। উলটো বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের ভিতরে থাকা ছাত্রদের টিয়ারশেল মারছিলো। আর এই পাশে পুলিশ রাস্তায় হাটা ছাত্র বয়সের পথচারী দেখলেই তাকে গলা টিপে ধরে হেনস্ত করছে, পেটাচ্ছে। পাশাপাশি দুই সড়কেই একই বাহিনীর কি বিচিত্র আচরণ। আহারে জনগণের বন্ধু!

Comments
Spread the love