বিকট একটা শব্দের পরে চারপাশে প্রচণ্ড হইচই, সবাই ছুটছে শুধু। পরপর আরও কয়েবার তুমুল শব্দে ফাটলো শক্তিশালী বোমা। ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন চারদিক, মানুষের আহাজারি আর মাংস পোড়ার কটু গন্ধে ভরে গেছে এলাকাটা। সবাই পালাচ্ছে প্রাণ নিয়ে, এই মৃত্যুপুরী থেকে দূরে সরে যেতে পারলেই বাঁচা যায় যেন!

অথচ কয়েক মূহুর্ত আগেও পরিস্থিতি এরকম ছিল না। একটা উৎসবমুখর ভাব ছিল সব জায়গাতে। নতুন ভোর এসেছে, শুরু হয়েছে বাংলা নতুন বছর। গান গেয়ে সেই নতুন বছরকে স্বাগত জানানো হয়েছে, রমনার বটমূলে চলছিল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। সেই অনুষ্ঠানস্থলের অদূরেই জঙ্গীরা পুতে রেখেছিল প্রাণঘাতি বোমা, নতুন বছর উদযাপন করতে আসা নিরীহ মানুষগুলো জানতো না, পায়ের নিচে মৃত্যুদূত ঘুমিয়ে আছে, প্রস্ততি নিচ্ছে সবকিছু ছত্রভঙ্গ করে দেয়ার!

নতুন বছরের প্রথম ভোরের সাক্ষী হবার জন্যে এসেছিলেন মানুষগুলো, ওদের মধ্যে কয়েকজন জানতেন না, জীবনের শেষ ভোর এটাই হয়ে থাকবে ওদের! বিস্ফোরণের পরে প্রাণ নিয়ে পালিয়ে গেল হাজার হাজার মানুষ, পালাতে পারলেন না দশজন। ওদের ছিন্ন-ভিন্ন দেহগুলো পড়ে রইলো রমনায়, সেগুলো মাড়িয়েই প্রাণের তাগিদে ছুটলেন সবাই। নিস্প্রাণ শরীরগুলোর বোবা আকুতি কেউ শুনতে পায়নি, মরে যাবার আগে ওরা কেউ জানতেও পারেনি, ওদের অপরাধটা কি!

ওদের অপরাধ হয়তো এটাই যে, ওরা পহেলা বৈশাখের ‘বিজাতীয় হিন্দুয়ানী সংস্কৃতি’ পালন করতে গিয়েছিল রমনায়। কট্টরপন্থী জঙ্গীদের মতে, বাংলা নববর্ষ পালন করা হারাম, সেই হারাম কাজে অংশ নেয়া মানুষগুলোকে শাস্তি দেয়ার ভারটা এই নরপশুগুলো নিজেরাই নিজেদের হাতে তুলে নিয়েছিল, চালিয়েছিল ঘৃণ্য হামলা। পুঁতে রাখা বোমাগুলো রিমোট কন্ট্রোলের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা যেতো, সেই বোমাই কেড়ে নিয়েছে দশজন নিরীহ মানুষের প্রাণ!

সতেরো বছর আগের পহেলা বৈশাখের দিনটাতে এই হামলা করেছিলন হরকাতুল জিহাদের জঙ্গীরা, ওদের নৃশংসতায় কেঁপে উঠেছিল বাংলাদেশ। আমাদের সংস্কৃতি, আমাদের ঐতিহ্যকে বোমা মেরে উড়িয়ে দিতে চেয়েছিল ধর্মান্ধ একটা গোষ্ঠি, গলাটিপে মেরে ফেলতে চেয়েছিল বাঙালীর গর্বের জায়গাটাকে। সেটা ওরা পারেনি, কিন্ত আমরা কি কিছু করতে পেরেছি? ওদের শাস্তি নিশ্চিত করতে পেরেছি কি গত সতেরো বছরেও? যে দশজন মানুষ সেদিনের হামলায় নিহত হয়েছিলেন, তাদেরকে কি ন্যায়বিচার এনে দিতে পেরেছি আমরা?

না, পারিনি। সেই নৃশংস হামলার দিনই পুলিশের পক্ষ থেকে মামলা করা হয়েছিল, কিন্ত সেই মামলার চার্জশীট দিতে কত বছর লেগেছিল জানেন? পাক্কা সাড়ে সাত বছর! ঘটনাটা যখন ঘটেছে, তখন আওয়ামীলীগ ক্ষমতায়, কিন্ত এরর চার মাসের মধ্যেই নির্বাচনে ক্ষমতার পটপরিবর্তন হয়। বিএনপি জোট সরকারের আমলে সাত বছরে এক কদমও আগায়নি মামলার কার্যক্রম। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে দাখিল করা হয়েছিল চার্জশীট। হরকাতুল জিহাদেত নেতা মুফতি হান্নানকে প্রধান আসামী করা হয় এখানে।

দেশের ইতিহাসে যে কয়টা কালো অধ্যায় বা কালো দিন আছে, সেগুলোর মধ্যে রমনার বটমূলে বোমা হামলার ঘটনাটা অবশ্যই থাকবে। একটা দেশের সাংস্কৃতিক আন্দোলনকে থামিয়ে দেয়ার ষড়যন্ত্র ছিল সেটা। এই মামলার বিচার করার কথা ছিল দ্রুত বিচার আইনে, জঙ্গীদের কঠোরভাবে জানিয়ে দেয়া প্রয়োজন ছিল, চোরের মতো বোমা হামলা করে, দশ-বিশজন নিরীহ মানুষকে মেরে বাঙালীকে দমিয়ে রাখা যায় না। অথচ সেটা আমরা করতে পারলাম কই? সতেরোটা বছর চলে গেল, সুনীলের কবিতার মতো কেউ কথা রাখলো না, এই ঘটনার বিচার হলো না।

নিম্ন আদালত আসামীদের মধ্যে আটজনের মৃত্যুদণ্ড আর ছয়জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের রায় দিয়েছেন ২০১৪ সালে, ঘটনার তেরো বছর পরে! সেই রায়ে আপিল করেছে আসামীপক্ষ, মামলা এখন হাইকোর্টে। সেখানে গত চার বছর ধরে কচ্ছপের চেয়েও ধীরগতিতে এগিয়ে নেয়া হচ্ছে মামলার কার্যক্রম। তারিখের পর তারিখ পড়ে, মামলার কাজ এগোয় না। একবার সরকারী কৌসুলি সময় চান তো আরেকবার আসামীপক্ষের উকিল। বিচারক পাল্টে যান, অ্যাটর্নি জেনারেল বদলে যায়, বদলায় না মামলার ভাগ্য। এই মামলাটার রায় শেষমেশ হবে বলেও অনেকে মনে করেন না।

মুফতি হান্নান অন্য এক মামলায় মৃত্যুদণ্ডের সাজা পেয়েছে, কার্যকর করা হয়েছে তার মৃত্যুদণ্ডও। অথচ এই মামলার কয়েক আসামী আলহাজ্ব মাওলানা মো. তাজউদ্দিন, হাফেজ জাহাঙ্গীর আলম বদর, মুফতি শফিকুর রহমান, হাফেজ মাওলানা ইয়াহিয়া ও মুফতি আব্দুল হাই পলাতক আছেন এখনও। আইনশৃঙখলা রক্ষাকারী বাহিনী এদের গ্রেফতার করতে পারেনি কোনভাবেই। আরেক আসামী মাওলানা আবু বকর ওরফে হাফেজ সেলিম হাওলাদার দীর্ঘ তেরো বছর পলাতক থাকার পরে ২০১৪ সালেএ নভেম্বর মাসে ঢাকার কেরাণীগঞ্জ থেকে গ্রেফতার হয়েছিল। এই আসামীদের এতদিন ধরে পলাতক থাকাটাও তো আমাদের নিরাপত্তাদানকারী সংস্থাগুলীর একটা ব্যর্থতা!

বছর ঘুরে পহেলা বৈশাখ আসে, পান্তা-ইলিশ-কনসার্ট কিংবা শাড়ি-পাঞ্জাবীর আমরা ভুলে যাই সেই মানুষগুলোর কথা, যারা বছরের প্রথম দিনটায় জমাট মাংসের স্তুপ হয়ে পড়েছিলেন রমনায়। বিনা অপরাধে যাদেরকে খুন করা হয়েছিল, সেই মানুষগুলোর জীবন তো ফিরিয়ে দেয়া সম্ভব না, কিন্ত ওদের ন্যায়বিচারটা তো আমরা অন্তত নিশ্চিত করতেই পারি, তাই না?

Comments
Spread the love