রিডিং রুমলেখালেখি

স্বর্গ থেকে লেখা… আজ থেকে তারা হয়ে গেলাম

সাজেদুল ইসলাম শুভ্র

আজ রাতে এই সময়ে রসায়নের প্র্যাকটিকাল লেখার কথা ছিল, কথা ছিল আব্বু যে থ্রি-পিস টা এনে রেখেছে ঈদের জন্য, সেটা টেইলার্সে আজ বিকালেই দেব, এক তারিখ থেকে অর্ডার নেয়া বন্ধ! কথা ছিল কাল কলেজে আসার সময় সোমার জন্য মামার কক্সবাজার থেকে আনা বার্মিজ আচার আনতে হবে, আরও অনেক কথাই ছিল। শুধু কথা ছিল না, কাল রাতেও যে ঘরে আমি থেকেছি, সেই ঘরটা ছেড়ে চলে আসতে হবে স্বর্গে! আমি বুঝতেই পারছি না কতগুলো কাজ বাকি রেখে আমি পৃথিবী থেকে চলে এলাম। আমার মধ্যবিত্ত বাবার স্বপ্নের মতন বড় জিনিসটাও আমি পৃথিবীতে রেখে চলে এলাম।

পৃথিবী থেকে স্বর্গে আসার মাঝের যে সময়টা আজ পার করলাম- অনেক চেষ্টা করেও ভুলতে পারছি না। মৃত্যু নাকি এই স্বর্গের দ্বার উন্মুক্ত করে দেয়, এই কঠিন জিনিসটা কখন আমার কাছে চলে এলো, আমি বুঝতেও পারলাম না। আজও তো কলেজ শেষ করে বাসের জন্যই দাঁড়িয়ে ছিলাম। ছোটবেলায় বাস খুব প্রিয় ছিল, অনেক খেলনা বাস ছিল বলে আমার ছেলে বন্ধুরাও আমাকে দেখে ঈর্ষা করত। চোখের নিমিষ বলতে যে সময় আছে, সেটা বুঝতে পারলাম আজ। একটা নীল রঙের বাস এলো, আমি তো স্টপেজে ছিলাম, কী দারুন স্টপেজ করা হয়েছে আমাদের জন্য। বাসটা তার স্টপেজে থাকল না, দানবের মতন একটা রূপ নিয়ে চলে এলো এক সেকেন্ডের একশ ভাগের এক ভাগ সময়ে আমার গায়ের উপর!

এরপর থেকে আমার মস্তিষ্ক অনুভব করতে পারেনি কিছুই। আমি আস্তে আস্তে অনুভুতিহীন এক মানবদেহ হয়ে যাচ্ছিলাম যেন। যেই মাথায় সামান্য ব্যথা হলেই দুটো নাপা খাই আমি, সেই আমার মাথায় পুরো পৃথিবী সমান একটা চাপ এসে পড়ল মনে হল, যেই পায়ে সিড়িতে ধাক্কা খেলে আমি মালিশ করতে থাকি, সেই পা আমার শরীরের থেকে একশগুন ভারী মনে হতে থাকল। যেই হাত পরীক্ষার খাতায় লিখে ব্যথা হলেই বারবার ঝাড়া দেই, সেই হাত আমার অসাড়, অনুভুতিহীন। যেই রক্ত দেখেই একবার জ্ঞান হারিয়েছিলাম আঙ্গুল কেটে যাওয়ায়, সেই আমার মুখেই কখন যে রক্তের লাল ছোপ, বুঝতেই পারিনি।

যেই বিছানায় একটা ময়লা পেলে আমি আম্মুকে ডাকি ঝাড়ু দিয়ে যাও, তার চেয়ে শতগুন ময়লায় আমার দেহটা শুয়ে, আমার মা কে ডাকার কন্ঠ নেই, কন্ঠ যেন কি? সেই অনুভুতিও নেই। যেই চোখে ব্ল্যাক বোর্ডের লেখা পড়তে পারিনা অজুহাত দেখিয়ে আব্বুর কাছে চশমা কিনে দিতে বায়না ধরতাম, সেই চোখ অন্ধকার হয়ে এসেছে, চোখ কচলে এটা স্বপ্ন না দিন সেটা যে দেখব, সেই হাত তো আর আমার নেই। এই যে অসহায়, এই যে শেষ হয়ে যাওয়ার সময়টা কাউকেই আমি পেলাম না। আমাকে কেউ আর সেই অন্ধকার থেকে টেনে আনতে পারেনি।

তারপরের সময়টাই আমার স্বর্গে চলে আসা। সময়ের থেকে আগে চলে আসায় আমার এখানে অভ্যর্থনার কমতি নেই, কিন্তু আমি পৃথিবীকে বড্ড মিস করছি, এক পলকে তাকিয়ে আছি পৃথিবীর দিকে। আমি অবাক হয়ে দেখলাম, শুধু আমিই না, স্বর্গে আমার সাথে একই সাথে আজ দাঁড়িয়ে থাকা আরও ২/৩ জন চলে এসেছে। আমরা একসাথেই পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে আছি। একটা বাস নাকি আমাদের উপর প্রতিযোগিতা করতে যেয়ে উঠিয়ে দিয়েছে। কী আশ্চর্য্য, কী ভয়ানক! আমাদের বন্ধুরা রাস্তা আটকেছে, ভাংচুর করেছে, আমাদের জন্য দেখি পুরো দেশ আজ হৈচৈ। আমি কিছুতেই মানতে পারছি না, এই বাসের প্রতিযোগিতাই আমাদের কে পৃথিবীতে থাকার দৌড়ে হারিয়ে দিল? আমি হেরে গেলাম, হেরে গেল কত কিছু!

আমি দাঁতে দাঁত চেপে চেষ্টা করছি আমার মায়ের মুখটা দেখার, আমার বাবার মুখটা দেখার। আমি পারছি না, যতটা ব্যথা নিয়ে আসতে হয়েছে স্বর্গে, তখন তো অনুভূতিশুন্য ছিলাম। বাবা মায়ের রক্তশুন্য মুখটা দেখলে আমি আর নিজেকে সামলাতে পারছি না। আমি কল্পনা করতে পারছি না, যে মা মশলা বাটতে বাটতে খবর পেয়েছে তার কলেজ পড়ুয়া মেয়ে বাস চাপায় মারা গেছে, তার কষ্ট আদৌ আমার সেই বাস চাপার চেয়ে কম ছিলো কিনা। আমার বাবাকে লোকজন কী কথা বলে স্বান্তনা দিচ্ছে আমার খুব শুনতে ইচ্ছে হচ্ছে। তারা কী আমাকে আবার পৃথিবীতে নেয়ার মত কোন আশ্বাস দিতে পারছে? আমার কলেজের শিক্ষকরা কী আর্তনাদে আমাদের জন্য চোখের জল ফেলছে! কোনভাবেই বুঝতে পারছি না কাল থেকে ঐ কলেজের ঘাস না মাড়িয়ে কীভাবে থাকব!

পৃথিবীতে তাকিয়ে থাকতে থাকতে দীর্ঘশ্বাস ফেলে যখন গেলাম ফেসবুকে, দেখি আমার আর ফেসবুক আইডিতে ঢোকার এখতিয়ার নেই। সবই দেখব, শুনব , ছোঁয়ার অধিকার নেই আর, পার্থিব না আর কিছু। কী আশ্চর্য্য ফেসবুকে এক স্ট্যাটাসে গোটা দশেক কমেন্ট পড়লেই সেলিব্রেটি ভাবতাম, আরে আজ তো আমি সেলিব্রেটি আসলেই, সবাই আমার ছবি দিচ্ছে, সবার কত আফসোস, আমি তাদের পৃথিবীতে নেই! কী ভয়ানক, আমার সেই অনুভুতিহীন হয়ে চলে আসার সময়টা মানুষ ভিডিও করে রেখেছে। তা দেখে আমার আরও মনে পড়ে যাচ্ছে সেই ব্রেনের নিউরন একয়াট একটা করে ছিড়ে যাওয়ার সময়গুলো!

স্ক্রল করতে করতে আরও আসছে গোফ ওয়ালা এক লোকের ছবি, সম্ভবত উনি দেশের হর্তা কর্তা গোছের কিছু। আগেও টিভিতে দেখেছি, নাম মনে থাকেনা- তাদের নাম মনে রেখে আমার কাজ কি? সেই লোকটাকে কে জানি আমাদের পৃথিবী থেকে চলে আসার বিষয়ে জানতে চেয়েছিল, উনি হেসে ফেললেন, আবার তাদের প্রশ্নের চাপে তাকে চিন্তিত দেখা গেল। একেকজন দুনিয়া ছেড়ে গেলে আবার জনপ্রতি ব্ল্যাক বেংগল ছাগল দেয়া লাগে যদি। আমাদের পরিবারকে তো স্বাবলম্বী করা লাগে নাকি? যারা পড়ছেন তাকে জানিয়ে দিয়েন তার ব্ল্যাক বেংগল ছাগল আমার বাবার দরকার হবে না। যার জন্য বাবা স্বচ্ছলতার স্বপ্ন দেখবে, সেই আর নেই!

আমার পৃথিবীর উপর খুব রাগ হচ্ছে, এত মায়া কেন পৃথিবীর? একটা গ্রহ কীভাবে মানব মনকে এত গ্রাস করে ফেলল? স্বর্গে কত আয়োজন, আমরা কিছুতেই চোখ ফেরাতে পারছি না পৃথিবী থেকে। এখানে বৃষ্টি নেই, আমার ঝুম বৃষ্টিতে ভিজতে ইচ্ছে হচ্ছে। এখানে ইচ্ছাপূরণ এর দৈত্য নেই কেন? আমার খুব ইচ্ছে হচ্ছে খিচুরি খেতে, এখানে চাহিবা মাত্র খাবারের আয়োজনের খিচুরি আমার গলা দিয়ে নামছেই না। আমি খুব অবাক হয়ে ভাবছি- আমি আর তোমাদের পৃথিবীতে যেতে পারব না- তোমাদের পহেলা বৈশাখে আর মেলায় যাওয়া হবে না, তোমাদেরও ঈদ হবে, আমি থাকব না। তোমাদের এই পৃথিবীর সাথে একটাই সম্পর্ক থাকবে আমার- ভালোবাসার! শেষ লাইনগুলো লিখে চোখে পানি চলে এলো, “তোমাদের” পৃথিবী বলতে খুব কষ্ট হচ্ছে! মানতেই পারছি না, আজ থেকে আমি পৃথিবীর না, আমি সব দেখব এখন তারা হয়ে।

(শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের অকাল প্রয়াত শিক্ষার্থীদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে কাল্পনিক দিনলিপি, এই ঘটনায় দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবী করছি)

Comments
Show More

Related Articles

Close