২৪শে অক্টোবর, রবিবার ছিল একাত্তরের রমজান মাসের ৩য় দিন। যথারীতি পাকিস্তানি সাচ্চা মুসলমান সেনাবাহিনী আর তাদের দোসর দালাল রাজাকারদের কাছে রমজান মাসের কোন পবিত্রতা, গুরুত্ব বা তাৎপর্য ছিল না। ধর্মের অপব্যবহার করে হিন্দু-মুসলিম বাঙালি নিধন করে, তাদের বাড়িতে অগ্নিসংযোগ, লুটপাট করে নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারেই মগ্ন ছিল।

বাংলাদেশ দালাল আইনে সাজাপ্রাপ্ত রাজাকার দুদু মিয়া এদিন পাকিস্তানি হাবিলদার মুশতাককে নিয়ে টাঙ্গাইলের মধুপুরের আশুরা গ্রামের অধিবাসী নিশিকান্ড চন্দ্রের বাড়িতে হানা দিয়েছিলো। বাবা সতীশ চন্দ্র সহ, বশির, বেলায়েত, ওমর, উপেন্দ্র, হরেন্দ্র, নগেন্দ্র ও খগেনকে ধরে নিয়ে গিয়ে গুলি করে হত্যা করে।(১) তাঁদেরকে হত্যা করার পর প্রাণহীন দেহ মধুপুরের আব্দুল জব্বারের কূপে ফেলে দেওয়া হয়েছিলো।(২) নিশিকান্ড চন্দ্র ৫ হাজার টাকার বিনিময়ে করিম রাজাকারের কাছ থেকে নিজেকে মুক্ত করার সময় উক্ত ঘটনা করিম রাজাকার তাকে বলেন। রাজাকার দুদু মিয়া প্রকাশ্যেই পাকিস্তানি হাবিলদার মুশতাকের সাথে পথ প্রদর্শক হিসেবে কাজ করতো, বাঙালিদের বাড়িঘর চিনিয়ে দিতো, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ করতো। তাকে নিয়ে ৭২ এর ২৪শে জুলাই দৈনিক পূর্বদেশ রিপোর্ট করেছিলো “টাঙ্গাইলের এক দালালের সশ্রম কারাদন্ড”, রিপোর্টে বলা হয় টাঙ্গাইলের দায়রা জজ এ এইচ চৌধুরী মধুপুরের রাজাকার দুদু মিয়াকে দেড় বছরের সশ্রম কারাদন্ড ও দুই হাজার টাকা জরিমানা অনাদায়ে আরো ৬ মাসের কারাদন্ড দেন।(৩)

এদিন দুপুর বেলা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুহসীন হল ঘেরাও করে রসায়ন বিভাগের ছাত্র হুমায়ূন আহমেদ (জনপ্রিয় কথা সাহিত্যিক) সহ দু’জন এবং অন্য বিভাগের ছাত্র, ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক গিয়াসউদ্দীন সাহেব, দারোয়ানকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ধরে ক্যাম্পে নিয়ে যায়, তারপর শুরু করে অমানবিক নির্যাতন। এই নির্যাতনে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন ইংরেজি বিভাগের ছাত্র মোহাম্মদ হুসেন।(৪)

হুমায়ূন আহমেদকে ধরে নিয়ে গিয়ে অকথ্য নির্যাতনের কথা পরবর্তীতে বলেছিলেন তাঁর ছোট ভাই আহসান হাবীব, তাঁকে রড দিয়ে পেটানো হয়েছিল। বড় ভাই হুমায়ূন আহমেদের মুক্তির জন্য জাফর ইকবাল আত্নীয়ের একজনের দ্বারা আর্মির ক্যাপ্টেনের সাথে যোগাযোগ করেছিলেন।(৫) তাঁর ভাগ্য সুপ্রশন্ন ছিল দেখেই তিনি বেঁচে গিয়েছিলেন, বাবা ফয়জুর রহমানকে পাকিস্তানিরা গুলি করে মেরে বলেশ্বর নদীতে ফেলে দিয়েছিল একাত্তরের মে মাসে।

অক্টোবরের ৫ তারিখে বিরুনিয়া গ্রামে আফসার বাহিনীর সাথে যুদ্ধ পাক বাহিনীর একদফা যুদ্ধ হয়েছিলো, তারই ফলশ্রুতিতে ২৪শে অক্টোবর রমজান মাসের ৩য় দিন আবারো ভালুকা থানার বিরুনীয়া গ্রামে পাকসেনারা ঢুকে পরে, শুরু করে লুটতরাজ ও বাড়ি বাড়ি অগ্নিসংযোগ, মুক্তিযোদ্ধারাও বসে থাকেননি, খবর পেয়ে দ্রুত মুভ করেন, আফছার সাহেব চাঁন মিয়া কোম্পানির মুক্তিসেনাদের নিয়ে পাক বাহিনীর উপর পাল্টা আক্রমণ করেন। ২ ঘন্টা গুলি বিনিময় চলে, ৫জন পাক সেনা নিহত হয়।(৬) কিন্তু ততক্ষণে প্রচুর বাড়িঘর ভস্মীভূত হয়ে গিয়েছিলো, নির্যাতিত হয়েছিলেন অনেক নারী পুরুষ।

এদিন গাইবান্ধার সবচেয়ে বড় যুদ্ধ খ্যাত ত্রিমোহনীর যুদ্ধ হয়েছিলো, মুক্তিযোদ্ধারা বোনারপাড়া শত্রুমুক্ত করার উদ্দেশ্যে ত্রিমোহিনী ঘাট এলাকার কয়েকটি বাড়িতে আশ্রয় নিলে এ খবর শান্তি কমিঠির সদস্যরা পাক শিবিরে জানিয়ে দেয়। এ খবর পেয়ে ২৪শে অক্টোবর সূর্যোদয়ের আগে পাকস্তানি সেনারা বিশাল বাহিনী নিয়ে ত্রিমোহিনী ঘাট এলাকা ঘিরে ফেলে, তুমুল যুদ্ধে ১২ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা নিহত হন আর পাক সেনা নিহত হয় ২১ জন।(৭) এই যুদ্ধে শহীদ ১২ জন মুক্তিযোদ্ধারা হলেনঃ ১। মধু, ২। শহিদুল্লাহ, ৩। প্রভাত, ৪। ভরত, ৫। আব্দুল হাই, ৬। আহম্মদ আলী, ৭। আনসার আলী, ৮। হাবিবুর, ৯। আব্দুল হাই মিয়া, ১০। রঞ্জন ও নাম না জানা আরো ২জন।(৮)

এই যুদ্ধের স্মৃতি আঁকড়ে ধরে আজো বেঁচে আছেন মুক্তিযোদ্ধা সামছুল আলম, গৌতুম কুমার সহ আরো অনেকে। প্রতিবছর এদিন ফুলছড়ি,সাঘাটার মানুষেরা শহীদদের স্মরণ করেন। উল্লেখ্য যে গাইবান্ধার ৩০টি বধ্যভূমি ও গণকবরের মাঝে ফুলছড়ি একটি বড় বধ্যভূমি, এখানে বিভিন্ন সময়ে প্রায় ৪ হাজারেরও বেশি বাঙালি নরনারীকে ধরে এনে হত্যা করা হয়েছিলো। পাকবাহিনী ও তাদের দোসরদের মধ্যযুগীয় বর্বরতার নিদর্শন ছিল গাইবান্ধার ফুলছড়ি থানার বধ্যভূমি। এখানে নির্যাতনের পর সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিলো হাজার হাজার বাঙালিদেরকে।(৯)

প্রত্যক্ষদর্শী আবু বক্করের বয়স ছিল তখন ১৩ বছর, তাকে দিয়ে দোকান থেকে সিগারেট, পান, বিভিন্ন বাড়ি থেকে খাসি মুরগি ধরে আনাতো। উপজেলার পাকাবাড়ির যেখানে পাক বাহিনী রান্না করতো সেখানেই বাঙালি ধরে এনে নির্যাতন করতো। রাতের বেলা বধ্যভুমিতে ১৫/২০/২৫ জনকে নিয়ে গিয়ে গুলি করে হত্যা করতো, হত্যার পর তাদের নির্দেশে গর্ত করে পুতে রাখতেন আবু বক্করের বাবা বাহার আলী বাটু, শেখ পুশু, কসিম, রইচ চুলকি, ময়েজ, আবাদার, সোনা মিয়া ও আরো অনেকে। গর্ত খননকারীদের মতে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার বাঙালিকে হত্যা করে পুঁতে রাখা হয়েছিলো।(১০)

ছবি: ফুলছড়ি বধ্যভূমি (ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত)

২৪ অক্টোবরের রাতের বেলায় মুক্তিবাহিনীর গেরিলারা নৌকাযোগে মজলিশপুর হয়ে নন্দনপুর আসলে আগে থেকে এমবুশ করা পাকিস্তানি বাহিনী ও রাজাকারেরা গুলি ছুড়েছিল, প্রথমদিকে পাল্টা গুলি ছুড়লেও টিকতে পারেনি, ছত্রভঙ্গ হয়ে ক্রলিং করে আশেপাশের গ্রামগুলিতে আশ্রয় নিয়ে পরে পালাতে সক্ষম হয়েছিলেন। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা আশুরঞ্জনের পায়ে গুলি লাগায় ক্রলিং করতে না পারায় আরো ৪জনের সাথে ধরা পড়েছিলেন। আশুরঞ্জনকে হত্যা করার আগে কালীবাড়িতে তাঁকে আটকে রেখে অমানুষিক নির্যাতন চালিয়েছিলো, তাঁকে দেখতে কালীবাড়িতে অনেক লোকের ভিড় জমতো কিন্তু কারো কিছুই করার ছিলো না। তাঁর পায়ের ক্ষতস্থান থেকে প্রচুর রক্ত পড়তো, চিকিৎসার ব্যবস্থা তো করাই হয়নি বরং তাঁকে কোন খাবার দেওয়া হতো না, পানি খেতে চাইলে তাঁর মুখের দিকে প্রস্রাব করে পানি খেতে বলা হতো।(১১) সাধারণ বাঙালিদের কাছে এই নির্যাতন অমানবিক মনে হলেও সাচ্চা পাকিস্তানিরা পাশবিক উল্লাসে ফেটে পড়তো।

এদিন ব্রাহ্মণবাড়িয়া থানার শালদা নদীতে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখযুদ্ধে শহীদ হয়েছিলেন নবীনগর থানার মহেষপুর গ্রামের হাবিলদার আব্দুল লতিফ বীরপ্রতীক(১২), কুমিল্লার গোয়ার নামক স্থানের যুদ্ধে শহীদ হন কুমিল্লার লাকসাম উপজেলার শাকেরা গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা মোখলেছুর রহমান(১৩), আরো শহীদ হন চট্টগ্রাম জেলার বাংলাদেশ রেলওয়ের সিরাজুল ইসলাম চৌধুরি(১৪)।

এছাড়া এদিন রাজশাহীর বেড়পাড়ায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীরা হামলা চালিয়ে নিরীহ গ্রামবাসীদের কে হত্যা করে(১৫)। কতজন গ্রামবাসী এদিনের বর্বর হামলায় নিহত হয়েছিলেন তার সংখ্যা জানা যায়নি, তবে রাজাকারদের সহযোগিতায় পাক বাহিনী যেখানেই তাদের মিশন চালিয়েছে সেখানেই তারা একেকটি গ্রাম ধ্বংস করে চলে গেছে, নিরীহ মানুষ হত্যা থেকে শুরু করে, বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ, লুটতরাজ, নারী ধর্ষণ, নির্যাতন কোন কিছু বাদ রাখেনি তা কোন সাধারন দিন হোক আর রমজান মাসের দিন হোক।

তথ্যসূত্রঃ
১। সাজাপ্রাপ্ত যোদ্ধাপরাধী ১৯৭১, প্রত্যয় জসিম, পৃঃ ১৮।
২। মুক্তিযুদ্ধ কোষ দ্বিতীয় খন্ড, মুনতাসির মামুন সম্পাদিত, সময় প্রকাশন পৃঃ ৩৬২।
৩। সাজাপ্রাপ্ত যোদ্ধাপরাধী ১৯৭১, প্রত্যয় জসিম, পৃঃ ১৮।
৪। ৭১ এর ১০ মাস, রবীন্দ্রনাথ ত্রিবেদী, কাকলী প্রকাশনী। পৃঃ ৪৫৭
৫। দৈনিক প্রথম আলোর বিশেষ সংখ্যায় প্রকাশিত হুমায়ূন আহমেদের ৬৪তম জন্মদিনে আহসান হাবীবের লেখা “তোমার জন্মদিনে” তারিখ ০৯/১১/২০১২
৬। হাসান হাফিজুর সম্পাদিত স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র ৯ম খন্ড পৃঃ ৪৭০
৭। দৈনিক ইত্তেফাক, বিজয় আমার অহংকার, ৮ ডিসেম্বর ২০১৪।
৮। একাত্তরের বধ্যভূমি ও গণকবর, সুকুমার বিশ্বাস, অনুপম প্রকাশনী, পৃঃ ৫০০।
৯। মুক্তিযুদ্ধ কোষ দ্বিতীয় খন্ড, মুনতাসির মামুন সম্পাদিত, সময় প্রকাশন পৃঃ ২৯৭।
১০। দৈনিক ভোরের কাগজ, ফুলছড়ি বধ্যভূমি, ৮ মার্চ ২০১৭।
১১। মুক্তিযুদ্ধে ব্রাহ্মণবাড়িয়া, জয়দুল হোসেন, বইপত্র, পৃঃ ১৫৮।
১২। মুক্তিযুদ্ধ কোষ নবম খন্ড, মুনতাসির মামুন সম্পাদিত, সময় প্রকাশন পৃঃ ৩৮৩।
১৩। মুক্তিযুদ্ধ কোষ একাদশ খন্ড, মুনতাসির মামুন সম্পাদিত, সময় প্রকাশন পৃঃ ৩৯৭।
১৪। মুক্তিযুদ্ধ কোষ দ্বাদশ খন্ড, মুনতাসির মামুন সম্পাদিত, সময় প্রকাশন পৃঃ ২৭২।
১৫। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে মুজিবনগর সরকার থেকে প্রকাশিত পত্রিকা “জয় বাংলা” তারিখ – ১৯শে নভেম্বর ১৯৭১ পৃঃ ৮।

গ্রন্থ কৃতজ্ঞতা- একাত্তরের রমজান- গণহত্যা ও নির্যাতন

বইটি পাওয়া যাচ্ছে ইত্যাদি শপ,বাংলা বই ,রকমারিবইপোকায়

Comments
Spread the love