সিনেমা হলের গলি

সাদামাটা, সাধারণ এক রাজকুমারের গল্প!

সন্তান যখন স্কুলে পড়ে, অনেক বাবা মা’ই চান তার ছেলেটা বা মেয়েটা পড়ালেখায় ভালো হোক, সেইসঙ্গে গানবাজনাটাও একটু করুক, স্কুলের সবাই যেন তার সন্তানের নাম জানে। এই ছেলেটার মা’ও তেমন কিছুই চেয়েছিলেন। স্কুলের পড়ার সময়টা থেকেই তাই নাচ শিখতো ছেলেটা, তারপর স্কুল ডে’র অনুষ্ঠানে একটা নাটকেও অভিনয় করলো শখে পড়ে। অভিনয় করার পরে সবাই এসে বাহবা দিয়ে গেল তাকে, পুরো স্কুলের সবাই তাকে চেনে তখন! অন্য বাবা মায়েরা অবাক হয় তার প্রতিভায়, তার ক্লাসের বাকীরা ঈর্ষায় ভোগে ওকে দেখে! ছেলেটা ভাবলো, বাহ! মজা তো! অভিনয় করলে তো দেখি সবার প্রশংসা পাওয়া যায়।

সেখান থেকেই অভিনয়ের পোকাটা মাথায় ঢুকেছিল তার। ভালোবাসা বা এরকম কিচ্ছু নয়, শুধু লাইমলাইটে থাকার বাসনা থেকেই অভিনয়টাকে আপন করে নিয়েছিলেন হরিয়ানার গুরগাঁও-তে জন্ম নেয়া এই ছেলেটা। সেদিন হয়তো ভাবনার ত্রিসীমানাতেও ছিল না, এশিয়ার সবচেয়ে বড় ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে অনেক বছর পরে রাজত্ব করবে সে, কোন স্টারডম নয়, শুধু ডেডিকেশন আর তুখোড় অভিনয় দিয়ে! ফিল্মফেয়ারে সেরা অভিনেতার পুরস্কার উঠবে তার হাতে, পুরো ভারত জানবে তার নাম, দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়বে তার দুর্দান্ত প্রতিভার খ্যাতি- এসবকিছু সেই সময়ে রাজকুমার রাও’য়ের কল্পনাতেও ছিল না। সেই রাজকুমার রাও, গতবছর সেরা অভিনেতা হিসেবে জয় করে নিয়েছিলেন বলিউডের সবচেয়ে মর্যাদার পুরস্কার ফিল্মফেয়ার, তাও ক্রিটিক্স চয়েজে! অনেকে পুরো ক্যারিয়ারে একটা ফিল্মফেয়ার পায় না, আর এই ভদ্রলোক একই রাতে দু-দুটো ব্ল্যাকলেডি(ফিল্মফেয়ার ট্রফি) ঘরে নিয়ে এসেছিলেন! অন্যটা পেয়েছেন সেরা পার্শ্ব অভিনেতা হিসেবে।

২০১৭ সালটাই পুরোপুরি রাজকুমার রাওয়ের ছিল। শাহরুখ-সালমানের মতো সুপারস্টারদের সিনেমাগুলো এবছর বানিজ্যিকভাবে ব্যর্থ, অথচ অল্প বাজেটে বানানো রাজকুমার রাও অভিনীত বেশীরভাগ সিনেমাই লগ্নি ঘরে তুলে আনতে পেরেছে, প্রযোজকের মুখে ফুটিয়েছে হাসি। গত কয়েকবছরে ভারতের সিনেমায় একটা অন্যরকমের পালাবদল ঘটছে, বিশেষ করে বলিউড সেটা প্রত্যক্ষ করছে বেশী। সিনেমার গল্পটা ভালো না হলে যতো বড় স্টারের মুভিই হোক না কেন, একটা সময়ে দর্শক সেটা প্রত্যাখ্যান করেছে। এই ব্যাপারটাই ঘটেনি রাজকুমারের বেলায়। তার মতে, একটা জিনিসই তাকে প্রভাবিত করতে পারে, সেটা হচ্ছে ভালো একটা স্ক্রীপ্ট। পরিচালক কে, সিনেমায় কো অ্যাক্টর কারা থাকবেন, তার চরিত্রের গুরুত্ব কতখানি, বাজেট কত- এসব কিছুই তিনি জানতে চান না, যদি স্ক্রীপ্টটা মনমতো হয়। সেই স্ক্রীপ্ট চয়েজের সুফল বলিউড দেখেছে গত বছরটায়। ট্র‍্যাপড, বেহেন হোগি তেরি, বরেলি কি বরফি, নিউটন, শাদী মে জরুর আনা- একেকটা সিনেমায় একেক অবতারে হাজির হয়েছেন রাজকুমার, এবং প্রতিটাতেই মনে রাখার মতো অভিনয় করেছেন, ট্র‍্যাপড বা নিউটনে তো ছুঁয়েছেন সামর্থ্যের চূড়াও!

রাজকুমার রাও, বলিউড, শহিদ, নিউটন, বরেলি কি বরফি, ট্র্যাপড

অথচ ক্যারিয়ারটা শুরু হয়েছিল অদ্ভুত সব ক্যারেক্টারে অভিনয় করে! ‘লাভ সেক্স অর ধোঁকা’য় তিনি অন্তরঙ্গ দৃশ্যের ভিডিও করে পরে সেগুলো দিয়ে ব্ল্যাকমেইল করতেন, আবার রাগিনী এমএমএসে তাকে দেখা গেছে গার্লফ্রেন্ডকে নির্জন এক বাংলোতে নিয়ে গিয়ে অন্তরঙ্গ হয়ে সেসব দৃশ্যের ভিডিও রেকর্ড করতে! সেই মানুষটা কেমন অদ্ভুত একটা ভিন্নতা নিয়ে এসেছেন সময়ের সঙ্গে, সাদাসিধে রোলে তিনি দারুণ মানানসই, আবার সেই সাধারণের মধ্যে থেকেই হুট করে অসাধারণ হয়ে ওঠেন, সেই ট্রান্সফর্মেশনটাও এত বিশ্বাসযোগ্যভাবে করেন, মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকা ছাড়া উপায় থাকে না দর্শকের!

এবছরের সিনেমাগুলোতেই দেখুন না, বেহেন হোগি তেরি- তে তিনি বেকার প্রেমিক, পাড়ার সুন্দরীকে পেতে যিনি মরিয়া, যার ভাই হতে তার তীব্র আপত্তি। শাদী মে জরুর আনার সরকারী ক্লার্ক সত্যেন্দ্র, ইন্টারভালের আগে এক রূপ, পরে আরেক রূপ! এমন অদ্ভুত পরিবর্তন আমাদের শুধু আনন্দই দেয় না, চোখকে তৃপ্তও করে। সারভাইভাল ড্রামা ‘ট্র‍্যাপড’- এ তিনি আটকা পড়েছেন নিজের ফ্ল্যাটে, বের হবার কোন উপায় নেই, কাউকে জানাতেও পারছেন না, এই কারাগার থেকে কোনদিন মুক্তি পাবেন কিনা জানেন না, স্বাধীনতার যে আকুতিটা চোখেমুখে ফুটিয়ে তুলেছেন রাজকুমার, এক কথায় অনবদ্য! নিরামিষভোজী মানুষটা শুধু বেঁচে থাকার তাগিদে টিকটিকি-তেলাপোকা মেরে খাচ্ছেন, প্রাণ বাঁচানোর যে আদিম তাড়নাটা রাজকুমার রাওয়ের চোখে খেলা করেছে, সেটা বিশেষণ ব্যবহার করে আপনি বর্ণনা করতে পারবেন না। এই সিনেমার জন্যে সমালোচকেরা তাকে সেরা অভিনেতার পুরস্কার দিয়েছে ফিল্মফেয়ারে, তুখোড় মেধা আর ডেডিকেশনের পুরস্কার খানিকটা হলেও পেলেন রাজকুমার রাও।

রাজকুমার রাও, বলিউড, শহিদ, নিউটন, বরেলি কি বরফি, ট্র্যাপড

নিউটনে তিনি সরকারী কর্মকর্তা, যেকোন মূল্যে ছিয়াত্তর জন আদিবাসী ভোটারের ভোটগ্রহন নিশ্চিত করতে যিনি বদ্ধ পরিকর। একগুঁয়ে, জেদি একরোখা ভাবটা এত দারুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন রাজকুমার, মনে হচ্ছিল সিনেমা নয়, বাস্তব কোন ডকুমেন্টরী দেখতে বসেছি বুঝি! অশ্বিনী আইয়ার তিওয়ারীর বরেলী কি বরফিতে তিনি স্ক্রীন শেয়ার করেছেন আয়ুশমান আর কৃতি শ্যাননের সঙ্গে, স্ক্রীনটাইম তুলনামূলক কম পেলেও পারফরম্যান্সে বাকী দুজনকে বিশাল ব্যবধানে ছাপিয়ে গেছেন অনায়াসে। এই তিনি আলাভোলা শাড়ির দোকানের সেলসম্যান, তো পরের মূহুর্তেই আবার ঢুকে যাচ্ছেন পাড়ার গুন্ডার রোলে, সমানে গালি আর ধমক দিয়ে যাচ্ছেন, আবার পরের দৃশ্যেই আয়ুশমানের মারের ভয়ে কেঁচো হয়ে যাচ্ছেন। সেকেন্ডে সেকেন্ডে এক চরিত্র থেকে অন্য চরিত্রে ঝাঁপ দেয়ার মতো দুরূহ কাজটা কি অনায়াসেই না করলেন তিনি! সেরা পার্শ্ব অভিনেতার পুরস্কার তিনি পেয়েছেন এই রোলের জন্যে, কিন্ত অনেকের চোখেই রাজকুমারই এই সিনেমার প্রাণ।

যশরাজ স্টুডিওর আলো ঝলমলে রাত কিংবা দু’টো ফিল্মফেয়ার ট্রফির মাঝে রাজকুমারের উজ্জ্বল হাসিটা আসলে পথচলার কষ্টের দিনগুলোকে বর্ণনা করতে পারবে না কখনও, পারবে না সিনেমার পেছনের গল্পগুলো বলতে, একটা চরিত্ররে ভেতরে ঢোকার জন্যে এই মানুষটার সীমাহীন ডেডিকেশনের স্বরূপটা ফুটিয়ে তুলতে। রাজকুমারের কাছে ‘স্ট্রাগল’ শব্দটা আসলে খুব বেশী অর্থ বহন করে না। তার মতে, যে ছেলেটা গ্র‍্যাজুয়েশন শেষ করে চাকরির আশায় বেকারজীবনের কঠিন সময় কাটাচ্ছে, তার জীবনটাও স্ট্রাগলের। স্ট্রাগল সবাইকেই করতে হয়, পদ্ধতিটা আলাদা থাকে।

এটাই রাজকুমার রাও। সাদামাটা, সাধারণ একজন। সেই সাধারণের ভেতরে লুকিয়ে থাকে অসাধারণত্ব, যেটা চোখে পড়ে না হরহামেশা। যিনি ক্যারিয়ারের শুরুর লগ্নে ‘শহীদ’ সিনেমায় অভিনয়ের জন্যে জাতীয় পুরস্কার পেয়ে বুঝে উঠতে পারেন না এর গুরুত্ব। তার কাছে ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড বা ফিল্মফেয়ার খুব একটা গুরুত্ব বহন করে না, যতোটা করে সিনেমার ভালো গল্পটা। গুরগাঁওয়ের মতো ছোট শহরে স্কুলের মঞ্চে নেচে গেয়ে অভিনয় করা ছেলেটা এখন বলিউড মাতিয়ে তোলেন অভিনয়ের দ্যুতিতে। শুভ জন্মদিন রাজকুমার রাও, যে রাজত্বের সূচনা হয়েছে ২০১৭-তে, সেটা সহজে ছাড়বেন না রাজকুমার, এটাই আমাদের চাওয়া। শুভকামনা আপনার জন্যে!

আরও পড়তে পারেন- বলিউডের নয়া রাজকুমার!

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close