গল্পটা তামিলনাড়ুর ইরোদ জেলার সাত বছর বয়েসী মোহাম্মদ ইয়াসিনের। দক্ষিণী সুপারস্টার রজনীকান্তের দারুণ ভক্ত সে। বাড়িতে ছোট একটা টেলিভিশন আছে ওদের, সেখানে প্রায় সারাক্ষণই একটা না একটা চ্যানেলে রজনীকান্তের সিনেমা দেখানো হয়। ইয়াসিনও ক্লান্ত না হয়ে একের পর এক চ্যানেল ঘুরিয়ে যায়, যেখানেই রজনীকান্তকে দেখতে পায়, সেই চ্যানেলটাই হয়ে যায় তার গন্তুব্য। তবে ইয়াসিন বোধহয় স্বপ্নেও ভাবেনি, প্রিয় এই নায়কের সঙ্গে কখনও তার দেখা হবে! স্বপ্নাতীত ব্যাপার স্যাপার তো কখনও ঘটে যায়, ইয়াসিনের সঙ্গেও তেমন কিছুই ঘটেছে। স্বয়ং রজনীকান্ত এখন ইয়াসিনের প্রশংসায় পঞ্চমুখ, ইয়াসিনের সারা জীবনের পড়ালেখার সবরকম খরচ বহন করার ঘোষণাও দিয়েছেন দক্ষিণী এই সুপারস্টার!

কিন্ত কি এমন কাণ্ড ঘটিয়েছে সাত বছরের ইয়াসিন, যে রজনীকান্ত তাকে নিয়ে পড়লেন? ঘটনাটা কয়েকদিন আগের। স্থানীয় পঞ্চায়েত স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়ে ইয়াসিন। ওদের বাড়ির অর্থনৈতিক অবস্থা খুবই খারাপ। বাবা দর্জির কাজ করেন, সংসার চালাতে অন্যের বাড়িতে ঠিকা বুয়ার কাজ করেন ইয়াসিনের মা। এত অভাবের মধ্যেও ছেলের পড়ালেখা বন্ধ হতে দেননি দুজনে, সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেই ছেলেকে পাঠিয়েছেন পঞ্চায়েতের স্কুলে। পুরনো বইখাতা জোগাড় করে চলে ইয়াসিনের পড়ালেখা, যে ইউনিফর্মটা পড়ে ইয়াসিন স্কুলে যায়, সেটার রঙ জ্বলে গেছে অনেক আগেই। বছর বছর ছেলেকে নতুন ইউনিফর্ম কিনে দেয়ার সামর্থ্যও নেই বাবা-মায়ের। 

রজনীকান্ত, থালাইভা, মোহাম্মদ ইয়াসিন, সততা, তামিলনাড়ু

কয়েকদিন আগে স্কুলের টিফিন ব্রেকের সময় ক্লাস থেকে বেরিয়ে মাঠে গিয়েছিল ইয়াসিন। সেখানেই পাঁচশো রূপির একটা নোটের তোড়া পড়ে থাকতে দেখে সে। ছোট্ট ছেলেটা এটুকু তো বুঝতে পেরেছিল যে, এই টাকার মূল্য অনেক। টিফিনে পাঁচ রূপির কুলফি খাওয়ার বায়নাও পূরণ হয় না প্রতিদিন, সেখানে পাঁচশো রূপির এতগুলো নোটের লোভটা সামলে ফেললো ইয়াসিন! টাকাটা তুলে নিয়ে গেল তার ক্লাসের এক শিক্ষকের কাছে। তাকে খুলে বললো সব, কিভাবে কোথায় টাকাটা পেয়েছে সে। সেই শিক্ষক তাকে নিয়ে গেলেন প্রধান শিক্ষকেত কক্ষে। গুণে দেখা গেল, সেখানে মোট পঞ্চাশ হাজার রূপি ছিল!

প্রধান শিক্ষক নোটের তোড়া আর ইয়াসিনকে নিয়ে ছুটলেন থানায়। ঘটনা শুনে তো পুলিশ সদস্যদেরও চক্ষু চড়কগাছ! সাত বছরের এই ছোট্ট ছেলেটার সততায় মুগ্ধ হয়ে গেল সবাই। থানার সুপারিন্টেনডেন্ট যখন ইয়াসিনকে পুরস্কার হিসেবে এক হাজার রূপি দিতে চাইলেন, সেই টাকাটাও নেয়নি ইয়াসিন। তার সাফ কথা, ‘এটা আমার টাকা নয়, এখান থেকে আমি কেন নেব? আমার বাবা শুনলে রাগ করবে…’

ঘটনাটা ছড়িয়ে পড়তে সময় লাগেনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইয়াসিনের ছবি আর ঘটনাটার উল্লেখ করে পোস্ট করেছিলেন থানার পুলিশদের কেউ একজন। সেখান থেকেই ভাইরাল হয়েছে ইয়াসিনের এই ঘটনা। খুব দ্রুতই পুরো ভারতের মানুষ, বিশেষ করে যারা ফেসবুক বা টুইটার ব্যবহার করেন তারা জেনে গেছেন ইয়াসিনের এই গল্পটা। অনেক নামীদামী তারকারাই ইয়াসিনকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, তার ছবি বা ঘটনাটা শেয়ার দিয়েছেন। 

রজনীকান্ত, থালাইভা, মোহাম্মদ ইয়াসিন, সততা, তামিলনাড়ু

তবে কাজের কাজটা করেছেন রজনীকান্ত। দক্ষিণ ভারতের মানুষ তাকে অন্যরকম শ্রদ্ধা করে, তার নামে পূজা দেয়, তার সিনেমা মুক্তি পেলে এখনও অঘোষিত ছুটি থাকে একটা দিন, টিকেটের জন্যে কাড়াকাড়ি লেগে যায়। ভক্তরা ভালোবেসে তাকে ডাকে থালাইভা, পর্দায় তিনি দুষ্টের দমন করেন। তবে এবার পর্দা ছাপিয়ে রজনীকান্ত বাস্তিবের নায়ক হতে এগিয়ে এলেন। খুঁজে বের করলেন মোহাম্মদ ইয়াসিন আর তার পরিবারকে। তাদের ডেকে নিলেন নিজের অফিসে। 

ইয়াসিনের পরিবার অবাক হয়ে গিয়েছিল, যখন তারা শুনেছিল স্বয়ং রজনীকান্ত তাদের সঙ্গে দেখা করতে চান! আলমারীতে তুলে রাখা সবচেয়ে ভালো জামাকাপড়গুলো বের করে পরিবারের সবাই মিলে গিয়েছিল রজনীকান্তের অফিসে। রজনীকান্ত নিজেই স্বাগতম জানিয়েছিলেন তাদের, ছোট্ট ইয়াসিন মুগ্ধ হয়ে দেখছিল তার প্রিয় নায়ককে। পর্দার সঙ্গে অনেক অমিল, বাস্তবের রজনীকান্ত অনেকটা বুড়িয়ে গেছেন, মাথার চুল কমে গেছে, গালের দাঁড়িগুলো পাকা, চোখে চশমা। কিন্ত তবুও ইয়াসিনের কাছে নায়ক মানে তো রজনীকান্তই! তার কোলে বসে সেদিনের পুরো ঘটনা আবার বলেছে ইয়াসিন, রজনীকান্তও ভীষণ মনযোগী শ্রোতার মতো করেই শুনেছেন গল্পটা। তারপর কথা বলেছেন ইয়াসিনের বাবা মায়ের সঙ্গে।

দারিদ্র‍্যতার সঙ্গে ইয়াসিনের পরিবারের সংগ্রামের কথা আগেই জেনেছিলেন রজনীকান্ত। ইয়াসিনের সততার এই ঘটনাটা তাকে নাড়া দিয়ে গিয়েছিল ভীষণ। অর্থাভাবে এমন ভালো একটা ছেলে পড়ালেখা করতে পারবে না, তার ভবিষ্যতটা অন্ধকার হয়ে যাবে, সেটা তিনি কোনভাবেই হতে দিতে চাননি। তাই বলেছেন, ইয়াসিনের পড়ালেখার সমস্ত দায়িত্ব তিনি নিতে চান। আর সিদ্ধান্ত গ্রহণের এই ব্যাপারটা তিনি ছেড়ে দিয়েছেন ইয়াসিনের বাবা-মায়ের ওপরেই। তারাও আপত্তি করেননি। ইয়াসিন জানিয়েছে, সে আপাতত পঞ্চায়েতের স্কুলেই পড়তে চায়, কোন ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে যাওয়ার ইচ্ছা নেই তার। রজনীকান্তও মেনে নিয়েছেন তার ইচ্ছেটা। 

রজনীকান্ত, থালাইভা, মোহাম্মদ ইয়াসিন, সততা, তামিলনাড়ু

সাংবাদিকেরা এই ব্যাপারে জিজ্ঞেস করেছিলেন রজনীকান্তকে, তিনি বলেছেন- “দেখুন, আমাদের সমাজে সবাই সবাইকে ঠকিয়ে দুটো পয়সা কামাতে চায়। অল্প ক’টা টাকার জন্যে বন্ধু বন্ধুকে খুন করে ফেলছে, এমন ঘটনাও আমি পড়েছি পত্রিকায়। অথচ এই ছেলেটা, ওর মাত্র সাত বছর বয়স, সে এতগুলো টাকা কুড়িয়ে পেয়েও বলেছে এগুলো তার টাকা নয়, ফেরত দিয়েছে সেগুলো! এমনটা তো সহজে দেখা যায় না। ইয়াসিনের এই গুণটা আমাদের প্রত্যেকের ভেতরে থাকাটা খুব দরকার।”

রজনীকান্ত আরও বলেছেন- “এই ছেলেটাকে সাহায্য করতে পারছি, এটা আমার জন্যে খুবই ভাগ্যের ব্যাপার। এমন সততা তো আজকাল খুঁজে পাওয়া যায় না। ইয়াসিন বলেছে সে আপাতত পঞ্চায়েতের স্কুলেই পড়তে চায়। প্রাইমারী লেভেলটা শেষ হলে ওর সঙ্গে কথা বলেই আমরা সিদ্ধান্ত নেবো, এরপরে কোথায় ও পড়বে। আপাতত ও এখানেই ভালো আছে বলে জানিয়েছে।”

রজনীকান্ত রাজনীতিতে যোগ দিয়েছেন বেশ কিছুদিন আগে। সিনেমায় অজস্রবার নীরিহ আর অত্যাচারিত মানুষের আশ্রয় হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন থালাইভা, এবার বাস্তব জীবনেও সেই চর্চাটা শুরু করে দিলেন মোহাম্মদ ইয়াসিনকে দিয়ে।

Comments
Spread the love