একদম ছোটবেলায় মা’কে হারিয়েছিল ছেলেটা। বাবাও সেই শোকে অপ্রকৃতস্থ হয়ে গেলেন। মাঝেমধ্যেই নিরুদ্দেশ হয়ে যেতেন, খোঁজ পাওয়া যেতো না অনেকদিন ধরে। হুট করেই একদিন চলে গেলেন অজানার দেশে, যেখান থেকে কেউ আর ফিরে আসে না। রাজীব নামের ছেলেটার জীবনযুদ্ধের শুরুটা ততদিনে হয়ে গিয়েছে। হাইস্কুলে পড়া ছোট্ট একটা ছেলে, বাবা-মা দুজনকেই অকালে হারিয়ে অথৈ জলে ভেসে যাচ্ছিল। ছোট দুই ভাইকে নিয়ে তার আশ্রয় হয়েছিল পটুয়াখালীর নানার বাড়িতে। সেখান থেকে অনেক বছর বাদে ঢাকায়, খালার বাসায় থাকলেন কিছুদিন। এইচএসসি পাশ করার পরে কলেজের হলে গিয়ে উঠলেন। ঢাকায় আসার সময় রাজীব কি জানতেন, এই শহরটা, আর শহরের মানুষরূপী যন্ত্রদানবগুলো একদিন ওকে পিষে মেরে ফেলবে? ওর স্বপ্নগুলো দুটো বাসের মাঝখানে চাপা পড়ে ভেঙেচুড়ে গুড়িয়ে যাবে!

এপ্রিলের তিন তারিখে বিআরটিসির লালরঙা ডাবল ডেকারের দরজায় দাঁড়িয়ে ছিলেন তিতুমীর কলেজের স্নাতকের ছাত্র রাজীব, কোথাও যাচ্ছিলেন। কারওয়ান বাজারের সার্ক ফোয়ারার মোড়ে হুট করেই অন্য একটা বাস এসে চাপা দিলো বিআরটিসির দরজা বরাবর। দাঁড়িয়ে থাকা রাজীব সরে যাওয়ায় সুযোগ পেলেন না ঠিকটাক, কিংবা শরীরটা সরিয়ে নিতে পারলেও, হাতটা সরাতে পারলেন না সময়মতো। দুটো বাসের মাঝখানে চাপা পড়ে গেল রাজীবের ডান হাতটা, অবাক হয়েই রাজীব দেখলেন, হাতটা তার শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে, ঝুলে আছে পাশাপাশি লেগে থাকা দুটো বাসের মাঝখানটায়! কারো চোখে সেটা কাটা হাত, কারো কাছে ভাংচুর হওয়া একদল স্বপ্ন! যে হাতে পরিশ্রম করে ছোট দুই ভাইকে নিয়ে মানুষের মতো করে বাঁচতে চেয়েছিলেন রাজীব, সেই হাতটা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল ওর শরীর থেকে, দুটো বাসের এগিয়ে যাবার একটা অসুস্থ প্রতিযোগীতার বলি হয়ে!

উদ্ধার করে শমরিতা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল রাজীবকে, সেখান থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। শমরিতা হাসপাতালে একদিনে যা বিল হয়েছিল, সেটা পরিশোধের সামর্থ্যও ছিল না রাজীবের স্বজনদের। প্রথমদিকে অবস্থার একটু উন্নতি হলো, কিন্ত ডান হাতটা শরীর থেকে আলাদা হয়ে গেছে, এটা বুঝতে পারার পরেই অজানা এক অভিমানে সবার সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছিলেন রাজীব। কার প্রতি সেই অভিমান, মনের ভেতরে জমে থাকা পুঞ্জিভূত ক্ষোভগুলো কার ওপরে ঝাড়তে চান, সেসব জানা যায়নি। বাম হাত দিয়ে মাঝে মাঝে কাটা পড়া ডান হাতটা খুঁজতেন, খুঁজে না পেয়ে আনমনেই নীরব হয়ে যেতেন। কেউ ডাকলে জবাব দিতেন না, জোর করেও কিছু খাওয়ানো যেতো না। নাম ধরে কেউ তাকে ডাকলে বলতেন- রাজীব কে? রাজীব মরে গেছে!

সড়ক দুর্ঘটনা, আয়েশা একসিডেন্ট, রাজীবের কাটা হাত

মেন্টাল শকটা কাটছিল না একদমই। শারীরিক অবস্থাও খারাপ হচ্ছিল ধীরে ধীরে। ভীষণ পরিশ্রমী ছিলেন রাজীব, কলেজে পড়ার সাথে সাথেই ছাত্র পড়াতেন, কম্পিউটার কম্পোজ আর গ্রাফিক্স ডিজাইনের কাজ শিখেছিলেন, তাতে যদি আয় রোজগার কিছু বাড়ে! রাজীবের কল্পনাজুড়ে ছিল নিজে বড় কিছু হয়ে ছোট দুই ভাইয়ের দায়িত্ব নেয়ার, এতিম দুই ভাইকে একটু স্বস্তিদায়ক জীবন উপহার দেয়ার। ঢাকা মেডিকেলের ধবধবে সাদা বিছানায় শুয়ে নিজের সেই স্বপ্নগুলোকে মরে যেতে দেখেছেন রাজীব, তার মৃত্যুর শুরুটাও কি সেখান থেকেই শুরু হয়ে গিয়েছিল?

মাদ্রাসায় পড়ুয়া দুটো ছেলেকে নিজের খরচে পড়াতেন রাজীব, ওদের থাকা-খাওয়ার টাকাটাও যতোটা সম্ভব নিজেই বহন করতেন। হৃদয়টা আকাশের সমান বিশাল ছিল রাজীবের, নিজের পকেটে টাকা নেই, তবুও এতিম দুটো ছেলের সব দায়দায়িত্ব পালন করার চেষ্টা করতেন পুরোপুরি। বাবা-মাকে হারিয়ে ফেলার কষ্টটা তো রাজীবের চেয়ে ভালো কেউ জানেন না। এমনই দুটো অসহায় ছেলের পাশে সবটুকু মায়া-মমতা নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন রাজীব। ওরা দুজনে পত্রিকায় জানতে পেরেছিল, ওদের রাজীব ভাইয়ার হাত কাটা পড়েছে বাসের চাপে। দুজনে হাসপাতালে রাজীবকে দেখতেও এসেছিল, কিন্ত রাজীব ভাইয়া কথা বলেনি ওদের সঙ্গে।

রাজীবের শরীরের অবস্থার অবনতি হচ্ছিল ধীরে ধীরে, রক্তচাপ কমে গিয়েছিল ভীষণ, সেটা বাড়ানো হয়েছিল ঔষধ দিয়ে। হৃদযন্ত্র, কিডনি, ফুসফুসের মতো অর্গানগুলো কাজ করছিল না, চিকিৎসকেরা প্রাণপণ লড়ছিলেন রাজীবকে বাঁচাতে, কিন্ত যে মানুষটার স্বপ্নগুলো মরে গেছে, তাকে বাঁচিয়ে রাখাটা তো সহজ কিছু নয়। ডাক্তারেরা পারলেন না, জীবনের সাথে লড়াইতে হেরে গেলেন রাজীব। মস্তিস্কে রক্তক্ষরণ শুরু হয়েছিল গতকাল, জ্ঞান হারিয়েছিলেন আরও অনেক আগেই, সেই জ্ঞান আর ফেরেনি রাজীবের, বাবা-মায়ের মতো অকালে শেষযাত্রা করেছেন তিনিও! গতকাল রাত ১২:৪০ মিনিট নাগাদ লাইফ সাপোর্ট খুলে ফেলা হয়েছে রাজীবের।

এই শহর থেকে রাজীবের জীবনের অধ্যায়টা ফুরিয়ে গেছে। এই শহরে রাজীবরা এভাবেই মরে । রাজীবের হাতটা কাটা পড়েছিল আগেই, ঢাকা মেডিকেলের মর্গে আরেকদফা কাঁটাছেঁড়া করা হয়েছে রাজীবের নিথর শরীরটাকে। মৃত্যুর কারণ হিসেবে স্বপ্নভঙ্গের নামটা লেখা থাকবে না নিশ্চয়ই। এই শহরে সম্মানের সাথে দাঁড়ানোর মতো জায়গা তৈরি করার নেশায় নিরন্তর ছুটছিল যে ছেলেটা, সেই রাজীব ছুটতে ছুটতেই কখন যে খরচের খাতায় জমা হয়ে গেল, সেটা সে বুঝতেই পারলো না! রাজীব চলে গেছেন না ফেরার দেশে, বাবা-মায়ের কাছে। অব্যক্ত অভিমানের গল্পগুলো ওদের নিশ্চয়ই খুলে বলবেন রাজীব, হাসপাতালের বেডে শুয়ে যেটা বলে যেতে পারেনি ছেলেটা!

অ্যাম্বুলেন্স সাইরেন বাজিয়ে ছুটে চলেছে পটুয়াখালীর দিকে। এই শহর আর শহরের মানুষগুলো রাজীবের মৃত্যুর কারণ ছিল, আবার এই শহরেরই হাজারো মানুষ রাজীবের কষ্টের কথা শুনে তার জন্যে প্রার্থনা করেছে, তার সুস্থ হয়ে ওঠার কামনায় দুই হাত তুলেছে স্রষ্টার কাছে। সেসবকে ব্যর্থ করে দিয়ে রাজীবের শরীরটা নিয়ে অ্যাম্বুলেন্স ছুটে চলেছে পটুয়াখালীর পথে। সেখানেই যে হবে রাজীবের শেষকৃত্য। পৃথিবী রাজীবকে শুধু দুঃখ আর কষ্টই দিয়েছে, অন্য ভূবনে রাজীবের কোন কষ্ট না হোক, এটাই শুধু কামনা।

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-